× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নম্র-নীরব ছায়ায়...

রিমঝিম আহমেদ

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০৭ পিএম

নম্র-নীরব ছায়ায়...

তখন আমি অষ্টাদশী। বুকে আধো-আলো আর আধো-অন্ধকার পুষি। আমার তখন ইচ্ছে পালানোর স্বভাব, বিষাদগন্ধী রক্তে সমুদ্রের হাহাকার। সারাক্ষণ পালাই-পালাই আর পালাই। এই বাড়ি থেকে ও বাড়ি, এ মানুষ থেকে ও মানুষ। ছুটতে থাকি, ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হই। তারপর মানুষ ফুরায়, পথ ফুরায় আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। বনের মুখে এসে পথ থমকে যাওয়ার মতো করে আমার সামনে যাওয়ার পথও ফুরায়। আরও পথ আছে হয়তো পথের আড়ালে, কিন্তু সে পথের দিশা আর খুঁজে পাই না। অথবা পথের ক্লান্তিতে পা ফুরিয়ে যায়। ঝুম বৃষ্টির পর রোদের কটাক্ষে যখন মাঠঘাট ফের শুকিয়ে ধু ধু হয়ে আসে, আমি থমকে থাকি, ডোবায় আটকে-পড়া জলের মতো স্তব্ধ থাকি ক্ষণকাল। কিছু মানুষ আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়, ভস্ম থেকে জন্মায়। তাদের পোড়ানোর যে আগুন তার জিভ অদৃশ্য। দেখা যায় না। কেবল যে পুড়ে যায়, সে দেখে আগুনের দাঁত, জিভ আর খিদে ভরপুর পাকস্থলী।

আমাদের গ্রামের একপাশে দারোগার নির্জন খামারবাড়ি। কোথাকার কোন লোক আসে, থাকে। পাহারা দেয়। মাঝে মাঝে সকালে-দুপুরে খালি গা, তামাটে পিঠ। আর রোদপোড়া মুখ। তারপর চলে যায়। তাদের থাকার আয়ু বছর এক-দুই, তিন-চার বা তারও কমবেশি হতে পারে। তাদের আসা-যাওয়ার গল্পগুলো আমরা তেমন জানি না। কত কত গল্পই তো আমরা জানি না! তাতে আমাদের খুব কিছু যায় আসে, এমন নয়। মাঝে মাঝে খাপছাড়া গোছের কোনো পরিবারও এসে মুফতে এখানে থাকে। মাস শেষে কোনো ভাড়া দিতে হয় না তাদের, বিশাল টিলাজুড়ে বারমাসি সবজির আবাদ করে, গরু-ছাগল পেলে দিব্যি তাদের কেটে যায়। বছরে ছয় মাসে মালিক এসে গাছের আম, কাঁঠাল, লিচু নিয়ে যায়। নয়তো এসব ফলমূল সবজি এই পরিবারের রিজিকে থাকে।

এর আগেও যারা এই খামারবাড়িতে থাকত, তাদের কাউকে চিনতাম না আমরা। আমরা মানে গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দারা। তারা আসে, তারা থাকে। তাদের এক/দুটি ছেলেমেয়ে থাকে মনে হয়। হাঁস-মুরগির মতো তাদেরও চরতে দেখা যায় খামারবাড়ির আঙিনায়। কিন্তু আমরা তাদের সঙ্গে আলাপ জুড়ে বসি না। এই খামারবাড়িটা গ্রাম থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তাদের খুব একটা গ্রামের মানুষের সঙ্গে মেশা, সমাজরক্ষা ইত্যাদির দায়ও নেই বলা চলে। তাছাড়া গ্রামের লোকেরা, সমাজকমিটিও তাদের খুব একটা গোনায় ধরে না। দারোগার খামারবাড়ি হাত বদলের ইতিহাসে বংশ পরম্পরায় কার কাছে হস্তান্তরিত হলো, কে এখন বর্তমান মালিকÑ আমরা তার খবরও রাখি না। তবে যে-ই হোক, এর মালিক ক্ষমতাবান মানুষ, কাকে থাকতে দিয়েছে, তা তিনিই বুঝবেন! আমাদেরই বা কী! এমনই ভাব নিয়ে আমরা চলি। তারাও একঘরে, সমাজচ্যুত মানুষের মতো আলগা পথ ধরে হাটে-বাজারে যায়। খায়-দায়, সঙ্গম করে, ঘুমায়।

অনেকদিন ধরে এক রহস্যময় নারীকে দেখি, খামারবাড়িতে থাকে। পাহারা দেয়। একটা শিশুও আছে তার। অরুণ-তরুণ কী যেন নাম। নারীটি সম্ভবত সুগন্ধি জর্দা দিয়ে পান খায়। তার মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকে। গরু-ছাগলকে খাওয়ায় আর গুনগুন করে গানও করে। সিনেমার গান। শাবানা-রোজিনার সিনেমা হতে পারে। আমাকে দেখে সে রোজ, যখন আমি কথা বলতে যাই, নিজের সঙ্গে, ঘাস-লতাপাতার সঙ্গে তখন, সে অবশ্য খুব একটা কথা বলে না। আমিও বলি না। আমরা কেউ কাউকে বিরক্ত করি না। শুধু দেখি। আর নির্জনতা খাই পেটপুরে। নারীটির স্বামী আছে কি নেই, কোথা থেকে এসে এখানে থাকে, কীভাবে এলোÑ এইসব কথা চাইলেই বলা যায়। কিন্তু আমার ইচ্ছে করে না। সম্ভবত সেও এসব গল্প বলতে আগ্রহীÑ তা মনে হয়নি। তার কণ্ঠস্বর শুনেছি টুকটাক গরুর সঙ্গে কথা বলতে, শিশুটির সঙ্গে। আর একদিন আমার সঙ্গে। ছোট্ট একটা আলাপ!

আমি আর খামারবাড়ি পরস্পরের সহোদরা। একজন মানুষ আরেকজন প্রকৃতি। প্রকৃতির নিজস্ব ভাষা আছে। সে ভাষা যে বোঝে, তার সঙ্গে প্রকৃতি সম্পর্ক পাতায়। আমি বোধহয় কিছুটা বুঝি! কোন পাখির কী ডাক, পাতার ঝরে পড়ার শব্দ, পায়ের নিচে পড়ার পর পাতার কেমন শব্দ হয়, সে শব্দও। বুঝি, গামারি ফুলের শব্দ, বুঝি কুর্চির ফোটার শব্দ, বুঝি ফলের পেকে ওঠা, ঝরে পড়ার শব্দ। বুঝি সাপের প্রেম-ভালোবাসা ও বিরহের শব্দও। তাই এই চরাচরের সঙ্গে আমার এক মৌন সম্পর্ক হয়ে গেছে। খামারবাড়ির নির্জনতা খানিকটা আমিও ভাগ নিতে শিখে গেছি তখন থেকে, যখন থেকে আমার মানুষ ভালো লাগে না। কথা বলা ভালো লাগে না। স্তব্ধ শামুকের মতো যখন নিজের পেটে নিজের ঢুকে যেতে ভালো লাগে, তখন আমি খামারবাড়িতে যাই। শীতকালে নরম রোদে গা পেতে বসি ঘাসের মাদুরে। আর গ্রীষ্মের তপ্ত রোদের তেজ কমে এলে দুপুর-বিকাল যখন হাত ধরাধরি করে, তখন আমি লিচুগাছ অথবা কাঁঠালগাছের নিচে বসি। আমার হাতে খাতা-কলম। মনের ভেতর কথার জঞ্জাল। মাথার ভেতর ভাবনার ছানাপোনা কিলবিল করতে থাকে। তখন আমি লিখি, নিজেকে, মাকে, হওয়া বন্ধু বা না-হওয়া বন্ধু, আধো প্রেমিক বা না প্রেমিক কিংবা ঊনপ্রেমিককে। লিখি মৃতদের, লিখি জীবন্মৃতদের। অর্থহীন সব কথার ভারে ন্যুব্জ হয় আমার খাতার পিঠ। তবু লিখি…

একটা রোদ কামাই করা দুপুরে আমি খামারবাড়ি যাই। ঘাসের ওপর বসি। আমার সামনে মারখাওয়া সূর্য, গালফোলা, অভিমানীÑ পশ্চিমের পাহাড়ে হেলান দিয়ে আছে। সেদিনও বুকের ভেতর কথার কোলাহল। আমার খাতার পাতা বাতাসে উড়ছে দুটাকার সানসিল্কে ধোয়া চুলের মতো। আমি কীসব লিখছিলাম। ঠিক তখন বাতাসে একটা সুর ভেসে এলো। পুরুষ কণ্ঠ। তিক্ত নয়, মধুর নয়। কেবল অচেনা, রহস্যময় সুর। আমি চোখ তুলে দেখি। অদূরে লিচুগাছের নিচে প্লাস্টিকের চেয়ারে এক যুবক বসে আছে। আগে কখনও দেখিনি। এই খামারবাড়িতে যারা থাকে তাদের মুখচেনা চিনি নিয়মিত আসার সুবাদে। একবার শুধু মহিলা জানতে চেয়েছিলেন, আমার বাড়ি কোথায়। বলেছিলাম- এই গ্রামেই। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেছিÑ ওই যে পাহাড়, ওই পাড়ায়। তারপর আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আমিও বলিনি। কিন্তু আজকের এই যুবককে এখানে কখনও দেখিনি। আশেপাশের গ্রামেও না। চোখ পড়তেই সে গান থামাল। চোখে অদ্ভুত ইশারা। মনে হলো, ডাকল, কাছে। আমি থোড়াই কেয়ার করি! যাইনি। নিজের মতো বসে ছিলাম। পাতা দেখলাম, গাছের সঙ্গে কথা বললাম। ঘাসের সঙ্গে, নিজের সঙ্গেও। সবই মনে মনে। বিকাল মিইয়ে আসতেই আমিও উঠে চলে এলাম। যুবক হয়তো আশা করেছিল কথা বলব। আমি উঠে চলে আসাতে তাকিয়ে থাকল। তার দৃষ্টি রহস্যেঘেরা। আমি তাকাইনি। তবে স্পষ্ট দেখলাম তার চোখ! এমন অদ্ভুত, গোঁয়ার মেয়ে হয়তো দেখেনি সে। তাতে আমারই বা কী!

তারপর আমি যাইনি কয়েকদিন। ব্যস্ত ছিলাম অথবা নিজের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হয়নি। তারপর আরও কদিন গেলে আমি যাই খামারবাড়িতে। চেনা গাছের নিচে, পেলব ঘাসেÑ যেখানে পাতা পড়ে আছে একটা দুটো, সেখানে বসি। সন্ত নির্লিপ্ত নয়, তবে একটা অদ্ভুত থমথমে বিকাল আমার খাতার ওপর ঝরে পড়ে আছে। দেখি, নারীটি কার যেন মা! আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। মুখে হাসি। কাছে এসেই বললেন, কদিন দেখিনি। কী হয়েছিল? আমি বললাম, আপনি কি আমার আসা, না-আসাও খেয়াল করেন? বললেন, করতাম না আগে। এখন করি। ওই যে দেখতে পাচ্ছ, আমার ভাই। হেলাল। আমার সঙ্গে থাকে। সেদিন তোমাকে দেখেছিল। কয়েকদিন ধরে তোমাকে খুঁজছে। আমি বললাম, কেন? একটু কথা বলো, সে-ই তোমাকে বলবে। নারীটি বললেন।

আমি দেখলাম হেলাল বলে ছেলেটি আমার দিকে চোখ পড়তেই হাতের রিকশা ইত্যাদিতে ব্যবহার্য একটা শেকল বিশেষ কায়দায় ঘোরাচ্ছে। সিনেমায় যেমন নায়করা ভিলেনকে মারার জন্য করে ঠিক তেমন করে। ভাবলাম, ভালোই তো দক্ষতা আছে। কাছে যেতেই সে থামল। বললো, আসেননি কেন কয়দিন? আপনাকে খুঁজছিলাম। কেন জানতে চাইলাম। বললো, আপনি অন্যরকম। আমি বললাম, হু, তা অন্যরকমটা কী রকম?

ছেলেটা হাসলো। সুন্দর হাসি। কিন্তু ভেতর ভেতর কেমন সুন্দর সেটা আন্দাজ করা গেল না। সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, এই যে, এরকম। এভাবে কেউ কথা বলে না। আপনি বলেন। আমি বিরক্ত হলাম না-কি আনন্দ পেলামÑ বুঝে ওঠার আগেই হনহন করে হাঁটা দিলাম। তারপর কিছুদিন আর ওদিকে গেলাম না।

সেদিন সন্ধ্যায় মন্তা আপার বাড়ি গেলাম রুনা-রুহুলকে পড়াতে। মন্তা আপার ছেলে ও মেয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, শোন, তোর সঙ্গে একটা কথা আছে। আমি বাচ্চাদের পড়া দেখিয়ে দিয়ে মন্তা আপার পাশে মোড়া টেনে বসলাম। বললাম, বলেন কী বলবেন! মন্তা আপা একটা রহস্যের হাসি টেনে বললেন, ওই দারোগার খামারবাড়ি আছে না, সেখানে যে মহিলাটি থাকে, সে এসেছিল। আমি একটু কৌতূহলী হলাম। মন্তা আপার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি কথাটা শেষ করার ইঙ্গিত নিয়ে। মন্তা আপা বলেন, ওর ভাইয়ের সঙ্গে তোর বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসছে। আমাকে বলেছে তোর সঙ্গে কথা বলতে। তুই রাজি থাকলে তাহলে ছেলেটা বিয়ে করতে চায় তোকে। আমি বললাম, আমি রাজি না। চিনি না জানি না। এমনও তো হতে পারে কোনো সন্ত্রাস, এখানে এসে গা ঢাকা দিয়েছে! মন্তা আপা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোর কথা ঠিক। এমনটা হতেও পারে!

তারপর প্রায় দিনই দেখি, নারীটি আমার পিছু পিছু আসছে। দূরত্ব কমে এলে ডাকছে। শোনো! দাঁড়াও! আমার কেমন একটা লাগে, গা ছমছমে, ভয় ভয়! দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটি। কিন্তু এভাবে তো চলে না। জানিয়ে দিয়েছিলাম এ বিয়ে আমি করতে চাই না। তবু কী চায় সে? ভাবলাম, সমস্যা পুষে রাখা নয়, তাকে প্রতিহত করতে হয়। দাঁড়ালাম। বললাম, আপা, বলেন কী বলবেন! বললেন, আমি রুনার মার কাছে শুনেছি, তুমি রাজি না এই বিয়েতে। আমার ভাইটা তোমাকে খুব পছন্দ করেছে। কিন্তু কী আর করা! জোর তো করা যায় না। তারপর বললেন, তুমি তো খামারের দিকে আর যাওই না। অসুবিধা নেই তো, যেতে পার। আমি এলাম, বললাম, এমনিই, ব্যস্ততায় যাওয়া হয়নি।

তারপর আমি আমার যাওয়া শুরু করলাম। জানিয়ে তো দিয়েছি, নিশ্চয়ই আর সমস্যা থাকার কথা নয়। হেলালের সঙ্গে দেখা হয়। আমাকে দেখে সে এগিয়ে আসে। যেন কিছুই হয়নি! আমরা অনেকদিনের চেনা। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে, এই মেয়ে, কী এত লেখ তুমি? আমি বলি, নিজের কাছে চিঠি লিখি। তার চোখে মুগ্ধতার রঙ দেখি। আমরা হাসি, আর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলি। এই খামারবাড়ির গাছের পাতায় সহজ বয়ে চলা বাতাসের মতো।

আমি আবার কিছু দিন যাই না ওদিকে। তারপর একদিন যাই। সুন্দর এক বিকালে। আমার হাতে খাতা-কলম। ভাবছিলাম, আজ হেলালকে বলব কাঁচা আম পেড়ে দিতে। কিন্তু গিয়ে দেখি ওরা নেই। লিচুগাছের নিচে রাখা চেয়ার, টিউবওয়েলের পাশে বালতি আর যা যা চিহ্ন থাকে মানুষবাসের, গৃহস্থের কিছুই নেই। ওরা চলে গেছে। কোথায় গেছে জানি না।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা