সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫২ পিএম
তিনটি সাহিত্যিক রচনা পাঠের অভিজ্ঞতা আমার বিশেষভাবে স্মরণে আছে; শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’; রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘ছুটি’; বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’। আমাদের কৈশোরকালে শরৎচন্দ্র ছিলেন অসাধারণ জনপ্রিয়। শরৎচন্দ্রের বই তো সর্বত্রই পাওয়া যেত। ‘রামের সুমতি’ পড়ে কিশোর-কিশোরীদের চোখ সজল হয়ে ওঠেনি এমন ঘটনা বিরল; আমার বেলাতেও অন্যথা ঘটেনি। রামের মা নেই, বাবা নেই, আছেন শুধু বৌদি, যিনি তাকে নিজের সন্তানের চেয়ে কম নয়, অধিক পরিমাণেই ভালোবাসেন। গল্পটি স্নেহের। আর রামের বয়সী বালক-বালিকাদের কার না স্নেহের প্রয়োজন? রামের যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পাঠক-পাঠিকাদেরও। দুঃখ কারই বা না থাকে; রামের দুঃখকে আমাদের নিজেদের দুঃখ বলেই মনে হতো। কাহিনীর শুরুতেই আছে, ‘রামলালের বয়স কম ছিল, কিন্তু দুষ্টবুদ্ধি কম ছিল না।’ রাম ডানপিটে, কিন্তু তার যে সমস্ত কর্মকাণ্ড দেখা যায় তাতে কোনো অন্যায় চোখে পড়ে না। অন্যায় বরঞ্চ অন্যেরাই করেÑ রামের প্রতি। রাম পাখির জন্য খাঁচা বানায়, ঘুড়ি ওড়ায়, বাড়ির পুকুরের বড় বড় মাছ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ করে, এবং অতিঅনায়াসে ও নির্ভয়ে জমিদারের ছেলের সঙ্গে মারামারি বাধায়। রামের প্রতি সহানুভূতি কার না থাকবে, দুষ্টবুদ্ধি-পরিচালিত ব্যক্তির ভিন্ন?
যে-রামলাল বাড়ির লোকদের মঙ্গলের জন্য সর্বদা চিন্তিত এবং তাদের উপকার
হবে মনে করে বাড়ির উঠানে অশ্বত্থ গাছের চারা এনে পুঁতে দেয়, সেই কিশোর যখন এক সন্ধ্যায়
বাড়িতে ফিরে দেখে উঠানের মাঝামাঝি ছাঁচা বাঁশের বেড়া দিয়ে বাড়িকে দু’ভাগ করা হয়েছে,
তখন ঘটনার আকস্মিকতায় রাম একা নয়, তার সঙ্গে আমরাও বড়ই কাতর হয়েছি।
গল্পটা অনেক আগের; সাতচল্লিশের দেশভাগ অনেক পরের ঘটনা; কিন্তু পেছনে
ফিরে দেখলে মনে হয় দুয়ের ভেতর মস্ত বড় একটা মিল রয়েছে। তুচ্ছ ঘটনাকে উচ্চৈ তুলে ধরা;
ভ্রাতৃকলহ, সম্পত্তির ভাগাভাগি, এবং সমস্ত ব্যাপারটাতে তৃতীয় পক্ষের গোপন অভিসন্ধিমূলক
উৎসাহ প্রদান, এই রাজনীতিতেই দুই ভাই, শ্যামলাল ও রামলাল ভাগ হয়ে গিয়েছিল উঠানে বাঁশের
বেড়া খাড়া করে। সাতচল্লিশের দেশভাগ অনেক বড় ঘটনা, কিন্তু ‘রামের সুমতি’র কল্পিত ওই
ছোট ঘটনারই অতিবৃহৎ ও বাস্তবিক সংস্করণের মতোই তো।
উঠানের মাঝামাঝি বেড়া উঠেছে। রাম ওই বেড়া মানবে না বলে মনে হয়েছিল;
তার মাতৃপ্রতিম বৌদি যে মানবেন না এ-ব্যাপারে রাম নিশ্চিত ছিল; কিন্তু দুজনের কারও
পক্ষেই না-মেনে তো উপায় রইলো না। ‘রামের সুমতি’র সবচেয়ে করুণ মুহূর্তটি সেটি রাম যখন
ঠিক করেছে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা মামার বাড়ির খোঁজে বের হয়ে যাবে, নিজেদের বাড়ি ছেড়ে।
করুণ অথচ বীরত্বব্যঞ্জক। রাম কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু আত্মসমর্পণ করেনি। একটা পুঁটলিতে
জরুরি কিছু জিনিস বেঁধে নিয়ে রওনা হয়েছে অজানা পথে। তাকে অবশ্য যেতে হয়নি। বৌদি নারায়ণী
ফিরিয়ে এনেছেন। নিজের বিধবা মা, দিগম্বরী, বিভাজনে যিনি উস্কানি যোগাচ্ছিলেন, তাঁকেই
বরং অন্যত্র চলে যেতে বলেছেন রামের বৌদি। এই মীমাংসায় অবশ্য রামের আপত্তি আছে। গল্পে
তার শেষ উক্তিটি ভুলবার নয়। রাম তার বৌদির বুকের ভিতর থেকে আস্তে বলল, ‘না, উনি থাকুক,
আমি ভালো হয়েছি, আমার সুমতি হয়েছেÑ আর একটিবার তুমি দেখ।’ আত্মসমর্পণ নয়, এ হচ্ছে বিজয়ী
রামলালের ক্ষমা ঘোষণা।
‘রামের সুমতি’র পরিণতি বিয়োগান্তক নয়, মিলনান্তক। কিন্তু পড়তে গেলে
চোখ ভিজে যায়, এই জন্য যে সে যা করে তা নিতান্ত স্বাভাবিক; কিন্তু করতে গিয়ে সে বিপদে
পড়ে অন্যদের কারণে, এবং বিপদে পড়ে আমাদের সহানুভূতির সবটুকু দখল করে নেয়, আমাদেরকে
নিরুপায় করে দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথের ফটিক চক্রবর্তীও কিছু কম ডানপিটে নয়। ওই বালকের কাহিনীর
সূত্রপাত এই বিবরণ দিয়ে : ‘বালকদিগের সর্দার ফটিক চক্রবর্তীর মাথায় চট করিয়া একটি নতুন
ভাবনার উদয় হইল।’ বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ওই রকমের নতুন ভাবনা তার মনে অহরহই উদয়
হতো। ফটিকও রামের মতোই, একই বয়সী, এবং একই রকমের চঞ্চল। কিন্তু রামের কাহিনী মিলনান্তক;
ফটিকের কাহিনী ঠিক উল্টো; তার পরিণতি নবজীবন লাভে নয়, মৃত্যুতে। অত্যন্ত অল্প সময়ে
ফটিক চলে যায়, পৃথিবী ছেড়ে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার এই যে, ফটিকের কাহিনী আমাকে
কাঁদিয়েছে বলে মনে পড়ে না, রামের কাহিনী পাঠে যেমনটা ঘটিয়েছে। এর কারণ তখন বুঝিনি,
এখন বুঝি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছুটি’ গল্পে একটি ট্র্যাজেডি উপস্থিত করেছেন, ছোটগল্পের
আকারে। তের-চৌদ্দ বছরের বালক ফটিকের পরিণতি এতটাই করুণ ও ভয়ংকর যে কান্না পায় না, কান্নার
চেয়েও গভীর এক কাতরতা জাগিয়ে তোলে। আমরা একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাই, করুণায় এবং ভয়ে। কৈশোরেও
হয়েছি, এখনও যে হই না তা নয়। ফটিকের বাবা নেই। বিধবা মা তাকে নিয়ে বড়ই বিব্রত। ফটিকের
মামা প্রস্তাব দিয়েছেন ফটিককে কলকাতায় নিয়ে যাবার। নিজের কাছে রেখে তিনি পড়ালেখা শেখাবেন।
বদান্যতার এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি নিজের জন্য কতটা যে অস্বস্তি, এবং বালক ফটিকের জন্য
কত বড় বিপদ যে ডেকে এনেছেন তা টের পাননি। টের পেলেন দেরিতে। দেরিতেই বা বলি কী করে,
ঘটনা তো ঘটেছে অতিদ্রুত।
ফটিক অস্থির হয়েছিল কলকাতা যাবার জন্য। ভেবেছিল সেখানে গিয়ে গ্রাম্য
বন্ধন থেকে মুক্তি পাবে। তার মায়েরও আগ্রহ ছিল; কেননা মায়ের ভয় ছিল দুরন্ত পুত্রটি
গ্রামে না জানি কখন কোন বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। কলকাতায় গিয়ে ফটিক পড়েছে মামীর সংসারে;
মামী নিজে তাঁর তিন ছেলে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন, সেখানে অনাবশ্যক ওই উৎপাত বৃদ্ধিতে
তিনি মোটেই সন্তুষ্ট হননি। ফটিক গ্রামের ছেলে, শহরের স্কুলে নিজেকে চৌকস বলে প্রমাণ
দেবে এমন সম্ভাবনা আদৌ ছিল না। দিতে পারেওনি।
রামলালের মিত্র ছিলেন তার বৌদি। তিনি একাই একশ’। বেচারা ফটিকের জন্য
সকলেই শত্রু। তার বয়সটা ছিল তার সবচেয়ে বড় শত্রু। এই অবস্থায় তার পক্ষে সুস্থ থাকা
সম্ভব হয়নি। সে অসুখে পড়েছে। অসুখ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। অসহায় ফটিকের প্রতীক্ষা ছিল
একটাই, কবে ছুটি হবে, কবে সে বাড়ি যাবে।
ফটিকের শেষ যে ঘনিয়ে এসেছে সেটা নিজেই সে জানিয়ে দিয়েছে, প্রলাপ বকে।
ফটিক খালাসিদের মতো সুর করে বলিতে লাগিল, ‘এক বাঁও মেলে না। দো বাঁও মেলে না।’ রবীন্দ্রনাথ
আরও জানাচ্ছেন, ‘যে অকূল সমুদ্রে সে যাত্রা করিতেছে, বালক রশি ফেলিয়া কোথাও তার তলা
পাইতেছে না।’
শেষ মুহূর্তে গ্রাম থেকে তার মা এসেছেন। কিন্তু ফটিকের সঙ্গে তাঁর
কথা হলো না। “ফটিক আস্তে আস্তে পাশ ফিরিয়া কাহাকেও লক্ষ্য না করিয়া মৃদু স্বরে কহিল,
‘মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, আমি বাড়ি যাচ্ছি’।” ওইখানেই সমাপ্তি; জীবনের এবং গল্পের।
শরৎচন্দ্র তাঁর গল্পের একেবারে ভেতরে চলে যান; রবীন্দ্রনাথ যান না,
যাননি এই গল্পেও। পাশে দাঁড়িয়ে থেকে নির্মম এক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন; ট্র্যাজেডির
লেখকরা যেমনটা দিয়ে থাকেন।
এই দুই বালক, রাম ও ফটিক, আমার খুব আপনজন ছিল। আর ছিল অপু, এবং অপুর
বোন দুর্গা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কিছুটা পরে পড়েছি। অনেক নয়,
অল্প কিছুদিন পরে। ‘আম আঁটির ভেপু’ নামে একটি কিশোর-সংস্করণ বের হয়েছিল, সেটিও পড়েছি।
বালক অপুর ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন। অপু মোটেই ডানপিটে নয়। সর্দার
নয়, সর্দার বরঞ্চ তার বোন দুর্গা। অপু বিষণ্ন এক বালক। শত্রু তারও আছে। মস্ত বড় এক
শত্রু। কিন্তু সে শত্রু কোনো দিগম্বরী নয়, তার নিজের বয়সটাও নয়, কলকাতা শহরের হৃদয়হীনতাও
নয়; তার শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য। অপু-দুর্গারা বড়ই দরিদ্র। তারা ব্রাহ্মণ, কিন্তু এতই
দরিদ্র যে সম্ভ্রম রক্ষা করা কঠিন।
তাদের জীবনে অতিনাটকীয় কিছু ঘটে না। ভাইবোনে মিলে ঘুরে বেড়ায়। নিশ্চিন্দিপুর
নামের সেই গ্রাম, গ্রামের পাশে বন, কিছুদূরে রেললাইন, সবকিছু বড় জীবন্ত, ওই ভাই-বোনের
কারণে। এটা জেনে আমার ভারি অবাক লেগেছে যে, ‘পথের পাঁচালী’র আদি পরিকল্পনায় দুর্গা
মেয়েটি ছিল না। সেটা কেমন কথা? দুর্গা ছাড়া ওই কাহিনী চলবে কী করে? চলবে না জেনেই বিভূতিভূষণ
দুর্গাকে নিয়ে এসেছেন; এনে উপন্যাসকে পূর্ণতা দিয়েছেন।
নিশ্চিন্দিপুর এবং দুর্গা অভিন্ন। অপু তার বোনের পেছনে পেছনে চলে।
অপুই বরঞ্চ মেয়েলি, দুর্গার তুলনায়। দুর্গার চেহারা উসকোখুসকো, তার চুল রুক্ষ। আঁচলে
থাকে ফুল ও ফল। পরের বাড়ির বাগানে আম কুড়াতে গিয়ে অপমানিত হয়, ঝাড়লাইটের রঙিন কাচ পেয়ে
সে মনে করে হীরা পেয়েছে। হারানো বাছুর খুঁজতে গিয়ে রেলরাস্তায় গিয়ে পৌঁছেছিল। তাকিয়ে
দূর দিগন্ত দেখে তারা, ভাই-বোনে। টেলিগ্রামের তার ও থাম দেখে। ভাবে তারা হারিয়ে গেছে।
বালক অপু তবুও বের হয়ে যেতে পেরেছে ওই গ্রাম ছেড়ে; বালিকা দুর্গা পারেনি। দুর্গা মারা
গেছে, তাদের ওই গ্রামেই। এর চৌহদ্দির বাইরে সে যাবে না, যেতে পারবে না। গুলতি ছুড়ে
অপু পাখি মেরেছিল; দুর্গা তাকে বকেছে; বলেছে, ‘কখ্খনো ওরকম করিস না আর। বনে জঙ্গলে
উড়ে বেড়ায়, কারোর কিছু করে না, মারতে আছে, ছিঃ।’ সেই দুর্গাই কিন্তু চুরি করেছিল। প্রতিবেশী
ধনী ঘরের সোনার সিঁদুর কৌটা চুরি করে সে লুকিয়ে রেখেছিল। প্রহারে প্রহারে জর্জরিত হয়েছে,
কিন্তু স্বীকার করেনি। দিদির মৃত্যুর পরে অপু আবিষ্কার করেছে লুকানো সেই কৌটা। দুঃখ
পেয়েছে, অবশ্যই। আমরা দুঃখ পাই কি? না, আমি পাই না। আমার তো বরং মনে হয়েছে, ওই রকমের
একটা কৌটা দুর্গার থাকা দরকার ছিল; না-থাকাটাই অন্যায়।
রামলাল কাঁদিয়েছে, ফটিক স্তব্ধ করে দিয়েছে, অপু যে অনুভবের সৃষ্টি
করেছে সেটি না-কান্নার, না-স্তব্ধতার; সেটি বিষণ্নতার। যে-রকম বিষণ্নতা আমি আমার কৈশোরে
আমাদের গ্রামে দেখেছি, দেখেছি রাজশাহী শহরে, দেখেছি আমার অসীম সাহসী দাদির চেহারায়।
‘পথের পাঁচালী’তে বিষণ্নতাই প্রধান; যেমন প্রকৃতির তেমনি মানুষের।
ওই তিনটি কাহিনী আমাকে বিশেষভাবে শিক্ষিত করেছে বলে আমার ধারণা। সে-শিক্ষা
কোনো পাঠ্যবইয়ে প্রাপ্তির তুলনায় অধিক। শিক্ষাটা হচ্ছে অনুভবের, এবং নিজের বাইরে গিয়ে
অন্যের জীবনের সঙ্গে মিলিত হবার আকাঙ্ক্ষার। রামলালকে আমার ঈর্ষণীয় মনে হয়েছে, বিশেষ
করে তার দল গড়বার ক্ষমতার জন্য; অপু-দুর্গাকে আমি আমার নিজের মধ্যেই দেখতে পেয়েছি,
মনে হয়েছে বুঝি-বা আমিও ঘুরে বেড়াচ্ছি ওদের সঙ্গে, গ্রামের পথে পথে। আর ফটিক তো আমার
ভয়েরই একটি অংশ হয়ে গিয়েছিল। ভয়টা ছিল হারিয়ে যাবার। ছেলেবেলায় আমি যে খুব স্বপ্ন দেখতাম
তা নয়। দেখলেও ভুলে গেছি। একটি দুঃস্বপ্নের কথা কিন্তু বেশ মনে আছে। সেটা এই রকমের
যে, একাকী আমি দাঁড়িয়ে আছি একটি মাঠের কোণে। মাঠটা ক্রমাগত বড় হচ্ছে, আর আমি যাচ্ছি
ছোট হয়ে। এটা দেখে স্বপ্নের ভেতরেই আমি চিৎকার করে উঠতাম। তাতে ঘুম ভেঙে যেত; এবং আমি
আশ্বস্ত হতাম এটা দেখে যে আমি শুয়ে আছি, বিছানাতে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়