ইরাজ আহমেদ
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৮ এএম
প্রতিকৃতি : মাসুক হেলাল
ধ্রুব কত বদলে গেছে! কিছুদিন আগে ওর পল্টনের আস্তানায় দুপুরবেলা আড্ডা দিতে দিতে মাথায় ঢুকে পড়েছিল ভাবনাটা। বসে বসে অনেক বছর আগে ওর চেহারাটা মনে করতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম। মনে হচ্ছিল, এই তো... এই শহরেই আমাদের দেখা হয়েছিল। দেখতে কেমন ছিল এই ধ্রুব তখন? এখন মনে করতে পারি না। কৃশকায় এক শিল্পী তখন। বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকিয়ে; যার ভাবনা আর শিল্পবোধ বাংলাদেশে বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরির গোটা প্রক্রিয়াটিকে পাল্টে দিয়েছে। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে এক মেসবাড়িতে ধ্রুবর সঙ্গে এক দুপুর অনেক আড্ডা হলো। সে তো নব্বইয়ের দশকের গোড়ার কথা! তারপর কত শীত-বসন্ত অতিক্রম করেছে আমাদের। এখন ধ্রুব আবারও একটি কাকের বাসার দখল নিয়ে আছে এই শহরেই। এখনকার ধ্রুবর সঙ্গে কয়েক দশক আগে দেখা ধ্রুবর শারীরিক ও মানসিক অবয়বে মেরুদূর প্রভেদ। অনেকটা সময় তো পেরিয়ে এলাম! ধ্রুবর অনেক বদলের মধ্যে কিন্তু তার মনটা পাল্টায়নি। এই এক জায়গায় শিল্পী মানুষটির জয় হয়েছে। আজও ধ্রুবর সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে মনে হয় চারপাশে কত কী বদল হলো কিন্তু ধ্রুব এষের মনটা সেই একই রয়ে গেল। কথায় সেই সারল্য, রাগ-ক্রোধের প্রকাশ, হাসির শব্দ, কথা বলার ভঙ্গির ভেতরে অন্য একজন আড়াল তৈরি করা মানুষ দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।
আমরা এই শহরের পথে পথে হেঁটেছি অনেক। ফুটপাতে পুরনো বই ঘাঁটতে গেছি, শীতের দুপুরে বোয়াল মাছের ঝাল ভুনা আর ভাত খেয়ে ধ্রুবর অন্য এক নিবাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থেকেছি উদাস হয়ে, ধ্রুব হলদেটে বাল্বের ম্লান আলোর নিচে ঝুঁকে বসে ছবি আঁকছে; দেখছি ধ্যানমগ্ন এক শিল্পীকে। এ রকম অসংখ্য ছবির কাট শটের ভেতরে ধ্রুব কিন্তু সেই অখণ্ড মনটাকেই
ধরে আছে। ধ্রুবর সঙ্গে দেখা হলে পুরনো দিনের গল্প হয়। পরচর্চাও হয় বিস্তর। আমাদের জীবন থেকে এই নিছক গল্প করার সময়টাও এখন তিরোহিত হয়েছে। কিন্তু ধ্রুবর ভেতরে বিষাক্ত ক্ষতের মতো কোনো কিছু বাঁচে না। তার মনের মধ্যে একধরনের প্রবহমানতা আছে। হয়তো তার ভাবনার প্রবাহ, ভাবনার সঙ্গে নিজস্ব বোধকে মিশিয়ে দেওয়া প্রবাহ, হয়তো মগ্নতার প্রবাহ। শিল্পী ধ্রুব এষের এই মগ্নতাই হয়তো জীবনের সব কাড়াকাড়ির বাইরে বাঁচিয়ে রাখে তাকে। অনেক দিন বিরতির পর আচমকা দেখা হয়ে গেলে ধ্রুব এমন ভঙ্গিতে কথা
বলতে শুরু করে যেন গতকালই দেখা হয়েছে আমাদের। এই ভঙ্গিতে খুব সহজে মানুষের মনের মধ্যে ধ্রুব এষ প্রবেশ করে। এই শিল্পী মানুষটির মধ্যে অদ্ভুত এক ধূসর রঙের নীরবতা আছে। কেন জানি মনে হয় এই নীরবতার অবিচ্ছিন্ন অনুভূতি ধ্রুবকে রঙ চিনিয়ে দিয়েছে, নিজের মনের ভেতরটা দেখতে শিখিয়েছে, ভাবতে শিখিয়েছে। পাশাপাশি শিখিয়েছে তার অনন্য মানুষ জড়ো করার স্বভাব। ধূসর রঙা কঠোর নীরবতা, কাজের ভেতরে তলিয়ে যাওয়ার যে একটি প্রতিবন্ধকতা আছে ধ্রুবর নিকটবর্তী হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কিছু মানুষ তা টপকে জুড়ে যায় তার সঙ্গে। বাইরে থেকে ধ্রুবর বিমুখ প্রান্তরের প্রতি অন্যদের গভীর টান, গভীর মায়া লক্ষ করি। এই অনুভূতি অথবা আবেগের নাম আসলে ভালোবাসা। নানা ধরনের মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছে ধ্রুব। একজন শিল্পীর জন্য এই ভালোবাসার চেয়ে বড় অর্জন আর নেই বলে মনে হয়। ধ্রুবর চরিত্রের দুর্বোধ্যতা আর নিজের ভেতরে বসবাস করার প্রবণতাকে অতিক্রম করে মানুষ এই শিল্পীকে ভালোবেসেছে। ধ্রুব কি এই ভালোবাসার সবটা টের পায়? নিশ্চয়ই পায়। হাজার হাজার বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পী তাই এগিয়ে চলার শক্তিটুকু পায়। শুরুতে বলছিলাম, কয়েক দশক ধরে আমাদের এই পরিচয়ের পালা বয়ে চলেছে। এই শহরের কোলাহল, অভিসন্ধি আর নৃশংসতার ভেতর দিয়ে ভীষণ নির্জন এক শিল্পী বয়ে চলেছে তার নিজের লক্ষ্যের দিকে। তার শিল্পযাত্রা তার লেখা তাকে তার ইচ্ছার, আকাঙ্ক্ষারই নিকটবর্তী করুক, এই কামনাই করি। ধ্রুব এষের ষাট বছরে পদার্পণ তাকে নতুন নির্জন দ্বীপ খুঁজে নিতে আলো ফেলুক নতুন পথের ওপর।