ধ্রুব এষ
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৩১ পিএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:১৪ পিএম
অলংকরণ : হাসনাত মোবারক
খোকন মাস্টারের মায়ের পেটের মামার জন্মদিন। ৫৯ প্লাস খোকন মাস্টার ফেসবুকে ‘শুভ জন্মদিন’ উইশ করেছে মামাকে। ভালো কথা। খোকন মাস্টারের মামার বয়স ৬০ হয়ে গেছে। আমাদেরও হবে। এই ২০২৬-২৭এ-ই হবে। সারি ধরে আমরা জন্মেছি। ১৭-১৮ জন। আমরা বন্ধু। খোকন মাস্টারের মামাও তন্মধ্যে আছে। আমাদের কেউ এখনও মরে নাই। চোর-ছ্যাঁচোড় হলেও বন্ধু, তদুপরি মায়ের পেটের মামা-খোকন মাস্টার তার মামাকে উইশ করে নিন্দনীয় কিছু করে নাই বটে।
কিন্তু তারা তিনজন ছিল গলিভাই। গলায় গলায় ভাব তিনটার। আমি বলতাম ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার’। তাদের ভাবের আতিশয্যে অনতিবিলম্বে সেই সম্বোধন পরিবর্তন করেছিলামÑ থ্রি মাস্কেটিয়ার নাÑ তিন ছিনাল। তারা এটা সর্বান্তকরণে সমর্থন করে মেনে নিয়েছিল তিনজনইÑ খোকন মাস্টার, অধ্যাপক ও মৎস্য অফিসার। আমি তিন ছিনাল উল্লেখ মাত্র তারা হে হে, হা হা, কিচ কিচ (খোকন মাস্টার) করে হাসত। সেইসব সুখের দিন গেছে। তিন ছিনাল আর একত্রিত নাই। একত্রিত নাই বলে তাদের ছিনাল পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হয়ে গেছে। খোকন মাস্টার এখন বুড়া খাটাশ। অধ্যাপক এখন লিডার। মৎস্য অফিসার মার্কামারাÑবনেদি মার্কামারা হিসেবে সেই কলেজ লাইফেই টাউনের সমাজে অবদান রেখেছিল সে।
আমি ফেসবুক-কেসবুকে নাই। যন্ত্রণা লাগে। তারা আছে। ফেসবুকে মার্কামারা ব্লক মেরে রেখেছে বুড়া খাটাশকেÑ এর কিছু আর দেখতে চায় না। লিডার ব্লক মারতে গিয়েও মারে নাই। মেরে দেবে। বেটার লেট দ্যান নেভার। তার আগে দুষ্কর্ম দেখে নিচ্ছে কিছু। সেই স্ক্রল করতে করতে লিডার দেখল, বুড়া খাটাশ তার প্রবাসী মামাকে শুভ জন্মদিন উইশ করেছে।
লিডার আজ রাতে কলকাতা যাচ্ছে। মেডিকেল চেকআপ করাতে। দুইশ ডলার এনডোর্স করে নিয়েছে, ছয়শ ডলার ব্যাগে নিয়েছেÑ বর্ডারে রেখে দিলে রেখে দেবে। কিন্তু এটা কি দেখল সে!
বাসে উঠে বসে আছে। বাস ছেড়ে দেবে দশ মিনিটের মধ্যে। মার্কামারাকে কল দিল লিডার, ‘বুড়া খাটাশ ফেসবুকে তার মামারে জন্মদিনের শুভেচ্ছা দিছে।’
‘কোন মামা? তার তো মামার অভাব নাই টাউনে।’
‘টাউনের মামা না, লন্ডনী মামা।’
‘আরে বাপরে! আজ কি তার লন্ডনী মামার জন্মদিন নাকি?’
‘কেন তুই কি উইশ করবি নাকি?’
‘আমি সেই মানুষ নারে দাদা।’
শান্তি-স্বস্তি বোধ করল লিডার। আমাকে ফোন দিল, ‘বুড়া খাটাশ তো ফেসবুকে তার লন্ডনী মামারে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাইছে।’
‘অ। বয়স কত হইল তার মামার?’
‘চোর বল। চোরের বয়স কত হইল বল।’
‘চোর শব্দটার সেই ধ্ক আর নাই, জেএসসি বলি।’
‘জেএসসি! জেএসসি কী? জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট? জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেটের সাথে এই চোরের কী সম্পর্ক?’
‘আরে তার নাম কি ‘জে’ দিয়া না?’
‘অ।’
‘টাইটেল ‘এস’ দিয়া না?’
‘উহু।’
‘আর ‘সি’ ফর চোর। জেএসসি ফর ** ** চোর।’
‘ঠিক আছে। এইটা সেরা হইছে।’
গাড়ি ছাড়ল। বাস্কেটভরা ক্রোধ দেহমনে নিয়ে কলকাতা রওনা দিল লিডার। রাস্তাঘাটে মাথা না ধরলে হয়। লম্বা জার্নি। পদ্মা সেতুর দৌলতে ঢাকা থেকে বেনাপোল মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টা দূর হয়ে গেলেও বর্ডারে দেরি হয়ে যায়।Ñ আমি সান্ত্বনা দিলাম লিডারকে। মন শান্ত রাখতে বললাম। ভ্রমণে রাগ ক্রোধ ক্ষোভ নাস্তি।
জেএসসি সম্পর্কে আমার সবিশেষ অভিজ্ঞতা আছে। অশ্বতর শাবক আমাকে বিরাট বিপদে ফেলে দিয়েছিল। আমি বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। সাময়িকভাবে অশ্বতর শাবকের চোর চরিত্র বিস্মৃত হয়েছিলাম তার কপট ভণিতায়। আর্লি লাইফ থেকেই চোর সে। বন্ধুবান্ধবের টাকা চুরি করে ধরা পড়ে লিখিত মুচলেকা দিয়েছেÑ একবার না চার ছয় বার। সেই সমস্ত মুচলেকা সংরক্ষিত আছে। যার সিন্দুকে সংরক্ষিত আছে সে সাব্যস্তবাদী ব্যক্তি। শুধু মুস্তফাকে সাক্ষী রাখি এখানে, আমি হেডলাইটের কথা বলছি।
ভাই রে! হেডলাইট!
বাবা রে! হেডলাইট!
হেডলাইটের পেটের ভিত্রে টাউন ঢুকিয়ে রাখা যাবে।
আমার হেনস্থার কথা আমি সকলকে বলেছি কিন্তু টাউনবাসী আমার বন্ধুরা কেউ কোনোদিনই জেএসসিকে জিজ্ঞেস করে নাই, আমার সঙ্গে কী করেছিল বেজন্মা। কত বড় সংকট হয়েছিল তাতে।Ñআমি তাতে কিছু মনে করি নাই। অপমান-হেনস্থা যার যার ব্যাপার। লন্ডনে জেএসসি কী করে আমার বা জেএসসির বন্ধুরা হয়তো জানে, আমি জানি না। টাউনেও আমি আর খুব একটা যাই না। মুস্তফার দুর্দশা দেখতে ভালো লাগবে না বলে যাই না। মুস্তফার দুঃখের আলিফ লায়লা ওয়া আলার আধরাতের আধসেকেন্ডের কাহিনী শুনতেও বিরক্ত লাগবে বলে যাই না। বরং জেএসসি দেড়-দুই বছরে একবার আসে টাউনে, উল্লসিত কিছু দিন কাটে সকলের।Ñএটা ভালো। মদখোর যারা তারা দেদার মদ পায়। গানজাখোরদের অভাব-অনটন যে কদিন টাউনে থাকে দেখে জেএসসি। বুড়া খাটাশের মুখের ড্রয়িং তখন আকর্ণ বিস্তৃত থাকে দিনমান। ‘দাদার কীর্তি’ গল্প বুড়া খাটাশ পড়ে নাই, ‘দাদার কীর্তি’ ছবি দেখেছে। আনন্দের চোটে সেই রকম একটা ছবি বানাতে ইচ্ছা করে তার, ‘মামার কীর্তি।’
‘ছবিতে তোর মামার বউয়ের চরিত্র কি তোর মামার বউ করবে?’
‘না-আ-আ।’
‘তবে কি তোর বউ করবে? তোর মামার বউয়ের চরিত্র। মানে চরিত্র। মানে ক্যারেকটার। তোর মামার বউয়ের ক্যারেকটার। সেরা হবে তোর বউ করলে।’
‘শালা খবিশ! মামার তরুণী ভার্যারে তো রাইত দুইটায় ফোন করো তুমি।’
‘রাইত দুইটায় না বারোটা দশে। মদ খাইছিলাম। বলতেই মার্কামারা নাম্বার দিয়া দিল।’
‘জানি তো। মার্কামারা কি আর চিন্তা করছে তার তরমুজ ক্ষেতে মুখ দিবা তুমি!’
‘তরমুজ ক্ষেত! তরুণী ভার্যা! এই তোর মামার বউয়ের বয়স কতরে? আমার তো মনে হয় তেষট্টি-চৌষট্টি। সত্তইর হয় নাই, এইটা কনফার্ম।’
লিডার মানে অধ্যাপক মানে চিকিৎসার্থে যে এখন কলকাতাগামী বাসে বসে জমে যাচ্ছে এসির ঠান্ডায়, মার্কামারাকে ফোনে তার দুর্দশার কথা বলছে সে, সেই মার্কামারার সঙ্গে জেএসসির বউয়ের সর্বজনবিদিত সবিশেষ সম্পর্ক আছে। আমি সেই বিদিকে যাচ্ছি না। বুড়া খাটাশ ‘শুভ জন্মদিন’ উইশ করেছে তার মায়ের পেটের আপন মামাকে, আমি বুড়া খাটাশের নাম্বার আমার ফোন থেকে ডিলিট করে দিলাম। যদিও তার ফোন নাম্বার আমার মুখস্থ। আমার সব বন্ধুর ফোন নাম্বার আমার মুখস্থ।
পুনশ্চ: বুড়া খাটাশের মামার বয়স ৬০ হয়ে গেছে। আমাদেরও বয়স ৬০ হয়ে যাবে। ৬০। ৬-এর পর একটা ০-এর কিবা মানে? বরং বুড়া খাটাশের নলেজে দিতে হবে যে আমি তার নাম্বার আমার ফোন থেকে ডিলিট করে দিয়েছি। মুখস্থ নাম্বার। আমি কল দিলাম বুড়া খাটাশকে।