লাবণ্য লিপি
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১৫ পিএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১৭ পিএম
চিত্রকর্ম : শাবিন শাহরিয়ার
সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় লিখেছেনÑ
‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি!’
আঠারো বছর বয়সটা এমনই! আঠারো দুঃসাহসী, আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার বয়স। আঠারো বছর বয়স আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার, নিজের সৌন্দর্যে নিজেই মুগ্ধ হওয়ার বয়স। আঠারো বছর বয়স শুঁয়াপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে ওঠার বয়স! আঠারো বছর বয়স সবকিছু ভেঙেচুড়ে তুমুলভাবে প্রেমে পড়ার বয়স; কিছু না ভেবে প্রেমিকের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালানোর বয়স। ভুল মানুষের প্রেমে পড়ার, প্রেমে ব্যর্থ হওয়ারও বয়স!
আমার জীবনে আঠারো এসেছিল একেবারেই আড়ম্বরহীনভাবে। আমাদের পরিবারে তখন ঘটা করে কারও জন্মদিন পালন করা হতো না! স্বাভাবিকভাবেই আমার জন্যও বিশেষ কিছু আয়োজন ছিল না। আমার সেদিন এসএসসির রেজাল্ট বের হয়েছিল। আমরা তিন বন্ধু, বন্যা পিংকি আর আমি স্কুলে গিয়ে নিজের চোখে নোটিস বোর্ডে টানানো রেজাল্টশিটে নিজেদের নাম এবং একই ফলাফল দেখে ভীষণ আপ্লুত হয়ে পড়ি। তখনও তো নম্বরপত্র দেখিনি। শুধু গ্রেডটাই জানা গেল এবং ভাগ্যিস একই গ্রেড পেয়েছিলাম। নইলে হয়তো এই আনন্দ আমাদের হতো না! রেজাল্ট পেয়ে সেটা বাসায় জানানো দরকারটাও আমরা সেভাবে অনুভব করিনি। তখন তো আর হাতে মোবাইল ফোন ছিল না যে বলব, হ্যালো মা! আমি পাস করেছি! মায়েরাও যে খুব অপেক্ষায় ছিল, এমনটাও হলফ করে বলতে পারছি না। আমাদের মায়েরা এমন ছিল, পাস করলে ভালো। না করলে পরের বছর আবার পরীক্ষা দেবে। আমরা ভয় পেতাম বাবাকে। কিন্তু বাবা তো দিনে বাসায় থাকে না। অফিস থেকে রাতে বাসায় ফিরবে। তাহলে আর রেজাল্ট নিয়ে ছুটে বাসায় যাওয়ার কী আছে! আমরা ঠিক করলাম আজ সারাদিন আমরা রিকশা নিয়ে ঘুরব। কোথায় যাব সেটা জানি না। ভাবছিলাম যেখানে খুশি যাব! আমাদের ইচ্ছামতো ঘুরব।
আমরা থাকতাম নারায়ণগঞ্জ। সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। আমার বন্ধুরা বলল, আজ তুই আমাদের খাওয়াবি! কী আর এমন খাব আমরা! ঝালমুড়ি, ললি আইসক্রিম বা শিঙাড়া। আমি বললাম আচ্ছা খাওয়াব। চল যাই! কিন্তু কোথায় যাব? দুইজনের রিকশায় আমরা বসলাম তিনজন। যদিও তিন জনের কেউই স্থূলাকার না। তবু আঠারো বছরের তরুণী তো। দুইজন সিটে আর একজন ওপরের সিটে বসলাম। বেশ বড় বড় একটা ভাব নিয়ে আমরা যাচ্ছি। পিংকি বলল, এই রিকশাওয়ালা, গুদারাঘাট যান! আমাদের মধ্যে পিংকি ছিল একটু চালাক-চতুর। কারণ ওরা ছিল নারায়ণগঞ্জের স্থানীয়। মিশনপাড়ায় ছিল ওদের বাসা। পাড়ায় ওদের খুব দাপট ছিল। বন্যারাও নারায়ণগঞ্জের স্থানীয়। ওদের বাসা ছিল দেওভোগ। তবে বন্যা ছিল বেশ শান্ত স্বভাবের। আমি ছিলাম নিতান্তই আলাভোলা। একে তো আমরা সিরাজগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে জুড়ে বসেছি, তার ওপর একা চলাফেরার অনুমতি ছিল না বলে রাস্তাঘাট তেমন চিনতাম না। তাই মনে মনে আমরা পিংকির নেতৃত্ব মেনে নিতাম। আমরা রিকশা থেকে নেমে নৌকা দিয়ে নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে নামলাম। নদীর ওপারে পুরনো পরিত্যক্ত দালানবাড়ি ছিল। আমরা হাঁটতে হাঁটতে সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরে থেকে খুবই রহস্যময় বাড়ি বলে মনে হয়। ঠিক যেমন রহস্য উপন্যাসে পড়েছি! এই সব বাড়ি কার, আগে কারা বাস করত, এখন তারা কোথায়, আমরা কিছুই জানতাম না। আমরা শুধু ঘুরে ঘুরে অন্ধকার, ভাঙা দেয়াল, শ্যাওলাপড়া ঘরের বারান্দা পর্যন্ত গেলাম। ঘরের ভেতরে ঢুকিনি। কেননা আঠারো যতই বেপরোয়া হোক না কেন, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমাদের সাবধান করছিল, ভেতরে বিপদ থাকতে পারে! কারণ আশপাশে বখাটে ছেলেদের দেখেছিলাম। তবু আমি একধরনের কৌতূহল বোধ করি। কিন্তু পিংকির ধমকে রহস্য উদঘাটনের ইচ্ছাটা জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা আগাই। এবার কোথায় যাব? পিংকি বলল, চল সোনারগাঁয় যাই। আমার বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। ভাবি যদিও আমাদের বাসায়, তাতে কী! ওদের বাড়িতে মানুষ আছে না! চল, দুপুরে আমরা ও বাড়িতেই খাব। বলে কী মেয়েটা! ওরা যদি খেতে না দেয়! কিন্তু পিংকির মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাধ্য আমাদের নাই। আমি আর বন্যা বাধ্যমেয়ের মতো পিংকির সঙ্গে বাসে উঠি। বারোটা নাগাদ আমরা পিংকির বাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পৌঁছাই। বাড়িটা এখনও আমার চোখে ভাসছে। গাছপালায় ঘেরা আধাপাকা বাড়ি। বাড়িতে ঢুকতেই দেখলাম একটা আমলকী গাছ। সেই গাছে কী পরিমাণ আমলকী যে ধরেছে বলে বোঝাতে পারব না! শুনলাম এই এলাকায় সবার বাড়িতেই নাকি আমলকী গাছ আছে এবং এটা তারা বাণিজ্যিকভাবেই বাগান করে। বাড়িতে তখন দুপুরের রান্না হচ্ছিল। বাইরে থেকেই আমি মাছ আর আলুর তরকারির গন্ধ পেলাম। খুব চেনা সে গন্ধ। আমাদের গ্রামের বাড়িতে রান্নার এমন গন্ধ পেতাম। পরে তরকারির গন্ধের মিল খুঁজে পাওয়ার কারণ জানা গেল। এ বাড়িতেও মাটির চুলায় রান্না হচ্ছে। টাটকা মাছ-তরকারি। আমাদের শহরের বাসার মতো ফ্রিজে রাখা মাছ-সবজি গ্যাসের চুলায় রান্না হচ্ছে না। যাই হোক, আমাদের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে তারা আমাদের আপ্যায়ন করল। যতদূর মনে পড়ে দুপুরে আমরা ছোট মাছের তরকারি, বেগুনভাজা আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। আহ! কী যে স্বাদ ছিল সে তরকারির। খাওয়া শেষ করেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। কারণ পিংকি যে আরও কিছু ভেবে রেখেছে।
পিংকি বলল, চল সোনারগাঁ জাদুঘরে যাই! এত কাছে এসেও জাদুঘর না দেখেই ফিরে যাব? আমরাও রাজি! আমাদের স্বাধীনতা দিবসের যে আরও অর্ধেক দিন বাকি আছে। ৩টার দিকে আমরা জাদুঘরে প্রবেশ করলাম। শুনলাম ৫টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা। যাক, ২ ঘণ্টা তো কম সময় না! এই ২ ঘণ্টায় যতটা পারি ঘুরে দেখি। কিন্তু কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টি নামল। একেবারে বড় বড় ফোঁটায় শুরু হলো সে বৃষ্টি। আমরা তিনজন ছিলাম খোলা মাঠে। অদূরে ছাউনি পর্যন্ত যেতেই আমরা ভিজে একেবারে চুপসে গেলাম। বিপত্তি ঘটল আমার। আমি একটা নীল রঙের বাটিকের ড্রেস পরেছিলাম। নতুন ড্রেস। তাই ড্রেসটা সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। দেখলাম আমার দুই পা বেয়ে নীল রঙ নেমে আসছে। মুহূর্তের মধ্যেই আমার হাতও জামার রঙে নীল হয়ে গেল! সঙ্গে আয়না ছিল না। তাই মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমরা বন্ধুরা আয়নার দায়িত্ব পালন করল। বলল, তোকে কৃষ্ণর মতো নীল লাগছে! এখন উপায়! এই অবস্থায় আমি বাসায় যাব কীভাবে! মনে আছে, পরে জাদুঘরের পুকুরে নেমে সাবান ছাড়া মুখ ধুয়ে যতটা সম্ভব রঙ তুলে আমরা নারায়ণগঞ্জের পথে রওনা হলাম। ফেরার পথে আর নদী পার হতে হলো না। বাসে চিটাগাং রোড হয়ে আমরা কালিরবাজার এসে নামলাম। সেখান থেকে রিকশায় বাসায়! তখন সন্ধ্যা। দুরুদুরু বুকে বাসায় ঢুকে বুঝলাম, আঠারো বছর মানেই স্বাধীন না! আমার রেজাল্ট কী, সেটা জানার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সারাদিন কোথায় ছিলাম? বাপ-ভাইকে সেই কৈফিয়ত দিতে দিতে স্বাধীনতার স্বাদই ভুলে গেলাম! আঠারো বছর একটা ছেলের জীবনে আর একটা মেয়ের জীবনে একইভাবে আসে না!