জাহাঙ্গীর ফিরোজ
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:২৪ পিএম
চোতের শেষে মেলা
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
একটি গ্রামে নরম নীরবতা
বাতাস বলে পাতার সাথে কথা।
ঘুঘুর ডাকে মধ্য দুপুর নাচে
রোদের তাপে বনবিড়ালী যাঁচে
শীতল ছায়া বনের মায়া গাছে
একটুখানি আছে।
গ্রামের প্রাণে বাড়ির কোণে
ফুটছে কুঁড়ি জুঁই
ঝরার আগে হলুদ পাতা
বলছে আমি শুই?
একটি বাড়ি, দুয়ার থেকে
বলল ডেকে কায়া
কাঁঠালতলে নিবিড় ঘন ছায়া
জিরিয়ে নাও
তিয়াসখানি জলে
মিটিয়ে নাও বলে
উঠল ছায়া দুলে।
কাঁঠাল ছায়া! কাঁঠাল ছায়া!
স্মৃতির মাঝে রোজ
চোত-দুপুরে শীতলপাটি
বিছিয়ে ভাই খোঁজ।
চোতের শেষে চরক পূজা
ভূতের চালান মুড়কি মুড়ির মেলা
এরই মধ্যে শুনতে পেলাম বউ কথা কও পাখি
আকাশ নীলে নিখোঁজ হলো ডাকি।
চোখ গেল রে চোখ গেল রে বলে
কোথায় গেল কুটুম পাখি চলে?
ছায়ার কায়া বলল হেসে
কোন শহরে বাস
গাছ কেটেছ, পাহাড় কেটে
করছ সর্বনাশ!
মনের বনে গভীর রাতে একী
উঠল ডেকে : শহর ছাড়
ঘুম ভাঙানো পাখি।
চৈত্রে অপ্রেম
সরকার মাসুদ
ছোট শহরের নির্জনতায় ভরা মন্থর বিকাল
গাভীর চোখের মতো ছোট জলাশয়
পিঠে শালিকসমেত মহিষের
হেলেদুলে হেঁটে আসা আর
গোসাঁই বাগানে হাজার হাজার খয়েরি-হলুদ
ফুলের আকুল আহ্বান…
এসবের চেয়ে ভালো স্মৃতি নেই,
আর কোনো ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই
তবু আমরা চেঁচিয়ে উঠছি কীসের আনন্দে?
এই গুমোট এপ্রিলে আমরা টেরই পাইনি
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মতো
নিঃশব্দে হাতছাড়া হয়ে গেছে ক্ষণজীবী প্রেম!
অন্তত এই মর্মে
আলফ্রেড খোকন
এখন আমার সেই পুরাতন
ডাক বিভাগের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে;
অনেক দিন পর যেমন খবর পেতাম
পেতাম চিঠির অক্ষরে
বহু দিন পর সেও আমার সংবাদ পেত
একটার পর একটা শব্দের ভেতরে
ডাক বিভাগের সিলগালা সহ্য করার পর
বেদনারা চাপা পড়ে যেত;
আমাকে তার অনেক দৃশ্য দেখতে হতো না
তার তরফ থেকেও
আমার অনেক দৃশ্য তার দেখা লাগত না
না দেখেই ভালো হতোÑ অন্তত এই মর্মে যে
আমি তার বেদনার কিছুই দেখিনি!
খড়মপুর
মতিন রায়হান
অন্ধের চোখের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চরাচরে
তাই আজ হাওয়া-হাওয়া সোনালি বিকাল
গভীর মগ্ন চোখে দেখি ছুটে চলা
দুরন্ত রেললাইন
ডাকে ভাদুঘর, নাচে রেলব্রিজ
কুরুলিয়া খাল
তাজা শিং কৈ বোয়ালের লাফ
কুয়াশার জাল ফুঁড়ে ওড়ে মাছরাঙা
খড়মপুর ধরমপুর
অতি পুণ্যধাম
তিতাস তিতাস তুই
বড় ভাগ্যবান
তোর জলে কল্লা ভাসে
শহীদের লোহু
অবাক সবাক সূর্যোদয়
জয়ের নিশান!
কল্লা থেকে আওয়াজ ওঠে
গায়েবি আওয়াজ
কী যে খাঁটিÑ পুণ্যমাটি
কল্লা শহীদের পবিত্র মাজার
অন্ধের চোখের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চরাচরে
শীত নেই বর্ষা নেই
ধ্বনি-প্রতিধ্বনি
নিত্য ওঠে এই গায়েবি মাজারে...
চৈত্রের গান
মুজিব ইরম
জয় কালীমন্দিরের পাশে
ফুটেছে ফুল জিয়লগাছে
হরষ হরষ লাগে
আমার
খুশি খুশি লাগে…
তোমার বাড়ির পূর্ব পাশে
শেয়াল কাঁটা ঝোপের মাঝে
ফুটেছে ফুল
হলুদ হলুদ
মন উচাটন লাগে
আমার
ফুর্তি ফুর্তি লাগে…
পথের ধারে খালের পাড়ে
ফুটেছে ফুল ভাটি বনে
রূপের ঝলক মারে
পুষ্প পুষ্প লাগে
আমার
কুসুম কুসুম লাগে…
চৈত্র : স্পর্শের পূর্বমুহূর্ত
শাহেদ কায়েস
চৈত্রের ভেতর দিয়ে হাঁটলে মনে হয় পৃথিবী নিজের পুরনো ত্বক খুলে
ফেলে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে এক লাল-কমলা দেহেÑ যেখানে রঙ মানে গোপনে জমে থাকা এক আকাঙ্ক্ষার
উষ্ণ বিস্তার।
পলাশ আর শিমুলের আগুনে চারদিক ভরে উঠেছে, যেন স্পর্শের আগেই জন্ম
নিচ্ছে এক অদৃশ্য ভাষা; দুই নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে কাছে আসে, কোনো নাম, পরিচয় ছাড়া,
শুধু উষ্ণতার ভেতর নিজেদের চিনে নিতে থাকে।
পুরনো পাতারা ঝরে পড়েÑ যেন নিষেধের স্তরগুলো খুলে যাচ্ছে একে একে,
আর বৃষ্টির ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী দুই স্রোতের মতো মিলনের ইঙ্গিত রেখে যায়।
কোকিলের ডাক দূর থেকে ভেসে আসে, দীর্ঘ এক আহ্বানÑ ‘আরও কাছে’, কিন্তু
সেই কাছে আসার শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না; শুধু শরীরের ভেতর এক অনন্ত কম্পন জন্ম নিতে
থাকে, যা স্পর্শের আগেই পূর্ণ হয়ে ওঠে।
গরমাশ্রু
শামীম হোসেন
আছি বলেই যে থেকে যাব
এমন বাজি বোকারাই ধরে
রোদের মুখোমুখি আয়নায়
কে কার প্রতিবিম্ব দেখে!
হড়হড়ানো বাতাসে তোমার চুলের মতো মোহনীয়
ঝরাপাতা গড়াতে গড়াতে আসে চৈত্রের উঠোনে।
আমি জানি, আমার জানার পেছনেও আছে
চূর্ণ মঞ্জুরি, কানামাছি
নিঝুম আতাবন পেরোলেই তোমাদের বাড়ি
গরমাশ্রু নদী...
চৈত্র-চরিতামৃত
বিধান সাহা
ফুলে ওঠা তাঁবুর মতো পর্ণার বুক ভালো লাগেÑ
রঙচংয়ে মুখের ভেতর অত্যুজ্জ্বল চোখ
যেন গিলে খাবে রহস্যের সবটুকু রস!
গলার লকেট আর গভীর নাভী
এর মধ্যবর্তী মরু এতটাই তীব্র যেÑ
এই দূর দেশ থেকেও ভয়াবহ তাপে পুড়ে যাই!
তেঁতুল বনে
নিজাম বিশ্বাস
তেঁতুল গাছটা বড় হয়ে গেছে
লোভনীয় কোনো ফুল
এমনকি কোনো ফল
ধারণ করেনি তার ডাল,
তবু তার নিচে বসে থাকতাম,
হাত দিয়ে ধরা যেত চিরিচিরি পাতা
এ তেঁতুলতলে বসে থেকে থেকে
আমাদের ভূতে ধরে,
এক দিন মুগ্ধ হয়ে
আমরা বলেই বসলামÑ
ভালোবাসি, ভালোবাসি…
তারপর হাত ধরে
আমরা হেঁটেছি শুধু তেঁতুলের বনে
তেঁতুলে আগ্রহ কম পক্ষীকুলে
পক্ব ফল ঝরে পড়ে
যথার্থ বয়স হলে,
হলুদ পাতার আল্পনাতে
বনে শীত নামে চুপিসারে
দৃশ্যমান হয় ডালে পরিযায়ী নীড়
হেতু-চৈত্র-দুপুর-সংকেত
অরবিন্দ চক্রবর্তী
বাঘ-বিছানো এই দুপুর
সান্নিধ্যের গহিনে যাচ্ছি।
দুপুর তো কারণ পছন্দ করে।
যেমন-হেতুর পুকুরে চৈত্র আসে
টুকরো-চৌচির, এবং
মাটির পর কাটাফাটা জ্যোৎস্না।
রৌদ্রের বেহাগে গমসমাগম—
ক্ষেতের চাষি আংশিক গোদাবরী পায়।
হেতুও চৈত্র পছন্দ করে।
তেমনই-নেপথ্যে থাকে সংকেত—
(হতে পারে) চাঁদ-সহচর,
(হতে পারে) সমীপের অক্ষ-পৃষ্ঠদেশ।
শব্দহীন ক্লান্ত চৈত্রে
হোসেন শহীদ মজনু
দায়িত্বের সুতোয় বাঁধা যান্ত্রিক ‘আমি’
ল্যাম্পপোস্টের নিচও অন্ধকার জানি
কেউ খোঁজে না মানুষ, নিদেনপক্ষে ‘মন’
পেলেই খুশি; চাইতে গেলেই নির্বাসন!
প্রশংসার ভিড়ে প্রশ্নরা এমনিতেই ক্লান্ত
অভ্যস্ত ভিড়ে লুকানো মুখ সৌম্য শান্ত!
অনলাইনের সবুজ ছেড়ে অফলাইনে যাই
কেউ কি চেনে মুখোশের ‘আমাকে’ হায়!
এইসব প্রশংসা ছেড়ে চলো পালাই কোথাও
বড় ভয় ল্যাম্পপোস্ট, নিচের অন্ধকারকেও!
এই চৈত্রে কেন শব্দহীন; বড় ক্লান্ত আমি
ফুরিয়ে যাওয়া মোহন সুরে হাসে অন্তর্যামী!
পথ্য, তরুণ কবিদের
শোয়াইব জিবরান
ক্ষুধার্ত করে তোলো, হাংরি রাখো নিজেরে
যেন এই বনে, পাশের লোকালয়ে কোনো রক্তমাংস নাই।
সেই স্বাদ মনে করে জেগে ওঠো মাত্রই তো গতকালের, নরমাংস ভক্ষণের।
যেন বহু দিন তুমি খুব অনাহারে নিপতিত
দুঃখিত মাংসাশী ঘাস পাতা খেয়ে করছ যাপন
লজ্জা আর ক্রোধের জীবন।
নিজেরে আগ্রাসী করে তোলো, শিকারে। ক্ষুব্ধ করে তোলো
গেঁথে চলো সেই সকল হরিণের ছায়া, পথরেখা যেদিকে গেছে
আর নখ লুকিয়ে খুব নরম পায়ে হেঁটে চলো গহন বনপথে।
নিজেরে তৃপ্ত করো না। কিছুতেই। না কিছুতেই
তবেই না ধরা দেবেন তোমার পাতায় দেবী, অমরতার।
চন্দ্রমাতাল
মামুন খান
দীর্ঘ দীর্ঘ চর পড়ে যাওয়া কোনো একটা নদীর ঠিক মাঝখানটায়
ঘাসের মুছলা পেতে
এক রাত জোছনাশরাব পান করে মরে যেতে চাই আমি।
চৈতের হাওয়ারা যদি তাতে চন্দ্রমাতাল বলে
গ্রামে গ্রামে দেশে দেশে রটিয়েও দেয় আমাকে
দিক, কিচ্ছু মনে করব না।
দ্বৈত সত্য
রাজিয়া সুলতানা ঈশিতা
দেহ-মনের সুগন্ধিতে ডুব;
গ্রীবা, ঘাড় ও চিবুক ওতপ্রোত
নৈর্ব্যত্তিক প্রেম ও কর্ম একই পুলসিরাতে পার,
বেহেশত দোজখের কোনখানে আমাদের স্থান!
প্রেম-পারিজাত অবজ্ঞায় স্বস্তি নাহি হায়!
কাম বনাম কর্ম, উভয়ই নৈবেদ্য
বিকল্প বলে কিছু হয় না পৃথিবীতে
সংসার ও অনুরাগ পাশাপাশি থাক।