ভ্রমণগদ্য
মাহবুব রেজা
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০২ পিএম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৫৩ পিএম
২০১২ সালের ছবি। ছাতিয়ানতলির পুকুর ঘাটে আড্ডায় বুলবুল চৌধুরী বললেন লন মিয়া দল বইন্ধা ছবি তুলি। ছবিতে বা থেকে থ্রিলার লেখক শেখ আবদুল হাকিম, কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী, নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া, ধ্রুব এষ, সুভাষ, লেখক, মামুন হুসাইন, কবি মাকিদ হায়দার। সামনে বসা বা থেকে প্রাবন্ধিক সালেহ আহমেদ, পুথিশিল্পী কাব্য কামরুল।
সিরাজদিখানের ছাতিয়ানতলি গিয়ে তার সন্ধান পেয়েছিলাম। আমরা মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে দলবল নিয়ে সারা দিনের জন্য বিক্রমপুরের এই গ্রামে যাই। ছাতিয়ানতলি যাওয়ার এই বিষয়টি অনেক বছর ধরেই চলছে। মহাত্মা ধ্রুব এষের মন খারাপ হলে আমাকে কল দিয়ে বলে, মাহবুব, মন খারাপ। ছাতিয়ানতলি যাওনের ব্যবস্থা করো।
বিক্রমপুর
গেলে কি মন ভালো হয়ে যায়!
জানি না। তবে ধ্রুবর মন খারাপ হলে সে বিক্রমপুর যায়। বিক্রমপুর গিয়ে সারা দিন গালগল্প,
আড্ডা দিলে মন ভালো হয়ে যায়।
ছাতিয়ানতলিতে কারা কারা গেছে?
গল্পকার বুলবুল চৌধুরী, মাসুদ রানার লেখক শেখ আবদুল হাকিম, কবি মাকিদ হায়দার, গল্পকার
বিপ্রদাশ বড়ুয়া, লেখক সালেহ আহমেদ, ছড়াকার নাসের মাহমুদ, ছড়াকার সোহেল মল্লিক, ছড়াকার
শাকিল ফারুক, কবি শুচি সৈয়দ, কবি মালা মাহবুব, কবি জামিল আক্তার বীনু, গল্পকার হামিদ
কায়সার, গল্পকার ইমতিয়ার শামিম, শিল্পী মামুন হুসাইন, লেখক মোকারম হোসেন, গল্পকার হুমায়ুন
কবির ঢালী, গায়ক সৌর বাপ্পা, সাংবাদিক রুদ্রাক্ষ রহমান, গল্পকার আনিস রহমান, গল্পকার
মইন আহমেদ, পুঁথি শিল্পী কাব্য কামরুল, সংস্কৃতিজন শামসুল করিম পল, লেখক মাহফুজা শিলু
আরও কত কত মানুষ যে ছাতিয়ানতলি যাত্রার সাথী হয়েছে সবার নামও স্মরণ করতে পারছি না।
প্রতিবারই আমাদের যাওয়ার দলে নতুন নতুন মানুষ যুক্ত হয়। প্রতিবার ছাতিয়ানতলি যাত্রার
আগে চলে নতুন মুখের সন্ধানে।
সেবারও
আমরা সকালের দিকে চলে গিয়েছিলাম। ছাতিয়ানতলি গিয়ে আমরা পুকুর ঘাটলায় বসে, দাঁড়িয়ে নানান
পদের ভর্তা-ভার্তি দিয়ে বউয়া/ বউ খুদা খাই। বউয়া দিয়ে আচারের তেল সহযোগে ভর্তা দিয়ে
খাওয়ার বিষয়টি প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে চলে আসছে।
আমার ছেলেমেয়ের নানাবাড়ি ছাতিয়ানতলি। ছায়া সুনিবিড় এক গ্রাম। চারদিকে ক্ষেতখামার। পুকুর,
ছাড়াবাড়ি, নামা ক্ষেত, সামনে-পেছনে গাছপালার বাগান নিয়ে পনেরো বিঘার ওপরে বড় বাড়ি।
সকালে
খাওয়াদাওয়ার পর চা খেতে খেতে নানান কথাবার্তা চলে। তারপর দুপুরের আগে আগে আমরা যাই
খানিক দূরের পাল বাড়ি। বাড়িতে ঢুকতেই শত বছরের পুরনো কালীমন্দির। বাড়ির চারদিকে
একতলা, দোতলা টিনের ঘর। প্রত্যেক ঘরের সামনে নিকনো উঠোন। বরই, নিম, লেবু, শজনে, জামরুল,
করমচা, হিজল, বেল, জবা, তুলসীসহ নানা নাম নাজানা গাছেদের আধিপত্য। টিনের ঘরের দরোজার
সামনে চার-পাঁচ ধাপের নকশা আঁকা সিঁড়ি।
পাল বাড়ির
হেলে পড়া পুরনো পুকুর ঘাট। ঘাটপাড়ে বসার সিমেন্টের বেঞ্চি। বেঞ্চির পেছনের দুই দিকে
নকশা আঁকা কলসি এখনও টিকে আছে। আমরা পাল বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে আরও পেছনের দিকে চলে যাই।
সেখানে যে বিল ধ্রুব এষের খুব পছন্দের জায়গা। প্রথমবার যখন ধ্রুবকে পাল বাড়ি দেখাতে
নিয়ে আসি, সে খুব অবাক হয়েছিল। পাল বাড়িতে পরিচয় হয়েছিল দিলিপ দার সঙ্গে। ষাট-সত্তর
দশকের বাংলা সিনেমার বিখ্যাত অভিনেতা নারায়ণ চক্রবর্তীর বড় ছেলে দিলিপ। তিনিই জানালেন,
এই পাল বাড়িতে আমার বাবায় কত আইত। ছাতিয়ানতলি গ্রাম থেকে কিছুদূরেই নারায়ণ চক্রবর্তীর
বাড়ি। পাল বাড়ির সঙ্গে তার সখ্য ছিল। আত্মীয়তা তো ছিলই।
পাল বাড়ির পেছনে নামা জায়গা দিয়ে কিছুদূর গিয়ে আমরা সেই বিলের সন্ধান পেয়েছিলাম। একসময়
এই বিল নাকি সারা বছরই পানিতে থই থই করত। এখন আর সেই দিন নেই। রাস্তাঘাট আর উন্নয়নের
নামে জমি ভরাট হয়ে যাওয়ায় গ্রামদেশের খালবিল তার চেহারা হারিয়েছে। গরমের সময় বিলের
পানি প্রায় শুকিয়ে যায়। বর্ষাকালে জোয়ারের পানি পেয়ে সে বিল পরিণত হয় সাগরে।
গরমের
সময় বিল শুকিয়ে গেলে সেখানে আলুর চাষ হয়। বিলের ধারের উঁচু জমির আলে বসে আমরা আড্ডা
দেই। গ্রাম থেকে দূরে বলে জায়গাটা নির্জনই থাকে। আশপাশে জলাজংলা, গাছপালা, পাখপাখালির
কিচিরমিচিরÑ সব মিলিয়ে জায়গাটা আমাদের আড্ডার জন্য বেশ উপযুক্ত। বিলের ধারের উঁচু জমির
ওপর দাঁড়িয়ে চারদিকের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে ধ্রুব আমাকে বলল, ছাতিয়ানতলি আইলে আমরা
এই বিলের ধারে বইসা তামাক-বিড়ি খামুÑ বাপ্পার গান শুনুম আর আড্ডা দিমু।
ধ্রুবর কথা শুনে আমি বললাম, খালি বইসা আড্ডা দিবেন? এত সুন্দর জায়গাÑ এইখানে গান-বাজনা,
গল্পকরণের ফাঁকে ফাঁকে যদি মাটিতে শুয়ে শুয়ে আকাশ না দেখি, তাইলে কি আর আড্ডা জমব!
আমার
কথায় ধ্রুব চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকায়। আমি বুঝতে পারি, তার সে তাকানোর মধ্যে প্রশ্রয়ের
একটা সুর ছিল।
সেবারও দুপুরের আগে আগে পাল বাড়ি হয়ে বিলের ধারে গিয়ে আমরা সবাই বসেছি। সেদিন বেশ গরম
পড়েছিল। গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ছিল না। গাছের ডালে মাঝে মাঝে অচিন পাখির ডাক ভেসে এসে
দূরের নামা ক্ষেতে মিলিয়ে যায়। নাদুসনুদুস সবুজ আলু ক্ষেতের লকলকে ডালে কোত্থেকে উড়ে
আসে ফিঙে- তারপর মুহূর্তের মধ্যেই আবার লেজ দুলিয়ে সে ফুড়ুৎ করে উড়াল দেয়। বসে থেকে
আমরা শুয়ে-বসে, কেউ কেউ চিত্তর হয়ে (যাকে কি না আধো শোয়া বলে) নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম।
দুপুরের দিকটায় মানুষজন তেমন থাকে না বললেই চলে। হঠাৎ করে আমি খেয়াল করলাম, বিলের নামা
জমিতে যে আলুর দিগন্ত বিস্তৃত খেত, তার মধ্য থেকে একটা মানুষ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে
এবং সে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
প্রখর রোদের ভেতর এত পথ হেঁটে হেঁটে লোকটা কই যায়! কাছাকাছি আসতেই দেখলাম লোকটার কাঁধের
ওপর বাঁশের লম্বা লগির মতন তাতে একদিকে রয়েছে টিনের পসরা, তাতে আছে নানা কিছু। অন্যদিকে
পুরনো ব্ল্যাকবোর্ডের মতন একটা কাঠের বোর্ড। টিনের পসরা আর কালো কাঠের বোর্ড লগির দুদিকের
ব্যালান্স বজায় রাখছে। লোকটা আমাদের আরও কাছে আসতেই দেখি কাঠের বোর্ডের কালো জমিনের
ভেতর সাদা অক্ষরে কাঁচা হাতের লেখা,
‘ডুবারী
যেকোনো স্বর্ণ
স্বর্ণ
ও রুপার জিনিস পুকুর বা নদীর ঘাটে হারান গেলে উঠাইয়া দেওয়া হয়।
মো. এবাদত হোসেন
গা গোয়ালি মান্দ্রা
থানা লৌহজং
জেলা মুন্সীগঞ্জ
সবার নিচে ফোন নম্বর দেয়া।
বুঝলাম লোকটার নাম এবাদত হোসেন। তাকে দেখে প্রথমটায় ভেবেছিলাম সে বুঝি স্রেফ ফেরিওলায়া।
ওরকম মনে হওয়াই সঙ্গত ছিল। এবাদত এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। গরমে জান হাঁসফাঁস করা দুপুরবেলা
বিলের ধারে আমাদের শুয়েবসে গল্প করার বিষয়টি তার কাছে কি বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি করেছিল!
সে অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। তারপর মুখে অনেক দিনের চেনা মানুষের মতো আমাদের
দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল,
আপনরা কোন বাড়ির মেমান গো?
ফকির বাড়ির। রনি গো বাড়িতে আইছিÑ বলে আমি তার দিকে ভালো করে তাকালাম।
এবাদতের কাঁধে ঝুলছে বাবুই পাখির মতো টিনের পসরা।
তার কাঁধের ঝোলানো জিনিসটি দেখে ভারী অবাক হলাম আমরা। ততক্ষণে আমরা বুঝে নিয়েছি এবাদতের
পেশা। জীবনে এই প্রথম এ রকম পেশার একজন মানুষ দেখলাম। কত বিচিত্র পেশা মানুষের।
জিজ্ঞেস করলাম, কাম-কাইজের কি অবস্থা?
এবাদত বলল, অবস্থা বালা না। আগে এই গ্রাম, হেই গ্রাম থিকা বউঝি গো সোনা-রুপার দামি
দামি গয়নাগাটি পুকুরঘাটে হারানির খবর পাওন যাইত। অহন আগিলা দিনের মতন আর হেই খবর পাওন
যায় না। হগলে অহন ইমিটিশন পরে, কামকাইজ আগের মতন নাই। স্বজন পরিজন লয়া বিপদে আছি। তাও
আশায় থাকি, যদি কখনও কারও গয়নাগাটি পুকুরঘাটে হারায়া যাওনের ডাক আহে...
এতটুকু বলে সে থেমে গিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।
এবাদত কি দীর্ঘশ্বাস ফেলল!
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে আবার হাঁটা শুরু করল।
আমাদের রেখে এবাদত হাঁটতে শুরু করে। আলু ক্ষেতের আলপথ ধরে সে ধীরে ধীরে দূরবর্তী হতে থাকে। আমি পরিষ্কার দেখতে পাই, বিক্রমপুরের দুপুইরাকালের রোদও এবাদতের পেছন পেছন সুবোধ বালকের মতো হাঁটতে থাকে।