আরিফ মঈনুদ্দীনের দুই কাব্যগ্রন্থ
গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১১:১৮ এএম
আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১২:৫১ পিএম
আরিফ মঈনুদ্দীনের দুই কাব্যগ্রন্থ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমি ধ্বংস হতে এসেছি পরাজিত হতে নয়
ফরাসি কবি স্টিফেন মালার্মে Stéphane Mallarmé একবার বলেছিলেন 'Word is poetry' অর্থাৎ শব্দই কবিতা। এই সংক্ষিপ্ত উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে কাব্যতত্ত্বের এক গভীর সারমর্ম। তিনি কবিতার ব্যাকরণ, ছন্দ, প্রকরণ বা অলংকার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় যাননি; বরং ইঙ্গিত দিয়েছেন শব্দচয়নের ক্ষমতার দিকে। কবির প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় তার শব্দ নির্বাচনে কোন শব্দ
কোথায়, কীভাবে, কতখানি প্রভাব নিয়ে বসবে; সেই সূক্ষ্ম শিল্পবোধেই নির্ধারিত হয় কবিত্ব। কবি ও কথাসাহিত্যিক আরিফ মঈনুদ্দীনের কাব্যগ্রন্থ 'আমি ধ্বংস হতে এসেছি পরাজিত হতে নয়' পাঠ শেষ করলে পাঠক অনুধাবন করবেন তার কাব্যভাষার দৃঢ়তা, চিন্তার গভীরতা এবং প্রতিরোধী মানসের শক্তি কতটা প্রখর। ৫৬ পৃষ্ঠার এই বইয়ে স্থান পেয়েছে মোট ৪৮টি কবিতা, তবে পরিমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর ভাবঘনতা ও উচ্চারণের তীব্রতা।
শিরোনাম কবিতা 'আমি ধ্বংস হতে এসেছি পরাজিত হতে নয়' মূলত আত্মবিশ্বাস, দ্রোহ ও ন্যায়ের প্রতি অটল অঙ্গীকারের এক উচ্চারণ। কবি এখানে স্পষ্ট করে দেন মানুষের জন্ম পরাজয়ের জন্য নয়; বরং প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তা জয় করার জন্য। তিনি সত্যের পথকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে তুলে ধরেন
'যা কিছু বলার কঠিন সত্যের পথে চলার/ যত জঞ্জাল মাড়িয়ে যাওয়ার...'
এই উচ্চারণ কেবল ব্যক্তিগত দৃঢ়তার নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরকালীন এক ইশতেহার।
'হরিণের কঙ্কাল' কবিতায় ফুটে উঠেছে বেদনা ও সামাজিক শোষণের নির্মম চিত্র। এখানে 'হরিণ' নিছক কোনো প্রাণী নয়; এটি সাধারণ মানুষ, তাদের স্বপ্ন ও সরলতার প্রতীক। কবি যখন লেখেন 'ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ব্যাসের হরিণটি...'- তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই হরিণ আসলে আমাদের দেশ, আমাদের সামষ্টিক অস্তিত্ব।
'নির্মোহের উপঢৌকন' কবিতায় কবি জীবনবোধের আরেক দিক উন্মোচন করেন। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবের বাইরে গিয়ে তিনি দেখান, প্রকৃত আনন্দ নিহিত আছে প্রত্যাশাহীন কর্মে।
'পুরস্কারের আশায় যারা হাত পেতে বসে আছে/তাদের হাত শূন্যই থেকে যাবে' এই পঙক্তি কেবল উপদেশ নয়, বরং এক গভীর জীবনদর্শনের সারাংশ। কবির মতে, মনের প্রশান্তিই প্রকৃত অর্জন।
গ্রন্থে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের অনুরণনও ধ্বনিত হয়েছে। শহীদদের স্মরণে লেখা 'পানি লাগবে? পানি' (শহীদ মীর মুগ্ধকে নিয়ে) এবং 'আবু সাঈদ তার নাম' কবিতায় রয়েছে সাহস ও আত্মত্যাগের শক্তিশালী চিত্রায়ণ। 'ঐশ্বরিক শক্তির আধার বুকটান করে দাঁড়িয়ে গেল/ আধুনিক সব মারণাস্ত্রের সম্মুখে' এই পঙক্তি প্রতিরোধের এক অবিনাশী প্রতীক হয়ে ওঠে।
'পতন' কবিতায় কবি ক্ষমতার অহংকার ও দাম্ভিকতার পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি দেখান, মানুষের প্রতাপ আসলে বেলুনভর্তি বাতাসের মতো-যেকোনো মুহূর্তে ফেটে যেতে পারে। অন্যদিকে 'যুদ্ধ' কবিতা আমাদের নিষ্ক্রিয়তা ঝেড়ে ফেলে আদর্শের পথে নামার আহ্বান জানায়।
গ্রন্থের শেষ কবিতা 'প্রতিদান' মানবজীবনের গভীর একাকিত্ব ও প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ফারাককে সামনে আনে। 'এ তো জীবন নয় ভয়াবহ মৃত্যুকূপ/ জীবন থেকে বিদায়'- এই পঙক্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের চূড়ান্ত লড়াই আসলে নিজের সঙ্গেই।
সব মিলিয়ে 'আমি ধ্বংস হতে এসেছি পরাজিত হতে নয়' কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি প্রতিবাদ, প্রতিজ্ঞা ও মানবিক চেতনার এক শক্তিশালী দলিল।
আমি ধ্বংস হতে এসেছি পরাজিত হতে নয়
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশক : বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা
প্রকাশ কাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দাম : ২০০ টাকা
পৃষ্ঠা : ৫৬
আর কত আমাকে ঋদ্ধ করবে তুমি
চলতি বইমেলায় লেখকের আরেকটি কবিতার বই- 'আর কত আমাকে ঋদ্ধ করবে।' বইটিতে লেখকের ৫৬টি কবিতা স্থান পেয়েছে।
নিখুঁত নিশানা ছাড়া কেউ দক্ষ তিরন্দাজ হতে পারে না, তেমনি যথাযথ শব্দ প্রয়োগের কলাকৌশল আয়ত্ত করতে না পারলে কবিও পূর্ণতা পায় না। কবিতা কেবল ভাবের বাহন নয়; তা শব্দের সচেতন নির্মাণশিল্প। শব্দ এখানে উপাদান, আবার অস্ত্রও, যার মাধ্যমে অনুভূতি রূপ পায়।
এ প্রসঙ্গে রোমান্টিক কবি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ Samuel Taylor Coleridge এর বিখ্যাত সংজ্ঞাটি স্মরণীয় ংজ্ঞাটি স্মরণীয় 'The best words in the best order' অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ শব্দের শ্রেষ্ঠ বিন্যাসই কবিতা। এখানে তিনি শব্দ ও বিন্যাস দুইয়ের সমন্বয়কেই গুরুত্ব দিয়েছেন। শুধু শক্তিশালী শব্দ যথেষ্ট নয়; সেগুলোর সঠিক বিন্যাসই কবিতাকে অনন্য করে তোলে। আরিফ মঈনুদ্দীনের কাব্যগ্রন্থ আর কত আমাকে ঋদ্ধ করবে তুমি বইটিতে পাঠক শব্দ ও বিন্যাস দুইয়ের দারুণ সমন্বয় পাবেন।
কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (William Wordsworth) তার প্রবন্ধ Preface to Lyrical Ballads-এ কবিতাকে আখ্যায়িত করেছিলেন 'spontaneous overflow of powerful feeling' অর্থাৎ প্রবল অনুভূতির
স্বতঃস্ফূর্ত উপচে পড়া প্রবাহ। তবে এই প্রবাহ কেবল আবেগের বিস্ফোরণ নয়; তা শিল্পিত হয়ে ওঠে তখনই, যখন শব্দালংকার, অর্থালংকার, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের সুষম গাঁথুনিতে তা নান্দনিক রূপ পায়। যেমন এ বইয়ের নগরে মহৎপ্রাণ নেমেছে শিরোনামে কবিতায় তিনি লিখেছেন- নগরে মহৎপ্রাণ নেমেছে, আমিও ব্যাকুল-আকুল প্রতীক্ষায়-তার সঙ্গে কথা আছে,
এই কবিতাংশটি মূলত 'মহৎপ্রাণ'কে কেন্দ্র করে আত্মঅন্বেষণ ও আত্মজাগরণের এক রূপকধর্মী উপস্থাপন। এখানে 'মহৎপ্রাণ' কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়; বরং এটি মানবমনের অন্তর্গত শুভবোধ, বিবেক, সৃজনশক্তি কিংবা মহত্তের প্রতীক।
কবিতার শুরুতে বক্তা মনে করেন- মহৎপ্রাণ
যেন বাইরে কোথাও নেমে এসেছে এবং তার সঙ্গে কথা বলার জন্য তিনি ব্যাকুল। জমে থাকা অগণিত কথা বলার জন্য তিনি একজন ধৈর্যশীল শ্রোতা খুঁজছেন। কিন্তু পরবর্তী দৃশ্যে দেখা যায়, সেই মহৎপ্রাণ নগর ছাড়িয়ে গ্রাম-প্রান্তরে, প্রান্তিক চাষির ঘরে উপস্থিত। চাষি বিস্ময়ে উপলব্ধি করে-মহৎপ্রাণ আসলে তার ভেতরেই ছিল; তার শ্রম, আশা ও বিশ্বাসের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সেই শক্তি। কবি বলেন, চাষি অবাক হয়ে বিস্ময়ভরা আবেগের তোড়ে বলে ওঠে, হায় মহৎপ্রাণ তুমি এখানে-আমার ভেতর! তাহলে তুমিই আমাকে আদরস্বরে বলে গেছ কথা-এবার ফসল ভালো হবে সংবিৎ আমারও ফিরেছে-পেছন ফিরে দেখি, মহৎপ্রাণ আমার ঘাড়ের কাছে-আমাকে বরণ করার অপেক্ষায়-ফিসফিস করে বলছে, কী কথা আমার সঙ্গে? মহৎপ্রাণের সঙ্গে কথা বলবে? বলো কথা নিজের সঙ্গে। শেষাংশে বক্তারও আত্মচেতনা ফিরে আসে। তিনি বুঝতে পারেন, যে
মহৎপ্রাণকে বাইরে খুঁজছিলেন, সে আসলে তার নিজের সত্তার খুব কাছেই। 'বলো কথা নিজের সঙ্গে'- এই ফিসফিস উচ্চারণটি কবিতার মূল তাৎপর্য প্রকাশ করে। এখানে কবি বোঝাতে চান, প্রকৃত সংলাপ বাইরের কারও সঙ্গে নয়; নিজের অন্তরাত্মার সঙ্গেই।
আর কত আমাকে ঋদ্ধ করবে তুমি
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশক : বিশ্বসাহিত্য ভবন
প্রকাশ কাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দাম : ২০০ টাকা, পৃষ্ঠা : ৫৬