আনিফ রুবেদ
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৪৬ পিএম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:২২ পিএম
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমার ভেতরে আমি একটা কুয়ো বানিয়ে রেখেছি, বেশ গভীর কুয়ো। সেই কুয়োর ভেতর একটা ব্যাঙ রয়েছে, সেই ব্যাঙটাও আমি। এ কথাটুকু বলে নিলাম এ কারণে যে আমার ঘোরাঘুরির পরিধি খুব কম। সহজে স্বস্থান ত্যাগ করা হয়ে ওঠে না আমার। আমার খেলাধুলা, আমার পড়াশোনা একই জায়গাতে প্রায়; আমার দেখা ও দেখিও ‘একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু’।
এ রকম ব্যাঙ হয়ে ওঠার বহুবিধ কারণ রয়েছে। সেগুলো এখন থাক; পরে কোনো একসময় বলা যেতে পারে। ব্যাঙ হয়ে থাকার ব্যাপারে মনের জন্য একটা কথার পোশাকও বানিয়ে নিয়েছি। কথাটি হলো, সীমার ভেতর থেকেই অসীমকে দেখে নেওয়া যায় আর সেটাই করতে হবে আমাকে। তবু যারা দেশের এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের শহর নগর গ্রাম ঝরনা বন বৃক্ষ পাহাড় ঘুরে ঘুরে দেখে তাদেরকে হিংসে হয়; আমার মনে হয় আহা, আমি কেন নই এমন! আমি কেন পারি না!
পর্ণমোচী উদ্ভিদের পাতা ঝরে যায় পাতা ঝরার মৌসুম এলেই। কিন্তু তবু সব পাতা একসাথে ঝরে যায় না; কোনোটা সকালে ঝরে কোনোটা বিকেলে, কোনোটা আজ ঝরে কোনোটা ঝরবে আগামীকাল। কিন্তু যদি কোনো ডাল ধরে ঝাঁকুনি দেওয়া যায় তবে অনেক পাতাই একসাথে ঝরে যায়; যে পাতাগুলো দুদিন পরে ঝরতে পারত তা ঝাঁকুনির জোরে তখনই ঝরে যায়। আমার এ লেখাটাও তেমনই হতে পারে; একটি শহরের কথা বলতে গিয়ে আরও কয়েকটি শহরের কথা চলে আসবে।
আমার জন্ম শহরে নয়; এটা শহর লাগোয়া একটা গ্রাম। নাগরিক সুযোগ সুবিধা প্রায় ওই শহরের মতোই। সুতরাং এ শহর আমার কাছে জলভাতের মতো; রক্তকণিকার মতো। নিজের রক্ত নিজের রক্তকে তো আর শিহরিত করতে পারে না; যে খাবার প্রতিদিন খাই সে খাবার তো অভ্যাস; যা অভ্যাস নয় তাই বিশেষ। ফলে আমরা বিভিন্ন জায়গার বিশেষ খাবার খেতে সেখানে যায়; তাজমহলের দেয়ালঘেঁষা যার বাড়ি তার কাছে তাজমহল আর কিইবা কিন্তু কোটি কোটি মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসে ভিড় জমায় তাজমহলের কাছে; তাজমহলের কাছে যার বাড়ি সে আবার পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে যাচ্ছে কোনো কিছুর টানে।
হ্যাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর আমার শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো; একইভাবে খুব কাছের শহর রাজশাহীতেও কাজে অকাজে বহুবারই যেতে হয়। সুতরাং এগুলোর প্রচুর প্রভাব আমার ওপর থাকলেও বিশেষ বলতে যা বোঝায় তা নয়।
যে শহরটি আমার কাছে বিশেষ ছিল, যা দেখার জন্য আমার ব্যাকুলতা ছিল সেটাÑ ঢাকা। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী; দেশের রাজা সেখানে থাকেন। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী; দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন ঢাকা যায় এবং কাজ শেষে ফিরে আসে। আমার এলাকা থেকেও লোকজন ঢাকা যায় এবং ফিরে এসে নানাবিধ গল্প করে। শুনে শুনে আমারও যেতে ইচ্ছে করে।
তবে কোনো বিষয়েই আমার কোনো তাড়া নেই; তাড়া থাকে না। সবসময় মনে হয়, যেসব আকাঙ্ক্ষা জন্মে মনের ভেতর তা পূরণের একটা সময় এমনিএমনিই চলে আসে। এই ঢাকাও নিশ্চয়ই আমার সময়ের ভেতর চলে আসবে একদিন।
২০০১ সালÑ বেশ বড় একটা ভ্রমণ শুরু হয়। বাসা থেকে বের হওয়ার পর প্রায় দেড় মাস মতো ছিলাম বাইরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বেরিয়ে প্রথমে রাজশাহীতে কয়েক দিনের জন্য থামি তারপর সোজা বরিশাল, বরিশাল থেকে পটুয়াখালী; পটুয়াখালী থেকে আবার বরিশাল; বরিশাল থেকে লঞ্চযোগে ঢাকা; ঢাকা থেকে দিনাজপুর; দিনাজপুর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিজের বাসা।
এই বড় যাত্রাটার কারণ ছিল; আমার ফুপু চাকরি করতেন; তার বদলি হয় বরিশালে; বরিশালে কয়েক বছর চাকরি করার পর বদলি হয় পটুয়াখালীতে। পটুয়াখালী থেকে আবার বরিশালে আসেন। ফুপুর বাসা বদলানোর জন্যই মূলত সেখানে গেছিলাম; আমার ফুপাতো ভাই ঢাকায় ডেন্টাল কলেজে পড়াশোনা করতেন; তিনিও এসেছিলেন। বরিশাল এবং পটুয়াখালীর কাজ শেষ করে আমার ভাইয়ের সাথেই ঢাকা যাই। লঞ্চ থেকে নামি যখন তখন খুব ভোর। আমি বিস্ময় নিয়ে ঢাকার ভোর দেখি; একটা বেবিট্যাক্সি করে ভাইয়ার হলে পৌঁছাই আমরা। পৌঁছেই কিছুক্ষণ পর ভাইয়া আর আমি ব্যাগ-ট্যাগ রেখে সকালের নাশতা খাওয়ার জন্য বের হলাম; ঢাকার বিখ্যাত তেহারি খেলাম। যা খাই, যা দেখি, যেখানে হাঁটি সবটাতেই আমার বিস্ময়।
সকালের নাশতা করার পর রুমে রেখে গেলেন ভাইয়া; তার ক্লাস ছিল। রুমে আরেকজন ভাইয়া থাকতেন। তিনি আমার সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। এই কথা বলার মাঝেই সেই আরেক ভাইয়ার এক ফ্রেন্ড আসলেন। তার আসার পর আমি অস্বস্তিতে পড়ে যাই। আমার মনে হলো এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। আমি তাকে কয়েকটি দর্শনীয় জায়গার কথা জিজ্ঞেস করলাম যেগুলো এখান থেকে কাছে হবে এবং এও জিজ্ঞাসা করে নিলাম কতক্ষণ পর ফিরে এলে আপনার এই ফ্রেন্ড আর রুমে থাকবেন না। তিনি আমাকে বত্রিশ নম্বর বাড়িটা বেশ কাছেই আছে বলে জানালেন; এও জানালেন হেঁটেই সেখানে যাওয়া যায়; দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হিসেবে জানালেন দুঘণ্টা পর ফিরে এলেই হবে।
আমি ১০টার সময় বের হলাম। যদিও একা বের হতে আমার ভয়ই লাগছিল; কারণ বরিশালে থাকাকালীন আমি ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিলাম। এই ছিনতাইয়ের ঘটনাটা মনের ওপর বেশ প্রভাব ফেলেছিল; অনেকটা ট্রমাটাইজ ছিলাম। তবুও বেরুলাম; বেরিয়ে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে একে-ওকে জিজ্ঞাসা করে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ির কাছে পৌঁছলাম। প্রতিটা ঘর, ঘরের প্রতিটা ইঞ্চি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। ভেতরটা কখনও ভালো লাগায় ভরে উঠলও, কখনও ভরে উঠল হাহাকারে।
ওখান থেকে আবার হেঁটেই ফিরলাম। দুপুর হয়ে গেছিল। ভাইয়াও চলে এসেছিলেন। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য বের হলাম স্নান সেরে এবং গেলাম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর; সেখান থেকে আরেকটা কোথাও গেলাম যেখানে বাংলাদেশের সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের ওপর একটা প্রদর্শনী চলছিল। বেশ ভালো লাগছিল, সার্থক লাগছিল সবকিছুকে।
পরদিন দেখতে গেলাম জাতীয় জাদুঘর, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা। এ সবই ছিল আমার জীবনের প্রথম। আমার জীবনের প্রথম বঙ্গবন্ধুর বাড়ি দেখা, জাদুঘর দেখা, বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখা, চিড়িয়াখানা দেখা। এগুলো সবই ছিল আমার জন্য বিস্ময়কর; আনন্দদায়ক; মনকে প্রীতিপূর্ণ করার মতো ব্যাপার।
ঢাকা ছেড়ে আসার একদিন আগে সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারটা ঘটে। ভাইয়া যেখানে পড়াশোনা করেন সেই ডেন্টাল কলেজে গেলাম। সেখানে সেদিন রক্তদান কর্মসূচি চলছিল। আমাকে ভাইয়া বললেন, রক্ত দিবি নাকি? তোর রক্তের গ্রুপ কী? বললাম, রক্তের গ্রুপ জানি না; রক্ত দিতে চাই। যেখানে রক্ত নেওয়া হচ্ছে সেই রুমে ঢুকলাম। রক্ত টেস্ট করা হলো। তারা বললেন, রক্তের গ্রুপ বি+। যিনি রক্ত নেওয়ার জন্য এলেন তিনি খুব যত্ন করে কাজটা করছিলেন; চমৎকারভাবে কথা বললেন আমার সাথে।
আমার গা থেকে বের হওয়া টাটকা রক্তের ব্যাগটা আমার হাতের কব্জিতে ঠেঁকিয়ে তিনি বললেন, অনুভব করুন আপনার রক্তের উষ্ণতা আপনারই শরীরে। আমি হাসলাম। তিনি আমাকে জুস খেতে দিলেন; তিনি তার নাম জানালেন, ভিয়াস। আমি এমন নাম এর আগে কখনও শুনিনি বললে তিনি জানালেন, ইতালির পর্বত ভিসুভিয়াস থেকে এ নাম এসেছে। তার বাবা, ইতালি গিয়েছিলেন এবং সেই পর্বত দেখে আসার পর তার মেয়ের নাম ভিয়াস রাখেন।
তারপরও বহুবার রক্ত দিয়েছি কিন্তু ওই প্রথমবারের রক্ত দেওয়ার কথা কখনোই ভুলি না। থেকে থেকে মনে পড়ে, ‘অনুভব করুন আপনার রক্তের উষ্ণতা আপনারই শরীরে’।
এই রক্তদানের একদিন পর আমি দিনাজপুরের দিকে পাড়ি জমায়। সেখানে আমার মেজো আব্বার বাড়ি।
এরপর বহুবার ঢাকা যাওয়া হয়েছে কিন্তু আর ভালো লাগেনি। এত মানুষ! এত যান! এত ধুলি আর ধোঁয়া! আমার ভালো লাগে না। কাজে ঢাকা যায়, কাজ সেরেই ফিরে আসি। তবু ঢাকা আমার অনেক কিছুর প্রথম এজন্য স্মৃতির ভেতর থাকবে চিরকাল; রক্তদানের মতো মহৎ কাজেরও প্রথম আমার ঢাকা। ঢাকা সুন্দর হয়ে উঠুক।
আনিফ রুবেদ