সৈকত আরেফিন
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৩২ পিএম
আমাদের জীবন যতটা আকাঙ্ক্ষা করে, অল্পই পূরণ হয়। বাইরে থেকে আমাদেরকে যতটা সুখী দেখায়, অন্তর্লিপ্ত জীবনে সুখ ব্যাপারটা হয়তো ততটাই অধরা মাধুরী থেকে যায়। আমরা প্রত্যেকে আসলে একেক জন উদ্বেগের চলমান বাহক। আমাদের প্রত্যেকের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকে একেকটা ক্ষরণ। এই উদ্বেগ বা ক্ষরণই হয়তো আমাদের প্রগলভ করে, যা পাই না, তা নিয়ে বাচালতা করি, যা তৈরি করতে পারি না, তা বাতিল করে দিই। আর এই বাতিল করে দেওয়ার তাড়াহুড়োই হয়তো ক্রমে আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের একটি মৌল-অভ্যাস হয়ে ওঠে : আমরা সহজে হাল ছাড়ি, তারপর সেই হাল ছাড়াকেই বাস্তবতার নামে চালিয়ে দিতে লজ্জিত হই না।
এই অভ্যাসটা কেবল ব্যক্তিজীবনে
নয়; সাংস্কৃতিক জীবনেও কাজ করে। রাজনীতিতে, সিনেমা আলোচনায়, গানে; আর সাহিত্যে তো কাজ
করেই। তাই যখন আমরা শুনতে পাইÑ ‘বাংলা গদ্যে বন্ধ্যাকাল চলছে। তখন এটাকে নিছক সাহিত্যিক
নির্ণয় হিসেবে নয়, আমি বরং বিষয়টিকে আমাদের জাতীয় মানসপ্রবণতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে
আগ্রহবোধ করি। কারণ কথাটি যতটা সাহিত্যিক সত্য, তার চেয়ে বেশি এটা একধরনের মানসিক অধি-অবস্থা,
একধরনের রাগ-অভিমানী দীর্ঘশ্বাস। যেন কেউ চায়ের কাপটা বিরক্তিতে নামিয়ে বলে, ‘এখন আর কিছুই হয় না।’
এই বন্ধ্যাকাল ধারণার কথা আমরা
অনেক দিন ধরে শুনছি। সাহিত্য-আড্ডায়, সেমিনারে, বইমেলার স্টলে, পুরনোদের চায়ের টেবিলে,
আবার সোশ্যাল মিডিয়ার হালকা-ফিসফাসেও। শুনতে শুনতে বাক্যটা এমন একধরনের অলিখিত রায়ের
মতো দাঁড়িয়ে যায়, যেন এই সময়ের কোনো উপন্যাস পড়ার মতো নয়, কোনো ছোটগল্প মন ছুঁয়ে যায়
না, কোনো প্রবন্ধ আমাদের চিন্তার ভিত নাড়া দিতে পারে না। যেন গদ্য আর জন্মায় না; জন্মায়
শুধু স্মৃতিÑ আর স্মৃতি যতটা কাব্যিক, বর্তমান ততটাই নিষ্প্রভ।
আরেকটা কথা আমার মনে হয় যে, এই
‘বন্ধ্যাকাল’ কথাটা কেবল রুচির বিবৃতি নয়; এটা সম্ভবত ক্ষমতারও বিবৃতি। ‘এখন আর কিছুই
হয় না’Ñএ কথা কে বলে? সেই কেন্দ্র বলে, যে কেন্দ্র একসময় সাহিত্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা
ছিল, সে-ই আলো জ্বালাত, মানদণ্ড দিত, গ্রহণ করত, বাতিল করত, ক্যাননের তালা-চাবি নিজের
প্রযত্নে রাখত। সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটে সেই ক্ষমতা আর কেন্দ্রের হাতে নেই। তাই সে এখন
অন্ধকারকে সত্য মনে করে। অর্থাৎ সমস্যাটা কেবল লেখা কম হওয়ার নয়; সমস্যাটা হলো, আলো
বা মানদণ্ড নিরূপণ করার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে। ফলে হাত বদলে গেলে পুরনো হাত মানে পুরনো
ক্ষমতাকেন্দ্রের দীর্ঘশ্বাসই হয়তো এই বন্ধ্যাকালের উদ্গাতা : ‘গদ্য আর আগের মতো
নেই।’ যেন রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে কেউ বলে, ‘ট্রেন নেই’। কেবল এই কারণে বলে যে, ট্রেন এখন
অন্য প্লাটফর্মে এসে থামে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো : তাহলে কি বাংলা সমকালীন গদ্য বন্ধ্যাকালের ভেতর
দিয়ে যাচ্ছে? নাকি বন্ধ্যা মনে হচ্ছে, কারণ আমাদের চোখ ‘পুরনো আলো’তে অভ্যস্ত?
নাকি গদ্যই বদলে গেছে, কিন্তু তাকে আমরা মূল্যায়ন করছি অতীত-সংজ্ঞা দিয়ে? নাকি আমরা
যে ধরনের সাহিত্য খুঁজি, সমকালে সেই ধরনের সাহিত্য কম অথবা নতুন ধারার সাহিত্য উপস্থিত
থাকা সত্ত্বেও আমরা তাকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছি!
আমার কাছে এর যে উত্তরটা আছে তা
আবার এক কথায় বলা যায় না। কিন্তু একটি অবস্থান স্পষ্ট করতেই পারি যে, ‘বন্ধ্যাকাল’ কথাটিকে আপাতভাবে নিরীহ শোনালেও এই
অতিনেতিবাদী মতে আমার পুরোপুরি সায় নেই। তবে আমি এটাও বলতে চাই না যে, সবকিছু
পরিপূর্ণ উল্লাসে চলছে, কিংবা সমকাল এক নির্ভার স্বর্ণযুগ। আমার মনে হয়, আমরা এমন এক
সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে উর্বরতা আছে, কিন্তু তা বহুধা-বিচ্ছিন্ন; গদ্য জন্ম নিচ্ছে,
কিন্তু হাসপাতালের করিডোরে; ভাষা ফুল হয়ে ফুটছে, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন বাগানে; সাহিত্যের
ঢেউ উঠছে, কিন্তু আগের মতো নদীটি প্রসারিত নয়। এখন হয়তো একে কখনও উপনদী বা শাখানদী
কিংবা খালের রূপকে বর্ণনা করা যায়।
এই অবস্থাকে যদি অন্য উপমায় ধরতে
চাই, তাহলে আমি বলব, সমকালীন বাংলা গদ্যের অবস্থাটা একটি শহরের বিদ্যুৎ-বিপর্যয়ের মতো।
যেমন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে কেউ বলতে পারে, ‘অন্ধকারে শহর শেষ হয়ে গেল।’ আবার কেউ বলতে
পারে, ‘এ তো সাময়িক, মোমবাতি জ্বালাও, জানালা খোলো, মানুষের মুখ দেখো।’ সত্যি কথা হলো,
বিদ্যুৎ না থাকলেও শহর থাকে, শহর চলে। হয়তো শহরের আলো কমে যায়, দৃশ্যমানতা কমে যায়,
দৃষ্টির অভ্যাস বদলে যায়। তখন যদি কেউ বলে ‘শহর নেই’ তা ভুল হবে। শহর ঠিকই থাকে, কেবল
আমাদের চোখ অন্ধকারে মানিয়ে নিতে পারে না।
‘বন্ধ্যাকাল’ কথাটার তীব্র সমস্যা
বোধ হয় এখানেই। বন্ধ্যাকাল শব্দটি যতটা সাহিত্যিক, ততটাই নির্মম। কারণ বন্ধ্যাকাল মানে
একেবারে উৎপাদনশূন্যতা, সৃজনশূন্যতা, সন্তানহীনতা। কিন্তু সাহিত্য তো এমন নয় যে হঠাৎ
করেই বন্ধ্যা হয়ে যায়। সাহিত্যের ভেতরে রক্ত আছে, ইতিহাস আছে, সমাজ আছে, ক্ষুধা আছে,
ক্ষত আছে। সেখানে লেখা থেমে যেতে পারে না, থেমে গেলে সমাজের শ্বাসই থেমে যায়।
তাহলে বন্ধ্যাকাল বলে মনে হচ্ছে
কেন? সমস্যাটা গদ্যের, নাকি আমাদের সম্মিলিত চোখের? এখানে দুটো সম্ভাবনার কথা বলা যায়,
প্রথমত, সত্যিই ভালো লেখা হচ্ছে না: এটা
সম্ভব। সমাজে বড় ঢেউ না থাকলে কোনো কোনো সময় সাহিত্যে প্রাণ কমে যায়। কখনো ভাষা অলস
হয়ে যেতে পারে বা লেখকেরা আত্মসন্তুষ্ট হয়ে যেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ভালো লেখা হচ্ছে, কিন্তু তা দৃশ্যমান হচ্ছে না :
এই সম্ভাবনাও এখন অনেক বেশি বাস্তব। কারণ আজকের সময়ে লেখা ছড়িয়ে আছে, কিন্তু
কেন্দ্র নেই; প্রকাশ আছে, কিন্তু একক মানচিত্র নেই; পাঠক আছে, কিন্তু তার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত;
সমালোচনা আছে, কিন্তু সংগঠিত সমালোচনার কাঠামো দুর্বল। আমার ধারণা, আমরা দ্বিতীয় সমস্যাটাকেই
প্রথম সমস্যা ভেবে বসে আছি। আমরা ভাবছি, ‘লেখা হচ্ছে না’, অথচ আসলে লেখা হচ্ছে; কেবল
সেই লেখা আমরা আগের মতো একই জায়গায় বা আগের মতো নির্দিষ্ট আলোয় দেখতে পাচ্ছি না।
এখানে আরেকটা সত্য যোগ করা দরকার
বলে মনে হয়। দৃশ্যমানতার সংকটটা শুধু ডিজিটাল মাধ্যম ছড়িয়ে পড়ার কারণে নয়; এটা ভূগোলেরও
সংকট। ঢাকা-কেন্দ্রিক আলোতে আমরা অনেক সময় দেশের অন্য কণ্ঠগুলোকে দেখতেই পাই না। বিভাগীয়
শহর, মফস্বল, সীমান্ত, নদীভাঙনের পাড় এমনকি পাহাড়ের গ্রামেও গদ্য লেখা হচ্ছে, কিন্তু
সেই গদ্য ঢাকার চায়ের টেবিলে পৌঁছায় না। পৌঁছালেও ‘প্রধান সাহিত্য’ নামের দরজায় ঢোকার
আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে ‘ভালো লেখা নেই’ কথাটা অনেক সময় আসলে এই অর্থ বহন করে,
‘আমাদের পরিচিত পরিসরে ভালো লেখা চোখে পড়ছে না।’ চোখে না পড়া আর না থাকা এক নয়।
বাংলাদেশে গদ্য নিয়ে অভিযোগের কেন্দ্রে
প্রায়ই আরেকটি হতাশা থাকে : ‘এখন বড়
উপন্যাস লেখা হচ্ছে না।’ অথবা ‘এখন বড় উপন্যাস লেখার ক্ষমতাই কোনো লেখকের নেই ‘এ
ধরনের কথা শুনলেই আমার মনে হয়, এটা কেবল একটি সাহিত্যিক অভিযোগ নয়; এটা আসলে একধরনের
নস্টালজিক ধারণা। ‘বড় উপন্যাস’ বলতে আমরা কী বুঝি? সাধারণত বুঝি, দীর্ঘ, মহাকাব্যিক,
বহুচরিত্রময়, সমাজ ও ইতিহাসকে একসঙ্গে বহন করতে সক্ষম, অনেকটা মহাসড়কের মতো উপন্যাস।
যেখানে চরিত্রসমূহ শুধু ব্যক্তি নয়, তারা শ্রেণি, ইতিহাস, রাষ্ট্র, সময়ের প্রতীক। যেখানে
গল্প শুধু গল্প নয়, সমাজের মানচিত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমকালীন সাহিত্য কি বাধ্য
এই একই কাঠামো অনুসরণ করতে?
এটা ঠিক সমকালীন উপন্যাস প্রায়ই
আকারে ছোট। আকৃতির ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও সেগুলোর বৈভব-গভীরতা যে কম, তা বলা যাবে না।
হয়তো তা মহাকাব্যিক নয়, কিন্তু সেগুলো যে জীবন সম্পর্কে মাইক্রোস্কোপিক, তাতে কোনো
সন্দেহ নেই। যদিও তা একটি শহরের মানচিত্র নয়, বরং একজন মানুষের মানসিক ঘরবাড়ি এবং তা
বহুচরিত্র-সমন্বিতও নয়, বরং এক চরিত্রের ভেতর অসংখ্য ছায়ার সমাবেশ। ফলে ‘বড় উপন্যাস
নেই’, এই কথার ভেতরে অনেক সময় এই অর্থ লুকিয়ে থাকে যে, আমরা যে ধরনের উপন্যাস খুঁজছি, সমকালে সে ধরনের উপন্যাসের সংখ্যা নিদারুণভাবেই
কম। কিন্তু কম মানে তো শূন্য নয়। আমার মনে হয়, সাহিত্যকে ‘একটাই ধরন’ হিসেবে
ধরে নেওয়াও কোনো ভালো সিদ্ধান্ত নয়। কারণ যুগ বদলায়। মানুষের জীবন বদলায়। তাই গদ্যের
কাঠামো বদলাবে না, তা তো হতে পারে না।
আর বড় উপন্যাসের অভাবের পেছনে কেবল
পাঠকের ধৈর্য নয়, অর্থনীতিরও একটা ভূমিকা আছে। কাগজের দাম, বইয়ের দাম, বই বহন-রাখার
ঝামেলা মিলিয়ে বড় উপন্যাস এখন পাঠকের কাছে শারীরিকভাবেও ভারী। প্রকাশকও ঝুঁকি কমাতে
চায়। কেননা, বড় বই মানে বেশি খরচ, বেশি অনিশ্চয়তা। ফলে ‘বড় উপন্যাস নেই’ কথাটা অনেক
সময় হয়ে ওঠে সাহিত্যিক অভিযোগের মতো শোনানো এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু অর্থনীতি
যখন শিল্পকে শাসন করে, তখন শিল্পের শরীরও বদলে যায়। এটা অবশ্যই দুঃখজনক, কিন্তু তা
অস্বীকার করলে আমরা সমস্যার মূলে পৌঁছাতে পারব না।
একটা সমাজ যদি টুকরো টুকরো হয়ে
যায়, ভিডিও যদি ৩০ সেকেন্ডে ছোটে, খবর যদি ১০ লাইনে শেষ হয়, মতামত যদি একটি স্ট্যাটাসে
ফেটে পড়ে; তাহলে সময়ের উল্লম্ফনে উপন্যাসও তার শরীর বদলাবে। আধুনিক মানুষ ‘বড় গল্প’
সহ্য করার মতো বড় ধৈর্য রাখতে পারে না। ফলে গদ্যের আকারও অনেক সময় ছোট হয়। কিন্তু ছোট
মানেই দুর্বল নয়। ছোট মানেই বন্ধ্যা নয়। ছোট মানেই নিষ্ফলা নয়।
সম্ভবত আরেকটা জায়গায় আমাদের চোখ
ভুল করে। আমরা ভাবি, গদ্য বদলেছে শুধু আকারে। কিন্তু গদ্য বদলেছে তার বাক্যের শ্বাসে।
আগে বাক্য ছিল দীর্ঘ নদীর মতো। ধীরে বাঁক নিত, তীরে তীরে একেকটি অর্থমাত্রা নিয়ে হাজির
হতো। এখন বাক্যকে তুলনা করা যায় ট্রাফিকের মতোÑ হর্ন, কাটাকাটি, হঠাৎ ব্রেক ও হঠাৎ
গতির উপমায়। তাতে আকস্মিক কথ্যভাষা ঢুকে পড়ে, ইংরেজি ঢুকে পড়ে, স্ক্রিনের মিম-ভাষা
ঢুকে পড়ে। এ যেন একধরনের শাহরিক-উচ্চার, যাকে কেউ হয়তো বলবে গদ্যের অবক্ষয়। আমি একে
গদ্যের বাস্তব অভিযোজন হিসেবে দেখতে চাই। কারণ মানুষও তো এখন এই ভাষাতেই নিজেকে বহন
করে: অল্প শব্দে, বেশি ইঙ্গিতে, দ্রুত প্রতিক্রিয়ায়। ফলে গদ্যও অনেক সময় রুচির চেয়ে
বেশি পরিস্থিতির বাহক হয়ে দাঁড়ায়।
একসময় গল্পকাররা দলবেঁধে লিটল ম্যাগাজিন
করতেন। অপেক্ষা করতেন ঈদসংখ্যা, পূজাসংখ্যার জন্য। লিটল ম্যাগাজিনের নতুন সংখ্যার জন্য।
পত্রিকার সাহিত্যপাতার জন্য। মাসিক বা ত্রৈমাসিক পত্রিকার জন্য। সেই অপেক্ষা ছিল একধরনের
প্রকাশনা-রীতির ফল এবং সেই রীতির ভেতরে একটি নিয়ন্ত্রণ ছিল। সম্পাদকীয় দূরদৃষ্টির প্রতি
লেখকদের যেমন সমীহ ছিল, তেমনি আস্থা ছিল নির্বাচনের মানদণ্ডের প্রতিও। এখন লিটল ম্যাগাজিন
বাজেটই পায় না। লিটল ম্যাগাজিনের নামে তবু যা হয়, তাতে বন্ধুকৃত্য-সম্পাদন হয় বটে,
সাহিত্যের খুব লাভ হয় না। এ ছাড়া অনেক কাগজই বন্ধ, দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা বিজ্ঞাপনের
চাপে সংকুচিত হতে হতে ক্ষীণকায়। ফলে গল্পের প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চ ক্রমে ছোট হতে হতে দৃশ্যের
আড়ালে চলে গেছে। গদ্যকে এখন দেখতে লাগে যেন ভাঙা বাজারে জায়গা পাওয়া অকালীন পণ্যÑ যেখানে
পণ্য আছে, কিন্তু দোকান কম। আর তখনই একটি বিভ্রম তৈরি হয়: ‘পণ্যই নেই।’ কিন্তু আসলে
পণ্য আছে, বদলেছে কেবল বাজারের পরিকাঠামো।
এখন গল্প পাওয়া যায় ফেসবুকে, ব্লগে,
অনলাইন পোর্টালে, ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে, বই হয়ে, ই-বুক হয়ে, কখনও কখনও এমনকি স্ক্রিনশট
হয়ে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই গল্পগুলোর আয়ু অনেক সময় স্ক্রল-পর্যন্ত সীমিত। পাঠক স্ক্রল
করে যায়, গল্প পড়ে, তারপর ভুলে যায়। গল্পটি যে আলো পেত, যে আলোচনা পেত, যে পুনঃপাঠ
পেত, তা আর পায় না। ফলে গল্পের মান কমে গেছে বলার চেয়ে বেশি সত্য হলো, কেবল গল্প নয়, সম্ভবত আমাদের পুরো পঠন-ব্যবস্থাই
সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
বাংলা গদ্যের আরেকটি শাখা প্রবন্ধ।
প্রবন্ধ মানেই যুক্তি আর চিন্তার সজীবতা। কিন্তু আজকের যুগে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে যে,
মানুষ আর যুক্তি চায় না, অবস্থান চায়। মানুষ চিন্তা চায় না, পক্ষ চায়। মানুষ প্রশ্ন
চায় না, উত্তেজনা চায়। ফলে প্রবন্ধের জায়গাটা সংকুচিত। কারণ প্রবন্ধ ধৈর্য আর মনন থেকে
জাত। প্রবন্ধের জন্য দরকার মস্তিষ্কের নিঃশব্দ ঘর। কিন্তু আজকের পাঠক বাস করে বিজ্ঞাপনের
চিৎকারে, নোটিফিকেশনের টিকটিকিতে। সে একসঙ্গে দশটা ট্যাব খোলে, তিনটা ভিডিও চালায়,
আর দুই লাইনে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।
এখানে সমস্যা হলো, এই সময়ে প্রবন্ধের
সংখ্যা কম, প্রচার কম, কিন্তু প্রবন্ধের প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ সংকটের যুগে আমরা যদি
যুক্তি হারাই, তাহলে আমরা কেবলই দলাদলি করতে থাকব। আর দলাদলি মানেই সাহিত্যের মৃত্যু।
সাহিত্য মরে যায় তখনই, যখন আমাদের প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। তাই ভালো প্রবন্ধ
হচ্ছে না বললে সেকথা আংশিক সত্য হতে পারে। কিন্তু ‘প্রবন্ধের ক্ষমতা নেই’, এ কথা ভুল।
প্রবন্ধের ক্ষমতা আছে; শুধু প্রবন্ধের পাঠক-পরিসর ক্ষীণ হয়ে এসেছে। একে হয়তো সাংস্কৃতিক
দুঃসময় বলা যায়, কিন্তু কখনও বন্ধ্যাকাল নয়।
সমকালীন গদ্য বিচার করতে আমরা প্রায়ই
পুরনো যুগের মানদণ্ড ব্যবহার করি। কারণ রবীন্দ্রনাথের ভাষা, শরৎচন্দ্রের আবেগ, মানিকের
বাস্তবতাবোধ, শহীদুল জহিরের জাদুময় গদ্য, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রাজনৈতিক গভীরতা আমাদের
মাথার ওপর একেকটা পাহাড়ের মতো চেপে থাকে। কিন্তু পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা যদি প্রতিটি
নতুন কুঁড়িকে বলি, ‘তুমি কেন পাহাড় নও!’
তাহলে কুঁড়ির প্রতি ঠিক বিচারটি করা হয় না। তাতে কুঁড়ির ফোটার সম্ভাবনা কমে যায়।
যে কথা আগে বলেছি, জাতিগত প্রবণতার
ধরনে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিরও একটি বড় প্রবণতা হলো, আমরা অতীতকে পবিত্র করে ফেলি
এবং সেই পবিত্রতার কারণে বর্তমানকে আমরা প্রায়ই মনে করি অপবিত্র। কিন্তু সাহিত্য তো
কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে একবার পবিত্র হয়ে গেলে তার পরে আর কিছু পবিত্র হবে না। সাহিত্য
জীবনের মতো, প্রতিদিন বদলায়, প্রতিদিন প্রশ্ন করে, প্রতিদিন আঘাত পায়।
আজকের বাংলা গদ্য যেন বহু জায়গায়
একসঙ্গে ফুল ফোটায়। কিন্তু সেই ফুলগুলো একই বাগানে ফোটে না। এক জায়গায় শহুরে মধ্যবিত্তের
বিষণ্নতা, আরেক জায়গায় প্রান্তিক মানুষের ভাঙাচোরা জীবন, কোথাও নারীর শরীর-রাজনীতি,
কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের তীব্রতা, প্রযুক্তির আগ্রাসন, আবার কোথাও অভিবাসনের দীর্ঘশ্বাস।
আর এই বহুমুখী ফুল ফোটার ভেতরে আছে একধরনের অস্বস্তি। কারণ নতুন লেখালেখি শুধু বিষয়
বদলায় না, পাঠকের নিরাপত্তাও বদলায়। নারী-লেখকের ভাষা যখন শরীরকে রাজনৈতিক করে তোলে,
কুইয়ার অভিজ্ঞতা বা লিঙ্গ-পরিচয় যখন স্বাভাবিকতার ধারণাকে নড়িয়ে দেয়, সংখ্যালঘু পরিচয়ের
তীব্রতা যখন সংখ্যাগুরুর আরামকে প্রশ্ন করে, তখন অনেকেই তাকে ‘সাহিত্য’ না বলে ‘আন্দোলন’
বলতে চায়। কিন্তু সাহিত্য তো আসলে জীবনের আন্দোলনই। ফলে যে পাঠক পুরনো আরামে সাহিত্য
খুঁজে, তার কাছে নতুন প্রশ্নের সাহিত্যকে ‘বন্ধ্যাকাল’ বলে মনে হতেই পারে। কেননা, এখানে
উৎসব কম, অস্বস্তি বেশি। অথচ অস্বস্তি কখনও শূন্যতা নয়। অস্বস্তি অনেক সময় নতুন জন্মের
প্রথম ব্যথা।
ফলে এখনকার গদ্য একদিকে যেমন বহুমুখী,
অন্যদিকে তেমন কেন্দ্রহীন। এই কেন্দ্রহীনতাকে আমরা ‘বিক্ষিপ্ত উর্বরতা’ হিসেবে শনাক্ত
করতে পারি। কেননা এখন যে উর্বরতা আছে, সংগঠিত নয় বলে তা তেমন চোখে পড়ে না। এটি যেন
কেবল একটি ফসলের মাঠ নয়, ছড়িয়ে থাকা খণ্ড খণ্ড বহু জমি। ফলে এই বিক্ষিপ্ত উর্বরতাকে
ধরতে গেলে আমাদের পুরনো ঘরানার বাইরে তাকাতে হবে। আজকের গদ্যে দিনলিপি বা নাগরিক-নোট
বা আত্মস্মৃতির মতো। গদ্যে গল্পের চেয়ে ক্রনিকল বেশি, কোথাও মাইক্রোফিকশন, এক-দুই পৃষ্ঠার
ভেতর এঁটে যায় একটি জীবনের ক্ষত। কোথাও অটোফিকশনের টান, যেখানে লেখক নিজের ভেতর ঢুকে
সমাজকে দেখে। কোথাও রিপোর্টারের ভাষায় খবরের উত্তাপকে লেখক শিল্পে রূপ দেন। দীর্ঘ প্রবন্ধ
নয়, কিন্তু ধারাবাহিক ছোট প্রবন্ধে প্রবন্ধকার তার চিন্তাদর্শনকে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যান।
এ সবকিছুর ভেতরেই গদ্য আছে। শুধু তার চেহারা বদলেছে। এখনও যদি কেবল পুরনো মুখকেই খুঁজে
ফিরি, নতুন মুখগুলোকে আমরা চিনতেই পারব না।
আজকের বাংলাদেশে, জীবনের যে বাস্তবতা
গদ্যকে নাড়িয়ে দিচ্ছেÑ শহরের বিস্তার ও গ্রাম থেকে শহরের দিকে আসা মানুষের অনবরত স্রোত;
চাকরির অনিশ্চয়তা, মধ্যবিত্তের স্থায়ী উদ্বেগ, রাজনৈতিক মেরূকরণ, দীর্ঘ হতাশা, বিশ্বায়ন
ও সংস্কৃতির হাইব্রিডিকরণ, সামাজিক মাধ্যমের সর্বগ্রাসী উপস্থিতি, ধর্মীয় পরিচয়ের তীব্রতা
ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, অভিবাসন ও বিদেশে চলে যাওয়ার বাস্তব বা কল্পবাসনা, প্রেমের
নতুন ভাষা, সম্পর্কের দ্রুত ভাঙা-গড়া, নারীর অবস্থান নিয়ে তীব্র বিতর্ক এবং জলবায়ু
সংকট, নদীভাঙন এবং বাস্তুচ্যুতির মতো সমূহ-ঘটনাবলি আমাদের উপন্যাসে, গল্পে, প্রবন্ধে
ঢুকছে। তবে সত্যি হলো, এসবই সাহিত্যের উপকরণ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু আগের মতো বিশাল মহাকাব্য
হয়ে নয়, বরং টুকরো টুকরো আহত টেক্সট হয়ে। এটাই আমাদের সময়ের গদ্যের বড় চরিত্র : এখানে
মহাকাব্যিকতা কম, মাইক্রোস্কোপিক উপাদান বেশি। এটা হয়তো ততটা জাঁকালো নয় যতটা বেশি
আহত। এখানে উৎসব গৌণ, প্রয়োজনীয়তা মুখ্য।
তাই এই সমকালকে গদ্যের বন্ধ্যাকাল
না বলে সংকটকাল বলা ভালো। এ সংকটকে যদি এক শব্দে বলতে হয়, আমি বলবÑ সংগঠনের সংকট। আমি এখানে সংকটের অন্তত তিনটি
স্তর দেখতে পাই। যেমনÑ এক. প্রকাশনা ও সম্পাদকীয়
মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল : অনেক বই বেরোয়, কিন্তু সম্পাদকীয় নির্মাণ দুর্বল।
ফলে ভালো লেখা চাপা পড়ে যায় এবং মাঝারি লেখা বেশি আলো পায়। দুই. সমালোচনার অভাব : একটি সাহিত্যজগৎ টিকে
থাকে সমালোচনায়। সমালোচনা না থাকলে ভালো-মন্দের পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়। মাপকাঠি হারিয়ে
যায়। তখনই ‘সব লেখা বাজে বা বস্তাপচা’ বলা সহজ হয়। অবশ্য সমালোচনার দুর্বলতারও একটি
সামাজিক কারণ আছে। আজকের সাহিত্যজগৎ একেকটি ছোট ঘরের মতো। সবাই সবাইকে চেনে, কেউ কাউকে
রাগাতে চায় না, আবার কেউ কাউকে ছাড়তেও চায় না। ফলে বিচার শিথিল হয়ে যায়, আর শিথিল-বিচার
অল্পদিনে প্রশংসার ফেনা তৈরি করে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও খুব বেশি সাহায্য করে না। সংগত
কারণেই গবেষণা প্রায়ই সমকালীন পাঠ থেকে দূরে থাকে। গণমাধ্যমের সাহিত্যপাতার সংকোচনের
কথা বলেছি। সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনাও খুব দ্রুত পক্ষপাতমূলক হয়ে ওঠে। ফলে সমালোচনা হয়
বিজ্ঞাপন অথবা প্রতিশোধ। কিন্তু সমালোচনা হলো পাঠের নৈতিকতা, যে নৈতিকতা না থাকলে উর্বরতার
ভেতরেও আমরা আসল ফসল চিনতে পারি না এবং শেষ স্তরটি হলো তিন. পাঠকের ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়া।
একসময় পাঠক ছিল তুলনামূলকভাবে কেন্দ্রীয়
এবং পরস্পর-সংলগ্ন। এখন পাঠক ছড়িয়ে গেছে ফেসবুক গ্রুপে, ইউটিউব রিভিউতে, ব্লগে, অনলাইন
পোর্টালে, অফলাইন বইমেলায়। ফলে কেন্দ্রীয় পাঠ-সংস্কৃতির দিন হয়তো আমরা পেছনেই ফেলে
এসেছি। তাই এটাকে গদ্যের দোষ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া না ঠিক হবে না। এটাই আজকের সমাজ ও
রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ফলে যে কথা আগেই বলেছি, ‘বন্ধ্যাকাল’
এলে এক ধরনের নস্টালজিয়া। যখন সাহিত্য-সংশ্লিষ্ট মহল বলে সমকালে ভালো কিছু হচ্ছে না,
তখন আমি তাদের কথায় দুটো বিষয় একসঙ্গে শুনতে পাইÑ এক. সত্যিকারের উদ্বেগ, দুই. হারিয়ে
যাওয়া সময়ের জন্য হাহাকার। কারণ যে সময় চলে গেছে, আমরা প্রায়ই তাকে স্বর্ণযুগ বানিয়ে
ফেলি। ভুলে যাই যে, আগের যুগেও অভিযোগ ছিল, আগের যুগেও বাজে লেখা ছিল। তবু আজ মনে হয়,
আগে সব ভালো ছিল। এটা মানুষের মনস্তত্ত্ব। কিন্তু সাহিত্য কোনো নস্টালজিয়ার নিয়মে চলে
না। সাহিত্য চলে জীবনের নিয়মে। আর যেহেতু জীবন এখন তীব্র, বিপর্যস্ত, অস্থির, তাই গদ্যও
তেমন জটিল।
আজকের গদ্য আগের মতো কেবল সুন্দর
বাক্য বানাতে চায় না। আজকের গদ্য অনেক সময় এমন বাক্য বানায় যেন বাক্য নিজেই হাঁপায়।
কারণ মানুষ হাঁপায়। শহর হাঁপায়। সম্পর্ক, চাকরি, রাজনীতি সবই ক্রমাগত হাঁপাতে থাকে।
ফলে গদ্যের ভেতরও যেন সেই শ্বাসকষ্ট। এই শ্বাসকষ্টকে কেউ বলে দুর্বলতা বলতে পারে। আমি
বলি, এটাই সময়ের সত্য উচ্চারণ।
যদি আমরা সত্যিই চাই সমকালীন গদ্যের
শক্তি উন্মোচিত হোক, তাহলে শুধু ভালো লেখা নেই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেই হবে না। আমাদের
দরকার সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো, যার ভেতর
দিয়ে লেখা শুধু জন্মাবে না, জীবনও পাবে।
করণীয়গুলো তাই কেবল সাহিত্যিক নয়;
প্রাতিষ্ঠানিক, পাঠ-সংস্কৃতিগত এমনকি নৈতিকও। কয়েকটি জরুরি করণীয় সম্পর্কে একটা ধারণা
দাঁড় করানো যায় : ১. সম্পাদকীয় সংস্কার :
বই প্রকাশ নয়, বই নির্মাণ : আজকের প্রকাশ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি, ‘বই নির্মিতি’
হয় না, ‘বই ছাপা’ হয়। একটি উপন্যাস বা গল্পগ্রন্থকে সম্পাদকীয় নির্মাণ দিতে হয়। ভাষা,
ছন্দ, কাঠামো, অতিরিক্ততা, অস্পষ্টতা দূরীকরণে দায়িত্বশীল চোখ লাগে। সম্পাদক মানে শুধুই বানান-সংশোধক নয়; সম্পাদক মানে
নির্মাতা। প্রকাশক যদি নির্মাতা না হয়, তাহলে ভালো লেখাও মাঝারি হয়ে যায়, আর
মাঝারি লেখা বাজারে ভালো বলে ভ্রম তৈরি করে। তাই প্রকাশনাকে পণ্যের ব্যবসা থেকে টেক্সটের
দায়-সত্তায় আমাদের ফেরাতেই হবে। ২. সমালোচনার
পুনর্গঠন : রিভিউ নয়, সঠিক মূল্যায়ন : আমাদের অবশ্যই অনেক রিভিউ আছে, কিন্তু
সমালোচনা কম। আমাদের রিভিউগুলো অনেক সময় প্রশংসার বিজ্ঞাপন কিংবা ব্যক্তিগত রাগের প্রতিশোধ
হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সমালোচনা মানে বিচারের ন্যায্যতা,
যেখানে ভালোকে প্রতিষ্ঠা করা আর খারাপকে যুক্তি দিয়ে ভেঙে দেখাতে হবে। সমালোচনা
না থাকলে ভালো লেখা পাঠক বুঝবে কীভাবে? লেখকওবা কীভাবে শিখবে ভালো লেখা কী করে লিখতে
হয়? কিংবা সাহিত্য মানদণ্ড পাবে কোথা থেকে? ফলে সাহিত্য সাময়িকীতে ধারাবাহিক সমালোচনা-প্রবন্ধ;
তুলনামূলক পাঠ এবং গদ্য-ভাষার সমালোচনা দরকার। এগুলো ছাড়া বিক্ষিপ্ত উর্বরতা কখনও ভুগোলজুড়ে
একটা নিজস্ব মানচিত্র পাবে না। ৩. পঠন-সমাজ
তৈরি, পাঠককে আবার কেন্দ্র ফিরিয়ে দেওয়া, বর্তমানের পাঠক এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে
আছে। কিন্তু ছড়িয়ে থাকা মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। সমস্যা হলো, পাঠক-অভিজ্ঞতাও এখন ব্যক্তিগত
স্ক্রলে বন্দি। আমাদের কেবল বইমেলা ভিত্তিক নয়, বছরজুড়ে ক্রমাগত পাঠচক্র করে যেতে হবে।
কেবল স্ক্রল নয়, আমাদের পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি ও কমিউনিটি বুকস্পেস তৈরি করতে হবে;
অনলাইন বুকক্লাব করতে হবে। আলোচনাকেন্দ্রিক পাঠক এক জায়গায় জড়ো হলে আলোচনার উত্তাপ
বাড়বে। আর উত্তাপ বাড়লে লেখাও তখন আরেকটু দায়িত্বশীল হয়। এখানে আরও একটি কথা বলা দরকার,
একটি পঠন-সমাজ কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন টিকবে না। এর জন্য অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক
আয়োজন লাগবে। এজন্য দরকার পাবলিক লাইব্রেরির পুনর্জাগরণ, স্কুল-কলেজে পাঠাভ্যাসের সংস্কার
এবং পাঠ্যসূচিতে সমকালীন গদ্যের উপস্থিতি। রাষ্ট্র যদি পাঠক উৎপাদন না করে কেবল পরীক্ষা
উৎপাদন করে, তাহলে সাহিত্যকে আমরা কেবল বইমেলার এক মাসেই খুঁজে ফিরতে থাকব। আর এক মাসের
আলোতে বারো মাসের সাহিত্য বিচার করতে গেলে তখন সমকালকে ‘বন্ধ্যা’ মনে হওয়া ছাড়া আর
উপায় থাকবে না। ৪. ডিজিটাল আর্কাইভ ও কিউরেশন
: খুঁজে পাওয়ার নৈতিকতা, সামাজিক মাধ্যমের যুগে ভালো লেখা হয়তো একেবারে হারিয়ে
যায় না, কিন্তু আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
মানসম্মত কিউরেশন সম্পাদকীয়র মাধ্যমে মাসিক বা বার্ষিক সেরা তালিকা, বিষয়ভিত্তিক সংগ্রহ
(শহর-গদ্য, জলবায়ু-গদ্য, নারীবাদী গদ্য, অভিবাসন-গদ্য ইত্যাদি) করা যায়। কারণ যে সমাজ
নিজের সৃষ্টিকে খুঁজে রাখতে পারে না, সে সমাজ নিজের সৃষ্টিকে বিচার করতে ব্যর্থ হবেÑ
সেটাই স্বাভাবিক। তাই কিউরেশন-নীতিকে বিলাসিতা নয়, এটাকে সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে
দেখাই ভালো। ৫. লেখকের শৃঙ্খলা : নিরীক্ষা
হোক, কিন্তু ফাঁকি নয়, সমকালীন লেখক বেশি আত্মসচেতন, এটা ভালো। কিন্তু আত্মসচেতনতা
যদি স্টাইলসর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভাষা গল্পকে ঢেকে ফেলে, আর নিরীক্ষা হয়ে ওঠে প্রকৃতপক্ষে
পাঠকবিরোধী। নিরীক্ষা প্রয়োজন, কিন্তু নিরীক্ষারও নৈতিকতা আছে, ভাষা যেন সাহসী হয়, অলস নয়। ভাঙন সত্য হোক, ভান নয়। লেখকের কাজ পাঠককে
তুচ্ছ করা নয়; লেখকের কাজ পাঠককে টেনে তোলা। ৬. প্রবন্ধের পুনর্জন্ম, উত্তেজনার বিরুদ্ধে যুক্তির শিক্ষা, প্রবন্ধের
জায়গা ফেরাতে হলে আমাদের একটা সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑ আমরা কি উত্তেজনার পেছনে
দৌড়াব, নাকি চিন্তার পেছনে? প্রবন্ধের জন্য চাই দীর্ঘ পাঠ-পরিসর; বিতর্কে চাই শালীনতা
ও যুক্তির শৃঙ্খলা; বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যমে চাই চিন্তাশীল লেখালেখির পরিসর। কেননা
প্রবন্ধকে বাঁচানো মানে সমাজকে বাঁচানো। কারণ যুক্তি না থাকলে আমরা কেবল প্রতিক্রিয়ায়
বাঁচব, চিন্তায় নয়।
সব মিলিয়ে সমকালীন বাংলা গদ্যকে
যদি এক বাক্যে আঁকা যায়, তবে ক্যানভাসে একটি
ছড়ানো-ছিটানো অরণ্য হয়ে ফুটে উঠবে। সেই অরণ্যে আমরা কেউ গাছ দেখব, কেউ পাতার
শব্দ শুনব, কেউবা পথ হারিয়ে ফেলতে পারি। তখন কেউ যদি বলে যে, এখানে বনই নেই, তাহলেও
কিন্তু বন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না। বন থাকবে, কেবল ‘ম্যাপ’-এ ধরা পড়বে না।
একদিকে পরীক্ষামূলক উপন্যাসের প্রবণতা,
অন্যদিকে পাঠক চাহিদার দ্রুতলয়, এই দ্বন্দ্ব নিয়েই বাংলা সমকালীন গদ্য যেভাবে এগিয়ে
যাচ্ছে তাকে বন্ধ্যত্ব বলা ঠিক নয়। এটা অবশ্যই এক ধরনের বিক্ষিপ্ত উর্বরতা। কারণ একক
নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলা সমকালীন গদ্য যে উপনদী, শাখা নদী আর ছোট ছোট খালে টুকরো
টুকরো হয়ে পড়েছিল তার কোনো কোনোটি শুকিয়ে গেছে। কোনোটিতে নতুন জল এসেছে। আবার কোনোটি
হয়তো অন্ধকারে বয়ে যাচ্ছে গোপনে, নিঃশব্দে।
তবে বিক্ষিপ্ত উর্বরতা নিয়ে একটা
সতর্কতা রাখতে চাই। বিক্ষিপ্ত উর্বরতাকে কেবল সম্ভাবনা হিসেবে দেখলে হবে না, এর ভেতরে
কুয়াশাও থাকে। কারও কারও প্রচারবাদ্যের শব্দ এত বেশি হয় যে, তাতে একটি মাঝারি লেখাও
ভালো হিসেবে খ্যাতি পেয়ে যেতে পারে। আবার প্রচারের অভাবে একটি ভালো লেখাও তেমন পাঠকপ্রিয়তা
নাও পেতে পারে। ফলে প্রচারকামীদের বাদ্যের শব্দদূষণে ক্লান্ত পাঠকের কাছে সমকালীন
‘সব লেখাই বাজে’ হলে পাঠককে দায়ী করা চলে না। কিন্তু মূলত সব লেখাই যে বাজে নয়, সেটাই
সত্য। জোরে বলার প্রতিযোগিতা সত্যের প্রতিযোগিতা নয়। এখন আমাদের দরকার এমন এক নীরব-অবসর,
যাতে ভালো লেখাকে চিনে নেওয়ার অবকাশ পাওয়া যায়।
সমকালীন গদ্যের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি
হলো, ভালো লেখা হচ্ছে, কিন্তু আমরা তাকে খুঁজছি পুরনো আলোয়। এই
সময়ের গদ্য হয়তো আগের মতো রোমান্টিক বা মহাকাব্যিক বা সুসংহত নয়। কিন্তু এই সময়ের গদ্য,
বেঁচে থাকার মতো, বিপন্নতার মতো, ভাঙা স্বপ্নের মতো, শহরের ধোঁয়ার মতো বিপর্যস্ত ও
অসরল। আর যদি আমরা সত্যি মন দিয়ে এইসব গদ্য পড়ি, তাহলে বুঝব, বাংলাদেশের গদ্য বন্ধ্যা
নয়। সে গর্ভবতী, প্রসব-বেদনা-আর্ত সে যেন মাতৃসদনের করিডোরে হাঁটছে। একদিকে জন্মের
সম্ভাবনা, অন্যদিকে ক্লান্তির দীর্ঘশ্বাস। আমরা পাঠকেরা দাঁড়িয়ে আছি সেই অব্যবস্থিত
করিডোরে। কেউ ধৈর্য হারিয়ে বলছি, ‘বাচ্চা
হবে না।’ কেউ বলছি, ‘আরে সময় দাও।
শুনতে পাচ্ছ, ভেতরে কিছু একটা নড়ছে!
হ্যাঁ, ভেতরে প্রাণ নড়ছে। বস্তুত
বাংলা গদ্যই নড়ছে। সে এখনও বেঁচে আছে।