× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রক্তজবা ফুল, চড়ক পূজা কিংবা চৈত্রসংক্রান্তি

সুমনকুমার দাশ

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৪৭ পিএম

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৮ পিএম

রক্তজবা ফুল, চড়ক পূজা কিংবা চৈত্রসংক্রান্তি

আট থেকে ৯ বছরের এক বালক অবাক বিস্ময়ে সামনে তাকিয়ে আছে। তার চোখের সামনে একের পর এক ঘটে চলেছে মহাবিস্ময়কর সব ঘটনা! টানা কয়েক গজ দাউ-দাউ জ্বলতে থাকা আগুন মাড়িয়ে কেউ হেঁটে চলেছেন। কারও জিহ্বায় লোহার লম্বা সুচালো শিক বিঁধে দেওয়া হচ্ছে। এ-শিক বিঁধে দেওয়ার আগে সে-ব্যক্তিকে চিবিয়ে খাওয়ার জন্য দেওয়া হচ্ছে টকটকে তাজা রক্তজবা ফুল। জিহ্বায় শিক গেঁথে তারা চারপাশ ঘুরছেন। পাশেই মাটি খুঁড়ে অস্থায়ীভাবে গেড়ে-রাখা চড়কগাছের চূড়ায় বেঁধে রাখা মোটা পাটের রশির শেষ মাথায় বাঁধা বড়ো লোহার বড়শি বা হুক। সে বড়শি পিঠের চামড়া ভেদ করে কারও কারও শিরদাঁড়ায় গেঁথে চক্রাকারে শূন্যে ঘোরানো হচ্ছে। আবার মাটিতে পেতে রাখা অসংখ্য ধারালো দায়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা মানুষের পেট-বুক মাড়িয়ে কেউ-কেউ দিব্যি হেঁটেও চলেছেন। ‘অতিপ্রাকৃত’ এসব ঘটনা দেখে উপস্থিত নারীরা কিছুক্ষণ পর পরই উলুধ্বনি দিচ্ছেন।

বালকের মুখে ভয়ের ছাপ, চোখে বিস্ময়! এমন-ও সম্ভব? ঘোর যেন তার কাটে না! পরের বছরও একই দৃশ্য, এর পরের বছরও। এভাবেই গোটা শৈশব-কৈশোর কাটিয়ে শহুরে-জীবনে থিতু হয় বালক। পরে বড়ো হয়ে মাঝেমধ্যেই ফিরে যায় গ্রামে, চৈত্রসংক্রান্তিতে। কারণ, চৈত্রসংক্রান্তির দিন, অর্থাৎ, চৈত্রের শেষ দিনটিতেই সেসব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটত। পুরো আয়োজনটিকে বলা হতো চড়ক পূজা। সেই পূজার ক্ষণ এলেই বালকটিকে তার শৈশব, কৈশোর হাতছানি দিয়ে ডাকে। একগাদা স্মৃতি তখন ভর করে বালকের মনে।

এতক্ষণ যে-বালকের কথা বলা হচ্ছিল, সে-বালকই আজকের আমি; সুনামগঞ্জের হাওরঘেরা প্রত্যন্ত এক জনপদ শাল্লা উপজেলার বাসিন্দা। শৈশব, কৈশোর কেটেছে উপজেলা সদরের ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজারে। এর পাশেই ডুমরা গ্রাম। ওই গ্রামেরই পূর্ব দিকে চড়ক পূজার আয়োজন বসত। এটাকে গাজন উৎসবও বলতেন অনেকে। প্রতিবছর সেখানেই গিয়ে আমরা অবিশ্বাস্য চোখে একের পর এক ঘটে চলা বিস্ময়কর সব আয়োজন দেখতাম। আশপাশের আরও গ্রামে একই সময়ে এমন আয়োজন হতো বলেও জেনেছি। সেসব গ্রামের কোনো কোনো আয়োজনে চড়ক উপলক্ষে ছোট পরিসরে গ্রামীণ মেলাও বসত। তবে ডুমরা গ্রামের আয়োজনই ছিল আমার দেখা প্রথম কোনো চড়ক পূজা। তবে এখানে কোনো মেলা বসত না।

শাল্লার মধ্যে ডুমরা গ্রামে আয়োজন-করা চড়ক পূজার নামযশও ছিল। আশপাশের অনেক গ্রাম থেকেই এখানে মানুষজন পূজা আর পূজা ঘিরে আয়োজিত লোকাচার দেখতে আসতেন। একটা পুকুরের পাড়ে খলায় (ধান শুকানোর স্থান) এ-আয়োজন হতো। যে খলায় চড়ক বসত, সেটাকে বলা হতো লামা-খলা, অর্থাৎ গ্রামের মূল বাড়ি থেকে খলাটি একটু ভাটিতে। এখন আর ঠিক মনে নেই, সম্ভবত গ্রামের তালুকদার-পরিবারদের খলায় পূজা হতো, তবে আয়োজনটা ছিল গ্রামবাসীর সম্মিলিত। আর, এর নেতৃত্বে থাকতেন গ্রামেরই ভক্তপ্রবর কিছু ব্যক্তি।

চড়ক পূজা কৃষিভিত্তিক উৎসব। এর আয়োজন হতো মূলত শিবের সন্তুষ্টির জন্য। এ পূজা শিবের আরাধনার অংশ। শিবকে সন্তুষ্ট করতে শিবলিঙ্গের ওপর রক্তজবা ফুল রাখা হতো। এ ছাড়া পূজায় রক্তজবা ফুলের প্রচুর ব্যবহার হতো। নতুন বছরে ফসলের সমৃদ্ধ কামনার প্রতীক হিসেবেই এ ফুলকে ভাবা হতো। তবে চড়ক পূজা আয়োজনের আগে চৈত্র মাসজুড়ে নানা বাড়িতে শিবভক্ত ও সন্ন্যাসীরা যেতেন। তাঁরা শিব, গৌরী, নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত সেজে নৃত্য করতেন আর শিব-পাবর্তীর পালা গাইতেন। এটা শিবের গাজন নামে পরিচিত। এ সময় নৃত্যরত ভক্তরা প্রতিটি হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি থেকে চড়ক পূজা আয়োজনের জন্য চাল, ডাল, সবজি ও নগদ টাকা ‘মাগন’ (মাধকুরী) হিসেবে সংগ্রহ করতেন। সবশেষে চড়ক পূজার মধ্য দিয়ে আয়োজন শেষ হতো।

চড়ক পূজায় আমরা থাকতাম দর্শনার্থী, তবে একটা আয়োজনে আমরা ছোটোরা-ও অংশ নিতাম। সেটা হলো অগ্নিপূজা। সম্ভবত এটাকে ধূরাল পূজাও বলা হতো। এ-পূজার অংশ হিসেবে একটা স্থানে কয়েক হাত লম্বা জায়গা বেছে নিয়ে গর্ত-মতন তৈরি করা হতো। পরে সেখানে শুকনো কাঠ ফেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো। সাধুসন্তরা সেই আগুনকে বশে আনার মন্ত্র পড়তেন, পূজা করতেন। পরে, একটা সময়ে সেই গর্তে জ্বলতে থাকা দাউ-দাউ আগুন মাড়িয়ে নগ্ন পায়ে হেঁটে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হতো। অন্য অনেকের মতো তখন আমরাও সেটি মাড়িয়ে যেতাম।

বলা ভালো, আমরা অনেকটা দৌড়েই আগুনের জায়গাটা পার হতাম। সবাই দৌড়/হাঁটা শেষ করে বলতেন, মন্ত্রের গুণে ‘আগুন পানি হয়ে গেছে’। তাই আগুনের ওপর দিয়ে নগ্ন পায়ে গেলেও পায়ে আঁচ লাগেনি। অন্যদের কাছ থেকে এসব শুনে আমিও প্রায় একই সুরে কথা বলতাম। সত্যি বললে মানুষজন আমাকে ‘পাপী’ ভেবে বসতে পারেন, সে-জন্য আগুনের তাপ যে কমবেশি পায়ে লেগেছে, সেটা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই চেপে যেতাম।

আরেকটা বিষয় নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের শেষ ছিল না। এটা করতেন কংস নামের একজন। ছোট-বড় প্রায় সবাই তাকে ডাকতেন ‘কংসদা’। তিনি পেশায় মজুর, খাদ্যগুদামে চাল বহনের কাজ করতেন। সেই কংসদা একটা লম্বা রামদা হাতে নিয়ে নৃত্যের মতো করে ঘুরিয়ে মাটি থেকে রামদার অগ্রভাগ স্পর্শ করে শূন্যে ঘোরাতেন। তখন ঝরঝর করে ‘শূন্য থেকে পড়ত’ মিছরির টুকরো। আমরা ছোটোরা সেই ‘অলৌকিক প্রসাদ’ মাটি থেকে সংগ্রহ করে খেতাম। আরেকটু বড়ো হয়ে বুঝতে পারি, এটা ছিল ছোটোদের বিস্ময় জাগানোর জন্য এক ধরনের কৌশলগত চালাকি। আগেই মাটিতে পুঁতে রাখা হতো মিছরির থলে। সেটাই রামদার অগ্রভাগ দিয়ে মাটি থেকে তুলে শূন্যে ছড়িয়ে দেওয়া হতো।

সেই কংসদা কিন্তু চড়ক পূজার নানা লোকাচারেও অংশ নিতেন। ছিলেন তো আরও অনেকেই। অনেকের চেহারা এখনও চোখে ভাসে, কিন্তু নাম মনে পড়ে না। একজনের কথা বিশেষ মনে পড়ে, তিনি নরেন্দ্র সাধু। যাঁদের পিঠে বড়শি কিংবা জিহ্বায় লোহার শিক বিঁধা হতো, তাঁদের হাতে তিনি রক্তজবা ফুল তুলে দিতেন। যাঁরা জিহ্বায় সুচ ফোড়েন, তাঁরা দুই হাত জোড় করে শিবকে প্রণতি জানিয়ে সেই ফুল শ্রদ্ধাভরে খেতেন। অন্যদিকে যাঁদের পিঠে বড়শি গাঁথা হতো, তাঁদের পিঠে সেই জবাফুল মালিশ করা হতো।

নরেন্দ্র সাধু ছিলেন ডুমরা গ্রামে আয়োজিত চড়ক পূজার আয়োজকদের একজন। তিনিও কখনও নিজের পিঠে বড়শি গাঁথতেন, কখনও জিহ্বায় লোহার শিক বিঁধে নৃত্য করতেন। পরে, অনেক পরে, যখন আমরা চাকরি-জীবনে ঢুকে পড়েছি, শুনি, সেই নরেন্দ্র সাধু স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে কোনো এক আখড়ায় মোহন্ত হয়ে সংসার ত্যাগ করেছেন। স্থানীয় পাটনিবাড়ির এক নারীকে মোহন্তী করে তিনি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। নরেন্দ্র সাধুর এভাবে সংসার ত্যাগ করা নিয়ে তাঁর স্ত্রী আমাদেরই বন্ধু শিটনের কাছে প্রায়ই বিলাপ করতেন। বলতেন, ‘তাইন (নরেন্দ্র) পাটনিবাড়ির এক বেটিরে নিয়া বৈরাগী হইয়া গেছইন।’ সে-বিলাপের কাহিনী পলাশ পরে আমাদের শোনাত।

যাইহোক, সেই শৈশব, কৈশোরে চড়ক পূজার আয়োজন দেখে বাড়ি ফিরে আমরা খেতে বসতাম। সেদিন থাকত শাকজাতীয় খাবারের বিশেষ আয়োজন। চৈত্রসংক্রান্তি মানেই নানা পদের শাক রান্না হতো বাড়িতে। পুরনো বছরের জীর্ণ ও মলিনতাকে ধুয়ে সাফ করার সংস্কারগত-ঐতিহ্য থেকেই বাড়ি, রান্নাঘর সব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিরামিষ রান্না হতো। এর মধ্যে বেশিরভাগ পদই থাকত শাকজাতীয় তরকারি। শাক-ভাত খাওয়ার এ আয়োজনকে বলা হতো ‘শাকান্ন’।

চৈত্রসংক্রান্তির দিন প্রতিটি বাড়িতেই অনেকটা পাল্লা দিয়ে বেশি প্রজাতির শাক রান্না হতো। মা যে কত পদের শাক রাঁধতেন! একেক শাকের স্বাদ একেক-রকম। নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকে আমরা বলে দিতে পারতাম, কোনটা কোন শাক! গিমা শাক, বতুয়া শাক, ঢেঁকি শাক, কচু, মেথি শাক, হেলেঞ্চা শাক, পালং শাক, লাল শাক, পুঁই শাক, নালিতা, কলমি শাক, নিম পাতা, লাউ শাক, মূলা শাকÑ কত কী যে শাক!

...

ডুমরা গ্রামে এখন আর চড়ক পূজা হয় কি না, জানি না। এ-ও আর এখন জানা নেই, চৈত্রসংক্রান্তির দিনে এক বাড়ির গৃহিণীর সঙ্গে আরেক বাড়ির গৃহিণীর বেশি প্রজাতির শাক রান্না করার অলিখিত-প্রতিযোগিতা হয় কি না!

জানি না তো শৈশবের ফেলে আসা কতকিছুরই খবর! সেই নরেন্দ্র সাধু বেঁচে আছেন কি না; কিংবা ঘরে রেখে যাওয়া স্ত্রী-সন্তানের কাছে তিনি আদৌও ফিরলেন কি না, তা-ও জানা হয় না।

পুরনো স্মৃতি এত ঘেঁটে ফেলে-আসা শৈশব, কৈশোরের চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করারই-বা কী দরকার? স্মৃতির মানুষেরা থাকুক-না স্মৃতি হয়েই! 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা