হেলাল উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১১:০৯ এএম
ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মুনিরা রহমান হেলেন ছিলেন দেশের টেবিল টেনিস (টিটি) অঙ্গনের প্রথম নারী চ্যাম্পিয়ন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত দ্বিতীয় বাংলাদেশ ওপেন টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথমবারের মতো নারী একক ইভেন্টে শিরোপা জয় করেন। এরপর ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপেও তিনি নারী একক শিরোপা জয় করেন। তার সৌন্দর্য ও লাবণ্যের কারণে এ সময় খ্যাতনামা ক্রীড়া সাংবাদিক ও দৈনিক বাংলার ক্রীড়া সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান তাকে 'হেলেন অব ট্রয়' নামে ডাকতেন। কিন্তু ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছোট বোন লিনুকে নিয়ে পরপর তৃতীয়বার নারী দ্বৈত ইভেন্টে জাতীয় শিরোপা জয়ের পর তিনি রহস্যজনকভাবে টেবিল টেনিস অঙ্গন থেকে হারিয়ে যান। এর ঠিক ষোলো বছর পর ১৯৯৩ সালে হেলেন আবার ক্রীড়াঙ্গনে ফিরে আসেন। সেসময় তাকে
বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের সদস্য (পরবর্তীতে সহসভাপতি) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, এবং এই সাংগঠনিক দায়িত্ব তিনি ২০২৪ সাল পর্যন্ত চালিয়ে যান। পরে ২০২৫ সালে তাকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সদস্য করা হয়। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় নারী টেবিল টেনিস খেলোয়াড় থাকাকালে ১৯৭৭ সালে তার হঠাৎ চলে যাওয়াটা ক্রীড়ানুরাগী দর্শক ও শুভানুধ্যায়ীসহ অনেককেই অবাক করেছিল। তার সম্প্রতি প্রকাশিত স্মৃতিকথা 'ফিরে আসা' বইটিতে তার অনুসারীদের মনে থেকে যাওয়া এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেওয়া হেলেনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সবুজ পাহাড়ে ছাওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের মনোরম শহর রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় এবং হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলাস্থ শাহজিবাজারের টিলাভ, মিতে, যেখানে তার পিতা শেখ আব্দুর রহমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন।
১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় মাত্র এগারো বছর বয়সে পদক জয় করে (লং জাম্পে দ্বিতীয়, আর ১০০ মিটার দৌড়ে তৃতীয়) তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। তবে সে বছরই হজিবাজার যাওয়ার পর তিনি তার পিতার সঙ্গে টেবিল টেনিস খেলা শুরু করেন। টেবিল টেনিসে ধারাবাহিক সাফল্যের পর যখন তিনি ১৯৭৭ সালে খেলাটি ছেড়ে দেন, এরপর তার জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ ও অন্ধকারের এক কালো অধ্যায়। সুদীর্ঘ ১৬ বছর শেষে ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ দক্ষিণ এশীয় গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ দলের পক্ষে টর্চ হাতে দৌড়ে তিনি যেন ফিনিক্স পাখির মতোই ছাই থেকে আবার উঠে আসেন। জন্ম থেকেই প্রকৃতি ও প্রাণীপ্রেমী হেলেন তার স্মৃতিকথায় শৈশব ও কৈশোরে কাপ্তাই, শাহজিবাজার ও তার পৈতৃক নিবাস খুলনায় দেখা প্রকৃতির বিচিত্র রূপের কথা বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া তার পারিবারিক জীবন এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঘটনাবহুল দিনগুলোর কথাও সবিস্তারে লিখেছেন। এর মাধ্যমে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বনে-পাহাড়ে হরেক রকম দুষ্টুমি, দুঃসাহসিক অভিযান, আর খেলাধুলায় সাফল্যের কথাও তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে।
শাহজিবাজারে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার পরিবারের বিড়ম্বনা ও দুঃখকষ্টের কথাও এতে অকপটে চিত্রিত হয়েছে। এর মধ্যে আছে যুদ্ধের শুরু ও শেষে কয়েকজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার তাদের বাসায় আগমন, এলাকার দূরবর্তী গ্রামে সপরিবারে আশ্রয় গ্রহণ এবং যুদ্ধ চলাকালে কিছু সময়ের জন্য শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের রেস্ট হাউসে পাকিস্তানি সেনাদের অস্থায়ী শিবির স্থাপনের বিবরণ। এরপর স্মৃতিকথায় উঠে আসে ১৯৭৩ সাল থেকে দেশের টেবিল টেনিস অঙ্গনে তার উল্কার মতো উত্থান এবং ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দেশের ভেতরে ও বাইরে শীর্ষস্থানীয় নারী টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা। তারপরই আসে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়, যার সূচনা একটি প্রতারণামূলক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ও ইউনিফর্ম পরা জনৈক স্বার্থান্ধ ব্যক্তির খপ্পরে পড়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসার মাধ্যমে।
এরপর শুরু হয় ১৫ বছরের এক দুঃস্বপ্নে ভরা যাত্রা, যা হেলেন অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এটা ছিল পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে থেকেও তার নিজের ও সন্তানদের বেঁচে থাকার জন্য নীরব সংগ্রামের এক অসামান্য কাহিনী, যেটা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটে ১১ বছর এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪ বছর মঞ্চায়িত হয়েছিল। এর মধ্যে তিনি ১৯৭৯ সালে এক পুত্রসন্তান এবং ১৯৮৪ ও ১৯৯১ সালে দুই কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, যাদের সবাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত নাগরিক। হেলেনের স্মৃতিগুলো এমন আবেগ ও সারল্যের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে যে কাহিনী শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাঠককে তা এক পৃষ্ঠা থেকে আরেক পৃষ্ঠায় ক্রমাগত নিয়ে যাবে। শেষ অংশে জুড়ে দেওয়া হয়েছে একটি ফোটো অ্যালবাম, যাতে চিত্রায়িত হয়েছে হেলেনের জীবন-সফরের বিভিন্ন পর্ব: তার শৈশব, ক্রীড়াক্ষেত্রে দেশে ও বিদেশে সাফল্য, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, পরিবারের সদস্যবৃন্দ, চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্না শখ এবং ঈগল ও সজারুর মতো প্রাণী পোষা।
বইটির ভূমিকা লিখতে গিয়ে প্রকাশক শাহরিন হক তিথি উল্লেখ করেছেন: 'ফিরে আসা' বইটি পড়তে গিয়ে আমি বেশ কবার থেমে গিয়েছি। প্রকাশক হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে। কিছু লেখা থাকে যা কেবল পাণ্ডুলিপি হয়ে থাকে না, ধীরে ধীরে তা পাঠকের ভেতরে ঢুকে পড়ে, না-বলা স্মৃতিগুলোকে নাড়িয়ে দেয়, মনকে নীরবে বিহ্বল করে তোলে। এই বইটি ঠিক তেমনই।... এই গ্রন্থে ফিরে আসা মানে কেবল পেছনে তাকানো নয়; ফিরে আসা মানে নিজের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষকে আলত করে ডেকে বলা- আমি আছি। লেখিকা বইয়ের এই পাতাগুলোয় তার স্মৃতি, শৈশব, প্রকৃতি ও হারানো সময় জমা করে রেখেছেন আর সেই সঙ্গে অজান্তেই তুলে ধরেছেন আমার মতো আরও সহচর মেয়ের না-বলা অনুভূতিগুলোকেও। কোথাও কোথাও মনে হয়েছে, এসব স্মৃতি শুধু তার নয়, এগুলো আমাদের সবারই; আমাদের ফেলে আসা দিন, আমাদের অপ্রকাশিত বেদনা, আমাদের নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা।
স্মৃতিকথায় হেলেন কেবল তার শৈশবের স্মৃতি, প্রকৃতির বিচিত্র রূপ, আর বৈবাহিক জীবনে তার কষ্ট ও যন্ত্রণার কথাই বলেননি, তিনি এই পুরুষ শাসিত সমাজে পারিবারিক সহিংসতার শিকার অসংখ্য নারীর না-বলা কথাগুলোও উচ্চারণ করেছেন। বইটি পড়লে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কালজয়ী উপন্যাস 'দি ওল্ডম্যান অ্যান্ড দি সি'-এর নায়ক সেই বুড়োটার বিখ্যাত উক্তির কথা মনে পড়ে: 'একজন মানুষকে ধ্বংস করা যায়, কিন্তু তাকে পরাজিত করা যায় না।' হেলেন যেন সেই বুড়োরই কল্পজগতের কোনো এক অপরাজিতা নারী।