স্নিগ্ধা বাউল
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৪ পিএম
চিত্রকর্ম: মলয় বালা
মানুষের কাছে জীবনের মানে খুব করে খুঁজে পাওয়া যায় না কিংবা উজানের গল্পের সঙ্গে ভাটির গল্প মিলেমিশে ঠিক কোথায় যায় তার গল্প নদী হয়তো জানে না কিংবা বিলিয়ে দেয় সমুদ্রে। কত করেই না তবে জানা গেল আমাদের অভিধানেই কেবল আছে অভিমান নামের শব্দ; তাহলে কি অভিমান হয় না দূরের দেশের মানুষের কিংবা অন্যভাষীরা জানেই না হৃদয় যে দুঃখের আগে টলটল করে রাখে চোখ তারও একটা নাম থাকতে হয় কেবল জানার জন্য! আমাদের হৃদয় তাই সম্ভবত চলে যায়, ভেসে যায়, আমাদের ছেড়ে যায়, যার নাম উজান-ভাটি; রেখে যায় জলের ছাপ, মুগ্ধ হৃদয়, আর পাতায় পাতায় স্মৃতির প্রবাহ। বাংলাদেশের মানুষের জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির সঙ্গে আবেগ-অনুভূতি বদল করে নেওয়ার এক সমন্বয়।
আমাদের শৈশব-কৈশোরের তুমুল স্মৃতি আমাদের নিয়ে যায় প্রতিদিনের মতো করে তার কাছে, যেখানে চৈত্রের বাতাস শুরু হলে আমাদের মনে জেগে ওঠে, ঠিক কখন কোথায় আমাদের আনন্দরা বসবাস করেছিল! মাতাল বর্ষায়, ফাল্গুনের বাতাসে, হেমন্তের তালপাতায়, হোগলার বনে লুকিয়ে রাখা রাজহাঁসের ডিমে, বর্ষার কদম ফুলে, আর বুনো জংলা ফুলের ঘ্রাণে আমাদের হৃদয় হয়ে যায় পুষ্পিত বন। ঠিক পড়ন্ত দুপুরে আমাদের মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা ঢেউ পুকুরে বিলীন হওয়ার আগে আমরা বসে পড়তাম পাড়ার তেঁতুলতলার নির্জন বকের সারথি হয়ে। তখন মাছরাঙা পাখিটি ধ্যানে বসে থাকলে, আমরা হয়ে উঠি অনবদ্য শিকারের চিত্রকর। একটা ছোট মাছরাঙা পাখি পুকুরে গুঁজে রাখা বাঁশের কঞ্চির ডগা থেকে সারসের মতো গলা বাড়িয়ে শকুনের শ্যেন দৃষ্টিতে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় পোনামাছের শরীর। পোনার শরীরের চিৎকার তখন হারিয়ে যায় আমাদের ঝিরিঝিরি বাতাসের গাবগাছের সবুজ পাতায়। গাবগাছের কাছে যে একটা গন্ধ থাকে তার সঙ্গে বাতাসের গল্প এই মধ্য চৈত্র্যের গনগনে দুপুরে যে ঝিমুনি এনে দিচ্ছে আমার তার জন্য নিজের বয়সের ওপর মায়া হচ্ছে। মনে এগিয়ে আসছে সংক্রান্তি; সে বয়স হোক নিজের কিংবা পৃথিবীর।
পৌষ-সংক্রান্তি মানেই আমার মায়ের বাড়াবাড়ি রকমের পরিচ্ছন্নতার সময়।
টিনের চালার ঘরে নারিকেল পাতার শলাকার ঝনঝন শব্দে একটা মাথাধরা লেগে আছে আজও আমার সত্তায়।
তখন আমগাছে বোল এসে গেছে, কাঁঠালের গাছে এসেছে নতুন মুচি কিংবা স্কুল ছুটির সঙ্গে এসেছে
আমাদের দুরন্ত ক্লান্তি। স্কুলের ছুটির পর এসে দেখি ক্লান্ত মা দরজায় পাটি পেতে আঁচল
বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেকে নিয়ে। মায়ের সে আঁচলে ভর করে থাকে ঢেঁড়স ভাজির সঙ্গে আম-ডালের
লবণাক্ত স্বাদ। কেবল আতঙ্ক কখন ঝড় আসে আর ঝড় আসার আগে আমি আর দিদি বস্তাবন্দি করে সাবধানে
রেখে দিতাম কড়কড়ে করে শুকিয়ে রাখা মায়ের জন্য মেহগনি গাছের ঝরে যাওয়া পাতা। পাতা কুড়ানোর
সেই দিনে মায়ের আঁচল, দিদির শাসন আর আমার দুষ্টুমি আচমকা যেন একটা বরই গাছে ঝাঁকুনি
দেওয়ার সমান্তরাল।
ঠিক এই সময়ে মানে চৈত্র মাসে আমরা পুতুলের বিয়ে দিতাম পুকুর পাড়ের
হিজল গাছের তলায়, টুকিয়ে আনতাম লাল ইট, ঝরে পড়া আম আর কচুরিপানা। আমগাছগুলোও এখন নিস্তব্ধতা
বিদীর্ণ করে মাঝে মাঝে বুনো ঝড় হয়ে কেঁদে যায়। এখনও আমাদের চালার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা
বৈশাখী আমের গাছটা কালের সাক্ষী হয়ে আছে! ঠিক এমন ভরদুপুরেই মরিচ-লবণ আর সরিষা তেলে
কলিজা পোড়া ভর্তা বানানো হতো জেঠার দরজার সামনের বিচ্ছিরি টক আমগুলোরে। মন খারাপ হলে
আমাদের পাড়ার মধুদার কথা মনে পড়ে, পাগলাটে খ্যাপাটে মধু। ঠাম্মার ঘরের পেছনের দিকটায়
বারান্দার মেঝেতে হাতের তালু দিয়ে পিষে ভাঙত সে কচকচা আম। লাল সিমেন্টের বাঁধাই করা
সেই বারান্দার কোঠা ঘরটায় ছিল ঠাম্মার সব জাদুর বাকশো; বাকশো ভর্তি চিনির দানা, পুরাতন গুড় কিংবা নতুন ভাজা মুড়ি। দুয়েকবার ঘ্যানঘ্যান করলেই
ঠাম্মার কাছ থেকে মিলত পিঁপড়েসহ চিনি অথবা ঝোলাগুড়। ঠোঁট কামড়ানিয়া পিঁপড়া সরিয়ে চেটে
খাওয়া গুড় আমভর্তার দিন আমাদের এসব দিনের মোহ ভেঙে দিচ্ছে ক্রমশ।
অবশ্য সংক্রান্তি এগিয়ে আসতে শুরু করলে আবার মনে পড়ে মায়ের হাতের
তিতা ডালের কথা। বসন্তের বাংলা বহু সংক্রামক বোধের বিপরীতে বিরাজ করে। তীব্র রোদ, বাতাসে
গরম রোদের হলকা আর সুর্যের দক্ষিণায়ন কিংবা গুটিবসন্ত আর রোগের প্রাদুর্ভাবে অতিষ্ঠ
যে জীবন তার সব স্বস্তি যেন আমাদের মায়েদের কাছে বিদ্যমান। নিমপাতা, পাটশাক, কুচিলা
পাতা, গিমা শাক, অরহরের ডাল, সুক্তোবদ্ধ জীবনের কাছে এই আমিষের জীবন আবার যেন ফেরত
যেতে চায়। ফেরত পেতে চায় সেই পাটাতন যেখানে কাঠের পিঁড়ি পেতে বসে আছে আমাদের সব আত্মীয়।
স্কুল ফেরত আমরা মফস্বলের শিশু-কিশোররা সন্ধ্যায় যারা ফিলিপ্স বাতির দিকে তাকিয়ে থাকতাম
বই বন্ধ করার আশায় তারা জোনাক পোকা ধরতে আজকের দিনে ছুটছি রিসোর্টের পানে। কত জোনাক
পোকা আমাদের সঙ্গে পিসিমার গল্প শুনে ঘুমিয়ে গেছে তার হিসেব আমাদের কাছে কেবল কোনো
সংখ্যায় আর ধরা যাবে না। তাই বড় হতে শুরু করলে মা হাতে ধরিয়ে দিতেন দিদির সঙ্গে ঘর
ঝাড়ার লাঠিঝাড়ু। কী দরকার মা সংক্রান্তির এসব আয়োজন; মা তেড়ে আসত বিকল্প এক চণ্ডালিনী
হয়ে। আর বলতেন, আসছে বছর আর আমার এমন না কাটুক; সুখ আসুক… জানি না সে অপর্যাপ্ত সুখ জীবনে আর আসে কি না!
প্রহর শেষের আলোয় রাঙা চৈত্র মাসের খোলনলচে পড়ে যাওয়ার আগেই আমাদের
যে বিধ্বংসী প্রহর নেমে আসে তাতে নতুন করে উন্মন কেউ দেখা দেয় না বরং সুনীল পড়তে পড়তে
ঘুমিয়ে গেলে মা চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলেছে পড়ন্ত বিকালের সন্ধ্যায়। বৈশাখ আসার আগে
যে সংক্রান্তি তাতে তিতা খাবারের সঙ্গে নিরামিষ খাদ্যের একটা মেন্যু আমাদের জানাই ছিল
অথচ রীতি ভাঙার বাইরে বের হওয়ার মতন সাহস আমাদের হয়ে ওঠে নাই। সমস্বরে চিৎকার করার
মতো রোদ উঠলে আমরা জলের ঘড়া নিয়ে হাজির হতাম মন্দিরের দরজায় আর অদ্ভুতভাবে জল ঢেলে
কাদায় সুর ধরে বলতাম, ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে… ’ অথচ আমাদের জানার কথা না যে মন্দিরের
ঘরে আল্লাহ থাকে কী থাকেন না! সরল সে জীবনের যাত্রা আর তাতেই বৃষ্টির জন্য বিয়ে দিয়ে
বসতাম ব্যাঙ আর ব্যাঙানীর। আমাদের সেই সরলতম জীবনে আনন্দ হয়ে হাজির হতেন হিমালয় ছেড়ে
আসা শিব-পার্বতী দম্পতি।
রূপকথার মতো সেই নীলচে বর্ণের শিব আর প্লাস্টিকের সাপ হাতে ত্রিশূল
মহাদেব, মাথায় রাজ্যের জটা আর পাশের পার্বতী যে একটা ব্যাটা ছেলে লাল কাতান শাড়ি পরেছে,
তা বুঝতে আমাদের দেরি না হলেও মায়ের বুঝতে সময় লাগত; দুগগা দুগগা বলে ঘরের চাল-ডাল
কিংবা আলু নিয়ে মাথার আঁচল গলায় টেনে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখলেই আমরা জানতাম তখন পাড়ায়
শিব ঠাকুর এসেছে, মানে গাজন আর চড়কের মেলা। চড়ক কী কিংবা গাজন কী, তখন জানতামই না;
কেবল জানতাম কৈশোরে যে নদীটা বয়ে যাচ্ছে তা এক দুখিনী দুর্গা, নতুনের প্রত্যাশায় প্রতিদিন
রেঁধে যাচ্ছে সংসারের অমৃত ডাল আর মুখরোচক পাচন। গাজনের শিবের নাচ এখনও আমাদের পাড়ায়
আসে, এইতো গত বছর তিনতলার বারান্দা থেকে যখন দেখছিলাম এক পলকে চলে গেলাম বিশ বছর দূর।
একে আমাদের পাড়ায় নীল ঠাকুরের পূজাও বলে, গাজনের শোভাযাত্রায় পিছন পিছন দৌড় দিলেই মা
টেনে বাড়ি নিয়ে আসত। এখন এই সময়েও জেনেছি, সবই প্রকৃতির কাছে নিজকে মেলে ধরার খেলা।
শরীরে লোহার আংটা ঝুলিয়ে রাখার যে কষ্ট, যা গাজন শিল্পী বছর বছর ধরে অপেক্ষায় রাখে,
ঠিক তেমন অপেক্ষায় থাকে আমাদের জন্য আমাদের নদীর জল।
সংক্রান্তির জল, শীতের টালবাহানা কাটিয়ে সম্ভবত নিজেকে মেলে ধরার
প্রত্যাশায় থাকে। দিন দিন ধরে একটু একটু করে ঘাটের জল বাড়তে শুরু করলে নদী আমাদের কাছে
চৈত্রের নদী হয়ে ওঠে; মেয়েরা কেবল শাড়ি আর গামছায় আড়াল করে নিজেকে মেলে ধরে তখন নদীর
জলে। আমাদের নদীতে কোনোদিন কুমির আসেনি। শুনেছি, কুমির আসার মন্ত্র জপে দিয়ে গেছেন
বাউল ঠাকুর। মেয়েদের নদীতে নামার এই অবাধ মিথটা আমার খুব পছন্দ ছিল, কিন্তু একবার মাইকে
ঘোষণা হলো, নদীতে কুমির এসেছে আর এরপর সে ঘাট হয়ে গেল একেবারে ফাঁকা! তখন নারীদের কলহ
নাই, নাই ভেজা শাড়ি রোদে শুকিয়ে আবার একই শাড়ি পরার স্থিরচিত্র। আমাদের এই নদীর ঘাট
ধরে দূরেই বসে চড়কের মেলা। চড়কের মেলা মানেই পুরনো বছর শেষ আর নতুনের আগমন। গাজনের
যাত্রা থেকে যে চাল-ডাল টাকা হয়, তা দিয়েই হয় চড়কের আয়োজন। খোলা প্রান্তরে চড়ক ঝুলিয়ে
অন্ত্যজ মানুষ যে উৎসব করে, আমার বোধে তারও রয়েছে একটা ভিন্নমাত্রা। আমাদের কাছে যা
কেবল মুড়ি-মুড়কির আয়োজন তা সেই সব মানুষের কাছে বিশ্বাসের নতুন বার্তা। মা বলতেন চড়কের
দেবতা হলো বুড়োশিব, আর বুড়োশিব রাগ করলে বৃষ্টি হয় না, ফসল হয় না!
সেইতো প্রকৃতি, সেইতো আমাদের জীবন, সেইতো আমাদের আয়োজনে কৃষিজ জী
বনের বিভিন্ন প্রান্তর যেখানে ধান-নৌকা-নদী-ফসলের জীবনেই আমাদের জীবন। আজ কত দিন আমাদের
নদীটা জীর্ণ অথচ টিকে আছে। এখন আর লাশ ভেসে আসে না, যার ভয় দেখিয়ে মা ঘুম পাড়াতেন!
নদীর গল্প বলার মতো ঢেউ আছড়ে পড়ছে না, তপ্ত শহরে কিংবা বেনামের শোধ উতরে দিতে আমাকে
গিলে খাচ্ছে না গাজনের গান আর চড়কের উচ্চতা; কেবল চৈতালি বাতাস বুকের ভেতর বয়ে গেলে
নিজেকে আজ সংক্রান্তির নিমগাছের চড়ুই পাখি মনে হয়, মনে হয়, আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে
তুমি পড়িছ বসে আমারি কবিতাখানি/; ঢেউ আছড়ে পড়ছে ভেতর বাইরে স্মৃতির দরবারে আগে পড়ে
অথবা সীমাহীনতায়!