× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অকালসন্ধ্যা

হাবীব ইমন

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:১৭ পিএম

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৩১ পিএম

হাবীব ইমন (কোলাজ প্রবা)

হাবীব ইমন (কোলাজ প্রবা)

বহুমাত্রিক লেখক ও সাংবাদিক হাবীব ইমন আজ রবিবার (৫ এপ্রিল) অসুস্থ হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী ধানসিড়িসহ বিভিন্ন বিভাগের তিনি ছিলেন একজন নিয়মিত লেখক। গত বৃহস্পতিবারে এই গুণী লেখক ধানসিড়িতে তার লেখা একটি ছোটগল্প প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। সেই গল্পটিতে ফুটে উঠেছে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষের জীবনের দীর্ঘশ্বাস। 

কমলের জীবন কখনোই সরল ছিল না। অন্য সবার মতো সুস্থ কিংবা স্বাভাবিক কোনো জীবন তার ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তার চারপাশে এক ধরনের অদৃশ্য, চাপা অস্থিরতা কাজ করত। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে যেন কিছু একটা সব সময় ভেঙে পড়ার অপেক্ষায় থাকত। অথচ সেই ভাঙনের ভেতর দিয়েই, সবার অলক্ষ্যে, কমল হয়ে উঠেছিল উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত। তার মুখের কোণে লেগে থাকত এক চিলতে হাসিÑ যেন নিজের কাছেই নিজের বেঁচে থাকার প্রয়াস।

সে খুব তাড়াতাড়ি শিখে গিয়েছিলÑ সব কথা বলা যায় না, সব কষ্ট প্রকাশ করা যায় না। তাই নিজের ভেতরের ভয়, অপমান, দুঃখ, অবজ্ঞাÑ সবকিছু সে জমিয়ে রাখতে শিখেছিল।

এই জমে থাকা অনুভূতিগুলো একসময় তার ভেতরে এক ধরনের নিঃশব্দ ভার তৈরি করে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, সেই ভারই তাকে গড়ে তোলে। বারবার ভেঙে পড়ার পরও সে নিজেকে আবার জোড়া দিয়েছেÑ কখনও নিখুঁতভাবে, কখনও ভাঙা দাগ রেখেই। মানুষের কাছে নিজের কথা বলতে না পারলেও সে শব্দের কাছে আশ্রয় খুঁজে পায়। ধীরে ধীরে লেখালেখি তার কাছে শুধু অভ্যাস নয়, অনুষঙ্গ হয়ে ওঠেÑ এক ধরনের অস্তিত্ব।

ডায়েরির পাতায় শুরু হওয়া সেই লেখা একসময় তাকে লেখক হিসেবে দাঁড় করায়। মানুষ তার লেখা পড়ে, তার অনুভূতির গভীরতা অনুভব করে, কিন্তু কেউ জানে নাÑ এই লেখাগুলোর ভেতরে কতটা চাপা যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে। সে নিজের ক্ষতকে ভাষা দিয়েছে, নিজের একাকীত্বকে গল্প বানিয়েছে।

ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নে ভাষার রাজনীতি

জীবনের মধ্যপ্রৌঢ় বয়সে এসে, যখন সে ভেবেছিল আর নতুন করে কিছু শুরু করার নেই, সঙ্গহীন জীবনই হয়তো তার অনিবার্য বাস্তবতাÑ তখনই তার জীবনে আসে নীলা।

প্রথমে সে নীলাকে সরিয়ে রাখে। বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে নীলার একাগ্র উপস্থিতি আর নীরব যত্ন তাকে ভেতর থেকে নরম করে দেয়। নীলা হয়ে ওঠে তার প্রেরণা, তার বিশ্বাস, তার জীবনশক্তি। অজান্তেই নীলা কমলের ভেতরের দরজাটা খুলে দেয়।

বহু বছর পর কমল আবার কাউকে বিশ্বাস করতে চায়Ñ নিজের অন্ধকারটুকু দেখাতে চায় না আর। নীলার সঙ্গে খাঁচা খুলে আলোর সহযাত্রী হতে চায় কমল।

কিন্তু সেই বিশ্বাসের সঙ্গেই তার পুরনো ভয়গুলোও ফিরে আসে। তার মনে হতে থাকে এই সম্পর্কও একসময় ভেঙে যাবে। নীলাও কি তাকে ছেড়ে চলে যাবে? এই আশঙ্কা এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, একসময় নীলা নিজেই সম্পর্কটা ভেঙে দিতে চায়, কিন্তু কমল বুঝতে পারে কষ্ট কখনও কমে না, বরং অন্য রকমভাবে আরও গভীর হয়ে ওঠে।

কমলের ভেতরে আবার সেই পুরনো অন্ধকার ফিরে আসে। কোনো কাজেই মন বসে না। লেখালেখিও থমকে যায়। নিজের ওপর যে আত্মবিশ্বাস এতদিন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেটাই এখন তাকে ভেতর থেকে বিদীর্ণ করতে থাকে। খাতা খুলে বসে থাকে, কিন্তু শব্দগুলো যেন আর তার কাছে আসে না। অথবা আসে, কিন্তু সে ধরতে পারে না।

জীবনে ঝড় আসেÑ সে ঝড় মানুষের ভেতরে কী ভাঙে, কী বদলে দেয় তা আগে থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু নীলার পরিবর্তন, কাছে থেকেও না-থাকার এই দূরত্ব কমলের কাছে এক অদ্ভুত বিস্ময় হয়ে ওঠে।

দিনগুলো তার কাছে অর্থহীন লাগে, রাতগুলো দীর্ঘ হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে না, কী চায়, কোথায় যাবে। কাউকে বলতে পারে না, কারণ চুপ করে থাকাই তার অভ্যাস হয়ে গেছে। আবার এই নীরবতাও সে সহ্য করতে পারে না, কারণ এই ব্যথাটা এবার খুব স্পষ্ট, খুব নৈকট্যের। এই না-বলা আর না-সহ্য করার মাঝখানে সে আটকে পড়ে।

এক রাতে, অনেকদিন পর, সে আবার খাতা নিয়ে বসে। দীর্ঘ নীরবতার পর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করে। তার হাত কাঁপে, তবু সে থামে না। সে লিখেÑ নিজের ভাঙন, নিজের ভয়, নিজের অসহায়তা।

লেখা শেষ করে সে চুপ করে বসে থাকে।

জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। সেই আলো তার ভেতরের অন্ধকার পুরো দূর করতে পারে না, কিন্তু তাকে একটা নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করায়Ñ সে যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে। তার ভেতরের যে কমল একসময় শব্দে বেঁচে থাকত, সে এখন তার কাছেই অচেনা।

কমল জানে না সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। সে জানে না, সে আবার দাঁড়াতে পারবে কি না। কিন্তু সে এটুকু বুঝতে পারে, যতদিন সে নিজের ভেতরের কথা লিখে যেতে পারে, ততদিন সে পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

দেবদারু বনের পাশে ঢেউতোলা সরু পথ নেমে গেছে নিচে, যেখানে বিকালের হ্রদের জলে হরিণশিশুর ছায়া কেঁপে ওঠে, মায়াবী আকাশের কোলে মিশে যায়।

তারপর সন্ধ্যা নামে।

দূর উপত্যকা ছুঁয়ে ভেসে আসা হিমেল বাতাস মর্মর তোলে দেবদারুর ডালে। পাতা কাঁপে। মন কাঁপে। অকারণ যন্ত্রণায় ভরে ওঠে কমলের হৃদয়। মনে হয়Ñ কিছু একটা ছিল তার, এখন আর নেই। অন্ধকার আরণ্যক নগরে, সময়ের স্মৃতি গুঁড়িয়ে যেতে যেতে, কমল নিজেকেই প্রশ্ন করে, ‘কাউকে কোনোদিন ভালোবেসে ছিলে তুমি?’

তারপর ধীরে ধীরে, তার নরম আঙুলে ধরা তানপুরার তারে সুর জেগে ওঠে। থেমে থেমে বলে, ‘তাও ভালো… ভালোবাসা পাপ…’ কথা বলতে গিয়ে তার দুচোখে জল টলমল করে ওঠে।

অন্ধকারে কেউ দেখে না, কমলের দুচোখ ভিজে ওঠে। কয়েক ফোঁটা জল নীরবে গড়িয়ে পড়ে মর্মর পাতার ওপর। তার ভীষণ ইচ্ছে হয় শব্দ করে কাঁদতেÑ একটা তীব্র আর্তনাদে বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত আগুন ছড়িয়ে দিতে বাতাসে।

কিন্তু কমল কাঁদে না। শুধু বসে থাকে, একটি অকালসন্ধ্যার ভেতরে, যেখানে আলো আছে, কিন্তু তা আর তার জন্য নয়।

প্রকৃতিও যেন সেই সত্যই পুনরাবৃত্তি করে, কমলের স্পর্শে নীলারা ঝড় তোলে, আলো নামাতে পারে না।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা