সোহেল মাজহার
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১৬:৫২ পিএম
চিত্রকর্ম : মনিরুল ইসলাম
শওকত আলী প্রদোষে প্রাকৃতজন, উত্তরের খেপ, দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত, পূর্বরাত্রি পূর্বদিন দখল, ওয়ারিশ, নাঢ়াই ইত্যাদি উপন্যাসে এই ভূভাগে মুসলমানদের আগমন ক্ষণ, শ্রমজীবীর প্রেম-ভালোবাসা, ঊনসত্তরের অসহযোগ আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, বাম রাজনীতির নানা বিভাজন, দেশভাগ, উদ্বাস্তু মানুষের মনোযন্ত্রণা ইত্যাদি বিষয় স্থান পেয়েছে। এর বাইরে শওকত আলী তার কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধকে নানা ফরমেটে বিশ্লেষণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শৈল্পিক, নিরেট বর্ণনা ও ভাষ্য আজও প্রাসঙ্গিক।
যাত্রা : গণহত্যার শিকার ভয়ার্ত মানুষের অনির্দিষ্ট গন্তব্য ও প্রতিরোধ প্রস্তুতি :
’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকা শহরে ভয়াবহ নৃশংস গণহত্যা চালায়। সংঘটিত গণহত্যার পর ঢাকার নিরীহ সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী, ভয়ার্ত, আর্ত, লড়াকু মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি, প্রতিরোধ প্রস্তুতি, দৃঢ় সংকল্প ও দোদুল্যমান মনস্তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায় শওকত আলীর ‘যাত্রা’ উপন্যাসে।
উপন্যাসের সময় ব্যাপ্তি ২৬ মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যভাগ পর্যন্ত। উপন্যাসটি চরিত্র-প্রধান নয়, সময় ও ঘটনানির্ভর। তবু কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হাসান ফার্নান্দেজ, সিকান্দার, ডাক্তার উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার পর উদ্বাস্তু, ভয়ার্ত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঢাকা শহর ছেড়ে বিভিন্ন গন্তব্যের পথে পা বাড়ায় ট্রেনে-বাসে-লরি-ট্রাকে চেপে, কেউবা নদীপথে, কেউ নিতান্ত হেঁটে অজানা গন্তব্যের দিকে ছুটে চলে। এ রকম অবস্থার বর্ণনা, বাস্তব চলচিত্র ও দৃশ্যকাব্য নির্মাণ করে লেখক যাত্রা উপন্যাসের গল্প শুরু করেন। উপন্যাসের সূচনাতেই একদল মানুষ হন্তদন্ত হয়ে নদী পার হয়ে শহরতলির একটি লোকালয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে অনেকের মধ্যে অধ্যাপক হাসান, মিনু ভাবি, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হাসান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লীলা, সাকিনা সবাই একত্রিত হয়। উপায় না থাকার কারণে নানা শ্রেণি-পেশা, বয়স ও ধর্মের মানুষ এক নদীর ঘাটে এক নৌকায় ভিড় করে। লেখকের বর্ণনায়Ñ ‘শুধু আসছে-ঘরবাড়ি দালানকোঠার ফাঁকফোকর দিয়ে গলে গলে পড়ছে যেন মানুষ। পিলপিল করে ছুটে আসছে চারদিক থেকে। নদীর জল সীমায় মানুষের একটা স্রোতও যেন অমনি একটা বাঁক নিয়ে রয়েছে। (পৃষ্ঠা ১৪, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র : শওকত আলী, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বাঁধন পাবলিকেশন্স, ঢাকা)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণের পর ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডামি বন্দুক, বাঁশের লাঠি ক্ষেত্রবিশেষে ইউটিওসির বন্দুক দিয়ে প্রাথমিক ট্রেনিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু তার মানসিক প্রভাব ছিল ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর। যে কারণে ২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার পর ইপিআর পুলিশ ও মুক্তিকামী মানুষ সীমিত পর্যায়ে হলেও প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। পূর্ব প্রস্তুতি, মানসিক সিদ্ধান্ত না থাকলেও কেউ কেউ নিজের অজান্তে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েÑ উপন্যাসে যার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হাসানের বর্ণনায়Ñ ‘না, হাসান করুণ হাসল, আমরা রাইফেল পেয়েছিলাম কতকগুলো তাই নিয়ে বেরিয়েছিলামÑ পজিশনও নিয়েছিলাম, হাসান মুখ নিচু করে থাকল, না মুখের কষ্ট গোপন করল বোঝা গেল না। শেষে লীলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ইউটিওসি ট্রেনিং নিয়ে সুন্দর মার্চ করা, রাইফেল ঘাড়ে বহন করা যায়, ট্রিগারও বোধহয় টেপা যায়Ñ কিন্তু ট্যাংক আর কামানের বিরুদ্ধে সামনাসামনি যুদ্ধ? হাসান মাথা নাড়লে ওই রকম যুদ্ধ বোধহয় করা যায় না। ‘(পৃষ্ঠা ২১, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র : শওকত আলী, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বাঁধন পাবলিকেশন্স, ঢাকা)।
এই বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্বের অপ্রস্তুত প্রতিরোধ ও সীমিত সামর্থ্যের কথা ব্যক্ত হয়েছে। মানুষের আশা, দৃঢ় সংকল্প, নিখাদ আবেগ সময়ে বড়ো হাতিয়ার হয়ে ওঠে। উপন্যাসে আমরা দেখি চট্টগ্রাম বেতার থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ বিভিন্ন জেলাশহরে প্রতিরোধযুদ্ধ, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন হওয়ার খবরে অনেকেই উদ্দীপিত হয়। শহরতলির মুক্তিকারী মানুষ সামান্য কয়েকটা শটগান, ৩০৩ রাইফেল, এক নলা বন্দুক ও বাঁশের লাঠি হাতে প্রতিরোধযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে দ্বিধা করে না। তারা অজানা নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ধাবমান মানুষের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার, কাপড়, ওষুধ ও নিরাপত্তার আয়োজন করে। অনেকের মধ্যে প্রফেসর রায়হান, তার স্ত্রী মিনু ভাবি, যুদ্ধাহত হাসান, লীলা সাকিনা, ফার্নান্দেজ একই সাথে রুদ্ধশ্বাস ও অনিশ্চিত জীবনের সাথী হয়। তাদের মাঝে আমরা বিচিত্র চিন্তাস্রোতের মানুষ দেখতে পাই। মধ্যবিত্তসুলভ দ্বিধাযুক্ত সুবিধাবাদী মানুষের পাশাপাশি সংকল্পে দৃঢ়চেতা মানুষও আছে। কেউ কেউ ভিয়েতনামের গেরিলাযুদ্ধের বাস্তবতার সাথে বাংলাদেশের একটি সমান্তরাল পর্যায় অনুসন্ধান করেন। তর্ক ওঠে জনযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, সামরিক বা মধ্যবিত্ত তরুণ নাকি কৃষক-শ্রমিক যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে, তা নিয়ে আশ্রিত মানুষের চিন্তাস্রোত বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। আবার দেখা যায় মানুষের ভেতর যে গোপন প্রত্যাশা তা কারও কাছ থেকে শুনলে তাদেরকে চাঙ্গা করে। আর যেকোনো যুদ্ধে প্রপাগান্ডা অনিবার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়। তাদের কাছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কিংবা আকাশ বাণীর বুলেটিনে ঢাকার উপকণ্ঠে যুদ্ধ, জেনারেল টিক্কা খানের মৃত্যুর গুজব কিংবা মিথ্যা প্রচারণা নয়, অধিকতর সত্য মনে হয়। কারণ মানুষ সেটি প্রত্যাশা করে, বিশ্বাস করতে চায়। শেখ মুজিব স্বয়ং যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেনÑ এই ধরনের খবর শোনার জন্য অনেকে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। কেউ কেউ আবার আওয়ামী লীগের কিংকর্তব্যবিমূঢ় নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষোভ, হতাশা ব্যক্ত করেন। নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতাও বিনিময় হয়। ঢাকা শহরের গণহত্যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আশ্রয় কেন্দ্রের এক আগন্তুকের বর্ণনায়Ñ ‘ভদ্রলোক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির টেকনিশিয়ান। অনেক খবর বললেন। স্টাফ কোয়ার্টারের চারতলা থেকে দেখছেন সব। আমি জগন্নাথ হলের ছেলেদের দিয়ে লাশ বইয়ে এনে মাঠে জড়ো করেছে প্রথমেÑ তারপর বহনকারী ছেলেদের সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছে। ড. দেবকে মেরে ফেলেছেÑ না একা নন, আরও মেরেছে টিচারদেরÑ শহীদ মিনারের যে বাড়িটা ওই বাড়িতে চার-পাঁচজনকে মেরেছে। জি না, আমি দেখিনিÑ রাস্তায় শুনলাম, আজ মাঝপথে। জি না, এক জায়গায় থাকিনি, পালাচ্ছিলামÑ পেছন থেকে গুলি শুরু হলোÑ তখন একটা ড্রেনে লুকোই আর ওই ড্রেনেই থাকতে হয় পুরো একদিন, তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করি। কোনো খেয়াল ছিল না। বৌ ছেলেমেয়েরা ছিল বকশীবাজারে, ওখানে গিয়ে দেখি ওরা নেই। সারা ঢাকা শহর খুঁজেছি ওদের। জি, এখনও মানুষ মারা হচ্ছে। (পৃষ্ঠা ৩৯. মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র : শওকত আলী, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বাঁধন পাবলিকেশন্স, ঢাকা)
আশ্রয় ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক সিরাজ, সেকান্দার ও শাকেরের তৎপরতার অন্ত নেই। তারা তাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। এখানেও বিশ্বাস, আস্থা, আনুগত্য ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে।
সিরাজ ও সিকান্দর প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী। মুক্তি ও স্বাধীনতা তাদের সংকল্প, বিশ্বাস ও আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু শাকের শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের প্রতি আস্থাশীল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সে স্বাধীনতাবিরোধী। তাকে একজন গতানুগতিক, পশ্চাৎপদ ও আজ্ঞাবহ মানুষ হিসেবে ভাবা যায়। অন্যদিকে শাকের লীলার প্রতি যত্নবান, সহানুভূতিশীল ও ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু তার আবেগ, ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠা লীলাকে স্পর্শ করে না। আপাতদৃষ্টিতে অন্তর্মুখী যুদ্ধাহত হাসান, পঙ্গুত্ব, মৃত্যু যার অনিবার্য পরিণতি, লীলা তার প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠে। এই যে হাসানের সমূহ পঙ্গুত্ব তবু তার প্রতি লীলার মনোযোগ। তার মধ্য দিয়ে লেখক একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগী অসীম সাহস ও নিঃসংকোচ আত্মনিবেদন ভঙ্গিকে মহীয়ান করে তোলেন। শেষ পর্যন্ত সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে পালালেও হাসান কিন্তু আশ্রয় কেন্দ্রে থেকে যান। তার থেকে যাওয়া যেমন শারীরিক অক্ষমতা প্রকাশ করে তেমনি তার দৃঢ় মানসিক শক্তির পরিচয়ও পাওয়া যায়।
২৫ মার্চ থেকেই মুক্তিকামী মানুষ প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হয়। মুক্তিযুদ্ধের এই এথমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক দক্ষতা যত না বেশি তার থেকে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি মুক্তিযুদ্ধে অশেষ প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক কর্মী, সংগঠক, সামরিক বাহিনীর লোকজন, কৃষক-শ্রমিক ছাত্র বেকারসহ সকল পর্যায়ের গণমানুষ বিচ্ছিন্নভাবে যেমন সংগঠিতভাবেও তেমন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ও প্রস্তুতি শুরু করে। উপন্যাসে আমরা দেখি পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসলীলা ও অগ্রগমনের মাঝে নিঃশঙ্ক মানুষ পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের অস্ত্র ছিনিয়ে প্রতি আক্রমণ করে। মানুষটিও নিশ্চিত মৃত্যুবরণ করে। পাশাপাশি নিজেকে সে আত্মত্যাগ ও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। মুক্তিবাহিনী সীমিত পর্যায়ে হলেও তাদের তৎপরতা শুরু করে। সেই সংবাদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী ও বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। উপন্যাসে তার প্রতিফলন ঘটে এভাবেÑ ‘ইচ্ছা না থাকলেও গুনতে হয়। মস্কো, অস্ট্রেলিয়া, দিল্লি, ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি সবার শুনতে হয়। সব মানুষই শোনে। এই এক নতুন ব্যাপার হয়েছে, সবাই রেডিওপাগল। কোনো খবরের একটা শব্দ বাদ থাকছে না। সব শোনা চাই, গান নয়, বাজনা নয়, শুধু খবর। কুষ্টিয়ায় যুদ্ধ হচ্ছে, দিনাজপুরে ঢুকতে পারছে না, সেখানে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে। খবর শুনে বাচ্চারা জয় বাংলা বলে চিৎকার করে উঠেছে। ‘(পৃ. ৫৭. মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র : শওকত আলী বাঁধন পাবলিকেশন্স, ঢাকা)
লেখক শওকত আলী যাত্রা উপন্যাসে গণহত্যায় ভীত, স্তম্ভিত ও সমূহ গণহত্যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার প্রত্যাশী মানুষের অজানা গন্তব্যে যাত্রা করা মানুষের গল্প বলেছেন। যাত্রার সেই গল্পে তাদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, ক্ষতি, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র্য ও জাতীয় জীবনের ছোট-বড় অনেক অনুষঙ্গ প্রতিকায়িত হয়েছে। তার মধ্য দিয়ে ২৫ মার্চ-পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্বিকার ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যকাব্য রচনায় লেখক চিত্রকল্প শব্দ ও বোধের পরিমিত ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেন। পাশাপাশি লেখক ব্যক্তি মানুষের সংকটের সমান্তরালে শেষ পর্যন্ত বৃহৎ গণমানুষের প্রতিরোধ যুদ্ধের অসম্ভব তাড়না, যুদ্ধ, প্রতিরোধ, সংশয় ও দৃঢ় সংকল্প বোধকে চিহ্নিত করেন। উপন্যাসে লেখক ভাষার সারল্য চিত্রকল্পের নিটোল ব্যবহারে নিরাপদ স্থানের যাত্রা উন্মুখ গণমানুষের চালচিত্রকে ব্যক্ত করেন।
হিসাবনিকাশ : আশির দশকে একজন মুক্তিযোদ্ধার টানাপড়েন :
লেখক শওকত আলী নিঃসন্দেহে একজন শক্তিমান কথাশিল্পী। ব্যক্তি, সমাজ জীবন, ইতিহাস, ইতিহাসের পরম্পরা ও সামাজিক অভিঘাতকে ভাষার মহিমায় প্রকাশে তিনি সিদ্ধহস্ত। মুক্তিযুদ্ধের নানা অভিঘাত এবং সমাজ, রাজনীতি, ক্ষমতা করপোরেট ব্যবসায় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করে তার ভাষা নির্মাণ করেন হিসাবনিকাশ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আশির দশকের ক্ষমতার রাজনীতি ও করপোরেট ব্যবসায়ের চালচিত্র তুলে ধরেন।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাজিদ মুক্তিবাহিনীর একজন প্লাটুন কমান্ডার। শিক্ষিত, ভদ্র, আত্মমর্যাদাপূর্ণ সাজিদ মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন এ কথা স্পষ্টভাবে উপন্যাসে উল্লেখ না থাকলেও লেখকের বর্ণনাভঙ্গি সেই ইঙ্গিত বহন করে। আশির দশকের সামরিক শাসনকাল তাকে যে বিরূপ পরিস্থিতি, বৈরী প্রতিযোগিতার মুখোমুখি করে, তা হলো এংরিস্থ উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সদ্য স্বাধীন দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরাট বাজার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে বৃহৎ অর্থে উদ্যোক্তা ও মূলধনের জোগানদাতা না থাকায় মারোয়াড়ি পুঁজিপতিগণ সেই সুযোগ গ্রহণ করে। উপন্যাসে এ রকম একটি পুঁজি ইন্দুযোশী, তার বাংলাদেশি অংশীদার আখতারকে এর নিয়ে পূর্বাশা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ব্যবসায়িক ফার্ম প্রতিষ্ঠা করে। সাজিদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিজের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেয় ও অংশীদার করে নেয়। এভাবে নিজের অজান্তে মুক্তিযোদ্ধা সাজিদ নিজের মুক্তিযোদ্ধা ইমেজ পরিচয়কে বিক্রি করে এবং ক্ষমতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও অর্থের কাছে পরাভূত হয়ে সুবিধাবাদী ওঠে। ঘটনাক্রমে হয়ে ইন্দুযোশী ও আখতার নিরুদ্দেশ হলে অনভিজ্ঞ সাজিদের পক্ষে ব্যবসায় ধরে রাখার সুযোগ হয় না। এ পর্যায়ে সাজিদ জাহাঙ্গীর নামের একজনের শরণাপন্ন হন। জাহাঙ্গীর মূলত সরকারের উচ্চ মহল, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তা, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের সাথে যোগসূত্র রক্ষা চলেন। তিনি বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার তদবিরবাজ, বিনিময়ে নিজে উচ্চহারে কমিশন পান ও অন্যদের জন্যও কমিশনের ব্যবস্থা করেন। আদর্শ, নীতি, নৈতিকতা তার কাছে কোনো বিষয় নয়, কেবল প্রশংসা ও লোভের ফাঁদ তৈরি করে স্বার্থ আদায় তার একমাত্র কাজ। লেখক তার মধ্য দিয়ে আশির দশকের দুর্নীতির যে সংস্কৃতি তার একটি চিত্র উপস্থাপন করেন। জাহাঙ্গীর বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সাজিদের পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের একজন হরমুজ আলী খান, যে মূলত স্বাধীনতা-বিরোধী। স্বাধীনতার পরেও অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলাদেশের স্বকীয়তা, সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে। পূর্বাশা কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে গুড হেভেন কিংবা আল মাশরিক করার প্রস্তাবের মধ্য তার মানসিক অবস্থার একটা পরিচয় পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত জীবনে তারা অভিজাত হোটেলে বসে মদপান করতে অভ্যস্ত। কিন্তু পোশাকি ইসলাম ব্যবহারে পারঙ্গম। আবার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাস না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে সে দ্বিধাগ্রস্ত নয়। লেখকের ভাষাÑ ‘একজন ফ্রিডম ফাইটার আমার দরকারÑ না হলে নানান ঝামেলা হয়। মা বাদে। পাকিস্তানি আমলের কথা তুলে আমাকে রাজাকার বলে গাল দেয়। নাফিস সাহেব কেন যে আপনার পুরা পরিচয়টা দেয় নাই বুঝলাম না। আপনি মুক্তি ছিলেন জানলে আমি ওইদিনই কথাবার্তা ফাইনাল করে ফেলতাম (পৃষ্ঠা ১৬২, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র : শওকত আলী, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বাঁধন পাবলিকেশন্স, ঢাকা)
একজন রীনা স্বাধীনতা-বিরোধী চরিত্রহীন স্বামী মাসুদকে ডিভোর্স দেয়। পরিবর্তিত জীবনে সাজিদের সাথে তার পরিচয় হয়, তার সাথে ঘর সংসারের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বাদ সাদে তার প্রাক্তন স্বামী। লেখক তাকে নির্মাণ করেন সুযোগসন্ধানী, হিংস্র, কুটিল ও শীতল চরিত্রের লোক হিসেবে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা বহুধাবিভক্ত হলেও স্বাধীনতা-বিরোধীরা পরস্পরের প্রয়োজনে পরস্পরের পাশে এসে দাঁড়ায়। মাসুদ স্ত্রীর প্রেমিক সাজিদকে শায়েস্তা করার জন্য রাজাকার কালু সিকদার ওরফে কালাম শিকদারের সাহায্য পায়। স্বৈরাচার এরশাদ স্বাধীনতা-বিরোধীদের পুনর্বাসনের সুযোগ দিলে কালাম শিকদার ক্ষমতাসীন দলের মহানগর শাখার ছাত্র সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। লেখক এই চরিত্রগুলোর মাধ্যমে রাজনীতিতে পেশিতন্ত্র, সুবিধাবাদ ও স্বাধীনতা-বিরোধীদের স্বরূপ চিহ্নিত করেন।
আশির দশকের বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে মাস্তানতন্ত্র, স্বাধীনতা-বিরোধীদের পুঁজি লগ্নি, বহুজাতিক পুঁজির নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। সবাই যে যার অবস্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ব্যবহার করতে চায়, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের চেতনা ধারণ নয়। অবশ্য এ অবস্থার সূচনা ’৭০-এর দশক থেকেই। উপন্যাসে আমরা দেখি মাস্তান নুট চৌধুরী, তার বোন সুখী, স্বাধীনতা-বিরোধী রাজাকার মাহফুজ, চীনা, হংকং, মারোয়াড়ি পুঁজি সবাই নিজের স্বার্থে মুক্তিযোদ্ধা সাজিদের সাথে ব্যবসায়িক চুক্তি করতে উদগ্রীব। মধ্যস্থতাকারী জাহাঙ্গীর যেভাবে পুরো বিষয়টি সাজিদের কাছে ব্যাখ্যা করেনÑ ‘দেখবেন মাহফুজ সাহেব একেবারে ঠিকমতো বলা যায় খাপে খাপে মিলে যাবেন আপনার সঙ্গেÑ ওর কোনো উপায় থাকবে না ওকে মিলতেই হবে মূল উদ্যোগটা কার? নুটুর বোন আর দুলাভাইয়ের তো? ওরাই জুটিয়েছে মাহফুজকে। কারণ ভদ্রলোকের প্রচুর টাকা আছে ইনভেস্ট করার মতোÑ তারপর ওই চীনা আর মারোয়াড়িÑ এখন যেহেতু আপনার ইন্ডাস্ট্রি লাইনে নতুন, সেহেতু জামান সাহেব আপনাদের নানাভাবে ইউজ করার চেষ্টা করবে। তখন নিজের স্বার্থের কথা ভেবেই আপনারা একে অন্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হবেন। মানে ওই রকম পরিস্থিতিতে শত্রু কি আর শত্রু থাকে? ওদিকে চীনা আর মারোয়াড়ির গাঁটছড়ায় মাহফুজ কেন, কেউই ঢুকতে পারবে না। সুতরাং মাহফুজ সাহেবের আর কোন পথ খোলা থাকবে? আপনার ওপর নির্ভর করা ছাড়া? (পৃষ্ঠা ১৮৮, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র : শওকত আলী, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বাঁধন পাবলিকেশন্স, ঢাকা)
ব্যবসায়, রাজনীতি, অর্থ, আদর্শ ও সুবিধাবাদীদের এই জটিল হিসাব-নিকাশ সাজিদকে বিভ্রান্ত করে। তার ভেতর একধরনের মোহ, প্রলোভন ও সুবিধাবাদ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সে লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে সংগ্রামমুখর কঠিন জীবন বেছে নেয়। জীবন ও প্রতিষ্ঠার এই জটিল হিসাব-নিকাশে সাজিদ শেষ পর্যন্ত তার আদর্শ, চেতনা ও বিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরে। লেখক শওকত আলী অত্যন্ত সহজÑ সরল ভাষায় আশির দশকের রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল প্রবণতা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন।