× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লোকটা

হোসেন আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ ১৪:০৫ পিএম

লোকটা

রউফ সাহেবকে এখন চেনাই মুশকিল। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় টুপি, গেরুয়ার মতন ধূসর রঙের আলখাল্লায় তার আপাদমস্তক ঢাকা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, হাতে ছোট্ট তসবিও রাখেন। অনেক দিন পরে আজ বিকালে এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যালের মোড়ে আকস্মিক সাক্ষাৎ হলো বখতিয়ার হোসেনের সঙ্গে। বখতিয়ার প্রথমে তাকে চিনেনি বরং রউফ সাহেব নিজেই পেছন থেকে বখতিয়ার বলে ডাক দেন। পরিচিত কণ্ঠ কানে বাজলে ঘাড় ঘুরিয়ে সে তার কাছে যায়। 

Ñআরে স্যার, কেমন আছেন? আমি তো কোনো ভাবেই চিনতে পারতাম না। 

আপনি যে সম্পূর্ণ বদলে গেছেন? 

Ñনা না, তেমন কিছু না। শোন, সকলকেই একদিন আসল ঠিকানায় ফিরে যেতে হবে। সেটা দুদিন আগে আর পরে। ওপারের স্থায়ী ঠিকানার জন্য সঙ্গে কিছু নিয়ে যেতে হবে। শূন্য হাতে যাওয়া যাবে না। সাদা খাতায় নম্বর দেওয়ার সুযোগ হয় না, কিছু একটা লিখতে হয়। এ-ই আর কী! 

কী বলো? 

Ñএখন বাসা কোথায় স্যার? 

Ñওই তো ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। একসময় তুমি বোধকরি গিয়েছিলে। 

সেখানেই তোমার ভাবির বাসায় থাকি। 

জানো তো, সে পৈতৃক সূত্রেই অনেক বড়লোক। বাবার অনেক সম্পত্তির মালিক এখন তোমার ভাবি নিজেই। 

Ñজি, জি। তিনি তো অভিনয়ও করতেন, এ দেশের বিখ্যাত একজন শিল্পী। যদিও ইদানীং টিভি চ্যানেলে তাকে কম দেখা যায়। 

Ñঠিকই বলেছ, সরকারের পরিবর্তন হলে আমার কুপ্রভাবটা তার ওপর গিয়ে পড়ে। বর্তমান মিডিয়ায় একপ্রকার কালো তালিকাভুক্ত হয়ে আছে। 

Ñনা, নিশ্চয় একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। উনি উনার যোগ্যতা দিয়েই স্বীয় মর্যাদা ফিরে পাবেন। 

এভাবে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা হলে রউফ সাহেব বললেন, 

Ñবখতিয়ার বাসায় এসো আরও আলাপ আছে। তোমার সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। অনেক স্মৃতি অনেক গল্প। এখন আমরা উভয়ই অবসরপ্রাপ্ত জীবন নিয়ে বেঁচে আছি। 

এসো, সুখ-দুঃখের কথা বলব। অতীতচারিতাও কখনও কখনও সুখকর হয়। 


দুই. 

হ্যান্ডশেক করে বিদায় নেওয়ার পরে বখতিয়ার হোসেন যেন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। সে যখন হাতিরপুল কাঁচাবাজারের ব্যস্ত সড়ক ধরে সোজা বাংলামোটরের দিকে যাচ্ছিল তার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা ছিল। এটা কীভাবে সম্ভব? রউফ সাহেবের মতন শতভাগ দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর মানুষটা কীভাবে এমন লেবাসধারী হয়ে হাটে-বাজারে ঘুরছে। তার অবৈধ অর্থ অর্জন, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট সে তো সবারই জানা। এসব অপকর্মের কারণে চাকরিতে দুয়েকবার সাময়িক বরখাস্তও হয়েছিলেন তিনি। অথচ আজ বললেন, তোমার ভাবির অনুকম্পায় তার সঙ্গেই আছি। এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? 

বখতিয়ার রীতিমতো বিস্ময়াভিভূত হয়ে যায়। তার হাঁটায় বারবার ছন্দপতন হচ্ছে, রিকশার সাথে ধাক্কা লাগছে, পেছন থেকে আসা গাড়ির হর্ন কানে লাগছে না বা রাস্তা পার হতে হোঁচট খাচ্ছে ইত্যাদি। সে মনে মনে বলছে, আরে যে মানুষটা টাকা ছাড়া কখনও একটা নথিও ছাড়েনি, তার দ্বারা এমন পরিবর্তন হলো কী করে? 

বখতিয়ারের মনে পড়ে গেছে, একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে রউফ সাহেব একটা ছালার ব্যাগ ভর্তি টাকার বান্ডিল নিয়ে বাসায় যাচ্ছিল। সেদিন বখতিয়ার নিজেই জিজ্ঞেস করেছিল। 

Ñস্যার, গাড়িতে কাঁচাবাজারের ব্যাগটা কেন? 

রউফ সাহেব বলেছিলেন, 

Ñএটা কিছু না, এতে তোমার ভাবির জন্য কেনা কাপড়ের কয়েকটি প্যাকেট আছে। আজ এত বছর পরে লোকটা একইভাবে বললেন, 

Ñতোমার ভাবির বাড়িতেই থাকি। কোনটা বিশ্বাস করা উচিত? মানুষ তো সবই পারে। তার পক্ষে অসাধ্য বলে কিছু নেই। রউফ সাহেবকে না দেখলে তা বোঝা কঠিন হতো।

বখতিয়ার হোসেন আনমনা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাংলামোটরের কাছে একটা কফিশপে প্রবেশ করেল। তার মাথায় তখন উদ্ভট এক চিন্তা কাজ করছে। সে রউফ সাহেবের স্ত্রী মিসেস জেনিফার খানকে ফোন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও ভাবির সঙ্গে অনেক দিনের যোগাযোগ নেই, বহুকাল বাসায় যাতায়াতের সম্পর্কও নেই। তথাপি মোবাইলের আগের নম্বর ঠিক থাকলে হয়তো তিনি রিসিভ করবেন। না করলেও ক্ষতি কী? ফোন তো করাই যায়। এমন একটা দোদুল্যমানতার মধ্যেই বখতিয়ার পূর্বের নম্বরে জেনিফার ভাবিকে কল করে বসল। কয়েকটি রিং হলেও ফোনটা রিসিভ হলো না। বখতিয়ার মানসিকভাবে একটু অপ্রস্তুত হলো। প্রায় নির্জন সুনসান-নিস্তব্ধ কফিশপে বসে ভাবছে, কী দরকার ছিল এতদিন বাদে ফোনটা করার? হয়তো এ নম্বরটি তিনি এখন আর ব্যবহার করেন না বা দেশের বাইরে কোথাও বেড়াতে গেছেন ইত্যাদি। তারা শিল্পী মানুষ বিদেশে যাওয়া ডালভাত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কফিশপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যখনই সে উঠে দাঁড়াল, ঠিক সেই সময়ে তার ফোনটা বেজে উঠল। জেনিফার ভাবির কল…

Ñআরে ভাই কেমন আছেন? আমাদের তো একেবারেই ভুলে গেলেন? কী খবর এখন কোথায় আছেন, রিটায়ার করেছেন কী? নাকি চাকরিতে আছেন? 

Ñনা না, ভাবি সরি। আমিও অবসরপ্রাপ্ত হয়ে গেছি, তা-ও বছর তিন হলো কিছু করি না, গ্রামের বাড়িতে যাই, পৈতৃক ভিটার দিকে খানিকটা ঝুঁকে গেছি। ঢাকা এবং গ্রাম মিলিয়ে সময় কেটে যাচ্ছে। 

Ñআপনার বাচ্চাদের খবর কী? নিশ্চয় ওরা বড় হয়েছে, চাকরি-বাকরি করে কি? 

Ñজি জি ভাবি, ওরা ভালো আছে। 

যে যার মতো চাকরি করে, এদের ঘরসংসারও হয়েছে। নানা হয়েছি অনেক দিন হলো। 

Ñএকদিন বাসায় আসেন। কত দিন আসেন না, বললেন, জেনিফার ভাবি।

বখতিয়ার এবার বলার ফুরসত পেল।

বললে, ভাবি, স্যারের সঙ্গে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ হয়ে গেল এলিফ্যান্ট রোডের ব্যস্ত সড়কে। মনে হয় সঙ্গে একজন হুজুর ছিলেন। অনেক কথা হলো। বললেন, আপনার বাবার সে-ই বাসায়ই একত্রে থাকছেন। উনি তো অনেক চেঞ্জড, চিনতেই পারছিলাম না। লম্বা আলখাল্লা পরিহিত বুজুর্গ মৌলানার মতন দেখতে। হাতে তসবি, শরীরে আতরের সুগন্ধি, মাথায় রেশমের টুপি, মুখে পানের লহরি, আগের চেয়ে স্বাস্থ্য বেড়েছে, হাসিহাসি 

মুখমণ্ডল। বললেন বাসায় যেতে ইত্যাদি। 

Ñবলেন কী ভাই? এটা কী করে সম্ভব? 

যদ্দুর জানি তিনি তো ঢাকায় থাকেন না। আর আমাদের মধ্যে সেপারেশন হয়ে গেছে তা-ও দুবছরের বেশি। তিনি নাকি পাবনায় নিজের গ্রামের বাড়িতে থাকেন। আমাদের ছেলে শুভ কানাডায় আছে, পড়াশোনার শেষে তার চাকরি ঘরসংসার সবই রয়েছে। ফোনে নিয়মিত আলাপ আছে। রউফ সাহেব ঢাকায় আসলেও তা এখন আমার জানার কথা নয়। তিনি কী করেন, কীভাবে আছেন, আমি বলতে পারব না। 

Ñএসব কী বললেন ভাবি? সরি, ভেরি সরি ভাবি। 


তিন. 

জেনিফার ভাবির সঙ্গে কথোপকথন শেষ হলে বেশ কয়েক মিনিট ঝিম ধরে একই আসনে বসে ছিলেন বখতিয়ার হোসেন। তার কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। একজন ওয়েটার কাছে এসে দ্বিতীয়বারের মতন জানতে চাইল কিছু লাগবে স্যার? কাস্টমার নেই অথচ তিনজন তরুণ সুদর্শন ওয়েটার প্রায় অলস বসে আছে। অবশ্য এটা কফিশপের রাশ আওয়ার নয়। ঘণ্টা দেড়েক পরে পড়ন্ত বিকালে নিশ্চয় জমে উঠবে। ওয়েটারদের দায়িত্ব যা সে তা-ই করবে। বখতিয়ার হোসেন নিজেও ষাটোর্ধ্ব রিটায়ার্ড পারসন। বিবেকবান মানুষ তিনি। ওয়েটারকে ডেকে বললেন, শোন, ভালো করে একটা ব্ল্যাককফি নিয়ে আস বাবা। সুগার হবে না। 

কফিশপে বসেই সে ভাবছে, রউফ সাহেব কেন তার সঙ্গে এমন ডাহা মিথ্যা বয়ান দিয়ে গেলÑ যা তার পরনের লেবাসের সাথে একেবারেই যায় না। তা ছাড়া তার সাথে চাকরির সহকর্মী হিসেবে দীর্ঘ সময়ের যেমন সম্পর্ক ছিল তাতে তিনি একজন অনুজের সঙ্গে কখনও এমনটা করতে পারেন না। আসলে কী হয়েছিল তা জানা কীভাবে সম্ভব?

ঠিক তখনই বখতিয়ার হোসেনের স্মৃতিপটে আরও একদিনের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। তখন তার অফিস কাকরাইলে। পৌষের এক সন্ধ্যাবেলা। সবাই ত্রস্ত হরিণের পায়ে ঘরে ফেরার জন্য বের হয়ে যাচ্ছে। রউফ সাহেবের গায়ে চমৎকার অভিজাত ডিজাইনের ব্লেজার, শার্টের সঙ্গে ম্যাচিং করা টাই। হাতে মাঝারি সাইজের দামি ব্রিফকেস। 

নিচে মুখোমুখি হতেই বললেন, বখতিয়ার চলো, মিরপুর থেকে ঘুরে আসি। বেশি সময় নেব না। যাব আর আসব। বখতিয়ার হোসেন ‘হ্যাঁ কিংবা না’ বলার আগেই তাকে গাড়ির দরজা খুলে প্রায় জোর করে ভেতরে বসানো হলো। সে-ও অগত্যা তার সহযাত্রী ও সহগামী হতে বাধ্য হলো। রউফ সাহেব তার টয়োটা কারটি সরাসরি মিরপুরের চিড়িয়াখানার কাছাকাছি গিয়ে ডানদিকের সরু গলি ধরে এগিয়ে যায়। একটা পুরনো ভবনের দরজা বরাবর গাড়িটা রাখলেন। বখতিয়ার এবং ড্রাইভারকে গাড়িতে অপেক্ষা করতে বলে লিফটে ওপরে উঠে গেলেন রউফ সাহেব একা। মনে হলো বাড়িটা তার পূর্ব পরিচিত। ওপরে অনেকটা সময় কাটিয়ে তিনি যখন ফিরে আসলেন, তার সঙ্গে বয়োবৃদ্ধ হুজুর ধরনের একজন সৌম্যকান্তি মানুষও নেমে আসলেন। 

বখতিয়ার হোসেন জানতে চাইলেন, আর কতক্ষণ লাগবে স্যার? 

Ñনা না, কাজ শেষ। শুধু হুজুরকে তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি। উনি হলেন সফিউল্লাহ মওলানা সাহেব। লোকজন তাকে সফি হুজুর বলেই ডাকে। বখতিয়ার গাড়ি থেকে নেমে হুজুরকে সালাম দিল। তিনিও সালাম নিলেন এবং বললেন, ‘আপনি রউফ সাহেবের সাথে একই অফিসে চাকরি করেন এবং জুনিয়র কলিগ। আমি আপনার নাম জানি, ঠিকানাও জানি। বখতিয়ার কিছুটা সচকিত হয়ে উঠে বলল, আমাকে চিনেন কীভাবে? হুজুর বললেন, ‘আমাকে অনেক কিছু চিনতে হয়, আমার নিজের প্রয়োজনেই।’ 


চার.

মিরপুর থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে বখতিয়ার হোসেনের মনে কৌতূহল জাগে, হুজুরের সম্পর্কে জানা দরকার। তার চেহারা, বাচনভঙ্গি, বিনয় এমনকি কথার মারপ্যাঁচ বেশ ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। তিনি সাধারণ কেউ নন। তার সঙ্গে রউফ সাহেবের যোগাযোগ কীসের? 

গাড়িতে তারা দুজন পাশাপাশি বসা আছেন।

বখতিয়ার জিজ্ঞেস করল, স্যার হুজুর আসলে কে? কেন এসেছিলেন তার কাছে? 

Ñতাহলে শোন, সে এক লম্বা কাহিনী। গত এক বছর আগে হুজুর আমার অফিসে এসেছিলেন। এখানে তার দুটো সরকারি প্লট আছে। একটা প্লটের বিপরীতে মামলা হয়েছে। তিনি প্রাথমিকভাবে হেরে গেছেন। তবে আমাদের অফিস থেকে তাকে দেওয়া বরাদ্দ পত্রের শর্তে এখনও তার অধিকার আছে। এই মর্মে একটা প্রত্যয়ন পত্র দেওয়া হলে বেচারার কাজটি হয়ে যায়। তিনি একদিন আমাকে নগদ পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে বললেন, বাজান, কাজটা করে দিবেন। তবে কাজ না হলে আমার টাকা অবশ্যই বাসায় গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবেন। 

তখন আমি বলি, আপনার বাসায় যাব কেন? 

তিনি বললেন, যারা কাজ পারে না, তাদেরকে আমার বাসা পর্যন্ত যেতে হয়। এতে করে আমি মনে মনে ভয় পেয়ে যাই। কাজটা করার জন্য সাধ্যাতীত প্রচেষ্টা চালাই, কিন্তু হয়নি। বস কিচ্ছু বুঝতে চায় না। সে সাফ বলে দিল রউফ, ‘এটা কিন্তু হবে না। এদিকে আমি দারুণ মর্মযাতনায় পড়ে যাই। ইদানীং সবকিছুতে অস্বস্তি লাগে, মনোযোগে বিচ্যুতি সৃষ্টি হয়েছে। কাজে মন বসে না। শরীরও ভালো যাচ্ছে না। স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদিন খুনসুটি লেগেই আছে। বাচ্চাটি এ বছর স্কুলে খুব খারাপ করেছে। সংসারজীবন তছনছ হয়ে উঠেছে। অথচ প্রতিদিন অফিস করছি, বেতন-ভাতাদি পাচ্ছি, সবকিছু ঠিক আছে। তবে চিত্তের প্রশান্তি চলে গেছে কোনো সুদূরেÑ যা কারও বোঝার উপায় নেই। তাই আজ হুজুরের দেওয়া সে-ই পাঁচ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার নিমিত্তে তার বাসায় গিয়েছিলাম। এখন মনে হয় আমার বুকের ওপর থেকে এক টন ওজনের একটা পাথর সরে গেছে। 

Ñস্যার বলেন কী? লোকটা কি টাকার জন্য ফোন করেছিল? 

Ñনা, কোনোদিন নয়। এমনকি জানতেও চাননি। কাজের কী হলো না হলো, তা-ও জিজ্ঞেস করেননি। আর কখনও অফিসেও আসেনি। কিন্তু আমার কানে সর্বদা বেজে চলেছে, ‘বাজান, আমার টাকাটা নিয়া কিন্তু বাসায় আসবেন। কী আশ্চর্য ঘটনা বলো। আমি কি ঠিক থাকতে পারি?’ 


পাঁচ.

এবার কফিশপ ছেড়ে রাস্তায় হাঁটা শুরু করল বখতিয়ার হোসেন। সে তার বাসায় ফিরে যাবে। বাইরে তাকিয়ে দেখে, সন্ধ্যা নেমে আসছে, তবু বাংলামোটর এলাকার চৌরাস্তাটা ফকফকা নিয়নের আলোয় ঝলমলে হয়ে আছে। মানুষের এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ির অন্ত নেই। মাথার ওপর দিয়ে নিমেষে চলে যাচ্ছে সদ্য চালু হওয়া আধুনিক মেট্রোরেল। মনে হয়, প্রতি ৫ মিনিটে একটা যাচ্ছে আর আসছে। আবার তলদেশে কোথাকার এই লক্ষ লক্ষ উদ্ভ্রান্ত জনতা দিনের শেষে কোথায় গিয়ে মিলিয়ে যায় তা কেউ জানে না। রাত পোহাতেই ঢাকা মহানগর এই বিপুল জনসংখ্যাকে নিত্যনতুন হয়ে কীভাবে যে ধারণ করে চলেছে, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। হঠাৎ যেন এমনই আকাশকুসুম অপ্রয়োজনীয় ভাবনায় পেয়ে বসেছে তাকে। বখতিয়ার হোসেন ভাবছে, ঘরে ঢোকার আগেই রউফ সাহেবকে একটা ফোন করলে কেমন হয়? পথিমধ্যে একটু দাঁড়িয়ে তার মোবাইল সেটে থাকা নম্বরটা বের করে প্রেস করার আগে সে দেখল, রউফ সাহেবের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়েছে প্রায় আড়াই বছর পূর্বে। যথারীতি রিং করা হলো, কিন্তু বারবার একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, ‘আপনি যে নম্বরে কল করেছেন তা এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। বখতিয়ার হোসেন অবাক হলো, যেখানে জেনিফার ভাবির নম্বরটি চালু আছে, তিনি ঠিকই ব্যবহার করছেন। সেখানে রউফ সাহেব তার নম্বর বদলে ফেলেছেন। এটা বখতিয়ারের ধারণা যে, ঘন ঘন ফোন নম্বর চেঞ্জ করা মানুষগুলো সত্যিই দুই নম্বরি করে থাকে। তার মতে, সমাজের ভদ্রলোক নম্বর বদলায় কম। সাধারণত প্রতারক বা কথা বরখেলাপকারীরাই বেশি বেশি নম্বর এবং ঠিকানা পরিবর্তন করে থাকে। এই মুহূর্তে বখতিয়ার হোসেন ভাবছে, সেদিন এলিফ্যান্ট রোডে তার কাছ থেকে ফোন নম্বরটি না নিয়ে ভালোই করেছি। বাস্তবে রউফ সাহেবের মতন মানুষরা কখনও পুরোপুরি বদলায় না।  


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা