× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তুমি না থেকেও

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:২৪ পিএম

তুমি না থেকেও

জুলাই মাসের শেষ বিকালের আলোটা ছিল পুরনো তামার মতোÑ মলিন, ভারী আর বিষাদগ্রস্ত। বৃষ্টি পড়ছিল। ঝমঝমিয়ে নয়; বরং ক্লান্তিহীন একঘেয়েমিতে, যেন আকাশেরও আজ কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। ঠিক যেমন অসীমেরও নেই।

শহরটা ভিজে চুপসে আছে। অসীম দাঁড়িয়ে ছিল সেই পরিচিত তিনতলার ফ্ল্যাটের দরজার সামনে। দরজার গায়ে লেগে থাকা পুরনো নেমপ্লেটÑ ‘অসীম ও ঐশী’Ñ এখন আর জ্বলজ্বল করছে না; বরং মরচে আর ধুলোর আস্তরে ঝাপসা হয়ে আছে। চাবিটা হাতে নিয়ে অসীম ভাবল, মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের নামগুলো দরজার কাঠে পেরেকের মাঝে গেঁথে থাকে। চাবি ঘোরানোর শব্দটা নিস্তব্ধ সিঁড়িতে বোমার মতো ফাটল। তালা খুলল। একটি ঘর, যা এতদিন শ্বাস বন্ধ করে ছিল, আজ হাঁফ ছাড়ল।


অধ্যায় ১ : ফিরে আসা

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই এক দলা বাতাস এসে অসীমের মুখে লাগল। বাতাস বলা ভুল, ওটা ছিল জমে থাকা সময়। ধুলো, পুরনো বইয়ের জীর্ণ গন্ধ, ন্যাপথলিন, আর... আর খুব ক্ষীণ, প্রায় নেই হয়ে যাওয়া ল্যাভেন্ডারের সুবাস। ঐশী।

অসীম জুতোর ফিতে না খুলেই ভেতরে ঢুকল। মেঝেতে ধুলোর আস্তরণ, অনেকটা ধূসর কার্পেটের মতো। দেয়ালগুলো তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সাদা চুনকাম করা দেয়াল, যেখানে একসময় ঐশীর আঁকা ছবি ঝুলত। এখন সেখানে কেবল চৌকো ফ্যাকাশে দাগ। ছবিগুলো নেই, কিন্তু ছবির অভাবটা ভীষণ স্পষ্ট। অনুপস্থিতি অনেক সময় উপস্থিতির চেয়েও ভারীÑ বেশি জায়গা দখল করে থাকে।’

জানালাটা বন্ধ ছিল, তবু মেঝেতে জলের ছোপ। অদ্ভুত! ছোপগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যেন কেউ ভিজে হেঁটে গেছে রান্নাঘর থেকে শোয়ার ঘরের দিকে। অসীম জানত এটা অসম্ভব, যুক্তিতে মেলে না। কিন্তু শোকের নিজস্ব যুক্তি থাকে, নিজস্ব পদার্থবিজ্ঞান থাকে।

সে ব্যাগটা নামিয়ে রাখল সেই ছোট কাঠের চেয়ারটার পাশে। চেয়ারটা এখনও ঐশীর অপেক্ষায়। তার পিঠের কাছে রাখা আয়নাটা ঘোলাটে। অসীম আয়নায় নিজেকে দেখল না। সে দেখল, আয়নার গভীরে একটা হাসির রেশ লেগে আছে। ঐশীর সেই হাসিÑ যেটা শুরু হতো ঠোঁটের কোণে আর শেষ হতো অসীমের বুকের বাঁদিকে।

হঠাৎ জানালার কাচে একটা ঝাপসা শব্দ। বাতাস? নাকি কেউ ডাকল?

অসীম দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘আলোটা কি এখনও বিকালে ওভাবেই পড়ে, ঐশী?’

দেয়ালের ছায়ারা উত্তর দিল না, শুধু কেঁপে উঠল। অসীম জানত, ঐশী এখানে নেই। আবার এও জানত, ঐশী এই ধূলিকণায়, এই বদ্ধ বাতাসে, জানালার গ্রিলে মরচে ধরা ক্ষতের মতো মিশে আছে।

 

অসীম ডায়েরি খুলে লিখলÑ

না-থাকার আবাদ

না-পাওয়ার আবাদ করছি, যেমন খরায় ফাটা জমিন চেনে লাঙলের ফলা।

না-হারানোর ত্রাস বুকে নিয়ে আমি এক চাষা,

অথচ তুমিই একমাত্র ফসল, যা আমার গোলাঘরে উঠল না।

তুমি নেইÑ এ কথা রাষ্ট্র জানে, সমাজ জানে,

তবু আমার হাড়ের ভেতর ক্যালসিয়ামের মতো তুমি মিশে আছো।

সন্ধ্যাবেলায় যখন গোয়ালঘরে মশা তাড়ানোর ধোঁয়া দেওয়া হয়,

সেই ঝাঁঝালো গন্ধে, সেই কুণ্ডলী পাকানো আঁধারেও আমি তোমাকে খুঁজি।

 

অধ্যায় ২ : স্পর্শের প্রশ্ন

রাত নামল নিঃশব্দে। শহরের সব কোলাহল যেন এই ফ্ল্যাটের বাইরে এসে থমকে গেছে। অসীম আলো জ্বালাল না। অন্ধকারের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, আলো জ্বালালে সেই ভাষা হারিয়ে যায়।

সে শোয়ার ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজাটা আধখোলা। ঐশী বলত, ‘দরজা পুরো বন্ধ করো না, বাতাস চলাচল করতে দিও। স্বপ্নরা বন্ধ দরজায় আটকা পড়ে যায়।’

সেই অভ্যাস আজও অসীমের শিরায়। সে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। বিছানার চাদরটা টানটান, যেন কেউ যত্ন করে পেতে রেখেছে, অথচ কেউ তো ছিল না।

তাকের ওপর একটা কাচের গ্লাস। তলানিতে খানিকটা পানি। অসীমের মনে পড়ল, ঐশী মাঝরাতে উঠে জল খেত। গ্লাসটা হাতে নিল সে। জলটা কনকনে ঠান্ডা। যেন বরফ। ঐশীর হাত দুটোও এমন ঠান্ডা থাকত। অসীম যখন সেই হাতে হাত রাখত, ঐশী বলত, ‘তোমার হাতটা তো আগুনের মতো, আমাকে পোড়াবে নাকি গলাবে?’

অসীম জানালা খুলল, পর্দা সরাল না। হুট করেই পর্দাটা উড়ল। খানিকটা সরে গেল। আজ বাইরের ল্যাম্পপোস্ট যেন সকাল ১০টার সূর্যের আলোর মতোই তেজী। ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ল বিছানায়। সেখানে ছড়ানো কিছু কাগজ, স্কেচবুক। বাতাসের তোড়ে একটা পাতা উল্টে গেল। অসীম ঝুঁকে দেখল। চারকোল দিয়ে আঁকা একটা স্কেচ। একটা ভ্রূণ। মায়ের জরায়ুর অন্ধকারে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে একটা ছোট্ট প্রাণ। তার চোখ দুটো খোলা, যেন সে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই সব জেনে গেছে।

ছবির নিচে ঐশীর লেখাÑ ‘আমার ভেতরে আরেকটা আকাশ তৈরি হচ্ছে। তুমি কি শুনতে পাও তার মেঘ ডাকার শব্দ?’

অসীমের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। সে জানত ঐশী শুধু শরীর দিয়ে মা হচ্ছিল না, সে তার সত্তা দিয়ে একটা নতুন মহাবিশ্ব বুনছিল। স্কেচবুকটা বুকে চেপে ধরল অসীম। কাগজের খসখসে স্পর্শে সে অনুভব করল এক হৃদস্পন্দন। যেটা থেমে গেছে, অথচ থামেনি।

সে ডায়েরিতে লিখলÑ

মরা কোষের মতো স্মৃতি

মনে পড়ে সেই ভরদুপুর?

যখন হেসে বলেছিলেÑ

‘ভালোবাসা তো আর কর্পূর নয়, যে বাতাসে উবে যাবে!’

অথচ দেখো, ভাতের হাঁড়িতে যেমন মাড় শুকিয়ে চামড়া হয়,

তেমনি আমার ভেতরটা এখন মৃত কোষের মতো খসে পড়ছে।

 

তোমার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা সেই হাসি,

যেন প্রজাপতির মতোÑ

ছেড়ে দিলে উড়ে যাবে, শক্ত করে ধরলে পিষে যাবে।

 

প্রতিটি রুটিন,

চায়ের কাপ, দরজার কড়চা,

ঘুমের ঠিক আগের মুহূর্তÑ

এমনকি ঘুমের মাঝেও তুমি।

কিন্তু বাস্তবে,

কোথাও নেই তুমি।

 

অধ্যায় ৩ : নামহীন নক্ষত্র

ভোর হলো। কাকের ডাক নয়, বরং দূরে কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের হুইসেল অসীমকে জাগিয়ে দিল। সে সারারাত চেয়ারেই বসেছিল। ঘুম আসেনি, এসেছিল তন্দ্রার মতো এক ঘোর। সেই ঘোরে সে শুনেছেÑ খুব ছোট্ট পায়ে হাঁটার শব্দ। টুপ… টুপ… টুপ…

 

মেঝের ওপর দিয়ে কেউ কি হেঁটে গেল?

অসীম রান্নাঘরের কোণে রাখা সেই ডায়েরিটা খুঁজে পেল, যেখানে তারা বাচ্চার নাম লিখে রেখেছিল। কালির আঁচড়ে কতগুলো শব্দÑ ‘অনির্বাণ’, ‘ঈশানি’, ‘অরুন্ধতী’, ‘রেহান’। নামগুলো এখন আর নাম নয়, একেকটা দীর্ঘশ্বাস। একেকটা না-হওয়া সম্ভাবনা।

ঐশী বলত, ‘নাম দিও না এখনই। নাম দিলে মায়া বাড়ে। আগে ওকে আসতে দাও। ওর কান্নার স্বর শুনে নাম দেব।’

কান্নার স্বর আর শোনা হয়নি।

এখন অসীমের মনে হয়, সেই নাম না-রাখা শিশুটি এই ফ্ল্যাটের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়। সে বড় হয় না, কাঁদে না, শুধু প্রশ্ন করে।

অসীম ডায়েরিতে লিখে রাখেÑ

প্রতীক্ষায় জমে থাকা পাথর

রাত বাড়ে, আমি জানালার গ্রিল ধরে ঝুলে থাকিÑ

যেন জেলখানার কয়েদি, নাকি মাজারের পাগল খাদেম?

তুমি কি ফিরবে?

নাকি মহাজনের খাতার মতো সব হিসাব-নিকাশ চুকে গেছে?

ঘড়ির কাঁটা যত এগোয়,

ততই পাথর জমে বুকের ভেতরÑ ওটা পাথর নয়,

ওটা না-বলা কথার জমাট দলা, যা অপারেশনেও বের করা যায় না।

নদীর মতো সময় গড়িয়ে যায়, ঘোলা জল বয়ে যায়,

আমি চাতকের মতো নই, আমি খরাকবলিত মাটির মতো হাঁ করে থাকি।

‘বাবা?’

শব্দটা কি সত্যি? নাকি মনের ভুল? অসীম রান্নাঘরের দেয়ালে হাত রাখল। দেয়ালটা ঠান্ডা।

‘তুই কি আছিস?’ অসীম ফিসফিস করে বলল। ‘তোর তো নাম নেই। তোকে কী বলে ডাকব? ‘শূন্যতা’? নাকি ‘স্মৃতি’?’

মনে হলো, রান্নাঘরের তাকে রাখা চায়ের কাপগুলো একটু নড়ে উঠল। যেন কেউ বলল, ‘নামের দরকার নেই। আমি তো আছি তোমার নিঃশ্বাসে। আমি সেই দীর্ঘশ্বাস, যা তুমি ফেলতে ভয় পাও।’

 

অসীম আজ ডায়েরিতে লিখলÑ

গুদামঘরের শূন্যতা

 

তুমি না থাকায়,

আমি এখন নিজেরই লাশ কাঁধে নিয়ে ঘুরি।

 

বন্ধুরা আসে, চা খায়, তর্কে মেতে ওঠে,

জীবন জীবনের নিয়মে গড়ায়Ñ বাজারদর বাড়ে, সরকার বদলায়।

কিন্তু আমার বুকে পাঁজরের তলে

একটি তালাবদ্ধ গুদামঘর, যার জানালায় জমেছে ধুলো,

আর সেখানে ইঁদুর আর আরশোলারা তোমার নাম কাটে।

আমি হাঁটি, হাসি, লোকারণ্যে যাই,

তবু মনে হয় তোমার না-থাকার ভার বুকে নিয়ে

আমি এক বাতিল মালগাড়ি টেনে বেড়াচ্ছি।

আকাশ বা জোছনা নয়,

রাস্তার ধুলো আর ড্রেনের কালচে জল দেখলেও তোমাকে মনে পড়েÑ

এতটাই পার্থিব আমার এই শোক।

 

অধ্যায় ৪ : নীল মলাটের ডায়েরি

বিকালের দিকে অসীম আলমারির নিচ থেকে খুঁজে পেল নীল মলাটের ডায়েরিটা। ‘নিসর্গ’। ঐশী নাম দিয়েছিল। এটা তার একান্ত গোপন জগৎ। অসীম আগে কখনও পড়েনি। আজ কাঁপা হাতে প্রথম পাতা উল্টাল।

 

তারিখ নেই। শুধু অনুভূতির দিনলিপি।

‘আজ খুব বৃষ্টি। আমার পেটের ভেতর ও নড়ছে। অদ্ভুত অনুভূতি। মনে হচ্ছে আমার শরীরের ভেতর দুটো ঘড়ি চলছে। একটার সময় আমার, অন্যটার সময় আমি জানি না। মাঝেমধ্যে খুব ভয় করে। মনে হয়, আমি কি পারব ওকে এ দুনিয়ায় আনতে? নাকি আমি নিজেই ফুরিয়ে যাব ওকে জায়গা দিতে গিয়ে?’

অসীমের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ঐশী ভয় পেত? ও তো সব সময় হাসত! সেই হাসির আড়ালে এমন মৃত্যুভয় লুকিয়ে ছিল?

পাতা উল্টাতে উল্টাতে শেষ দিকের একটা লেখা চোখে পড়ল। দুর্ঘটনার ঠিক দুদিন আগের।

‘তাকে বলা হয়নি… আমি রোজ রাতে দুঃস্বপ্ন দেখি। দেখি আমি নেই, শুধু একটা দোলনা দুলছে। অসীম একা দাঁড়িয়ে আছে। খুব বলতে ইচ্ছে করে, যদি আমি না থাকি, তুমি থেক। আমাদের দুজনের হয়ে থেক। তুমি ভেঙে পড়লে আমাদের বাচ্চার স্মৃতিটাও যে মরে যাবে।’

 

অসীম ডায়েরির ওপর মুখ গুজল। এত দিন সে শুধু নিজের শোক নিয়েই ছিল। জানত না, ঐশী তাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে গেছে। বেঁচে থাকার দায়িত্ব। স্মৃতির পাহারাদার হওয়ার দায়িত্ব। এই অক্ষরগুলো শুধু কালি আর কাগজ নয়, এগুলো ঐশীর রেখে যাওয়া ডিএনএ।

 

এবার অসীম নিজের ছোট্ট ডায়েরিটা বের করল, লিখলÑ

 

নীরবতা ভাষা

 

তুমি কোনো ইশতেহার ঘোষণা না করেই উধাও হলে।

না কোনো বিদায়, না কোনো স্লোগান,

শুধু এক আদিগন্ত নীরবতা রেখে গেলেÑ

বুঝিয়ে দিলে, ভাষার চেয়েও বড় রাজনীতি আছে বিচ্ছেদে।

নীরবতাও যে একটা ধারালো কাস্তে, যা দিয়ে গলা কাটা যায়,

তা তুমি প্রমাণ করে দিলে।

 

তোমার এই চলে যাওয়াটা কোনো কাব্যিক ভুল নয়,

এ এক জ্যামিতিক সত্য।

আমি তার অনুবাদ করার চেষ্টা করিÑ

কিন্তু আমার অভিধানে কেবল আর্তনাদ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

 

অধ্যায় ৫ : সময় যখন থেমে গিয়েছিল

বৃষ্টিটা বাড়ল। জানালার কাচে জলের ধারা পাগলের মতো আছড়ে পড়ছে। অসীমের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনটা। সেই অভিশপ্ত সকাল।

তখনও দিনটা ছিল সাধারণ। ঝকঝকে রোদ, আজকের মতো মেঘলা নয়। রোদেরও যে দাঁত-নখ থাকে, সেদিন বুঝেছিল অসীম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছিল সে। ফোনটা ছিল ভাইব্রেশনে। একবার, দুবার, তিনবার।

যখন ধরল, ওপাশের গলাটা খুব যান্ত্রিক।

‘মিস্টার অসীম? হাসপাতাল থেকে বলছি…’

বাকিটুকু আর শুনতে হয়নি। রাস্তা দিয়ে কীভাবে সে হাসপাতালে পৌঁছেছিল, মনে নেই। শুধু মনে আছে, হাসপাতালের সাদা করিডোরটা অনন্তকাল লম্বা মনে হচ্ছিল। আর সেই উৎকট ফিনাইলের গন্ধ। মৃত্যুর গন্ধ কি ফিনাইলের মতো হয়? নাকি ফিনাইল দিয়ে মৃত্যুকে ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়?

অপারেশন থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার বলেছিল, ‘উই আর সরি…’

এক মুহূর্ত। আর মাত্র তিনটি শব্দে অসীমের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সব চুরমার হয়ে গেল।

ঐশী শুয়েছিল স্ট্রেচারে। কপালে সামান্য ক্ষত। মনে হচ্ছিল ঘুমিয়ে আছে। এখনি উঠে বলবে, ‘এত দেরি করলে কেন?’

কিন্তু সে ওঠেনি। তার ভেতর বেড়ে ওঠা প্রাণটাও ঐশী সঙ্গে করে নিয়ে গেছে।

অসীম সেদিন কাঁদেনি। পাথর হয়ে গিয়েছিল। শোক যখন খুব বেশি হয়, তখন কান্না আসে না, আসে স্তব্ধতা। সেই স্তব্ধতা আজও তাকে ঘিরে আছে। প্রায় তিন মাস চিকিৎসার পর এক দিন কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের ঘরে ফেরে অসীম। এর আগে ডাক্তারের পরামর্শেই নিজের অনুভূতিগুলো ডায়েরিতে লেখা শুরু করে অসীম।

ডায়েরিতে সে প্রথম লিখলÑ

পুনরুত্থানের ডাক

তুমি কি কখনও ফিরবে?

রক্তমাংসের শরীরে না হোক,

অন্তত নবান্ন উৎসবে নতুন ধানের গন্ধে?

তুমি কি জানো,

আমার প্রতিটি পঙক্তি, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসÑ

একেকটা আইনি দলিল, তোমার অনুপস্থিতির জবানবন্দি?

যদি তুমি শোনো, যদি তুমি বোঝোÑ

এই হৃদয়ের ভাঙা দরজার শব্দ,

যা প্রতি রাতে মাথা কোটে তোমার না-থাকার দেয়ালে।

আমি আর কিছু চাই না।

শুধু একবার,

বানের জলের মতো দুকূল ছাপিয়ে এসোÑ

ভাসিয়ে নাও এই একলা আমাকে।

সব পথ, সব নদী, সব কাঁটাতার শেষেÑ

দিনশেষে আমি দাঁড়িয়ে থাকি,

যেন এক পরিত্যক্ত দ্বীপ, যার কোনো মানচিত্র নেই।

 

অধ্যায় ৬ : অস্তিত্বের কুয়াশা

রাত গভীর। অসীম বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির ছাঁট আসছে।

হঠাৎ তার মনে হলো, সে একা নয়।

কাঁধের ওপর একটা পরিচিত হাতের স্পর্শ। খুব হালকা। পালকের মতো।

অসীম চমকে পেছনে ফিরল না। সে জানে, ফিরলে কেউ নেই। কিন্তু না ফিরলে? না ফিরলে ঐশী আছে।

‘তুমি ভিজছ কেন?’ সেই গলা। সেই আদুরে অনুযোগ।

অসীম মনে মনে উত্তর দিল, ‘ভিজছি না তো। আমি তো কবেই জমে গেছি, ঐশী। আজ মনে হয় সে জমাট ভাঙবে।’

কণ্ঠস্বরটা বাতাসের সঙ্গে মিশে কানে এলোÑ ‘আমি তো যাইনি। আমি এই বৃষ্টির ফোঁটায় আছি। ওই যে রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট, বাড়ির সামনের দেবদারু গাছটা; সেখানেও আমি আছি।’

অসীম কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘আর… আমাদের বাবুটা?’ ‘ও আছে ওই জোনাকিদের মাঝে।’

অসীম দেখল, বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে একটা জোনাকি পোকা ঘরে ঢুকল। অন্ধকারে মিটমিট করছে আলোটা।

‘তুমি কি আমার ছেলে? নাকি মেয়ে?’ অসীম মনে মনে প্রশ্ন করল।

জোনাকিটা তার হাতের ওপর এসে বসল। এক মুহূর্তের জন্য। তারপর উড়ে গেল ক্যানভাসের দিকে।

অসীম বুঝল, শোকের কোনো সমাপ্তি নয়। শোক হলো ভালোবাসারই আরেকটা রূপ। যার নাম নেই, যার শরীর নেই, তাকেও ভালোবাসা যায়। এই না-থাকাটাই এখন তাদের নতুন সংসার।

অধ্যায় ৭ : পুনর্জন্ম

পরদিন সকালে আকাশ পরিষ্কার। রোদের আলোয় ঘরটা অন্যরকম লাগছে। ধুলোগুলোকে মনে হচ্ছে সোনালি রেণু।

অসীম তার পুরনো ইজেলটা বের করল। কত দিন রঙতুলি ছোঁয়নি সে! টিউবগুলোর রঙ শুকিয়ে গেছে কি না, কে জানে!

সে একটা নতুন ক্যানভাস চড়াল।

সাদা ক্যানভাস। শূন্যতা।

সে তুলি ডোবাল নীল রঙে। ঐশীর ডায়েরির মলাটের মতো নীল।

আঁকতে শুরু করল। কোনো মানুষের মুখ নয়। সে আঁকল বৃষ্টি, আঁকল একটা খোলা জানালা, আর সেই জানালার বাইরে একটা ঝাপসা অবয়বÑ অর্ধেক নারী, অর্ধেক লতাগুল্ম। তার কোলে এক মুঠো আলো।

 

ছবিটা শেষ হওয়ার পর অসীম নিচে লিখে রাখলÑ ‘তুমি না থেকেও।’

সেদিন বিকালে অসীম লিখতে বসল। ডায়েরির পাতায় নয়, কাগজের বুকে। সে লিখল তাদের গল্প। লিখল সেই না-হওয়া সন্তানের কথা, যার নাম রাখা হয়নি কিন্তু যার অস্তিত্ব নক্ষত্রের চেয়েও উজ্জ্বল। সে লিখল বৃষ্টির কথা, পুরনো তালাবন্ধ ঘরের কথা।

লেখাটা শেষ করে সে যখন জানালার দিকে তাকাল, দেখল কাচের ওপর বাষ্প জমেছে। সেখানে একটা আঁচরের দাগ। যেন কারও নিজের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার চেষ্টা।

অসীম হাসল। বহু দিন পর।

ঐশী নেই। সন্তানটি নেই।

কিন্তু অসীম আছে। আর অসীমের এই থাকা মানেই তারা সবাই আছে।

মৃত্যু মানুষকে কেড়ে নেয়, কিন্তু ভালোবাসাকে স্পর্শও করতে পারে না। তারা এখন অসীমের সত্তায়, তার ক্যানভাসে, তার শব্দের মিছিলে বেঁচে আছে।

নদী সাগরে মিশলে নদী শেষ হয় না, সে সাগর হয়ে যায়। অসীম এখন সেই সাগর। তার ঢেউয়ে দুলছে ঐশীর স্মৃতি, আর অনাগত সন্তানের নামহীন অস্তিত্ব।

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা