× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হেম্মত আলীর চেয়ার

তমোনাশ চট্টোপাধ্যায়

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৫:১১ পিএম

শক্তিশালী বাঙালি গল্পকার মঞ্জু সরকারের সদ্য প্রকাশিত গল্পসংকলন ‘শখের বাগানে সাপ’। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শক্তিশালী বাঙালি গল্পকার মঞ্জু সরকারের সদ্য প্রকাশিত গল্পসংকলন ‘শখের বাগানে সাপ’। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শক্তিশালী বাঙালি গল্পকার মঞ্জু সরকারের সদ্য প্রকাশিত গল্পসংকলন ‘শখের বাগানে সাপ’। এই গ্রন্থটি মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের সদ্য ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান। দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি, নানা সামাজিক শ্রেণি ও বিবিধ অনুরাগী ও বিরাগী স্বার্থ-স্বরচালনা কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে শিরোপরি দণ্ডায়মান করে দিতে পারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান তারই স্মারক। মঞ্জু সরকারের গল্প সংকলনটি প্রায় পুরোটাই এই চলনটির গায়ে গায়ে লেপ্টিয়ে আছে। সদ্য উৎখাত হওয়া শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সরকার সম্বন্ধে সমাজের নানা স্তর ও শ্রেণির কী প্রতিক্রিয়া তা লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেখানে একেবারে দীনহীন মাজা ভাঙা বুড়ি থেকে ফেসবুক বিলাসী প্রতিবাদী, সাংবাদিক থেকে হেম্মত আলী ভ্যান।

 ‘শখের বাগানে সাপ’ তার চতুর্দশতম গল্পগ্রন্থ। এই দীর্ঘযাত্রায় মঞ্জু সরকার সম্ভবত নিজের যুগদূত ও সমকালৈতিহাসিক ভূমিকাকে নজরে রাখতে চান। এই দিক দিয়ে তিনি তারাশঙ্করের উত্তরসূরি। ‘শখের বাগানে সাপ’ তাই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে সমকালকে। লেখক চেষ্টা করেন বাংলাদেশের প্রতিটি কোণ ও মন থেকে নিঃসৃত স্বর সংকলন করার এবং বেশিরভাগই তিনি সম্পাদনা করেন না, তাকে তার মত থাকতে দেন। যাত্রাটি খুবই কঠিন। ঐতিহাসিকের নির্মোহ দৃষ্টি লেখকের প্রায় স্বচ্ছ। ব্লার্বে কথিত ‘সত্যসন্ধ ও দায়বদ্ধ’ বিশেষণ দুটি লেখকের এ যাবত লেখালিখির ফলশ্রুতি। 

মামুন হোসাইনের আঁকা প্রচ্ছদটি চমৎকার। চোখের ব্যবহারের পিকাসোকে মনে করিয়েছেন শিল্পী। দুটি মানুষ না তিনটি এই ভাবনাও উস্কে দিয়েছেন। সাপ ও মানুষকে সমদেহধারী একটি প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি। প্রচ্ছদ বইয়ের নামগল্পকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছে। ভুললে চলে না কালো রঙের প্রয়োগ। কালো রাত্রির কয়েকটি মুখ আলোয় এনেছেন প্রচ্ছদকার।

 বইটিতে মোট গল্প আটটি। বেশিরভাগই আকার মোটেই ছোট না। অনেক গল্পের শেষে একটি চমকে দেওয়া মোচড় আছে সত্যি কিন্তু তীব্রতা গায়ে গতরে কম, যেন একটি নাদুস কিশোরের তীব্র দুটি চোখ ও ভাষার প্রবল বুদ্ধিদীপ্ততা। সাতটি গল্পে পরিবেশিত সময়কাল বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের সামান্য পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকারের শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা।

 প্রথম গল্প ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’ সরাসরি এই ঐতিহাসিক ঘনঘটার অংশীদার নয়। তবে এক খুদে চাষির মর্মকথা। চাষি মামুদের ‘ভালোবাসার বউ’ অত্যন্ত গোছানো সংসারী মহিলা। মূলত তার সেবায় মামুদের বিশ হাজারে কেনা বাছুর লাখ দুই লাখে বিক্রি হয়। দেখা যায় মামুদের দুই ছেলে সবুজ অবুজকে। মেধাবী সবুজ বিদেশে যেতে চায়। মামুদের সম্পত্তি বলতে সামান্য ভিটে জমি আর গরু কটা। প্রতিবেশী বন্ধু শুটকুর পরামর্শে তার নিজের দেখানো গরু গেইলকে বেচে বিদেশি পাইকারের কাছে। সাথে ওই পাইকারি ট্রাকে রাতজাগা গরু পাহারার ঠিকাশ্রমিক হয়ে চেপে বসে ১০-১৫ হাজার বেশি পাওয়ার স্বপ্নে। কিন্তু কোথায় যাবে স্নেহÑ 

 ‘দু’বছরের নিত্যসঙ্গী প্রাণীটার এমন রক্তাক্ত পরিণতি কল্পনা করতে ভালো লাগে না’ Ñ 

আরও একটা জিনিস উঁকি দেয় গেইল আর সবুজ মামুদের পরিবারের মূলধন। এক মূলধন খাটিয়ে আরেক মূলধন থেকে লাভ তুলতে চায় মামুদ। শেষের দিকে স্নেহ ও এই কঠিন দ্বন্দ্ব মামুদকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির ডাক, ক্লান্তি ও ক্লান্তিজনিত ঘুম তাকে কব্জা করে ফেলে। ঢলে পড়ে সে তার প্রিয় গেইলের শরীরে।

 ‘কুড়ানি বুড়ি ভাদুর মা’ থেকে সরাসরি আওয়ামী লীগের দুষ্কর্মের ছবি সামনে আসে। ভাদুর মা কুড়ানি পুরনো সংগ্রাহক সভ্যতার এক প্রতিনিধি যেন। এতে অবশ্য কেউ অখুশি হয় না। এটা যেন প্রাকৃতিক। কিন্তু বুড়ির স্থাবর সম্পত্তি তো তা হতে পারে না! তাতে মিঠে কথায় ভাগ বসাতে চেষ্টা করে ভাদু। কিন্তু স্বাধীনচেতা কুড়ানিকে বশ করা ভাদুর কম্ম না। আসরে নামে গায়ের মোড়ল ভূঁইয়া। ছলে কৌশলে ভাদুর মাকে বশ করে স্থাবর হাতাতে চায় আওয়ামী লীগের এই নেতা। কিন্তু বুড়ির বাহাসে এমন কথা উঠে আসে যে মোড়লের সাথে তাবত পাঠকও যেন থ’ মেরে যায়Ñ

‘ওই জমির মালিক আমি না বাবা। জমির আসল মালিক আল্লাহ।… আল্লাহর দুনিয়ার ওপর সব বান্দারই সমান হক আছে। … আল্লাহর জমি বেচাকেনা কইরা টাকা লাগবে না আমার…’ 

ভাদুর মা ছোটবেলায় একবার দৈবক্রমে বিখ্যাত বাংলাদেশি সমানাধিকার প্রবক্তা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গলাভ করেছে। লেখক অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে বাংলাদেশি জনমানুষের অনেক ভেতরে নিহিত তবুও অন্তরে সজাগ মার্কসবাদী ভাবনা ভাদুর মার মতো যথার্থ সর্বহারার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। একটু অতিকথনদোষ থাকলেও গল্পটি এখানে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

 ‘শখের বাগানে সাপ’ সংকলনে দুটি গল্পকে রূপক বলে আমার মনে হয়েছেÑ ‘দাঁতভাঙ্গা হাসি’ ও ‘কবর’। ‘দাঁতভাঙ্গা হাসি’ গল্প হিসেবেই বেশ ভালো। অন্য গল্পের মতো শেষতক একটা চমকের বদলে এই গল্পে পরতে পরতে চমক আর সেসবের জোগানদার মূল নারী চরিত্র একটি অজ্ঞাতনাম্নী যুবতী। প্রেমিক যুগল এক পার্কে বসে আছে। যুবকটি আসন্ন দেহ মিলনের কল্পনাবিলাসী আশায় উদ্দাম। কিন্তু যুবতী বলতে থাকে একে একে তার বহুবিধ কথা, যা গত এক বছর যাবৎ এগারোটি ডেটের অন্তেও যুবকের অজানা। সে চমকে চমকে ওঠে। যুবতীটি একটি দুর্ঘটনায় হারিয়েছে তার সব দাঁত। আজকে যুবক যে হাসি দেখে আসক্ত, আরক্ত তা সবই নকল দাঁতের… কী নিদারুণ পরিহাস!!

 দ্বাদশতম এই ডেটে এসে ধরা দিয়েও নারী থেকে যায় অধরা। চিরন্তন প্রেমকে শরীরের থেকে উঁচুতে তুলে ধরে জানায় ‘শরীর কি শুধু খেলাধুলার জন্য’- এরপরও জোর করলে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে – ‘তুমি শুনলে হতাশ হবে এজন্য ফোনে বলিনি। কাল রাতেই মাসিক শুরু হয়েছে আমার।’ এই গল্পের শেষ পর্বে লেখকের একটি রেখা দারুণ ‘সহসা সচল হয়ে ওঠা জ্যামের একটি বড় বাসের জ্যান্ত হয়ে ওঠার গর্জন’ কার এ গর্জন!! এই গল্পের রূপক চেহারাটিতে যুবতী আওয়ামী লীগ সরকার ও যুবক প্রতিশ্রুতি আশ্বস্ত জনতাÑ হয়তো এটা আলোচকের ভ্রম, হয়তো নয়; শেষ মুহূর্তে ভেঙে দেওয়া সরকারি প্রতিশ্রুতির মতো যুবতীও যেন বা, আর যুবতীর নয়নলোভন হাসিটি সরকারি শোভনতার মতই নকল।

 ‘কবর’ লেখকের রূপকাশ্রয়ী দ্বিতীয় গল্প। নগরশহরের দিকে ছুটে চলা একরোখা জনস্রোত, একটু সাচ্ছল্য আসতে না আসতেই মরিয়া চেষ্টায় মানুষ ছোটে শহরে, শহর গর্ভিণীর মতো ওঠে বেড়েÑ এসবের বর্ণনায় গল্পের প্রথমেই সুনিপুণ বর্ণনায় লেখক অধিকার করেন মন। শহরমুখী এই বিরাট জনস্রোত আকাশে তুলে দেয় ভাড়াবাড়ির মুখ ও চাহিদা। এহেন পরিস্থিতিতে জনৈক সাংবাদিক বাড়ি ভাড়া নেন। সে বাড়ির চোখে পড়ার মতো জিনিস উঠোনে একটি বাঁধানো, পাকা ছাতওয়ালা কবর, বাড়িওয়ালা কুদ্দুস হাজির আব্বা হুজুর শহীদ মাতবরের। ধীরে ধীরে জানা যায় কুদ্দুস হাজির বাবার নানা বিচিত্র খবর। সাংবাদিকের স্ত্রী সংগ্রহ করে জানানÑ ‘বাড়িওলার বাপ একটা গুন্ডা ছিল। ভেজালি জায়গা কিনে বাড়ি করেছে। আর বাড়িঅলা সহোদর ভাইদের জমি দখল করতেই বাপকে বাড়ির সামনে মাটি দিছে।’

এদিকে জাতীয় শোক দিবস নিয়ে উপযুক্ত লেখা না লেখায় চাকরি গেল সাংবাদিকের। কুদ্দুসের বাবা ভেজাল শহীদ মাতবরের জন্য তাকে ওই ধরনের লেখাই লিখতে হবে ফেসবুকে, শেষে তাই সাব্যস্ত হয়। সাংবাদিকতা জিনিসটা যে দেশে অব্যবহার্য, পুরনো, মূল্যহীন এই গল্পটি তারই প্রমাণ। আর রূপকার্থে কুদ্দুস কাজী শেখ হাসিনা, শহীদ মাতবর মুজিবুর রহমান।

 এই সংবাদ প্রতিবাদ সূত্রেই আসে পরের গল্প ‘পেশাদার প্রতিবাদী’। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কুলিমুল্লা, শেখ হাসিনা সরকারের প্রবল প্রতিবাদী। ঘটনাক্রমে কলিমুল্লা পেয়ে যান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার বাসভবনে ডিনারের নিমন্ত্রণ। এমন শাঁখের করাতে কলিমুল্লাহ জীবনে পড়েননি। নিমন্ত্রণ করে প্রধানমন্ত্রী ভালো কথাই বলবেন, প্রশংসা করবেন, সেই সুতো ধরে জুটে যেতে পারে কোন সরকারি নামজাদা পুরস্কারওÑ কলিমুল্লা মনগড়া নানা কল্পনায় উড়তে থাকেন। সরকারের প্রতিবাদীদের, বিশেষত বুদ্ধিজীবীদের মুখে পুরস্কার গুঁজে চুপ করানো তথাকথিত সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার পুরনো, কাজের ও প্রচলিত প্রথা। শেষ পর্যন্ত প্রায় নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়া দিনে দেশের বাড়িতে অসুস্থ দাদিকে দেখতে যাওয়ার বাহানায় ছাড় মেলে কলিমুল্লার। কিন্তু এই শখের সাংবাদিক, ফেসবুক-প্রতিবাদীকে শেষ পর্যন্ত এই না যাওয়া যেভাবে পেড়ে ফেলে তাতে আম ও ছালা দুইই হাতছাড়া। দেশের বাড়ির অবস্থায় মনে হয় সরকারি নেকনজরের সম্ভাবনা অথবা প্রতিবাদীর ভাবমূর্তি দুয়ের কোনোটাই বোধহয় কলিমুল্লা শেষ পর্যন্ত বজায় রাখতে পারবে না।

 এই সংকলনের সবচেয়ে জমাট গল্প ‘লুণ্ঠিত সিংহাসন’। হেম্মত আলী ভ্যানওয়ালা জুলাই অভ্যুত্থানের লুটপাটে গভীরভাবে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত অতি মূল্যবান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বসার চেয়ারটির সাথে লুট করে তার একটি শাড়িও। হেম্মত আলী ও বউ সখিনা দুজনেই চেয়ারটা রাখে অতি যত্নে অতি গোপনে খাটের তলায় কাঁথা-কানিতে চাপা। এইসব মেহনত করে হেম্মত আলী ছক করে বড় দাঁওয়ের। অনটন, যন্ত্রণা, গ্লানি নিত্যসঙ্গী হলেও একদিন যাই হোক করে খাচ্ছিল, অরাজকতা তাদের সেটুকুও রাখতে দিল না। দিন গুজরানো অসাধ্য, দেশ টালমাটাল, জাহাজের খবর আদার ব্যাপারীর গায়েও জোর ছেঁকা দেয়।

 যে কয়েকটি চরিত্র মঞ্জু সরকার ‘শখের বাগানে সাপ’ বইয়ে এঁকেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে রঙদার এই হেম্মত আলী। হেম্মত আলী বিচিত্রকর্মা, অভিজ্ঞতাও তার বিপুল। অভিজ্ঞতাই তো শেষতক জ্ঞান। তাই হেম্মত আলী জ্ঞানী। কর্মীও বটে, তাইতো এখনও ঝামেলা-বিপ্লব-আন্দোলনে পাঁচটা সাধারণ ভীতু লোকের মত ঘরে খিল দিয়ে বসে নেই সে। উদ্যম উন্নতির সার বুঝে সে খেয়ে না খেয়ে দিনের পর দিন সংগ্রহ করে আনছে পুরনো গণতন্ত্রের মুখোশে রাজতন্ত্রের ধ্বংসচিহ্নগুলো। মতলব পরে এগুলো চড়া দামে বেচবে। ঠিক চেয়ার বেচতে যাওয়ার রাতের শুরুর দিকে সেই চেয়ারে বসা হেম্মত আলীর হুকুমে বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনার শাড়ি গায়ে দেয় সখিনা। এই সময়ের সংলাপ ও ঘটনায় এক অমর চির স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করেছেন লেখক মঞ্জু সরকার, তাকে বাহবা। যদিও ওই তুঙ্গবিন্দু থেকেই পাঠককে খোঁচাতে থাকে একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতির আশঙ্কা। রাতে ভ্যানে চাপিয়ে চেয়ার বেচতে গিয়ে খুন হয় হেম্মত আলী। এই গল্পে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে উপস্থাপিত করেছেন লেখক। অন্য কিছু গল্পের মতো এর অতিকথনটা ঝুলে থাকে না গায়ে এঁটে বসে যায়। গল্প বড় ও গল্প ভালো। 

 পরের গল্প একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নিনাদ’। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লড়াই ১৯৭১-এ পাকিস্তানের অত্যাচার থেকে মুক্তির। এতে শেখ মুজিবুরের অবদান শ্রদ্ধাসহ স্মরণ করা হয়েছিল কত ৫০ বছরের বেশি। জুলাই অভ্যুত্থানে তা ফর্সা। নতুন রাজা বসলে পুরনো ধর্মকে যে মনোযোগ নিয়ে ধ্বংস করেন সেভাবে ভেঙে ফেলা হয় শেখ মুজিবুরের যাবতীয় ধারণা ও ছবি। এবারে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা পায় মুক্তিযোদ্ধা আকবর। নতুন যুগের নতুন মতের দুই যুবকের তাকে ধমকানোর দিন চারেক পরে শেখ হাসিনার গদি উল্টোয়। একদিন মুক্তিযুদ্ধান্তে আকবরের সমধর্মী মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের ধরে যা করত তারই কতটা ভাগ পেল সে। এমনকি তাদের হাতে রাজাকারদের লাঞ্ছনাস্থান গ্রামের বটতলেই তীব্র অপমানিত হলো আকবর। গলায় জুতোর মালা, মালার একটি ‘ফুলে’ আবার কোন বর্জ্য সেই সমেত মালাটি গলায় ঝুলিয়ে ছবি ওঠে তার। ফেসবুকে যাবে তা। সে কি পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে বলা ‘জয় বাংলা’ আবার বলে উঠবে!

বইটির নাম গল্পে আছেন অবসরপ্রাপ্ত আশরাফ সাহেব। তিনি মুক্তিযোদ্ধা, হাসিনা আমলের বড় সরকারি কর্মী ও নাস্তিক। আশরাফের মুখেই প্রথম আমরা শুনি একটি দলমত খ্যাতিবৃত্তি পেরোনো কণ্ঠস্বরÑ 

‘দেশটার যে কী হবে, কীভাবে থামবে এই টালমাটাল অবস্থা’

 সংকলনের আর কোনো চরিত্রেরই এই সিংহাবলোকন দেখা যায়নি। এই শেষ গল্পটি ২০২৫-এর নভেম্বরে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরের। তখন অন্তর্বর্তী মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। যাই হোক দেশ সামান্য স্থিত। আশরাফ সাহেব শেষ জীবন সুখে ও শৈশবে কাটাতে চান। একটা কথা মাথায় এসেই পড়ে আচ্ছা স্ত্রীদের শৈশব তবে কোনোদিনই ফিরে পাওয়া হবে না!! যাক, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের খুশিতে মসজিদের ইমাম এমদাদ মৌলানার মিষ্টি বিলোনোয় ও মিষ্টির প্রথম হকদার হিসেবে আশরাফকে নির্বাচন করায় আশরাফের স্ত্রী জিনাত বিহ্বল। গ্রামে নানান হিংসুটের বাক্যকর্মের জ্বালায় তিনি অস্থির। আবার গোদের ওপর বিষফোড়া। এ নিয়ে তুমুল দাম্পত্য কলহের শেষে জিনাত ঢাকা যাবার সিদ্ধান্ত নেন। আশরাফও বাধা দেন না। এই দাম্পত্যকলহে বাংলাদেশের অনেকখানি অন্তর্জগতের খবর আছে। আসে আশরাফের পুরনো বন্ধু, ছোটবেলার সহপাঠী আবুল। পুরনো বন্ধু হলেও আশরাফকে আবুল শ্রদ্ধাভাজন হিসেবে ‘আপনি’ বলে, আর নামতে পারে না। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় স্পষ্ট হয় হ্যাবস ও হ্যাবনটদের আসভ্যতা টানাপড়েন। আবুল তার চোখ খুলে দিল। ঝামেলা থেকে বাঁচতে ঢাকায় পালিয়ে যান আশরাফুলরা।

 বিশ্বের বহু দেশে পালাবদলকালীন সাহিত্য চিরকালই লেখা হয়ে এসেছে। ইতিহাসে এর গুরুত্ব খুব বেশি। ফরাসি বিপ্লবের প্রায় ১০০ বছর পরে লেখা ভিক্টর হুগোর শেষ উপন্যাস ‘১৭৯৩’, রাশিয়ার নভেম্বর বিপ্লবের পরের লেখা বরিস পাস্তেরনাকের ‘ডক্টর জিভাগো’, হিটলারের সময়কাল নিয়ে ফ্রিড্রিশ স্টোরবেরগের ‘তান্তে জোলেশ’, আফ্রিকার বিভিন্ন ছোট রাষ্ট্রের বিপ্লব ও বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি নিয়ে চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল এপার্ট’, ‘দা ক্যাম্প’ নামে ডাম্বুজও মারেসেরার ছোটগল্প সংকলনÑ এগুলো সামান্য কিছু উদাহরণ মাত্র। মঞ্জু সরকারের ‘শখের বাগানে সাপ’ পূর্বোক্ত বইগুলোর সমগোত্রীয়।

 পুরো বইতে মঞ্জু সরকারের ভাষা ব্যবহারে মনে হয় তিনি সবস্তরের ভাষা কান করে শুনেছেন, মনে করে রেখেছেন ও সুযোগ বুঝে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, প্রফেসার, বাড়িওয়ালা, বৌ-ঝি সবারই ভাষা স্বকীয়। চোদনা, বোকচোদ, খানকিরপুত, বালের এসব এখনো পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্যলোকে সুপ্রচলিত হয়নি। লেখকের বাস্তবদৃষ্টি, বাস্তব উন্মোচন ও সৎ সাহসের প্রশংসা করতেই হয়।

 বইয়ের বানান ও যতিচিহ্ন ব্যবহারের সামান্য ত্রুটি আশা করি পরের সংস্করণেই ঠিকঠাক হয়ে যাবে। 

 সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কথা ও শিল্পীদের কথা থাকলে সংকলন আরও হয়তো ইতিহাসনিষ্ঠ হতে পারত।

 ‘শখের বাগানে সাপ’ বইয়ের নামকরণের সমনামি গল্পটিতে যে কাহিনীর বিস্তার তাতে সাপ যে কে এ ভ্রম কিছুতেই নিরসন হয় না। শখের বাগানের শৌখিনটিই বা কে? বাংলাদেশের জনগণ না অন্য কেউ? এটিও একটি দোদুল্যমান প্রশ্ন। মনে হয় কোনো সিদ্ধান্তে আসার সময় এখনও হয়নি। সময়কালীন সাহিত্য থেকে চিরকালীন হয়ে ওঠার উপাদান মঞ্জু সরকারের এই গল্প সংকলনে আছে। দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গড়ায়!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা