× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দেখা হলো ভালোবাসা, বেদনায়

জফির সেতু

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৮ পিএম

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৫৬ পিএম

চিত্রকর্ম : ন্যান্সি পেরাল্ট

চিত্রকর্ম : ন্যান্সি পেরাল্ট

নৌকার গলুইয়ে পা ঝুলিয়ে বসার মতোন প্রিয়

বাল্যকাল ছেড়ে একদিন এসেছি কৈশোরে

বাবার হাত শক্ত করে ধরে নিজের চোখের চেয়েও

অনেক বড় চোখ মেলে

পা দিয়েছিলাম এই শহরের বাঁধানো রাস্তায়।...

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাংশটি সাদামাটা হলেও আওড়াচ্ছি কম করে হলেও তিন যুগ ধরে, কিন্তু পিপাসা তো মেটে না। কী আছে এই পাঁচ পঙ্‌ক্তিতে? নিহিতার্থই-বা কী পঙ্‌ক্তিগুলোর? আমি টোকিওতে পাতাল রেলে, লন্ডনে কিংবা বেইজিংয়ের ব্যস্ত রাস্তায়, কলকাতা কিংবা ইস্তাম্বুলের ফুটপাতে হাঁটতে হাঁটতে পঙ্‌ক্তিগুলো যে কত বিরবির করে উচ্চারণ করেছি! কারণ পঙ্‌ক্তিগুলোর  ভেতরে যে আমিই আছি। বাবার হাত শক্ত করে ধরে নিজের চোখের চেয়েও অনেক বড় চোখ মেলে...সেই যে পা দিয়েছিলাম শহরের রাস্তায়-সেই রাস্তা নিয়ে গেল কত শহরের কত যে রাস্তায়! আসলে হাঁটছি তো সে একই রাস্তায়, পিচঢালা পথে।

আমার প্রথম শহরে আসা নৌকা করে, নৌকার গলুইয়ে বসে; নদী পথে, হাওর-বাঁওড় বেয়ে। নৌকাবোঝাই মানুষের ভিড়ে, আর বাবার হাত ধরে। নদীর গলুইয়ে বসে আমি দেখলাম, মাছেদের ঘাই; শোলমাছের পোনা। দেখলাম জলঢুপির বাসা, পানকৌড়ির ঝাঁক; নৌকায় শুনলাম শিশুর কান্না। একটা ছাগলকে নিয়ে যাচ্ছে একটি অর্ধউলঙ্গ লোক, তার পায়ে স্যান্ডেল নেই। নোখগুলো মরে গেছে। থুঁতনিতে ক-গাছি দাঁড়ি। ছাগলের দড়ি ধরে পাটাতনে বসে আছে লোকটি। সেবারের আর কিছু মনে নাই আমার।

কিন্তু গ্রাম থেকে যখন অগস্ত্যযাত্রা করি, কৈশোর পেরিয়ে গেছে। সে এক যাত্রা বটে, যাত্রার শুরু নাই, শেষ নাই। এটাই হয়তো জীবনযাত্রা। প্রথম শহর থেকে দ্বিতীয় শহর, দ্বিতীয় থেকে তৃতীয়; তৃতীয় থেকে চতুর্থÑ এভাবে বাড়তে থাকে; প্রথমে দেশ, তারপর মহাদেশ-তারও পরে গোলকজুড়ে। আমি প্রায়শ ভাবি মানুষের কেন এই যাত্রা, আর কী-বা চায় পথে ও পথের প্রান্তে? কোথায়ই-বা যেতে চাই আমিও, গন্তব্য কোথায়? তখন মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের এই লাইনগুলোÑ ‘এই বাসাছাড়া পাখি ধায় আলো-অন্ধকারে/ কোন্‌ পার হতে কোন্‌ পারে।’ সত্যি মানুষ এক বাসাহারা পাখি বটে।

আমারও ঠাঁই নাড়া হলো প্রথম। আমি শহরে এলাম, বাবার সঙ্গেই। পেছনে পড়ে রইল এক দঙ্গল ভাইবোন। কাঁচাপাকা ঘরবেষ্টিত একটা বড় উঠান। একটা গোয়ালঘর। পেছনে পড়ে রইল একটা সবুজ গ্রাম, একটা অখ্যাত গ্রাম; গাছগাছালি তেমন নেই, কলাগাছে ভরা। বাতাসে পতপত ওড়ে পাতাগুলো। গাছগুলো মায়ের মতো প্রিয়, মা-ও রইল পেছনে পড়ে। এককাঁথার নিচে শুয়ে থাকার বিবিও-আমার দাদি।

প্রথমে নৌকা, তার পরে বাসে চেপে আমরা শহরের পথ ধরলাম। বাসের গতি বাড়ে, গাছগুলো সরে যাচ্ছে, কারেন্টের খুঁটিগুলো উড়ে যাচ্ছে। চা বাগানোর ভেতর দিয়ে, বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে আমরা শহরে যাচ্ছি, পাশে বসে আছে বাবা। আমার চোখ শুকিয়ে গেছে, পানি বলতে কিছু নেই। গলায় তীব্র ব্যথা হচ্ছে। এটা হয়; আজও কোনো বিচ্ছেদে, বেদনায়-গলায় তীব্র ব্যথা হয়। 

বৃষ্টি থেমে গেছে বহু আগে, চা-বাগানেও তখন বৃষ্টি ছিল না; তবে একটা রেশ রয়ে গিয়েছিল। রোদ চিকচিক করছে চারদিকে। লাক্কাতুরা টি-এস্টেট; ১৯৫৪। ইংরেজিতে লেখা। দেখে চমকিত হয়েছিলাম। বইয়ে পড়েছিলাম, এটা উপমহাদেশের প্রথম চা-বাগান; ইংরেজরা করেছিল। ইংরেজরা রেললাইনও করেছে ওই সময়ে। রেললাইন তখনও দেখা হয়নি।

আমি শহরে এলাম। আমরা শহরে এলাম, আম্বরখানাতে নামলাম। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছিল। বাবা বললেন, কিছু খাবি?

একটা ছোট হোটেলে বসলাম। রাস্তার পাশেই। ভাতের পরিবর্তে পরোটা খেতে চাইলাম আমি। বাবা খেলেন রুইমাছের ঝোল দিয়ে ভাত। আমি পরোটা আর গরুর মাংস। কী স্বাদ! পরোটাগুলো ছিল মচমচে, কী যে সুগন্ধভরা। আহা, এমন পরোটা নেই কেন এখন? এমন স্বাদও তো জিভে আসে না!

আমাদের সঙ্গে আছে কাঁথা-বালিশ; একটা ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর কাপড়-চোপড়। মায়ের দেওয়া এক বোতল সর্ষের তেল। একটা কাপড়ের জুতা। পায়ে পরেছি চামড়ার স্যান্ডেল। আজ থেকে শহরবাসের শুরু। হ্যাঁ, প্রথমে বন্দর বাজার একটা হোটেলেই; বাপ-বেটা। কিছু কেনাকাটা করতে হবে, দুয়েকদিনের মধ্যে কলেজের পাশে একটা মেস ভাড়া করতে হবে।

দুদিন পর বাবা চলে গেলেন বাড়িতে, আমি একটা মেসে ঠাঁই পেলাম, টিলাগড়ে। এমসি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম, কী সুন্দর টিনশেড দিয়ে বানানো ঘর; দালানও আছে দুয়েকটা। এক সকালে ক্লাসে ঢুকলাম, পরিচিত কেউ নেই। শহরে যেমন অচেনা রাস্তা, অচেনা মানুষ; ক্লাসেও সব মুখ অচেনা। অনেকে এসেছে নামকরা স্কুল থেকে; সবাই ফিটফাট-পায়ে কেডস, চামড়ার জুতা। আমি অজপাড়াগাঁর অখ্যাত এক বিদ্যালয় থেকে। ক্লাসের ওপাশে ছাত্রীরা, একেকজন কী যে রূপসী, চোখ ঝলসে যায়। একেকজনের চারু নখ, রঙিন ঠোঁট আর সুডৌল পা। অধ্যাপকদের ক্লাস-লেকচার, আর খুনি সুন্দরীদের আবাহনে মাথা ঝিমঝিম করে। কিছুই বুঝে উঠতে পারি না; বিশেষত ইকোনমিক্সের ক্লাস। অধ্যাপক বলেছিলেন, ‘একজন মানুষ গরিব, কারণ সে নিজে গরিব!’ কী কথা!

দুই

দেখতে দেখতে সপ্তাহ পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর পেরোয়। একটা বন্ধুবৃত্ত তৈরি হয়; শুধু নিজের ক্লাসের, নিজের সেকশনের তা নয়। নিজ কলেজের সিনিয়র-জুনিয়র, পাশের কলেজের অনেকে, শহরের পশ্চিম দিকের মদনমোহন কলেজেও বন্ধুত্বের আহ্বান। উপলক্ষ পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়া, স্টেডিয়ামে খেলা দেখা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রান্তিক চত্বরে নাটকের রিহার্সেল, বিএনসিসি ইত্যাদি। নিজের নিঃসঙ্গতা কাটতে থাকে, শহর পরিচিত হয়ে ওঠে, মানুষকেও কাছের বলে মনে হতে থাকে। একদিন কলেজে যাচ্ছি, সাইকেলে থেকে নেমে একটা পাগলাটে লোক পথ আটকায়। ‘এই ছেলে একটা ছড়া লিখে দেবে? আমার পত্রিকায় ছাপব? আমার পত্রিকার নাম উদীয়মান, আমি নবীনদের লেখা ছাপি।’

আমি অবাক হই; আমি তো কখনো লিখিনি। এই লোক ছড়া চাচ্ছে কেন? প্রায়ই তার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হতো। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলত। পরে জানলাম তিনি একজন স্কুল-শিক্ষক। পত্রিকা বের করে দুই টাকায় বিক্রি করেন। 

আমি পড়াশোনা করতে শহরে এসেছি; বড় হতে চাই। বড় হওয়া মানে কী, সেটা অবশ্য জানতাম না। হয়তো বড় চাকরি করাটা বড় ছিল আমার কাছে। কিন্তু আমি হতে চাই অধ্যাপক। প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ে একজন অধ্যাপকের কীর্তি পড়ে মনে এই সাধ। আমি তো লেখক হতে চাই না। লেখক কীভাবে হতে হয় তাও তো জানি না!

কিন্তু সাহিত্য আমি পড়তাম মাধ্যমিক ক্লাসে থাকতেই। লাইব্রেরি থেকে প্রথম বই নিয়েছিলাম মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড; রোমেনা আফাজ, সেবা প্রকাশনীর বিভিন্ন বই, শরৎচন্দ্র আর প্রভাতকুমারের গল্প আমার বড় প্রিয়। কলেজ লাইব্রেরিতে পেলাম একদিন একটি উপন্যাস-পিপাসা; পড়ে ভালো লাগল। আরেক দিন খুঁজে পেলাম আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য সান অলসো রাইজেসের বাংলা অনুবাদ। একসময় বন্ধুদের ফাঁকি দিয়ে একা একা লাইব্রেরিতে বসতে থাকি। এরই মধ্যে হাতে পড়ে রবীন্দ্রনাথের একটি বই, আসলে রচনাবলির একটা খণ্ড, চামড়ায় বাঁধানো। পাতা উল্টাতেই একটা পঙ্‌ক্তিতে চোখ আটকে গেলÑ ‘পথে যেতে দেখা তুলনাহীনারে’; কী পঙ্‌ক্তি, কী যে অর্থ আছে এতে! আমার ভেতরে অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হয়।

উদীয়মানে আমার লেখা ছাপা হলো। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম আর লেখা দেখে চোখে পানি এসে গেল। এবারে শুরু হলো লুকিয়ে লুকিয়ে লেখা। ছড়া, কবিতা। একটা খাতা বানানো হলো, রঙিন কালিতে দুদিকে বর্ডার টেনে। আর রাত জেগে দীর্ঘ দীর্ঘ কবিতা। কবিতায় নজরুল আমার আদর্শ, কিন্তু বেশি পড়া হয় রবীন্দ্রনাথের কবিতা। স্থানীয় পত্রিকায় একটা বিশেষ দিনে সাহিত্য পাতা ছাপে; জাতীয় পত্রিকায়ও। কিন্তু সেই কবিতাগুলো রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের কবিতার মতো নয়। কেমন ছন্দহীন কবিতা, কিন্তু পড়তে ভালো লাগে। আনন্দও পাই। জীবনানন্দ দাশের নাম তো জানতাম, তার কবিতাও কোথাও পড়ি; ‘বনলতা সেন’ কবিতার নামটি যেন কেমন! ঠিক কবিতা কি? কবিতাটাও কেমন যেন। এই সময়ে সৈয়দ আলী আহসানের একটা কবিতা পড়ি, ‘আমার পূর্ব-বাংলা’। পাঠ্যবইয়ে। ‘হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সিক্ত নীলাম্বরী’-পঙ্‌ক্তিটি নিয়ে রাতদিন ভেবেছি আমি। আশ্চর্য, কবিতাটিতে আবার বিরামচিহ্ন পর্যন্ত নেই।

স্বরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিপাসা এতটাই দাগ কাটল যে, একদিন বন্দর বাজার থেকে একটা ডায়েরি কিনে আনলাম। চকলেট রঙের। রাতজেগে কয়েক দিনের মধ্যে একটা উপন্যাস লিখে ফেললাম। আসলে পিপাসার সমান্তরাল একটি কাহিনী। মনে আছে বর্ণনা ও ক্রিয়াপদ ব্যবহারে আদর্শ হিসেবে নিলাম শরৎচন্দ্রের ‘শেষ প্রশ্ন’। বইটি এর মধ্যে পড়া হয়েছিল।

ইচ্ছে ছিল ইকোনমিক্স পড়ব, কিন্তু তা আর হলো না। ভেতর থেকে কে বলে দিল সাহিত্যই তোমার গন্তব্য। আমাকে টানছিল সাহিত্য। এই শহরের প্রথম দান যদি কিছু বন্ধু হয়ে থাকে, দ্বিতীয় দান হচ্ছে সাহিত্য আর তৃতীয় হচ্ছে স্বাধীনতা।

তিন

প্রান্তিক চত্বরে অনেকে নাটক করে; আমি নাটক দেখি, রিহার্সাল দেখি। কোনো গ্রুপে না ঢুকে একদিন শিল্পকলা একাডেমিতে ইন্টারভিউ দিই। অভিনয় বিভাগে, শিখব বলে। ইন্টারভিউতে বাদ পড়ি, মনকে বোঝাই এ কাজ আমার নয়, আমি বরং কবিতাই লিখব। গল্প-উপন্যাস লিখব।

একদিন ক্লাসে এক শিক্ষক ঢুকলেন, দীঘল আকৃতির; শ্যামবর্ণ। ঢিলেঢালা পাজামা-পাঞ্জাবি গায়ে। হাতে একটি বই-বৃত্তাবদ্ধ রবীন্দ্রনাথ। বইটি তার লেখা, তিনি একজন গবেষক। ক্লাসে উচ্চারণ করলেন সক্রেটিসের নাম, সার্ত্রের নাম। কবিতার ক্ষেত্রে বোদলেয়ার, মালার্মে ও র‌্যাঁবো। পিকাসো ও দালির কথা বললেন চিত্রকলা প্রসঙ্গে। বললেন ইয়েটস ও রবীন্দ্রনাথের কথা। হোমার ও মিল্টনের কথা। পাঠ্যবইয়ের বিষয় তার আলোচনায় খুব আসত না। তিনি বলতেন তোমরা ডিরোজিও হও। তোমরা র‌্যাঁবো হও। তোমরা সুকান্ত হও। আর বলতেন কাস্তে শান দিতে; পুরাতন সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে। তার ক্লাসে ভিড় করত অন্য সেকশনের, অন্য বিভাগের ছাত্ররা। আমাদের মনে তার প্রভাব বড়।

কলেজে একে একে যোগ দিলেন আরও দুজন শিক্ষক; দুজনেই কবি। একজনের নাম শুনেছি আগেই, ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি। কল্যাণব্রত, শ্বেতপত্রÑ তার বইয়ের নাম। দ্বিতীয় জন এলেন চট্টগ্রাম থেকে। তার একটিই বই, -বিমিশ্র অনুভব। দুজনের কথাবার্তা ভিন্ন রকমের, আমার ভালো লাগে তাদের। একদিন দেখাও করি। দুজনই আমাকে একটি করে বই উপহার দিলেন। লাজুক আমি কত কথা বুকে নিয়ে ঘরে ফিরি। 

যে-শহরে একদিন ছিলাম একা, ছিলাম দিশাহীন-ক্রমে দেখতে পেলাম নতুন পথের রেখা। দেখা পেলাম রবীন্দ্রনাথের, নজরুলের। হ্যামলেটের সঙ্গে দেখা হলো নাট্যমঞ্চে। শিল্পকলা একাডেমিতে কত কী যে হয়; মনিপুরী নৃত্য, ধামাইল নাচ, সিলেটি গানের আসর আর নানা লোকউৎসব থাকে শহরজুড়ে সারা বছর। মনে হলো একা তো নই; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার সাথে আছেন, বিভূতিভূষণ আছেন; আছেন বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্‌দীন। সামনে এগিয়ে এলেন আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান। আর যখন পৃথিবীর দিকে তাকাই একদিকে দেখি শেলি-বায়রন-কিটসকে; অন্যদিকে টলস্টয়-গোর্কি-শলোকভকে। এখানে, এই শহরে না এলে পেতাম কি এসব? আমি ভাবি সারাবেলা; কিন্তু আমি সবই চাই, চাই! যত দিন যাচ্ছে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই শহর আমাকে বুঝি পাগল করে ছাড়বে!

একসময় দেখতে পেলাম বিভিন্ন কলেজে যারা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত; কিংবা যারা লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ে; কিংবা টুকটাক লেখালেখি করেÑ এরা সকলে মিলে একটা কিংবা একেকটা দল হয়ে গেছে। শহরের কেন্দ্রস্থল রাজা ম্যানশনের লাইব্রেরিগুলোতে নিত্যনতুন বই আসত, সেখানেই মৌপোকার মতো আমাদের ভিড়। এখানেই শুরু সিগ্রেট ফুঁকা। সিগ্রেটে দম নিতে নিতে জীবনকে আস্বাদ করা। কেউ কেউ গাঁজাতেও টান দিতে শিখেছে। কারও প্রেমে পড়া শুরু হয়েছে; আর একটি দল লিটল ম্যাগাজিন নামক একটি আজব পত্রিকা পড়তে ও প্রকাশ করতে মনোযোগী হয়ে উঠছে। বন্ধুদের কেউ অভিনয়ে, কেউ প্রবন্ধসাহিত্যে, কেউ গল্প-উপন্যাসে, কেউ কবিতায়, কেউ স্রেফ সম্পাদনায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

এরই মধ্যে শুরু হয় চিঠি চালাচালি; লিটল ম্যাগাজিনের লেখাকে কেন্দ্র করে পত্রযোগাযোগ। সবারই ঠিকানা একটাই, শহর সিলেট। অথচ সবাই এসেছে মফস্বল-গ্রাম থেকে, দুয়েকজন ছাড়া। এই চিঠি আসে ঢাকা থেকে, আসে ময়মনসিংহ থেকে, আসে বরিশাল থেকে কিংবা বগুড়া ও চট্টগ্রাম থেকে। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও চিঠি আসে, আসে ত্রিপুরা থেকেও। সবাই নবীন কবি-সাহিত্যিক, লিটলম্যাগ সম্পাদক।

আমরা লিখি, রাত জেগে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা সাজাই; লিটলম্যাগ করি। বাংলা সাহিত্যকে বদলে দেওয়ার একটা স্বপ্ন দেখি।

বোদলেয়ার রাস্তায় পড়ে থাকতেন, ঘরে ফিরতেন না; গিন্সবার্গ সমকামী ছিলেন; রুদ্র বেশ্যালয়ে গিয়ে সিফিলিস বাঁধিয়েছেনÑ এইসব কথা মাত করে রাখত আমাদের। মায়াকভস্কির আত্মহত্যা অনেক কৌতূহলের বিষয় ছিল। আবুল হাসান-সুরাইয়া, কিটস-ফেনি-ব্রাউন, সিলভিয়া-টেড-এদের প্রেমকাহিনী আমাদের মুগ্ধ করত। হায়, এমন প্রেম কি আসবে না আমাদের জীবনে? কেউ একজন এরই মধ্যে প্রেমে ব্যর্থ হলো, সোজা পথ হাঁটল বেশ্যালয়ে, শহরের পশ্চিমপ্রান্তে। সেই অভিজ্ঞতা শুনে আমাদের অনেকের রক্তগরম হয়ে যায়, মাথা ঝিমঝিম করে। এভাবে দিন যায়, আমাদেরও বয়স বাড়তে থাকে। 

এর মধ্যে দেখা হয় সুরমাপারের কবির সঙ্গে। তিনি দিলওয়ার। দেবদূতের মতো কথা বলেন। এখনও চোখেমুখে কবিতার স্বপ্ন, মানবমুক্তির স্বপ্ন। দেখা হয় তদীয় কবিপুত্র কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারের সঙ্গে। শুদ্ধস্বর তাকে নিয়ে একটা সংখ্যা করবে। সাক্ষাৎকার নেব আমি, আহমদ মিনহাজ ও মাহবুব লীলেন। শুদ্ধস্বর বেরুল, আমরাও ডিমের কুসুম ভেঙে বেরিয়ে এলাম। সম্পাদক আহমেদুর রশীদ চলে গেল ঢাকায়।... মাহবুব লীলেন সম্ভবত বরিশালে।

একসময় আমিও শহর ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই, চট্টগ্রামে।

সেই শহর সিলেট ছেড়ে চলে যেতে হলো আমাকে। যে-শহরের বৃষ্টি অদ্ভুত, বর্ষাকালে কৃষ্ণচূড়ায় রক্তিম হয়ে উঠত পথ-ঘাট-রাস্তাকে মনে হতো নদী। উঁচুনিচু রাস্তায় একলা হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ত গ্রামকে, আত্মীয়স্বজনকে; কিন্তু আমাকে প্রবোধ দিত সুরমা নদী থেকে বয়ে আসা একচিলতে বাতাস-তরুণীর জর্জেট ওড়নার মতো।

এই শহরের সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি আমাকে মুগ্ধ করত; একই সঙ্গে মন্দিরের কীর্তনের বাদ্যধ্বনি ও সুরও আমাকে তীব্র আনন্দ দিত। শাহজালালের মাজারের প্রতিদিন কত শহর থেকে নানা ধর্মের লোক আসত-বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মাজারে গান হতো-মানুষের মিলনমেলা হতো। শাহজালালের পিতলের ডেগ আর জালালি কবুতর আমাকে অবাক করত, একটা শান্তির পরশ দিত বুকের ভেতরে। প্রথম প্রথম কিছু ভালো না লাগলে, নিঃসঙ্গ মনে হলে মাজারের পুকুরের পারে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আহা, বিশাল আকৃতির মাছগুলো নিয়ে কত যে গল্প শুনেছি দাদির কাছে; এরা সকলে নাকি পীর-ফকির!

এসবই ছেড়ে যেতে হলো। আরও ফেলে যেতে হলো পরিচিত জন, বন্ধু; উঁচুনিচু রাস্তা, সুরমার পার। টিলাগড়ের সবুজ বনানীঘেরা পাহাড়, সঙ্গে বাতাসে চা-পাতার গন্ধমধুরতা।

চট্টগ্রামের ট্রেন চলতে শুরু করলে হয়তো কানে ভেসেছিল জামালুদ্দিন হাসার বান্নার দরাজ কণ্ঠ-‘বিষমাখাইয়া তিরের মুখে/মারিল তির আমার বুকে/দেহ থইয়া প্রাণ লইয়া গেল গো’। সিলেটি ভাষায় রচিত সিলেটের লোকসংগীত। এই সুর আমার প্রথম শহরের ভাষা, প্রেমের আর্তি। হাসন-রাধারমণ-দুর্বিন শাহের ভাবের রস দিয়ে মাখানো।

চার

দেশের আধ্যাত্মিক নগরী এই সিলেট। টিলা কেটে কেটে এখানকার অধিবাসীরা তৈরি করেছে একে। এই শহরের একটা জাদু আছে বলে অনেকে বলেন। কী জাদু আমি জানি না। আমি যা জানিÑ এ হচ্ছে প্রথম প্রেমের মতো। প্রথম প্রেম মানুষকে নিজের ভেতর থেকে বের করে পৃথিবীর পথে ঠেলে দেয়। চাবুক মারে; রক্তাক্ত করে, আবার উপশমও দেয়। এও আমার সঙ্গে তা-ই করেছে।

আমি স্বপ্ন দেখা শিখেছি এই শহরে। সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি এই শহরে। দর্শনের কথা শুনেছি এই শহরে। মানবমুক্তির মন্ত্র পেয়েছি এই শহরে। নিজেকে তৈরি করেছি এই শহরে। এই শহর তাই আমার কাছে তাই পায়ের তলার মাটিবিশেষ। এই শহর ধীরে ধীরে আমাকে গ্রহণ করেছে, আমিও তাকে একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি।

এই শহরে শিখেছি মানুষের দুঃখ কত বড়; দেখেছি মানুষ কত প্রতারক। এই শহর আমাকে ঘৃণা শিখিয়েছে, ভালোবাসতে শিখিয়েছে; ক্ষমা করতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে কীভাবে সংগ্রাম করতে হয়। আরও শিখিয়েছে জয়-পরাজয় বলে কিছু নেই। শিখিয়েছে মানুষকে অপমানের ভেতর দিয়ে বড় হতে হয়, অপমান সহে যেতে হয়!

সবচেয়ে বড় জিনিস; এই শহর আমাকে শিখিয়েছে, কীভাবে প্রেমে পড়তে হয়Ñ ভালোবাসতে হয় আর ভালোবাসা পেতে হয়। শিখিয়েছে ভালোবাসায় পাওয়া না-পাওয়া বলে কিছু নেই; প্রেম পরিণামহীন-প্রবহমান নদীর মতো।

আসলে এই শহর পৃথিবীর সকল শহরের মধ্যস্থতাকারী আমার কাছেÑ সেই আমাকে পাঠিয়েছে ঢাকায়, কলকাতায়, দিল্লিতে, কাশ্মিরে, টোকিওতে, বেইজিংয়ে, ইস্তাম্বুলে, লন্ডনে কিংবা আর যত শহরেÑ এই শহর আমাকে উদরে গ্রহণ করেছে, আবার পৃথিবীর বুকে উগড়েও দিয়েছে। তাই যেখানে যাই ভালোবাসায়, বেদনায় এই শহর আমার সঙ্গেই থেকে যায়। আমাকে ডাকেÑ আয়, আয়।

...

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা