প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১৭:০২ পিএম
চিত্রকর্ম : রফিকুন নবী
শূন্য
মাসুদুজ্জামান
কোনো কোনো দিন
তুমি এই ঘরে এলে
থেকে যেতে
একসময় পোশাকটা
ধীরে ধীরে খুলে নগ্ন হতে
আমার হাত ভীষণ কাঁপত
ছায়ান্ধকারে শরীর সম্পূর্ণ
নগ্ন হয়ে জ্বলজ্বল করত
এরপর রাত নামলে
আমরা দুজনে
শূন্য হয়ে যেতাম

গৃহহীন শব্দের ভিতরে
ইরাজ আহমেদ
শব্দের ভিতরে ঘর আছে
জানালার পর জানালা আছে
কোনো ঘরে দরজা খুলে দেখি বৃষ্টি পড়ছে
কোনো জানালা আচ্ছন্ন আকাশে;
অনেক মানুষ উঠে এসেছে আশ্রয় নিতে শব্দ নির্মিত ঘরে।
কোনো কোনো শব্দের জানালা দিয়ে চোখে পড়ে নদী
মানুষের মতো অনুযোগ নেই
বয়ে চলা,
শুধু বয়ে চলা আছে তার।
আছে রাখাল বালক
ওই পাহাড়ের নিচে যার ঘর;
যে রোজ গরু নিয়ে আসে নদীতে আকাশের ছায়া ছুঁয়ে দেবে বলে।
তারও কোনো অনুযোগ নেই নদীর মতো;
যার অভাব বলতে একটুকরো বাঁশি,
ধুলোবালির মতো একমুঠো সুর।
শব্দের ভিতরে ঘুম আছে,
ভেসে যাওয়ার মতো ময়ূরের পালক দিয়ে তৈরি একা নৌকা আছে,
ভীষণ রাঙা টিপের মতো রাজকন্যা আছে
আছে চায়ের দোকানে পেতে রাখা বেঞ্চিতে কিশোরের দিন
আছে স্বপ্নে কোনোদিন দেখে ফেলা বাড়ি ফিরবার পথ,
অশ্বত্থ গাছের ছায়া,
ভূত-দেখা সত্যি গল্প।
শব্দের ভিতরে বৃষ্টি আছে
বৃষ্টির ভিতরে এক দেশ আছে।
একদিন মাটিতে রক্তের দাগ ফেলে যারা উঠে এসেছিল
যারা শস্যহীন মাঠে বুনে দিয়েছিল নিজেদের আত্মা
একদিন ধান হবে বলে
যারা গোল হয়ে বসে গল্প করেছিল এই মাঠে নক্ষত্রের সাথে
তারাও মিশে আছে শব্দের ভিতরে সেই বৃষ্টিতে।
আজ শব্দের ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছে স্বদেশের বুকে
গৃহহীন অসংখ্য কথার ঢেউ ভাঙছে নদীতে।

শাদা হাঁসের পালকের নিচে
সুহিতা সুলতানা
এমন দিনে এসো আকাশ ছুঁয়ে দেখি ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আজ আমাদের কাছে অব্যর্থ তীরের মতো। আমাদের ইচ্ছেগুলো শাদা হাঁসের পালকের নিচে উষ্ণতার সারল্য ভরা আদিগন্ত মাঠ। আমরা হারিয়েছি নদীর নাব্যতা, পথ ও দিগন্তরেখা। মুখগুলো সব ছদ্মবেশে ঢাকা, জটিল ও সংকেতময়। এমন দিনে তোমাকে ভুলে যাওয়ার মতন দুঃসাহস আমার নেই। অপরিহার্য ও মূল্যবান চক খড়ির এখন কোনো মূল্য নেই একদিন তুমি কলিংবেলের মতো মূল্যবান ছিলে বটে! কাল পরিক্রমায় অনিবার্য সম্পর্কগুলোও আজ স্থিমিত। স্বার্থকেন্দ্রিক মানুষের অতিযাপনের নেশা নিয়ে আসে অস্বপ্নের দাহ। এটা স্বাধীনতা নয়... এখন বিশ্বাসের পাশে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটে অপ্রেম ও আশঙ্কা। ভ্রুর প্রান্তদেশ বেয়ে নেমে আসে ঘৃণা ও পতনের ঢেউ আমরা যতটুকু দেখি তার চেয়ে বেশি কিছু তুমি নও। এমন দিনে মন নেচে বেড়ায় ভোরের হাওয়ায়। বৃক্ষের পাতায় পাতায় লেখা আছে সীমানা ছাড়ার গান। আমি কোন দিকে যাব? চারদিকে বিষ ও নগ্নতা আমার কোনো ক্ষমতা নেই। অপেক্ষার নিচে সম্ভাবনার সূত্র, ঘণ্টার ধ্বনি ভেব না তোমার প্রতি আমার কোনো মনোযোগ নেই। শুধু জল ও পথের বৃত্ত ভেঙে ভেঙে তোমার কাছে পৌঁছে যাওয়া। অনুশাসন বলতে কেবল নীরবতা, অমনোযোগ নয়। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিও তোমাকে পাবার জন্য যথেষ্ট নয় তবু অক্ষত এ শব্দটি বড় প্রিয় আমার।
স্বাধীনতার মানে
টোকন ঠাকুর
শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা শুধু একটি শব্দ
শব্দার্থ লেখা আছে অভিধানে
ছাব্বিশে মার্চের কবিতা লিখেও দেখি
ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল স্বাধীনতার মানে
কেন যে আজও আমি থেকে যেতে চাই
ভালোবাসার অধীনে
জন্মের পরই তো পৃথিবীতে আটকে পড়ি, দিনে দিনে
যৌথ অপচয়
সাকিরা পারভীন
দুটি গাছ একই গহন অরণ্যের নানাপ্রান্তে বাস করছে বহুদিন পরস্পর নানা কাল পেরিয়ে প্রহর গুনছে বিদায়ের কিন্তু মাটি ততোধিক খাঁটি আত্মজার মতন রেখেছে গেঁথে যারপরনাই বিরামহীন এখন পাতা ঝরার দিন হেমন্তের গান আমরা গাই গাইতামও পাতায় পাতায় দেখা হতো আজও হয় তারা দ্বিপাক্ষিক সভাসমিতি করে বাঁশি-বেহালার সংযোগ একপাতে খায় এমনকি আদর আবদার সে কারণে অপেক্ষায় থাকি ঝরে যাওয়া বৈকুণ্ঠে আমাদের যৌথ অপচয় প্রলয়ের পীত-পদ্মফুলে সাপের মাথায় নাচে ভ্রমদংশন তবু হায় আমরা থেকে যাই হাওয়ার কথক হয়ে কতিপয় কথকের মর্মভেদী ভ্রমর মুদ্রায় অপেরার ঘোর সুন্দর।
স্বাধীনতা : বাহাত্তর পৃষ্ঠায়
এমরান কবির
সাদা বইটার কালো অক্ষরগুলো রেখে এলাম রাস্তার পাশে
ধূলিকণা পড়বে, পথের পাশে বামনবৃক্ষ পড়বে, বাতাস পড়বেÑ এমন ভাবি না। কেন তবে এই কাজ! এজন্য যে কাছে থাকলে গুরুত্ব বোঝা যায় না।
অনেক পৃষ্ঠা সেখানে, পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দেখা যাবে শেষই হচ্ছে না। যত পাতা ওল্টানো হচ্ছে ততই বেড়ে যাচ্ছে এর সংখ্যা আর টুকটুক লেখা হয়ে যাচ্ছে বর্ণমালা, তারা শব্দ হচ্ছে, বাক্য হচ্ছে, বাক্যমালা হচ্ছে। এভাবে ভরে উঠছে পৃষ্ঠাগুলো
নতুন পৃষ্ঠার অবয়ব বৃদ্ধি তবুও থামছে না। না থামুক বাড়তে থাকুক এইসব।
শুধু সাদা বইটা কালো হয়ে না যাক
সংকেত কারখানা
শিমুল সালাহ্উদ্দিন
কৃষ্ণতিলে লেখা থাকে যে অপূর্ব মাধুরীসংকেত তা কেবল
প্রেমিকপাঠ্য বলে গোধূলিতে মেশে এসে দিন আর রাত
যেমন শ্মশানে, ছাইভস্মে পড়ে থাকা মৃগনাভী মাড়িয়ে শেকল
জীবনের, মাটির মদিরা মেখে নেয় অনন্তের হাতে রেখে হাতÑ
সেইভাবে বুকের কিনারে সাড়ে চব্বিশ হরফ লুকিয়েছ ঢেউ
এমন গভীরে যেন কেউ শ্রুতিইতিহাস ঢুঁড়ে পায় না হদিস
অথচ জাগরকাঠি হাতে ছিল, ছিল আত্মবিষধর কেউ
তোমাকে দেখাতে পথ, মানোনি ঈশ্বর তুমি নিজেকে নবিশ!
ছুটেছ দূরের কাছে, বসনি কাছের ঘাসে মাতাল ঋত্বিক
অন্ধস্কুলের দুয়ারে গিয়ে শেখনি তো বর্ণান্ধের সংকেত
নিজেকে পুড়িয়ে আমি বীজ আর অনিকেত পাখির খোঁজে
উড়ে উড়ে দেখেছি জীবন ঈশ্বরের অপারগতার ক্লেদ!
জীবনের সুমেধ হিশাব সোজাবাঁকা হৃদয়ের অনেক ভাঙচুর
বুঝেসুঝে আমি পলাতক এক সমুদ্রসাক্ষী বেলাভূমিতে একা
আদিগন্ততক ফাঁকা রেলপথে দাঁড়িয়ে পতপত উড়াচ্ছি পতাকা
আমার এ একক মহড়া গুঁড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর শেষ জাদুঘর