সুমাইয়া মতিয়াতুর
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১০:৫৯ এএম
ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
'লাখখানেক টাকা হলেই পুরো সাজিয়ে গুছিয়ে সেটআপ করা যাবে আম্মা বুঝলা?' নিশির প্রচ্ছন্ন আবদার শুনে যদি আম্মা বোঝে। আব্বাকে বলে কিছু টাকা ম্যানেজ করতে পারলে ব্যাংকে আর দৌড়াতে হয় না, কত লম্বা প্রসেস। 'তুই এইসব দোকান নিয়ে, হাতের কাজ নিয়ে বসে আছিস, এই জিনিস চলবে তো? সিদ্দিক বলছিল আজকাল মেয়েরা অহরহ এসবের দোকানই দিচ্ছে। কিছুদিন চলে, বিক্রি হয়, তারপর বন্ধ হয়ে যায়। মাঝখান থেকে সময় আর টাকা নষ্ট। শুধু খাটলে তো হয় না, দিন-দুনিয়া বুঝতে হয়।'
এসব কথা শুনে বিরক্ত লাগে নিশির। বলে, 'আম্মা, সিদ্দিক ভাই এসব কথা বলবেই। উনি নিজে কী এমন বোঝে ব্যবসার? উনি নিজে করেছে? আর আমি তো এগুলার উপর কোর্স করেছি।'
মামাতো ভাইয়ের নামে নালিশটা নিশির আম্মা অতটা ভালোভাবে নিলেন না মনে হয়। 'সিদ্দিক তো অনেক জায়গায় বিনিয়োগ করে, কত মানুষজনের সাথে উঠাবসা। আর তা ছাড়া, বয়সে বড় তোর, লোকজন চেনে। সবকিছু কি আর কোর্স করে হয়? তুই কীসব কামার-কুমার নিয়ে পড়ে আছিস। ফিনিশিং ভালো না ওদের, জিনিস বিক্রি না হলে তো তোরই টাকা, কষ্ট সব মাটি।'
কথা বাড়ায় না নিশি। বুঝে গেছে, সিদ্দিক ভাই এসব আম্মার মাথায় ঢুকিয়ে গেছে। কত আশা ছিল, আম্মা তার হয়ে বদরাগী আব্বাকে বোঝাবে, সে আশায় গুড়েবালি। কোথায় গেল সেই সিনেমার গল্পের আম্মারা যারা নিজেদের গায়ের গয়না দিয়ে হলেও ছেলে-মেয়ের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দেয়।
সিদ্দিকের ওপরই গিয়ে রাগ পড়ে নিশির। 'যত্তসব, ফালতু লোক একটা। সারা দিন ঘুরঘুর করে। আব্বা-আম্মা ক্যান যে উনাকে এত বিশ্বাস করে বুঝি না।' মনে মনে বলে আর গজগজ করতে থাকে। কথায় পটাবার যে স্কিলটা সিদ্দিকের আছে, নিশির সেটা নেই। তাই বাড়ির লোক নিশির ওপর ভরসা পায় না। অনেক চেষ্টা করেছে পাল্টাবার। লাভ হয়নি। প্রমাণ কাজের মাধ্যমেই দিতে হবে। তবে, পুঁজি বাড়ানো দরকার। রাতে খাবার টেবিলে তাই প্রচণ্ড দুঃসাহস নিয়ে আব্বাকে বলেই ফেলে যে লাখখানেক টাকা তার লাগবে দোকানটা একটু বড় করতে। টাকার অঙ্কটা খুব একটা বেশি নয়, এতটুকু দেবার ক্ষমতা তার বাবার আছে সে জানে।
'দোকান করার সময় কি আমার অনুমতি নিছো যে এখন টাকা চাও?' ঠান্ডা গলায় বলেন নিয়ামত জামান, নিশির আব্বা।
মুখ নিচু করে বসে থাকে নিশি। কথা চালিয়ে যান তিনি-'তার চেয়ে বরং ওসব ছেড়ে দাও, টাকা বাঁচবে, আর তোমার শরীরও। নিজের চেহারা পুড়ে পুড়ে কী হয়েছে, আয়নার দিকে তো তাকাও না মনে হয়। সময় যায়, আর তোমার আক্কেল কমে। এখন তো তাও দুয়েকটা প্রস্তাব আসে, কদিন পরে তাও আসবে না তোমার যে অবস্থা।'
চুপ করে যায় নিশি, আগে একটা সময় এসব শুনলে গলার কাছে খাবার আটকে আসত, এখন সয়ে গেছে। সকালে বাস তার। আবার তিন মাস পরে ফিরবে এখানে,
অযথা রাগারাগি বা কান্নাকাটি করে বিদায় নেবার মানে নেই। এমন তো না যে চেঁচামেচি করলে আব্বা রাগ করে হলেও ফান্ড দেবে। আর তা ছাড়া এ তাচ্ছিল্য কেবল মেয়ে হিসেবে পাওয়া নয়, সে বাড়ির ছেলে হলেও বাড়ির ছেলে হিসেবে একই উপহাস মিলত। চুপচাপ খেয়ে ঘুমোতে যায় নিশি।
পরদিন বাস ধরে চলে যায়। দিনরাত খাটাখাটা খাটাখাটনি, ব্যাংক লোনের জন্য দৌড়ানো- এসবের মাঝে টিমটিমে করে তার সাধের 'চিন্ময়' শৌখিন হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকানও চলতে থাকে। তিন মাস দেখতে দেখতে কোথা থেকে যায় টেরও পায় না সে।
'আজ রাতে বাস?' ব্যাংকের অফিসার এবং হিসেবে নিশির ভার্সিটির ইয়ারমেট আদিব প্রশ্ন করে। হেসে মাথা নাড়ে নিশি একটা ডকুমেন্ট যত্ন করে ব্যাগে রাখতে রাখতে।
'ভালোই তো। বাসায় গিয়ে সুখবর দিস। এখন ব্যবসা বেড়ে লালে লাল হবে।'
'হ্যাঁ, দোয়া করিস রে।'
নিশি ব্যাংক থেকে বের হয়, বুকটা দুরুদুরু, ব্যাগে থাকা কাগজটাই এখন সবচেয়ে দামি জীবনে, লোন পেয়ে গেছে সে। গায়ে কাঁটা দেয় তার, আসলেই পেল সে এটা!
কিছু টুকটাক কাজ বাকি এখনও, তা ছাড়া বাড়ির জন্য গুঁড়-দেওয়া তিলের খাঁজা কিনতে হবে, আর এখানের স্পেশাল কিশমিশ-বাদাম দেওয়া ঝুড়ি চানাচুর। 'বাবা সরভাজা খুব পছন্দ করেছিল গতবার, ওটা কয়েক কেজি নিতে হবে।' ভাবে সে।
রাতে একগাদা বোঁচকা নিয়ে বাসে ওঠে সে, ঘুম হয় না বলতে গেলে। ফজরের আগে বাড়ি পৌঁছলে অন্যবারের মতো মা-ই দরজা খুলে দেয়। একটু থমকে যায় ওখানেই নিশি। 'আম্মা কী হইছে? তোমার মুখ এমন লাগে ক্যান?'
'কিছু না। তুই যা ঘুমা গিয়ে। এই নাদিম তোর আপার ব্যাগগুলা ঠিকঠাকমতো আন।' ঘুমন্ত ছেলেকে গুঁতো মেরে তোলেন নিশির আম্মা। চোখ ডলতে ডলতে উঠে নাদিম ব্যাগ বোনের ঘরে রেখে আসে। তখনকার মতো কাপড় পাল্টে ঘুমায় নিশি। তবে দিনের বেলা বোঝে একটা অদ্ভুত জিনিস-আব্বা বা আম্মা কারও মুখেই তেমন একটা হাসি নেই। খাওয়াপাগল আকা এখন এত মেপে খায়, পাড়ার ভাবিদের সাথে গল্প করে বেড়ানো আম্মা মনমরা, চুপচাপ। জোর করে প্রেশার মেপে দেখে নিশি, কই ঠিকই তো আছে। সুগারও কন্ট্রোলে। একটু অপরাধবোধ হয় নিশির, বাড়ির বাইরে থেকে থেকে হয়তো বাড়ির মানুষের মনের খবর এ তিন মাসে অতটা রাখেনি সে।
'ঐ, আমি যখন ছিলাম না তখন কিছু হইছে?' থাকতে না পেরে একসময় খাটে শুয়ে হেডফোনে গান শুনতে থাকা নাদিমের মাথায় একটা চাপড় দিয়ে বলে সে।
'হয় নাই আবার।' নাদিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটু সরে বোনকে বসতে দেয়।
'কী হইছে?'
'কী আবার। ওই সিদ্দিক ভাই।'
'কী করছে উনি?'
'দারুণ' বলে একটা অনলাইন ব্যবসা আসলো না? ২৫ হাজার টাকায় বাইক দেবে তিন মাস আগে অ্যাডভান্স করলে, ১ লাখ টাকায় গাড়ি ৫ মাস আগে। প্রতি শনিবার সবকিছুতে ৫০% ছাড় যদি ৪ মাস আগে টাকা জমা রাখে। তো সিদ্দিক ভাই সেখানে ইনভেস্টমেন্ট করছে ২৫ লাখ টাকা এটা-সেটা মিলায়। তারপর দেখা গেল পুরা ব্যবসাটাই ভুয়া, উনি পুরাটাই ধরা খাইছে এখন।'
'তো উনি ধরা খাইলে খাইছে।' বোঝে না নিশি, 'ওই লোকটা তো এমনিতেও কথা বেশি, কাজ কম, নজরও ভালো না। এত ফুটানি মারে যে উনি এই বোঝে, সেই বোঝে, ব্যবসার লাইন মেয়েদের না হেনতেন। এই রকম একটা শিক্ষা পাওয়া উনার দরকার ছিল। এতে আব্বা-আম্মা এমন মুখ ব্যাজার করে আছে ক্যানো?"
'কারণ উনি ইনভেস্ট করছে আসলে ১০ লাখ আর উনার কথায় বিশ্বাস করে আব্বা-আম্মাও উনার মাধ্যমে ঢালছে আরও ১৫ লাখ। এখন তো টাকা ফিরত চাইতে পারতেছে না। চাইলেও কত আগডুম বাগডুম দেখায় সিদ্দিক ভাই।'
নিশি থ মেরে যায়। একটু পর হঠাৎ করে হা হা করে হেসে ওঠে সে।
'আপা তুমি হাসতাছো ক্যান? কতগুলান টাকা গেল।' অবাক হয়ে বলে নাদিম।
'কিছু না রে এমনি। দুঃখে হাসতেছি।' গম্ভীর হয়ে যায় নিশি। তার ভিতরে এখনও কোকের বোতলের ফেনার মতন ভুড়ভুড়িয়ে হাসি জমছে। জানে হাসা উচিত নয়, তাদের পরিবারেরই লস হয়েছে, তবুও ভিতরে কোথায় যেন একটা শান্তি লাগছে।
একেবারে কড়ায়-গণ্ডায় মিলেছে, হিসাব এখন বরাবর।