তাসনুভা অরিন
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:১৩ পিএম
চিত্রকর্ম: কাজী রকিব
একবার দেয়াল পত্রিকার জন্য ১২ মাসের কোলাজ এঁকেছিলাম। সেখানে শেষ ছবিটা ছিল চৈত্রের। অফিস, ঘর আর গাড়ির চার দেয়াল যখন শীততাপ নিয়ন্ত্রিত, চৈত্র অথবা বৈশাখ শোকেস গুছিয়ে রাখা কোনো কালচারাল শোপিস মনে হয় অথবা খুব রোমান্টিক গানের কোনো লাইন যেমন ‘চৈতী রাতে… উদাস হাওয়ায়… শুনতে শুনতে মনে হতে থাকে, মানুষের উদাসীনতা হয়তো ঋতুজাত।’
ফাল্গুন মানে
যখন ফুল, পাখি, প্রজাপতি, লাল, নীল হলুদের আশকারা আকাশে বাতাসে, ঠিক তার পরের মাস চৈত্র;
যা কিছু সুন্দর হয়ে ফোটে সব ঝরে পড়ে। যেমন বন্ধুত্ব, প্রেম কিংবা খুব অল্প সময়ে তৈরি
হয়ে ভেঙে পড়া সম্পর্কের মতো, যা মানুষকে ভেঙে দেয় কিন্তু মেরে ফেলে না, বরঞ্চ তাকে
এক নতুন দিনের দিকে নিয়ে যায়, যা প্রত্যাশিত। যেমন টুইন ফ্লেইম সম্পর্ক। কিন্তু তার
পর থেকে নিজের মতো চরিত্রের কোনো মানুষের সঙ্গে আর কখনও মিশতে যাই না। আমার মনে হয়,
মানুষ খুব বেশিক্ষণ নিজের মতো দেখতে, শুনতে কিংবা বুঝদার মানুষের সঙ্গে মিশে থাকতে
পারে না, কিন্তু নিজেকে বোঝা বা জানার জন্য নিজের মতো খুব চেনা কারও কাছে যেতে হয়।
আর এই সাক্ষাৎটা হয়েই যায়। যেন কেউ বসন্তের মতো ফুলের পসরা নিয়ে আসবে, কিন্তু খুব অল্প
সময় পরই ওই সম্পর্কে ভর করবে দারুণ উদাসীনতা। ছিটকে পড়বে দুজন মানুষ দুই দিকে যেন তারা
জরাসন্ধের দুই পা, যা দুই দিকে যাবেই, আর তাতেই মৃত্যু। কিন্তু তার পরও কী শক্তিশালী
আবেগ, যেন বসন্ত। উপচে পড়ছে গাছ ফুলের ভারে, প্রজাপতিদের যেন ঈদ।
তুমি টুইন
ফ্লেইম বোঝ?
বুঝি।
এই দেখো, আমি
আমাদের সম্পর্ক নিয়ে একটা ছবি এঁকেছি।
ঋতমের আঁকা ছবিটার
নাম ছিল চৈত্র। আমি ছবিটার ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম হু হু ধ্বনি। পুরো ক্যানভাস জুড়ে
চৌচির মাঠের টেকচার। দেখে মনে হচ্ছে দোকানে ঝুলিয়ে রাখা ইয়োলো অকার রঙের কাপড়। আর তাতে একটি কোকিল পলাশ ফুলের কাছে
খুব গম্ভীরভাবে বসে আছে, তার কণ্ঠে কুহু ধ্বনি নেই, চোখে বসন্তের উচ্ছ্বাস নেই। আর
পলাশ ফুল ফুটে আছে টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো টুকটুকে রঙে, যেন টোকা লাগলেই গলগল করে রক্ত
ঝরবে। সবকিছু সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও পুরো চিত্রকর্মের ভেতর শূন্যতা। পেছনের চৌচির মাঠের
ব্যাকগ্রাউন্ড জানিয়ে দিচ্ছে, এই যা কিছু সুন্দর তা থাকবে না। এই কোকিল পাখিটা এই ডালে
বসে কাউকে আর ডকাবে না, আর ফুলটা টুপ করে খসে পড়বে মাটিতে। হয়তো ওই ডালে নতুন কোকিল
আসবে, নতুন ফুল ফুটবে, কিন্তু এই মুহূর্তের কোনো দ্বিতীয় রূপায়ণ হবে না। ঠিক সেখানেই
চিনচিনে আর্তনাদ ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তির মতো লাগছিল। জানতে চাইলাম–
এই ছবির অর্থ
কী?
ঋতম ছবিটা আমার
হাতে দিয়ে জানাল, সে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে জানায় আমাদের সম্পর্ক আর
সামনে এগোবে না।
আমি বললামÑ ‘যদি
আমি অপেক্ষা করি।’ সে উত্তরে জানায় ‘ক্যালেন্ডারের শেষ মাস চৈত্র, আমরা চাইলেও পুরনো
ক্যালেন্ডার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি না।
কিন্তু তুমি তো
বলেছিলে, আমি নাকি বসন্ত, কোনোদিন ফুরাই না।
যা ফুরিয়ে না
যায়, তা সুন্দর না, আর যা সুন্দর তার মৃত্যু হয়, এটাই সত্য।
তারপর ঋতম জানায়
আমার সঙ্গে কাটানো একটা বছরের সুন্দর সুন্দর মুহূর্তের কথা। ক্যাম্পাসে পহেলা বৈশাখে
লাল-সাদা শাড়িতে আমাকে দেখে প্রথম তার ভালো লাগা বা ফ্যান্টাসি, তার পর এক দিন জাম
খেতে খেতে নীল জিভ বের করে প্রপোজ করে বলাÑ ‘আমার রাঁধা হবে? তার পর আষাঢ়-শ্রাবণের
মতো ঝরছিলাম আমরা, মেঘ ভেঙে। বাঁধ ভাঙা নদীর মতো ভেসে আর ভাসিয়ে নিয়েছিলাম একে অপরকে।
তারপর কিছুটা কারণ কিংবা অকারণে অভিমান, দূরে যেতে চেয়ে ফিরে আসা, শান্ত আর অশান্ত
অনুভূতির দারুণ মিশেলে দুর্দান্ত প্রেম জানতই না সম্পর্কেও শৈত্যপ্রবাহ আসতে পারে।
তার পর ফের শীত কাটিয়ে আরও রহস্য আর নাটকীয়তার পসরা নিয়ে এসেছিল বসন্ত। প্রেম যেন ফুল
ফলের বিন্যাস। শত ঝড়ঝাপটা আর শীতলতার পরিশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত বসন্ত। দেহের সঙ্গে
মন আর মনের সঙ্গে দেহের কাঁচা রঙ মিশে জীবন যে চিত্রকর্ম তৈরি করল, তা সেই মাস্টারপিস
যার জন্য মানুষের প্রতিটা জন্ম অপেক্ষায় থাকে।
এই ছিল ঋতম। তার
আঁকা ছবিটা হাতে নিয়ে ভাবছিলাম সুন্দরের অপর পাশেই থাকে ভয়ংকর, যেখানে প্রেম সেখানে
বিচ্ছেদ, যেখানে জন্ম সেখানেই মৃত্যু, যেখানে ফাল্গুন সেখানেই চৈত্র। আমি ক্যানভাসের
দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল কোকিল পাখিটা উড়ে যেতেই পলাশ ফুলটা তার
আগুন রঙ হারিয়ে ফেলল। আমি দেখছিলাম, কীভাবে বসন্তের কুহু কুহু সুর বদলে যায়, কীভাবে
সুন্দরের প্রতীক ফাগুনের ফুলগুলো একটা একটা করে ঝরে যায়।
চৈত্র একটা খাঁ
খাঁ অনুভূতি, যেখানে প্রকৃতি পেয়ে হারায়, মানুষকে ভাবায়, যা হারিয়ে যায় তা কি সত্যিই
হারিয়ে যায়? ভীষণ বিপরীতে আটকানো জীবনের সত্যগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় শেষ ঋতু বসন্ত তার
ফাগুন আর চৈত্রের বিপরীত সন্নিবেশে, যেন তার এক হাত শূন্য, রিক্ত আর অন্যহাত আশ্চর্যের
সমাহার। বছরের শেষ মাস এই চৈত্র বুঝিয়ে দেয় পরিপূর্ণতার আরেক পাশে অপূর্ণতা। আর এটাই
প্রকৃতির প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ।
এ পর্যায়ে মনে
হতে পারে, তাহলে কি সব শেষ, যেমন আমি ভেবেছিলাম বহু বছর আগে।
কিন্তু সৃষ্টি,
স্থিতি আর লয়ের এই মহাসংসারে কিছুই শেষ হয় না, প্রতিটা শেষ নতুন শুরুর অঙ্কুর নিয়ে
হাজির হয়। এটাই চৈত্রসংক্রান্তির কথা। বসন্ত একবার আসে না, ফাগুনের ফুলগুলো একবারই
ফোটে না, কোকিল কেবল এক বসন্তেই কুহু কুহু করে না। সামনের সব গল্প নতুন, আসে নতুন বছর,
চৈত্রের উদাসী হাওয়া ঝড় তুলে বৈশাখে জানিয়ে দেয়, সামনে ১২ মাসের বহু খেলা বাকি। ওই
মহাযজ্ঞের খেলায় কোনো এক ছোট্ট ক্যানভাসের কোকিল আর পলাশের গল্পটা মুহূর্তে ফুরিয়ে
যায়। যেন কিছুই ছিল না, কিছুই ঘটেনি, সময় চক্রের ১২ রূপ কেউ কারও থেকে বিচ্ছিন্ন না,
যে যার নিজস্ব ভূমিকায় আমাদের জানিয়ে দেয়, বৈচিত্র্যই জীবনের সবচেয়ে বড় নান্দনিকতা,
এখানে চৈত্র যেমন আছে, আষাঢ়-শ্রাবণ আছে, ভাদ্র আছে, শীত আর ফাগুনও আছে।
আমাদের জীবন ওই
১২ মাসের কোলাজ, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি আমরা আলাদা গল্পের চরিত্র হয়ে, আরও চরিত্রকে
চিনে নিই। আমার বারবার মনে হতে থাকে ছোটবেলায় আঁকা ১২ মাসের কোলাজ চিত্রটির কথা। তার
শেষ মাসের চৈত্রের ছবিটি ছিল নতুন বছরে যাওয়ার প্রস্তুতি। ওই চৌচির মাঠ আর মন, দুটোই
প্রস্তুত হতে থাকে, নতুন করে পাওয়ার জন্যÑ যা কিছু হারায়।
কেবল উপলব্ধি
থেকে যায়, যেন মন আর প্রকৃতি কেউই কখনও কাতর না হয়।