গল্প
মাহবুব ময়ূখ রিশাদ
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৩ পিএম
শহরে এখন রাশেদ আরিফ নামটি কেউ উচ্চারণ করে না। কাগজে-কলমে সে রাশেদ করিম। নথিতে বদলে যাওয়া একটি নামÑ যেন মানুষটিকে নয়, তার অস্তিত্বকেই সম্পাদনা করা হয়েছে।
মৃতদেহটি রেললাইনের পাশে পাওয়া গিয়েছিল। মুখে তেমন আঘাত নেই, শরীরে রক্ত নেই। শুধু চোখ দুটো খোলাÑ অস্বাভাবিকভাবে খোলা। হাতে তার প্রিয় ঘড়িটাও নেই। শেষ মুহূর্তে সে কি এমন কিছু দেখেছিল, যা তার দেখার কথা ছিল না?
পুলিশ বলেছে দুর্ঘটনা। রিপোর্টে লেখাÑ সম্ভাব্য আত্মহত্যা। শহর বলেছে, ভালো ছেলে ছিল।
শুধু নীলা জানে, এ মৃত্যু সাধারণ নয়।
রাশেদের বদল শুরু হয়েছিল প্রায় ছয় মাস আগে। আগে সে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই নীলাকে দিনের গল্প বলত। অফিসের সহকর্মীদের নিয়ে হাসাহাসি করত। ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখত।
কিন্তু হঠাৎ করেই সে চুপচাপ হয়ে যায়।
এক রাতে সে বলেছিল, তুমি কি খেয়াল করেছ, সামনের বিল্ডিংটার জানালার আলো প্রতি রাতে একই সময়ে নিভে যায়? এক সেকেন্ডও এদিক-সেদিক হয় না।
নীলা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।
আরেকদিন বলেছিল, আমাদের গলির কুকুরগুলো বদলে গেছে। আগেরগুলো নেই।
মরেছে হয়তো, নীলা বলেছিল।
রাশেদ মাথা নাড়েনি। শুধু বলেছিল, মরা আর বদলে যাওয়া এক জিনিস না।
দুই
দাফনের তৃতীয় রাতে ঘড়িটি ফিরে আসে। কোনো শব্দ নেই, তবু কাঁটা ঘোরে। ঠিক রাত ১২টায় থেমে যায়। ঘড়িটা দেখে নীলার মনে আশা ফিরে আসে। তার মনে হতো শুরু করে রাশেদ হয়তো ফিরে আসবে, ঘড়িটা যেমন করে ফিরে এসেছে, সেভাবে। সে ঘড়িটা হাতে নেয়, বুকে নেয়, পাশে নিয়ে ঘুমায়।
সেই রাতেই নীলা প্রথম স্বপ্ন দেখেÑ রেললাইন সোজা নয়, বাঁক নিয়ে ঢুকে গেছে আরেক শহরে। সেখানে মানুষদের মুখে সাদা মুখোশ। তাদের পা মাটিতে ছোঁয় না।
রাশেদ দাঁড়িয়ে আছে লাইনের ওপর। মুখোশধারীরা বলছে, তুমি কেন দেখলে?
রাশেদ শান্তভাবে বলছে, কারণ আমার চোখ ছিল।
স্বপ্ন ভাঙার আগে নীলা দেখতে পায়, একজন মুখোশ খুলছে। ভেতরে কোনো মুখ নেই। শুধু অন্ধকার।
তিন
নীলা একটা নোটবুক খুঁজে পায়। নোটবুকটি আলমারির গোপন তাকে ছিল। তালা ভাঙা নয়, কিন্তু নীলা জানে, এটি আগে সেখানে ছিল না। পাতায় পাতায় আঁকিবুঁকি। ল্যাম্পপোস্টের ছায়া উল্টো দিকে। দেয়ালের ভেতর দিয়ে হাঁটা মানুষ। চোখহীন মুখ।
একটি মানচিত্র শহরের। কিন্তু কিছু জায়গা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত। রেললাইন। পুরনো বটগাছ। তাদের বাড়ির ছাদ।
আরেকটি বাক্য বারবার লেখাÑ বদল শুরু হয় আলো থেকে।
নীলা সেই রাতে ছাদে ওঠে। বারোটা বাজতেই শহরের আলো হালকা নীল হয়ে যায়। খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন, চোখে না পড়ার মতো। কিন্তু একবার খেয়াল করলে আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
নীলা দেখে, সামনের বিল্ডিংয়ের জানালায় একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়া নেই।
লোকটি ধীরে ধীরে জানালার কাচ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যায়।
পরদিন থানায় গিয়ে নীলা এই নতুন তথ্যগুলো দিতে চায়। তবে বলার আর সুযোগ পায় না। তদন্ত কর্মকর্তা আগে থেকেই বিরক্ত।
মিসেস রাশেদ করিম, আপনি বিশ্রাম নিন। আপনার স্বামী ডিপ্রেশনে ছিলেন কি?
নীলা থমকে যায়। কড়া স্বরে উত্তর দেয়। বলে, না।
রিপোর্টে আছে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন।
নীলা কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, কে বলেছে? মানসিক চাপে থাকলে আগে তো আমার জানার কথা।
অফিসার ফাইল উল্টায়। বলে, সহকর্মীরা।
নীলার মনে পড়েÑ রাশেদ বলেছিল, অফিসের কয়েকজন আচমকা বদলে গেছে। একই মানুষ, কিন্তু আচরণ আলাদা।
তাহলে কি অফিসের কেউ জড়িত? নীলা পুলিশ অফিসারকে কথাটা বলতে চায়। বলে না। জানে, বলেও লাভ হবে না। এই যুদ্ধ তার একার।
রাত বারোটায় নীলা ইচ্ছে করে রাস্তায় নামে। ল্যাম্পপোস্টের আলো এবার স্পষ্ট নীল। মানুষ হাঁটছে, কিন্তু তাদের ছায়া নেই। একটি শিশু রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার মুখ মসৃণ, চোখ, নাক, মুখ কিছুই নেই।
নীলার পা কাঁপে।
হঠাৎ একজন তার সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখ আছে, কিন্তু মণি নেই।
তোমার স্বামী নিয়ম ভেঙেছিল।
ভীতি সামলে নীলা উত্তর দেয়, কোন নিয়ম?
শহর বদলাবে। মানুষ বদলাবে। কিন্তু কেউ দেখবে না।
আর যদি দেখে?
লোকটি মৃদু হাসে। বলে, তাহলে সে থাকবে না।
যারা দেখে ফেলে এমন মানুষদের তোমরা কোথায় নিয়ে যাও?
উত্তর আসেÑ তারা থাকে। শুধু অন্যরকম হয়ে।
তার মানে, আমার রাশেদও আছে? কোথায়? আমাকে নিয়ে চলো তার কাছে, নীলার কণ্ঠে কাতরতা ঝরে পড়ে।
লোকটির মুখ ধীরে ধীরে গলে যায়। সাদা মুখোশ ফুটে ওঠে।
নীলা হঠাৎ বুঝতে পারে, রাশেদের মৃত্যুর দিন রাত বারোটার পর সে নিজেও একবার জেগেছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শহরটা অন্যরকম লেগেছিল।
চার
দিনে সব স্বাভাবিক।
কিন্তু এখন নীলা খেয়াল করে, মুদির দোকানের বৃদ্ধের কণ্ঠ আগের মতো নেই। পাশের ফ্ল্যাটের আন্টির হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে। একই মানুষ, কিন্তু সূক্ষ্ম অমিল। সে আয়নায় নিজের দিকে তাকায়। এক মুহূর্তের জন্য তার ছায়া দেরিতে নড়ে। তার বুক ধক করে ওঠে। নীলা আবার রেললাইনের কাছে যায়।
রেললাইনের পাশে গিয়ে মাটিতে হাত রাখে নীলা। কম্পন। কোনো ট্রেন নেই।
মাটির নিচ থেকে ভেসে আসে রাশেদের কণ্ঠ, ওরা পুরো শহর বদলে ফেলছে। অদৃশ্যভাবে। যারা টের পায়, তাদের সরিয়ে দেয়। কিন্তু সরিয়ে ফেলা মানে শেষ করে দেওয়া নয়।
তাহলে?
তাদের জায়গায় আরেকজন বসে।
তুমি কোথায়?
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপরÑ তুমি কি নিশ্চিত, আমি আর আগের আমি আছি?
লাইন হঠাৎ জোরে কেঁপে ওঠে। নীলা হাত সরিয়ে নেয়। বাড়ি ফিরে আসে। আবার যায়। আবার ফিরে আসে। এভাবে কেটে যায় একটা বছর। একটা বছর পর নিউজ দেখে চমকে ওঠে নীলা। এক বছর পর শহরে আরেকজন নিখোঁজ হয়। নাম ইমরান। রিপোর্টে লেখা ইমরান করিম। নীলা বুঝতে পারে করিম হলো চিহ্ন। যারা দেখে, তাদের নাম বদলে যায়। ঘড়িতে তখন সাড়ে এগারোটা। যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থায় বের হয়ে নীলা রেললাইনের কাছে যায়। রাত বারোটায় রেললাইনের পাশে একদল মুখোশধারী দাঁড়িয়ে।
পাশের মাঠে একটি নতুন কবর। ফলকে এখনও নাম খোদাই হয়নি।
একজন মুখোশ খুলে ফেলে।
ভেতরে যে মুখ, তা রাশেদের নয়। ইমরানেরও নয়।
তা নীলার নিজের মুখ। কিন্তু আয়নায় দেখা মুখের চেয়ে সামান্য ভিন্ন। ঠান্ডা। শূন্য।
মুখোশধারীরা একসঙ্গে বলে, তুমি অনেক দূর দেখে ফেলেছো।
নীলা পিছিয়ে যায়।
হঠাৎ তার মনে হয়, রাশেদের সঙ্গে কাটানো কিছু স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রথম দেখা… বিয়ের দিন… কিছুই পরিষ্কার না। তার ঘড়ির কাঁটা থেমে যায়। ল্যাম্পপোস্টের আলো নীল থেকে সাদা হয়ে ওঠে। একজন তার কানে ফিসফিস করেÑ এখন তোমার পালা বদলানোর।
নীলা চিৎকার করতে চায়। কিন্তু তার কণ্ঠ বের হয় না। সে বুঝতে পারে, প্রথমে কণ্ঠ অদৃশ্য হয়। তারপর ছায়া। তারপর নাম। দূরে কোথাও নতুন একজন নারী জেগে উঠছে, তার বালিশের পাশে একটি ঘড়ি।
ঘড়ির কাঁটা ঠিক বারোটায় এসে থেমে থাকে।
আর শহরের ভেতর অদৃশ্য কণ্ঠ বলে ওঠে, সে দেখেছিল।