মাহমুদ শফিক
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০০ পিএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:১৫ পিএম
অলংকরণ: হাসনাত মোবারক
রক্তকরবী
মাছরাঙার ডানায় নেমেছিল রঙিন ভোর,
স্নিগ্ধতা ছিল রোদে, স্নিগ্ধতা ছিল
অবসরে,
তাই হাঁটতে হাঁটতে এসেছি জলের ধারে,
দেখেছি নিজের মুখ জলের দর্পণে।
স্নিগ্ধতা ছিল মনে মনে, স্নিগ্ধতা ছিল
অবেলার গানে,
তাই শিরীষ পাতার ওপর চমকে উঠেছে
ভোরের আলো, চোখের তারায় তারায়
জমেছে সাদা মেঘ।
স্নিগ্ধতা ছিল বৃষ্টিতে, স্নিগ্ধতা ছিল
জোয়ার-ভাটায়,
তাই সূর্যাস্ত শিকারির হাত ধরে আমি
কচ্ছপের মতো নেমে গেছি সমুদ্রের
তলদেশে, মাছ হয়ে দিয়েছি ধরা তোমার
জালে।
স্নিগ্ধতা ছিল সারসের ডানায় ডানায়, তাই
একপায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি জলের ধারে,
অসহ্য স্নিগ্ধতায় তোমার স্তনের নিচে
ঢুকিয়ে দিয়েছি ধারালো ব্লেড,
গলগল করে বেরিয়ে এসেছে লাল রক্ত,
মিশে গেছে ভোরের আলোয়, বুকের
মধ্যে ফুটে উঠেছে রক্তকরবী।
যদি বাঁচি
যদি আরেকটি দিন বেঁচে থাকি,
বুকের মধ্যে রাখবো আগুন।
মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবো আলো,
এরপর চন্দনকাঠের সৌরভ ছড়িয়ে
দিয়ে
পুড়তে
পুড়তে
ছাই হয়ে যাবো।
যদি আরেকটি দিন বেঁচে থাকি,
শিশির হয়ে ঝরবো ঘাসফুলে,
ভোরের নরম আলোয় ধরে রাখবো
নিজের অস্তিত্ব,
কেউ কেউ দেখতে পাবে আমাকে,
কেউ বা মাড়িয়ে যাবে
এই ভেবে কখনো কষ্ট পাবো না।
যদি আরেকটি দিন বেঁচে থাকি,
অসমাপ্ত শস্যের বেদনা নিয়ে
জেগে থাকবো পুরোটা দিন,
তবু ফুল হয়ে ধরা দেবো না
মৌমাছির কাছে,
বরং লিখবো কবিতা।
যদি আরেকটি দিন বেঁচে থাকি,
স্বরবর্ণ হয়ে মিশে যাবো ব্যঞ্জন
বর্ণের সাথে,
টুংটাং মিষ্টি সুরে নীড় খুঁজে নেবো
কমলাবাগানে,
মুমূর্ষু রোগীর কাছে ধরা দেবো নিভৃতে
এরপর বেরিয়ে আসবো ভেতর থেকে।
ফুলদানি
সেই একটু অভিমান, আর কখনো
কথা হয়নি, আমার বুকের মধ্যে
জমা হয়েছে শীতল বরফ,
ক্ষয় হয়ে গেছে নক্ষত্র
তৃণভূমির খরগোশগুলো ঢুকে
গেছে গর্তে, সাপ শুরু করেছে
আনাগোনা, কবিতার খাতা থেকে
সাধিত শব্দগুলো ঝাঁক ঝাঁক
রাজহাঁস হয়ে উড়ে গেছে হঠাৎ,
সেই একটু অভিমান।
তুমি অভিমান করেছ বলেই কুঁড়ির
ভেতরে লাল হয়ে রয়ে গেছে গোলাপ
বাইরে আসেনি, রয়ে গেছে
অন্ধকারে।
আমার কাছ থেকে অনেক দূরে
চলে গেছে আকাশ, বসন্তের
আড়ম্বর উৎসবেও বের হইনি
আমি
সৌরভ ছড়িয়ে
ছড়িয়ে
শ্মশানে পুড়েছে চন্দনকাঠ,
ছাই হয়েছে, কী আশ্চর্য
সবচেয়ে বেশি পুড়েছি আমি
ছাই হয়নি, কুমারবাড়ির উনুনে
পুড়েছে ফুলদানি, শক্ত হয়েছে
তা,
যদি পারো তোমার হাতের কাছে
ফুলদানি করে রেখে দিও আমাকে।
পথের রেখা
চোখে তার খেলা করে অজস্র
লাল নীল মাছ, ডানা কাৎ
করে জলের কিনারে নামে
সাদা সারস, পালকের নিচে
ঠোঁট লুকিয়ে রেখে এক পায়
দাঁড়িয়ে থাকে, কয়েকটি হিজল
গাছ কোমর ডুবিয়ে রাখে হাওরের
মাঝখানে, তার ডালে নৌকা বেঁধে
ঘুমিয়ে পড়েছে মাঝি, এদিকে
দৃষ্টি নেই তার।
চোখ কি তার আমলকীর বন? বহুদিন
সে এই গাছের নিচে বসে শুনেছে
হলুদ পাখির গান, সন্ধ্যা হয়ে
গেছে, ফিরেনি বাড়ি,
হাঁটতে
হাঁটতে
চলে গেছে সে দিগন্তের কাছাকাছি
সন্ধ্যা ও রাতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে
দেখেছে সূর্য ও চাঁদের গোধূলিনৃত্য,
লাল ও সোনালি রঙের মহমর্মিতা
আর
দিনের আশ্চর্য অবসান,
দেখেছে এ-পার থেকে
ও-পারে যাবার অস্পষ্ট
পথের রেখা।
আগুন
উঠানে নেমেছে শুল্ক পক্ষের চাঁদ
আমিও কৃষ্ণপক্ষ পার হয়ে এসেছি
এখানে, তুমি চলে গেছো বহুদূরে
এভাবেই ক্রমাগত
বেড়ে গেছে
তোমার আমার দূরত্ব। এ কেমন বিরহ!
রক্তজবার চেয়েও বেশি লাল
আগুনের চেয়েও বেশি উত্তপ্ত
এ কেমন খাণ্ডবদাহ! অরণ্য পুড়ে
ছাই হয়ে যায়, নিভে যায় আগুন
আমার বুকের আগুন নিভে না;
আমি পুড়ি অন্যরকম আগুনে।
ময়ূরের পেখমখোলা নীল ঝিলমিল এই
আগুন নৃত্যের মহিমা নিয়ে জ্বলতেই
থাকে, নিভেনা কখনো, এ কেমন
খাণ্ডবদাহ!