ধানসিড়ি
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৪ পিএম
কবি ও সাংবাদিক মাহমুদ শফিক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪। জন্মস্থান নড়িয়া, নানার বাড়ি। পিতৃভূমি গ্রাম: মগর, উপজেলা : নড়িয়া, জেলা: শরীয়তপুর। বাবা দীল মোহাম্মদ, মা সখিনা বেগম
কবির প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ছবি প্রকাশিত হলে (১৯৭৩)’। এই গ্রন্থ সম্পর্কে রণেশ দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘সীমানা ভাঙ্গার শুরুতেই এই তরুণ কবির লেখা শুরু। তবু এই কবির কলম কোনো রকম ভণিতা না করেই যেভাবে অভিজ্ঞতাকে রূপাধারে স্থাপন করেছে, তাতে কিছুটা আশ্চর্য হয়েছি (দৈনিক বাংলা/১১ নভেম্বর ১৯৭৩)’। তার কবিতা সম্পর্কে নাট্যকার আতিকুল হক চৌধুরী লিখেছেন, ‘তার কবিতায় শিকারী বাঘের অহঙ্কার আছে এবং সেই সঙ্গে আছে বাঘের চলাফেরার সৌন্দর্যময় ম্যাজেস্টিক আঙ্গিক (দৈনিক বাংলা/ ২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮)।’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছেÑ কোকিলের বাণিজ্য ভবন (১৯৭৫), ভেতরে নীরব যাত্রী (১৯৮৮), ভেতরের গল্প (১৯৯০), দহনের পিপাসা (১৯৯০), অন্ধ শিকারি (১৯৯৪), তৃষ্ণার ময়ূর আগুন (২০০২), পুরনো বাড়ির ছিন্ন নিনাদ (২০০৬), তৃণের দুঃখ (২০২১) ইত্যাদি। কবি মাহমুদ শফিকের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ‘দাও স্তব্ধতা, দাও প্রাণ (২০২৩)’ তার সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। বইটি প্রকাশ করেছে ‘সূচীপত্র’।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও মাহমুদ শফিকের অনেকগুলো গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে। তার লেখার পরিমাণ বিপুল। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। সংগীত রচনা করেছেন দুইশ’র বেশি। তার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠশিল্পীরা। আশির দশকে বিটিভিতে তার নির্দেশনা ও উপস্থাপনায় এক্সক্লুসিভ গানের অনুষ্ঠান ‘সঙ্গীত বিচিত্রা’ বেশ দর্শকপ্রিয় হয়েছিল। পেশায় তিনি একজন সাংবাদিক। ছিলেন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র প্রধান প্রতিবেদক। বিচিত্রায় করা তার প্রচ্ছদকাহিনী এখনও কিংবদন্তি হয়ে আছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, সোনারগাঁও’র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
লেখাই মুক্তির হাতিয়ার
কবি ও সাংবাদিক মাহমুদ শফিক। দেশের সাড়া জাগানো এই প্রতিবেদক সত্তর দশকের উজ্জ্বলতম কবিদের একজন। ভাষা ভঙ্গি ও বিষয় ভাবনায় তার কবিতা পেয়েছে নিজস্বতা। তার কবিতা কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, বরং সময় এবং দৈনন্দিনের একটি নীরব দলিলও। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সাহিত্য সাময়িকী ‘ধানসিড়ি’র পক্ষ থেকে প্রচারবিমুখ এই কবির মুখোমুখি হয়েছেন সাঈদ বারী
সাঈদ বারী: আপনার শৈশব এবং বেড়ে ওঠার জায়গা লেখকজীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে?
মাহমুদ শফিক: প্রচলিত অর্থে আমার শৈশব বলতে তেমন কিছু নেই। আব্বা ছিলেন পোস্টমাস্টার। তার চাকরি ছিল বদলিযোগ্য। অফিসের সঙ্গেই ছিল সরকারি বাসা। শান-শওকতের সঙ্গেই বেড়ে উঠেছি। খেলাধুলার সুযোগও পেয়েছি। তখন থেকেই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কবিতা পড়তে শুরু করেছি। একই সঙ্গে পড়তে শুরু করেছি দেশ-বিদেশের রূপকথা ও গল্প, শেক্সপিয়রের নাটকের গল্পের রূপান্তর।
ধানসিড়ি: লেখালেখির প্রতি আকৃষ্ট হলেন কীভাবে? অর্থাৎ শুরুটা জানতে চাই।
মা. শ: তা আমার মনে নেই। তবে নিজের অজান্তেই কিছু একটা লিখতে শুরু করি।
ধানসিড়ি: আপনার প্রথম প্রকাশিত লেখা কোনটি এবং তা কোথায় প্রকাশিত হয়?
মা. শ: আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক সংবাদে। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে। কবিতার নাম ‘কণ্ঠস্বর’। এই কবিতাটি লিখে বন্ধু-বান্ধবের কাছে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছি। তখন থেকেই লেখালেখির প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে যায়।
ধানসিড়ি: প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
মা. শ: সত্তর দশকের কবিদের মধ্যে আমারই কাব্যগ্রন্থই প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। কাব্যগ্রন্থের নাম ‘ছবি প্রকাশিত হলে’। প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৩ সালে। গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর কবিদের মধ্যে আমার নাম ছড়িয়ে যায়। গ্রন্থটি প্রবীণ সমালোচকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এই গ্রন্থটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা লিখেছেন বিপ্লবী রনেশ দাশগুপ্ত, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর, অধ্যাপক শফিউল আলম, শেখ আবদুর রহমান, আখতার হুসেনসহ আরও অনেকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন সরাসরি আমার শিক্ষক। এখনও গ্রন্থটি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হয়। এটা ছিল আমার কাছে দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
ধানসিড়ি: পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের সৃজনশীল জগৎকে কীভাবে সমন্বয় করতেন?
মা. শ: বাংলাদেশে লেখালেখিকে পুরোপুরি পেশা হিসেবে গ্রহণ করার তেমন কোনো সুযোগ নেই। আমিও লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। এতে লেখালেখির কাজ অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে। পরিমাণে আমি অনেক বেশি লিখেছি বলে (আমার) পেশার সঙ্গে লেখালেখির বিরোধ পাঠকের কাছে ধরা পড়েনি। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, আমি আরাম-আয়েশের কথা না ভেবে লেখালেখির জন্য অনেক কষ্ট করেছি।
ধানসিড়ি: কবি গবেষক-প্রাবন্ধিক, গীতিকার, সাংবাদিকÑ এই পরিচয়গুলোর মধ্যে কোনটিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
মা. শ: নিঃসন্দেহে কবিতায়। আমি কবিতা নিয়েই বেঁচে আছি। থাকতে চাই আমৃত্যু।
ধানসিড়ি: সত্তর দশকের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আপনার কবিতায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে?
মা. শ: এ সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্রকল্প রয়েছে আমার কবিতায়। আছে বিদ্রোহ, বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজেকেও ভেঙেছি, ভেঙে টুকরো টুকরো করেছি এবং আবার জোড়া লাগিয়েছি।
ধানসিড়ি: আপনার কবিতার ভাষা ও বয়ান নির্মাণে কারা বা কোন ধারা প্রভাব ফেলেছে?
মা. শ: স্থান-কালের প্রভাবে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে। মানুষের অচেতন ও অবচেতন মনের ভেতরে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে, যেখানে যুক্তি ও বাস্তবতা একসঙ্গে কাজ করে না। আমরা কথায় কথায় বলি, সময় বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সময় কোন দিকে বয়ে যাচ্ছে? এর কি কোনো সহজ উত্তর আছে?
ধানসিড়ি : সাংবাদিকতার পেশা আপনার সাহিত্যচর্চাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
মা. শ: সাংবাদিকতা খুবই দায়িত্বশীল পেশা। এই পেশার কারণেই আমাকে অন্তত দুইবার অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। আরেকবার হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। মারাত্মকভাবে আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থেকেছি। ফ্যাসিস্ট আমলে আমার কোনো লেখা কিংবা গান প্রচারিত হয়নি। রেডিও-তে প্রচারিত গানের রয়্যালটি দেওয়া হয়নি। এরপরও আমার লেখা বন্ধ থাকেনি। আমি লেখাকে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছি।
ধানসিড়ি: আপনার জীবনের স্বর্ণালি সময় কেটেছে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য়। সেখানে কাজ করার সময় কোনো স্মরণীয় অভিজ্ঞতা পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করবেন কী?
মা. শ: ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে চাকরি করেছি।
ধানসিড়ি: আপনার গান লেখার প্রেরণা কার কাছ থেকে পেলেন?
মা. শ: এদেশের বেশিরভাগ আধুনিক কবিই গান লিখেছেন। এই ব্যাপারে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন কবি শামসুর রাহমান।
ধানসিড়ি: আপনার সমসাময়িক লেখক-বন্ধুদের সম্পর্কে কিছু বলুন।
মা. শ: আমার বন্ধু, সহপাঠীদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত কবি ও লেখক। তাদের সঙ্গে এখন খুব কমই দেখা হয়।
ধানসিড়ি: বাংলা কবিতার বর্তমান প্রবণতা সম্পর্কে কিছু বলুন।
মা. শ: বাংলা কবিতা কোথায় যেন আটকে আছে। তাই প্রতিভাবান কবিদেরও মূল্যায়ন হচ্ছে না।
ধানসিড়ি: এই প্রজন্মের কবিদের লেখালেখিতে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেন?
মা. শ: এই প্রজন্মের কবিরা নিজেরাই নিজেদের লেখা অবাধে প্রকাশ করছেন। তবে তা প্রকৃত সমালোচকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে।
ধানসিড়ি: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরÑ এই দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি কতটা উপভোগ করেছেন?
মা. শ: দারুণ উপভোগ করেছি। বিশেষ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে চুক্তিভিত্তিক নিযুক্তি দিয়েছেন। তা আমি পবিত্র মনে গ্রহণ করেছি এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
ধানসিড়ি: সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় আপনার সাহিত্য চিন্তার কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে কি না?
মা. শ: এই ব্যাপারে কিছুটা হলেও সতর্ক থাকতে হয়েছে।
ধানসিড়ি: (আপনার) প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কেন?
মা. শ: আমার প্রথম গ্রন্থ ‘ছবি প্রকাশিত হলে’ (১৯৭৩) এবং তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ভেতরে নীরব যাত্রী’ (১৯৮৮)। ‘ছবি প্রকাশিত হলে’ আমার প্রথম গ্রন্থ বলেই প্রিয়। ‘ভেতরে নীরব যাত্রী’ কাব্যগ্রন্থটি দীর্ঘদিন পরে প্রকাশিত হয়েছিল বলে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছি। কবি আল মাহমুদ আমার এই গ্রন্থটিকে কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ধানসিড়ি: দীর্ঘ সাহিত্য জীবনের দিকে ফিরে তাকালে কোন বিষয়টি আপনার কাছে তৃপ্তিদায়ক বলে মনে হয়?
মা. শ: নিজে লেখা এবং অন্যের লেখাপড়ার আনন্দই আলাদা, যা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় না।
ধানসিড়ি : একজন তরুণ কবিকে আপনি কী পরামর্শ দিতে চান?
মা. শ: না, তেমন কিছু পরামর্শ দিতে চাই না।
ধানসিড়ি: আপনার জীবন ও সাহিত্যকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
মা. শ: অতৃপ্তি।
ধানসিড়ি: আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ আমাকে সময় দেওয়ার জন্য।
মা. শ: আপনাকেও ধন্যবাদ।