× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মায়ায় বাঁধা টুকরো জীবন

শফিক হাসান

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৭ এএম

চিত্রকর্ম: সান্দ্রো দে পান্তে

চিত্রকর্ম: সান্দ্রো দে পান্তে

কিছু কিছু ফুল আছে, শুকিয়ে গেলেও সুরভিটুকু থেকে যায়। বই তো একধরনের ফুলই, কাগজের ফুল। এই ফুলের কোনোটা তীব্র সুগন্ধ ছড়ায়, কোনোটা মৃদু; আবার কোনোটার গন্ধ-বর্ণ কিছুই নেই! একটি ফুলের ফ্যাকাসে পৃষ্ঠা ভেদ করে এখনো ম ম গন্ধে মদির করে রাখে, তার নাম পথের পাঁচালী। লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই শৈশবে পড়া বই, অথচ এখনও যেন চোখের সামনে ভাসছে নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম। অনুন্নত অনগ্রসর একটি জনপদের ছবি।

অপু ও দুর্গা দুই ভাই-বোনের বাবা হরিহর রায়; তাদের মা সর্বংসহা বাঙালি নারী সর্ব্বজয়া। দুঃখ-দারিদ্র্য মোকাবিলা করেই অবোধ দুটি কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে বসবাস করে সর্ব্বজয়া। হরিহর রায় অর্থোপার্জনের জন্য বাড়ির বাইরেই থাকে বেশি, নিশ্চিন্দিপুরে তাকে একপ্রকার দেখা যায় না বললেই চলে। এই পাঁচালীতে আরও আছেন একজন বিধবা বৃদ্ধা- ইন্দির ঠাকরুণ। সর্ব্বজয়ার কটুকথা শুনেও তিনি সংসারে পড়ে আছেন। যাওয়ার জায়গা কোথাও নেই। তাই তো 'নতুন বউ'য়ের সঙ্গে মিছেমিছি রাগ দেখিয়ে গাঁটরি-বোঁচকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন 'বিদায়' বলে। কিন্তু সন্ধ্যার আগে আবার হাজির হন পুরনো ডেরায়। অসহায় মানুষের গন্তব্য কখনও বহুদূর বিস্তৃত হয় না। কিন্তু সব গন্তব্য কিংবা অগন্তব্য একদিন মৃত্যুতে শেষ হয়। ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যু এই উপন্যাসে শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এই রেশ কাটতে না কাটতে আরও বড় ক্ষত নিয়ে আসে দুর্গার মৃত্যু। এই দুর্গা আবার ভীষণ ন্যাওটা ছিল ইন্দির ঠাকরুণের। 'পিতিমা'র কাছ থেকে রূপকথার গল্প ও ছড়া-শ্লোক শুনতে পছন্দ করত। কিশোরী দুর্গার মৃত্যু অশ্রুসজল করে তুলেছিল বারবার। বিশেষ করে বিয়েবাড়ির আসর থেকে সে যখন পুঁতির মালা 'চুরি' করে আনে- সেই ঘটনা-সূত্র আরও বেদনার।

গ্রামে কারও বাড়ির বিয়ে মানে পুরো তল্লাটে খবর হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে কমবয়সী ছেলে-মেয়েদের জন্য এটা বিরাট আনন্দের উপলক্ষ। এমন একটি বিয়েবাড়িতে দুর্গা যায়, সেখানে সে পুঁতির মালা চোর হিসেবে সাব্যস্তও হয়। অবস্থাপন্ন গৃহস্থবাড়ির লোকজন মালাটি ফেরত চায়, না পেয়ে বেদম প্রহার করে দুর্গাকে। এখানটায় এসে পাঠক হিসেবে মন আর্দ্র হয়ে ওঠে। আজ গরিব বলে নিষ্পাপ একটি মেয়েকে অন্যায়ভাবে মারধর করা হচ্ছে। এটা যেন রবীন্দ্র-পঙ্ক্তির বাস্তব রূপ- যা কিছু হারায় গিন্নি বলে কেষ্টা ব্যাটাই চোর! উপন্যাসের শেষপ্রান্তে গিয়ে জেনে যাই, দুর্গাই চুরি করেছিল। তখন বিষম ওঠে বৈকি। একই সঙ্গে মমতার আর্দ্রতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

বাঙালি পরিবারগুলো পুরুষতান্ত্রিক হওয়ায় ব্যাটা-ছেলের ওপর দিয়েই সব ঝড়-ঝাপ্টা যায়। কড়ি উপার্জনে তাদের অপারগতায় দুর্ভোগ নেমে আসে পুরো পরিবারের ওপরই। অপু-দুর্গার বাবা হরিহর রায় বলতে গেলে আজব মানুষই। বিদ্যা-শিক্ষার আরাধনা করে, বড় বড় পুঁথি রচে, শেষপর্যন্ত লক্ষ্মী বা সরস্বতী কেউই তার সঙ্গে থাকে না। রোজগারের ধান্ধায় বের হলে সহজে বাড়ি ফেরে না। অবশ্য ফেরার পথ থাকে কি! কী নিয়ে দাঁড়াবে সংসার নামক রাক্ষসের সামনে! এই আজদাহার ক্ষুধা যে মেটানো যায় না।

দুর্গা মারা যায় আর প্রলয়ঙ্করী লন্ডভন্ড ঝড়ে ভেঙে যায় হরিহরের ঘর-দুয়ার। শেষ পর্যন্ত গ্রামত্যাগের সিদ্ধান্তই নিতে হয়। ফেরার আগ-মুহূর্তে অপু খুঁজে পায় পুঁতির মালাটি। দিদির লজ্জা ও অপমানের চিহ্নটুকু রাখবে না বলে সে মালাটি পুকুরে ছুড়ে মারে। প্রত্যেক কিশোরীর মনেই অবচেতনে লুকিয়ে থাকে ঘর বাঁধার স্বপ্ন। তাই তো অংকন খাতায় তারা ঠিকই রঙবেরঙের ছবি আঁকে, পরিপাটি করে তোলে। আর সাজিয়ে তুলতে চায় নিজেকে। দুর্গাও নিজেকে সাজাতে চেয়েছিল একটু পরিপাটিরূপে। 'চোর' দুর্গার পরিচয় উন্মোচিত হওয়ার পর তার প্রতি বিতৃষ্ণা আসে না একটুও, বরং মায়াটা আরও তীব্র হয়। আহারে মেয়েটা, গলায় মালাটা পরার আগেই চলে গেল।

ইন্দির ঠাকরুণ ও দুর্গা দুজনের মৃত্যুই কি পথের পাঁচালীকে আরও ঔজ্জ্বল্য দান করল! গভীর একটা আঁচড় সৃষ্টি করল দুই মৃত্যু। শেষে হরিহর রায়ও মারা যায়, সেটা মামুলি সহানুভূতি ছাড়া বিশেষ কোনো অনুভূতি জাগ্রত করে না। অন্যদিকে দুর্গার প্রতি ভালোবাসা যেন আরও বেড়ে ওঠে- প্রজ্বলিত আগুনের মতো। তীব্র একটা হাহাকার সৃষ্টি হয় মনে। দুর্গা ছিল স্নেহশীলা দিদি। অপু বনে বনে ঘুরত, বিড়বিড় করে কী সব বলত, তা দেখে দুর্গা নিবিড় মমত্ববোধ করে ভাইটির প্রতি। মনে হতো তার, এই বিশ্বচরাচরে ভাইটি একা, অসহায়।

ভাইয়ের জন্মমুহূর্তে কী নাকানি-চুবানিটাই না খেতে হয়েছিল দুর্গাকে। অবশ্য তার অজ্ঞাতে! নবজাতক অপু যখন কাঁদে, দুর্গা পেয়েছিল বেড়ালের ডাক। ওর মনে হয়েছিল, বুঝি বেড়ালই ডাকছে! সন্ধ্যার সময় রেখে আসা বেড়ালছানাগুলোকে দেখেও আসে সে। সব ঠিক আছে। আদতে মানবশিশু আর বেড়ালশিশুর ডাকে তো বড় কোনো পার্থক্য নেই। পরদিন সে দেখতে পায় অপুকে, এই সুযোগে মিছেমিছি রাগ দেখিয়ে চলে যাওয়ার ইন্দির ঠাকরুণও আবার বাড়িতে প্রবেশাধিকার পেলেন। তার 'ট্রেডমার্ক' ঘটী ও পুঁটুলি ফিরে আসে যথাস্থানে। হিংসুটে সর্ব্বজয়ার কটুকথায় প্রায়ই তাকে মিছেমিছি বিদায় নিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার নাটকটা মঞ্চস্থ করতে হতো। ছোট্ট অপুও মায়ের সঙ্গে এমন লুকোচুরি খেলে। মায়ের চোখকে ফাঁকি দিতে অপু যখন লুকানোর চেষ্টা করে, সর্ব্বজয়া দেখেও না দেখার ভান করে বলে- কোথায় গেল, এই এখানেই তো ছিল! না দেখার ছলে মা সর্ব্বজয়া এভাবেই জিতিয়ে দেয় অপুকে। ঠকিয়ে দেওয়ার আনন্দ পায় অপু।

প্রায় সব গ্রামেই মিলেমিশে থাকে প্রকৃতি ও প্রকৃতির নির্যাস। নিশ্চিন্দিপুরে লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অপু-দুর্গার নবীন চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন প্রকৃতির অসামান্য রূপের নিবিড় বর্ণনা। বৈচি ফুল ও ফল যারা কখনও দেখেনি, তারাও যেন লহমায় চিনে নেয় লেখকের জাদুকরী বর্ণনাগুণে। নিশ্চিন্দিপুর অনুন্নত গ্রামজীবনের প্রতিনিধিই শুধু নয়, প্রতিটি গহন গ্রামই হয়ে ওঠে একেকটি নিশ্চিন্দিপুর। পাঠক হিসেবে নিজের গ্রামকে কল্পনায় নিয়ে আসি, তবে আমার গ্রাম যেন এটার মতো এতটা বর্ণাঢ্য ও ধনাঢ্য নয়, এতটা বৈচিত্র্যপূর্ণও নয়- বুঝে ফেলতে পারি সহজেই। সবচেয়ে বড় যে অভাব- এমন এমন চমৎকার দুটি শিশুকে তো নিজ গ্রামে কল্পনায় বসাতে পারি না। এভাবেই মানসপটে অপু-দুর্গা হয়ে ওঠে অদ্বিতীয়-অদ্বিতীয়া।

হিংসা, ঘৃণা, পারস্পরিক রেষারেষি পেরিয়ে একটি মহৎ উপন্যাস মূলত দেখাতে যায় শেষ পর্যন্ত যে ভালোবাসাটুকু রয়ে যায়, সেটাই। এমনই একটি ভালোবাসাময় চরিত্র এই উপন্যাসের আতুরী বুড়ি। বুড়ির ইহজনমে কেউ নেই। জঙ্গলের একধারে ডেরা বেঁধে থাকে একাই। চেয়ে-চিন্তে খায় কিংবা না খেয়েই থাকে নিঃসঙ্গ যাপনে। তাকে নিয়ে কিছু গল্প প্রচলিত আছে নিশ্চিন্দিপুরে। আতুরী বুড়ি যার দিকে তাকায়, তার শরীরের সব রক্ত শুষে নেয়। একদিন তার মুখোমুখি পড়ে যায় অপু। প্রচলিত কথা মনে হলে ভয় পায় অপু, সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচে। অন্যদিকে আতুরী বুড়ি তড়পায়, স্নেহধারা বিলাতে না পারায়। কাদের বাড়ির ছেলে সে, এমন নির্দোষ আলাপটুকুই তো করতে চেয়েছিল বুড়িমা।

কাশবন পেরিয়ে একদিন রেলগাড়ি দেখতে বেরোয় দুই ভাই-বোনে মিলে। উপন্যাসের নির্বাচিত অংশ 'মাঠের পারের দূরের দেশ' নামে পড়েছিলাম কোনো এক পাঠ্যবইয়ে। অপু-দুর্গার সঙ্গে পাঠক হিসেবে আমিও যেন রেলগাড়ির দেখা পেয়েছিলাম। নানাবাড়ি নোয়াখালীর নরোত্তম গ্রামের মাঝ বরাবর রেলগাড়ি চলত। চলন্ত গাড়ি দেখে তো আশ মেটে না। গাড়ি থামলে কাছ থেকে দেখা যেত। দূর থেকে ট্রেন আসতে দেখলে পাশ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে রেললাইনের স্লিপারের ওপর পাথর রেখে দিতাম। যাতে পাথরের ধাক্কায় গাড়িটা পড়ে যায়! না, গাড়ি পড়েনি কখনোই, বরাবরই হতাশ করেছে। যদি সত্যিই কখনও গাড়িটা হেলে পড়ত স্লিপারের বাইরে, কী ভয়াবহ দৃশ্য হতো ভেবে এখন শিউরে উঠি।

আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে যেত কত আইসক্রিসওয়ালা, কটকটি বিক্রেতা, মুড়ির মোয়া বাহক। পয়সার অভাবে কিনতে পারতাম না। একটা চকলেট পাওয়া যেত ২৫ পয়সায়, সেটাও বহুদূরের পথ। অপু-দুর্গার সামনে থেকেও যখন ফেরিওয়ালারা ফিরে যায়, ওদের কাছে পয়সা নেই যে লোভনীয় খাদ্যদ্রব্যগুলো কিনবে! নিজের শৈশবটাই উঠে আসে চোখের সামনে, এক লহমায়। অপু-দুর্গার যাত্রাপালা দেখা ও বায়োস্কোপ দেখার আনন্দও নিজের ভেতরে অনুভব করেছি। অপু যেন নিজেরই ভিন্ন একটা সত্তা। ভুল করে সে অন্য পরিবারে জন্মেছে, কিংবা আমি।

আমাদের জ্বালানির অভাব ছিল। মাটির চুলায় রান্না করতে লাকড়ি লাগে। অন্য কারও গাছের ডাল ভেঙে পড়লে টুকিয়ে আনতাম। কখনও-বা বৈদ্যবাড়িতে গিয়ে ঝাড়ু দিয়ে লাই ভরে আনতাম বাঁশপাতা। আড়ালে যে বিধবা জেঠিকে 'রাঢ়ী' বলত বাড়ির লোকজন, সেই 'রাঢ়ী'র গাছ থেকে পাতা তাল পড়লে একছুটে নিয়ে আসতাম ঘরে। তিনি নিজের ঘরে বসে শাপ-শাপান্ত করতেন। সেই স্বর পৌঁছে যেত আরও অনেকের কানে। এভাবে প্রতিবেশীদের আমগাছে, বরইগাছে কত ঢিল ছুড়েছি আর বকা খেয়েছি!

ঝড়ে প্রতিবেশীর গাছ থেকে ঝুনা নারকেল ঝরে পড়লে অপু-দুর্গাও নিয়ে আসবে নিজেদের বাড়িতে এটাই তো স্বাভাবিক। নারকেলটা দেখে সর্ব্বজয়া খুশি হবে এটা আরও স্বাভাবিক! চুরি করা নারকেল দেখে সর্ব্বজয়া ছেলে-মেয়েকে তিরস্কার করে না। কিন্তু প্রতিবেশীর বকাবাদ্যির চোটে ছেলে-মেয়ের অমঙ্গল আশঙ্কায় একসময় ফেরতও দিয়ে আসতে বলে। এভাবেই বাঙালি মায়েরা সবদিকের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে, চুলচেরা হিসাব-নিকাশে হয়ে ওঠে 'সর্ব্বজয়া'।

অপু কোথায় যেন বেড়াতে যায়। লাবণ্য ঢলঢল অপুকে দেখে তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়া গর্ববোধ করে। অন্যদের দেখিয়ে যেন বোঝাতে চায়- দেখ, কেমন বংশের মেয়ে আমি! অপুকে নিয়ে চাপা গর্ববোধ করা সঙ্গত। আমাদের প্রায় সবার চোখই তো নক্ষত্রের দিকে। যদিও পড়ে থাকতে হয় ধূলির ধরায়। যখন আমরা বড় হই, 'সুন্দর' হই- গর্ব করার লোকের অভাব হয় না।

অন্যদিকে সংসার যদি হতশ্রী, হরিহর-সর্ব্বজয়ার ঝড়কবলিত কাদা-পানিতে লেপ্টে থাকা মতো নিকটাত্মীয়রাও পরিচয়টুকু স্বীকার করতে চায় না। এমন করেই তো চলছে জগৎ-সংসার। মানবমনের নিগূঢ় অন্ধিসন্ধি কোন জাদুমন্ত্রে আবিষ্কার করে ফেলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমীকরণ মেলাতে পারি না সহজে।

অপুই কি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়? এমন একটি সন্দেহ চালু রেখেছেন সমালোচক ও ভূমিকা লেখকরা। হতেও পারে, লেখক কম বা বেশি তার রচনায় মিশে থাকেন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যেভাবেই হোক না কেন। শৈশবে যে পেপারব্যাক পথের পাঁচালী পড়েছিলাম সেটার ভূমিকা লেখক জোরগলায় এমন কথাই বলেছেন। তবে দীর্ঘ ভূমিকায় বিশেষ প্রসঙ্গ অবতারণ করতে গিয়ে তিনি 'অমুক পৃষ্ঠা দেখ, তমুক পরিচ্ছদ দেখ' এমন পণ্ডিতিমার্কা আচরণ ভালো লাগেনি। নিজেকে যে কেউ পণ্ডিত ভাবতেই পারেন, তাই বলে অন্যকে খেলো মনে করাটা বোকামির নামান্তর।

অপু-দুর্গা ও সর্ব্বজয়াকে নিয়ে হরিহর রায়ের সংসার। এই হবে সেই হবে, পুঁথি-কাব্য লিখে নাম হবে, তারপর টাকার অভাব থাকবে না- কত স্বপ্ন তার। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না। এমনকি ভিটাটুকু আঁকড়েও থাকতে সমর্থ হয় না তারা। কাশিতে পাড়ি জমায় সপরিবারে। সেখানে জ্বরে হরিহরের মৃত্যু হয়। সর্ব্বজয়া নেয় বাসা-বাড়িতে চাকরানির চাকরি। নিশ্চিন্দিপুরকে পেছনে ফেলে তারা নতুন কোথাও ডেরা বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল। একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য কত সংগ্রামই না করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা পায় কি সুখের সন্ধান- পাঠকমনে প্রশ্নটা জাগরূক হয়ে হাহাকার তোলে। আবার কি ফিরে আসতে হবে নিজের ডেরায়, সহৃদয় ও নির্দয় নিশ্চিন্দিপুরের জল-হাওয়ার জীবনে! যে গ্রামে কাশফুল ফোটে, রোদ হয়, বৃষ্টি ঝরে। মানুষের সঙ্গে মানুষের শত্রুতা-মিত্রতা দুটোই চলমান থাকে।

গ্রামাঞ্চল যত লাঞ্ছনা-বঞ্চনাই দিক, বাঙালি জীবনের শেষ আশ্রয় এটাই। এ ছাড়া সে কোথাও শান্তি পায় না, স্বস্তি মেলে না। পোলাও-কোরমা খাওয়ার সুখ আর ক'দিন থাকে মনে!

পথের পাঁচালীতে ইন্দির ঠাকরুণের অংশের নাম ছিল বল্লালী বালাই, আর অপুর অংশের নাম আম আঁটির ভেঁপু। আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, কাঁচা আমের আঁটি দিয়ে ভেঁপু প্রায় সবাই বাজিয়েছি। বিশেষ কায়দায় বাজানো হতো এই ভেঁপু। নারকেলের কাঁচা পাতা ও এর মধ্যকার শলাকা দিয়ে চশমা বানিয়ে পরতাম আমরা। এই 'সংস্কৃতি' বহুদূর পৌঁছে গেছে দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত চলচ্চিত্র 'চন্দ্রকথা'য় নায়িকা মেহের আফরোজ শাওনকে ঠিক এমন একটি চশমা পরিয়ে ছেড়েছেন! নারকেলের পাতার চশমা এখন আর কাউকে পরতে দেখি না। এখনকার ছেলে-মেয়েরা না চাইতেই পেয়ে গেছে সত্যিকারের চশমা। নানা অর্থেই রঙিন চশমাও। সেই আনন্দ কি আর পাবে কেউ, জিহ্বায় অনুভব করতে পারবে হাওয়াই মিঠাইয়ের স্বর্গীয় স্বাদ! মজাটা প্রকৃতপক্ষে কেমন।

চিঠিতে ভালো-মন্দ খবর মিলত অতীতে। পথের পাঁচালীতেও ছিল চিঠি ও মনিঅর্ডার প্রসঙ্গ। এগুলো ধীরে ধীরে জাদুঘরের অংশ হয়ে গেলে আমাদের আরও বেশি করে ফিরে আসতে হবে প্রায় শতবর্ষী এই উপন্যাসের কাছে। পথের পাঁচালী নানা কারণেই উল্লেখযোগ্য। ত্রয়ী (ট্রিলজি) এই উপন্যাসের পরের দুটি হচ্ছে- অপরাজিত, কাজল (অপুর সংসার)। কাজল লিখেছিলেন লেখকের পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। জানা যায়, তার আগেই উপন্যাসের খসড়া ছক এঁকে রেখেছিলেন লেখক। সাহিত্য-ইতিহাসে এটাও বোধকরি ব্যতিক্রমী ঘটনা। আবার এই তিন উপন্যাস থেকে তিন তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন কিংবদন্তিতুল্য সত্যজিৎ রায়। এটাও নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রটি দেশে-বিদেশে প্রচুর প্রশংসিত হয়। আবার চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা নিয়েই সত্যজিৎ রায় লিখে ফেলেছিলেন আস্ত একটি বই- 'অপুর পাঁচালী'। এমন দৃষ্টান্ত বোধকরি বেশি পাওয়া যাবে না। পথের পাঁচালীসহ অন্য দুই উপন্যাসে অপু যতটা না 'দাপিয়ে' বেড়িয়েছে, তার চেয়ে বেশি স্পন্দন উঠেছে পাঠক হিসেবে আমার মনে। পথের পাঁচালী যেন নিজেরই জীবনভিত্তিক উপন্যাস, ধীরে ধীরে আমার হৃদভাষ্য হয়ে উঠেছে। তেমনই বোধকরি প্রত্যেক বাঙালি পুরুষের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একজন অপু। যে অপু ঠকতে ঠকতে ঠকে যায়, সুদিনের স্বপ্ন দেখতে দেখতে মরে যায়, জীবনের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারে না। তেমনি আমরাও যুদ্ধ করতে করতে শরবিদ্ধ হই আর স্বপ্ন দেখি- একদিন এটা হবে, ওটা আসবে। নাম হবে, বংশমর্যাদার শানশওকত আসবে, অর্থকড়ি ঝনঝন করবে, ভাঁড়ারে অভাব থাকবে না আর। শেষ পর্যন্ত আসে না কিছুই। হতাশাগুলো বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে শনশন শব্দ হয়। ইথারে ইথারে বাজে নীরব ক্রন্দনধ্বনি।

হরিহর রায় তবু সাহসী মানুষ ছিল, নিজের ভিটাটুকু ছেড়ে যাওয়ার বুদ্ধিটুকু ছিল ঘটে। । আমরা অনেকেই তো কুয়ার ব্যাঙ, কুয়াকে পৃথিবী ভেবে কাটিয়ে দিচ্ছি সাধের মানবজীবন। আদতেই কি এটা মানবজীবন! নাকি আরেকটা ভুল পরিচয় বয়ে বেড়াচ্ছি লাখো মানুষ। ন্যাতানো এই জীবন-পাঁচালী সব সময় রয়ে যাবে অপরিবর্তিত-অবিকল!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা