কুমার দীপ
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৫৬ পিএম
শীতের হিমেল সকাল। চিত্রকর্ম: হামিদুজ্জামান খান
সা.
ইচ্ছে করছিল না। উষ্ণ আদরে জড়িয়ে রাখা গরম বিছানা-কম্বল ছেড়ে, একদমই ইচ্ছে করছিল না উঠতেÑ এই কলিজা কাঁপানো শীত প্রত্যুষে। কিন্তু শৈশবের ইচ্ছেÑ জীবন তো আর এ সংসারে বেশি দিন থাকে না, তাই উঠতেই হয়Ñ সংসার জীবনের জোয়াল এসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ডাক দেয়। অগত্যা, অনিচ্ছার আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে পাঁজর ভাঙা বেদনা নিয়ে উঠেই পড়লাম। অতঃপর অনিবার্য জলস্পর্শের যন্ত্রণা সয়ে, বাড়তি পোশাক-আশাকের বোঝা শরীরে চাপিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘরের বাইরে পা রাখলাম। ও-মা, যেন মশারির ভেতর থেকে বের হয়ে আরেকটি মশারির মধ্যে এসে হাজির হলাম!
রাত প্রায় একই রকমের অথচ তা শেষ হলে কত রকমের সকালের দেখা হয়! গতকাল সকালে যখন বাড়ির বাইরে বের হই, দু-হাত বাড়িয়ে আমাকে আলিঙ্গন করেছিল কুসুম কুসুম রোদ। অথচ আজ পুরো বাড়িটা ঘিরেই মশারি টাঙিয়ে রেখেছে শুভ্র কুয়াশা! শুধু কি বাড়ি? যেদিকে চোখ যায়, আদিগন্ত কুয়াশার মেলা! যেন পৃথিবী জুড়েই কুয়াশা-মশারি টাঙানো! যেন কাফনের কাপড় হাতে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে রয়েছেÑ পৌষের হিমেল সকাল!
পথরোধ করলেই কি আর পথচলা থামানো যায়? জীবিকার মহিষ বরং পিছু তাড়া করে! পা চালাতে চালাতেই দেখি, কুকুরটা কুঁকড়ে পড়ে আছে বালুর ঢিবিতে, চোখের জলে পথ ভেজাচ্ছে পথের পাশের প্রবীণ খেজুর গাছ। ডানে তাকাই। অদূরের পুকুর ঘাটকে মনে হয় কত সুদূরের! বাঁদিকের শীতলা মন্দিরের টিনের চালাটিও চিনতে পারছি না।
রাস্তায় হাঁটছি, হাঁটছে আরও অনেকেই, যার যার প্রয়োজনের পা। কেউ কাউকে ঠিকঠাক দেখছি কি? শৈশবে এ রকম কুয়াশা সকালে, বাবা বলতেন, ধীরে চলো ব্যাটা। না হলে হোঁচট খাবি! আমার দ্রুত হাঁটার অভ্যেস। আর পথটাও এবড়ো-খেবড়ো। জানা ছন্দ, ভেঙে ভেঙে যেতে চায়। চেনা পথ, অচেনা মনে হয়। সহসা দুলে ওঠে আমারই কয়েকটি পঙ্ক্তিÑ
কুয়াশা গভীর হলে
চারদিক অদেখা রয়ে যায়
‘চেনা’কেও মনে হয়Ñ কী!
কাছের মানুষটিও হয়ে ওঠে
এক দূরের পৃথিবী।
রে.
বেশখানিকটা দেরিতেই উঁকি দিল সূর্য। দিনের প্রভু। দ্বীনেরও বটে। শীতার্তের পরম প্রণয়। কিন্তু সেই তেজ কোথায়! সেই উজ্জ্বল উষ্ণতা! কুয়াশা মেঘের জাল ছিন্ন করে যেটুকু আলো এসে পৌঁছাচ্ছে এই বঙ্গমৃত্তিকায়, তার কোনো যৌবন নেই!
তবুও ঘড়ির কাঁটা যখন দ্বিপ্রহর ছুঁইছুঁই, ধীর পায়ে প্রস্থান করছে কুয়াশাকন্যা। ক্ষীণায়ু শোকের মতো মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে হিমস্নিগ্ধ শিশির। শিশিরে সিক্ত শরীরগুলো শুকিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে চারদিকের গাছপালা, মৃত্তিকার বুক। হৃদয়ে উঁকি দিচ্ছেÑ স্মৃতির উনুন।
ছেলেবেলার উঠানে শীতের সকালগুলো কী যে মহিমা নিয়ে হাজির হতো! চার দশক আগের সেই বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে তখনও গরম ভাতের রেওয়াজ শুরু হয়নি বললেই চলে। গরমের দিনে জলে ভিজিয়ে রাখা পান্তা আর শীতের সকালে জল না দেওয়া ঠান্ডা ভাতের দলা। আমরা বলতাম ‘ককোড় ভাত’। সেই ককোড় ভাত আর রাতেরই উদ্বৃত্ত, ঠান্ডা তরকারির বাটিটা নিয়ে নরম রোদের উঠানে বসে যেন শরীরের সঙ্গে সঙ্গে ভাত-তরকারিটুকুও রোদে সেঁকে নিতে নিতে পরমানন্দে খাওয়া। এখনকার ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত-তরকারিতেও সেই আনন্দ মেলে কি? শৈশবের নিরামিষের কাছে প্রৌঢ়ের মাছ-মাংসের স্বাদও যে ফিকে হয়ে যায়!
গা.
পৌষদিবসের আয়ু বড় অল্প। কর্মস্থল থেকে ফিরতে ফিরতে সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়লে যুদ্ধের আয়োজন বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। কেউ কেউ অবশ্যই সকালেই যুদ্ধটা জিতে নেয়, কেউ আবার এই যুদ্ধের মুখোমুখি না হয়ে সন্ত্রস্ত প্রজার মতো আগেই পরাজয় স্বীকার করে মিইয়ে পড়ে। হ্যাঁ, যুদ্ধই তো। এমন দোর্দণ্ডপ্রতাপী শীতের দিনে স্নান করাটা একটা যুদ্ধই। মনে পড়ছে প্রায় দুই যুগ আগের এক দুপুরের কথা।
রাজশাহীর তাপমাত্রা সেদিন সাড়ে চার কী পাঁচ ড্রিগ্রিতে নেমেছে। রোদহীন উত্তুরে হাওয়া বুকের ভেতর পর্যন্ত কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। সকালে সেলিম ভাইয়ের দোকানের সামনে নাশতা করতে গিয়ে মনে হলোÑ জলও একটু ঘন আর ভারী হয়ে পড়েছে! এমন দিনে স্নান করাটা স্রেফ বোকামি বলেই মনে হয়, কিন্তু পরের দিন তাপমাত্রার সামান্য উন্নতি ঘটলে যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতিটা নিয়েই ফেললাম! বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একেবারে পূর্বপ্রান্তে, সৈয়দ আমীর আলী হলের উত্তরে আর নবাব আব্দুল লতিফ হলের পূর্বের মাঠটিতে কয়েকজন মিলে নেমে পড়লাম ক্রিকেট খেলতে। ব্যাটে-বলে গা গরম করে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম ড. শামসুজ্জোহা হলের পুকুরজলে; শৈশব-কৈশোরেও নানাভাবে গা-গরম করার কসরত শেষে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তাম গ্রামের পুকুরে। আহা, শীতপুকুরে লাফ দিয়ে ঝুপ করে ডুব দেওয়ার সেই চ্যালেঞ্জভরা রোমান্সকর মুহূর্তটুকু!
এখন শহুরে বাসায় লাফালাফির জায়গা নেই। সময়ইবা কোথায়? পল্লীদুপুরের রোদে শরীর তাতিয়ে নেওয়ার বদলে জলটাকেই নানাভাবে গরম করে নিই বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মন্ত্রে।
মা.
বিকাল মাঠের ফুটবলে-ক্রিকেটে-দাড়িয়াবান্ধায় গা গরম শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ঝুপ করে সূর্যের আলো নিভে যাওয়া সেই শীত-সন্ধ্যাগুলোতে পুকুরে হাত-পা ডুবিয়ে মায়ের উনুনের পাশে বসে আগুন পোহানো আরামের রাত ঘনিয়ে এলে বই পড়ার চেয়ে বিবিধ রঙ-রূপের গল্প শোনাতেই ওম পেতাম বেশি। আর হাট-ফেরত বাবা যখন নলেন গুড়মাখানো মুড়ির মোয়া এনে হাতে দিতেন, সেই আনন্দ-আস্বাদন আর কোথায় পাব? এখন বিকালে বরং নিজেকে একটু কম্বলে মুড়ে নিতে না পারলে সন্ধ্যার পড়ালেখাটা জমে না। আর গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে এই যে শীত সন্ধ্যায় লিখছি, এ-ও এক অনিন্দ্য আনন্দ বটে!
পা.
বিজলি আলোর পোশাকে সেজে থাকা এখনকার রাতগুলো ডিঙিয়ে মাঝেমধ্যে হিম কুয়াশার অন্ধকারে মোড়ানো গ্রামের দিকে মন চলে যেতে চায়। হাঁটতে হাঁটতে আজ যখন শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে গেলাম, প্রিয় ভৈরব অন্য সময়ের মতো আমাকে হাতছানিতে ডাক দিল না! বরং হাড়কাঁপানো হিমেল বাতাস ঠেলে দিয়ে আমাকে বলতে চাইলÑ এদিকে এসো না ভাই, দেখছ নাÑ হিম-পৌষের রাতে আমিই কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছি শীত-অসুখে!
তবুও অচেনা মাঝির পথরেখা বেয়ে এগিয়ে যাই পায়ে পায়ে। ভৈরবে ভাটির টান। সেই টানে, ভেসে চলেছে সারি সারি কচুরিপানা। উত্তরের হিম-হিম হালকা বাতাসে ওরাও সুশৃঙ্খল পদাতিকের ধরনে এগিয়ে চলেছে নিম্নভূমির দিকে। আকাশের কার্নিশে ঝুলছে ধূসর পূর্ণচাঁদ। হায়, পূর্ণিমা চাঁদ এত স্নান, এত ধূসর জ্যোৎস্না বিলোচ্ছেÑ যেন কুয়াশার জাল ভেদ করে এই জনপদে পৌঁছাতেই পারছে না! বাঁশ-কাঠ দিয়ে বানানো ছোট্ট ঘাটের কাছে বাঁধা নৌকাটিও যেন ঠান্ডায় কাঁপছে। নদের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যে শীতল বাতাস উঠে আসছে, তার দাপটে দাঁড়িয়ে থাকা দায়।
মনে পড়ে গেল মহাভারতের মহাবীর ভিমের কথা। মাতা কুন্তীকে একবার বলেছিলেনÑ মা, আমার চেয়ে শক্তিশালী বীর কেউ কি আছে? কুন্তি বলেছিলেনÑ আছে। ভিম সেই বীরের সাক্ষাৎ চাইলে মা তাকে রাতের বেলায় নদীর তীরে গিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। তো, প্রায় খালি গায়ে থাকতে অভ্যস্ত ভিম রাতের বেলায় নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরেও সেই বীরের দেখা না পেয়ে বাড়ি ফিরে এসে মায়ের ওপরে বিরক্তি প্রকাশ করে বললেনÑ মা, তুমি যে বললে, আমার চেয়ে বড় সেই বীর আসবে, কই, কেউ তো এলো না! মা বললেনÑ রাত তো এখনও অনেক বাকি, তুমি ফিরে এলে কেন? ভিম বলেÑ দাঁড়িয়ে থাকতে নদীর প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাসে আমার শরীরে কাঁপন ধরেছে, তাই ফিরে না এসে পারলাম না, মা। মা হেসে বললেনÑ যে তোমার শরীরে ঠকঠক কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠিয়েছে, সে-ই তো তোমার চেয়ে বড় বীর!
ধা.
শীত পোশাকে মোড়ানো, তবু গরম চা না হলে কী আর শীত রাত পোহানো যায়? পিছন-পথে পা বাড়ালাম। এই অচলপ্রায় শীতের রাতেও খোলা আছে মিন্টু দার চায়ের দোকান। কত মানুষের গল্প ও নাম, জাগিয়ে রাখে তার চায়ের সুনাম! অপেক্ষার প্রহর শেষে উষ্ণ ঠোঁটে এগিয়ে আসে চায়ের কাপ, রেড ওয়াইনের মতো ঝকঝকে লাল।
একেকটি কাপের ঠোঁটে জেগে আছে ভিন্ন ভিন্ন চুম্বনের দাগ! চুম্বনেই উষ্ণতা। উষ্ণতার প্রত্যাশাÑ কত কাঙ্ক্ষিত মানুষের কাছে! কত আবেদনময় মুহূর্তের প্রেম! তবু মানুষ এত ঈর্ষা বুকে বাঁচে! এত ঘৃণা! এত অপরমার্থের স্বেদে ধুঁকে ধুঁকে, এমন উন্মত্ত ক্রোধের আগুন জ্বলে জ্বলে, এত শ্মশান শ্মশান খেলে কেন পৃথিবীর বুকে!
এক জীর্ণ প্রবীণ; পাগল বলেই মনে করে লোকে, যদিও পাগলের মতো প্রলাপ তো দূরÑ আমি তাকে কোনোদিন কোনো কথা বলতেও শুনিনি। তিনি এই শীতের কাঁপুনি ধরা রাতেও ভৈরবলগ্ন পথরেখা ধরে, তার সেই কাপড়ের পোঁটলাটি কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন। কত বছর ধরে তাকে দেখছি শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে হেঁটে বেড়াতে; যতবার দেখি, গ্রিক পুরাণের এটলাসের কথা মনে পড়ে যায়। এটলাসের মতো পৃথিবীকে কাঁধে করে বেড়ানো এই লোকটাকে আমি কখনও খেতে দেখিনি, হাসতে দেখিনি, কথা বলতে দেখিনিÑ শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা একই রকমে হেঁটে যেতে দেখেছি এই ছোট্ট শহরের রাস্তায়। এই অসহিষ্ণু, স্বার্থান্ধ, সহিংস আর ক্ষমতালিপ্সু সময়ে বসে এমন আশ্চর্য নির্বিকার মানুষটিকে যতবার দেখি, মুহূর্তেই ভাবান্তর ঘটে ভেতরে। কিছুক্ষণের জন্য ‘অন্য’ হয়ে যাই। জীবনানন্দ এসে ডাক দেনÑ ‘তোমার আকাশে তুমি উষ্ণ হয়ে আছ, তবু-/ বাহিরের আকাশের শীতে/ নক্ষত্রের হইতেছে ক্ষয়, নক্ষত্রের মতন হৃদয়/ পড়িতেছে ঝরে-/ ক্লান্ত হয়ে শিশিরের মতো শব্দ করে!/ জানো নাকো তুমি তার স্বাদ,/ তোমারে নিতেছে ডেকে জীবন অবাধ,/ জীবন অগাধ!’ অতল ভাবনা-সাগরে পতিত হই।
নি.
ফেরার পথে পা বাড়াতেই আবারও শীতের বার্তা ধরিয়ে দেয় উত্তরের হিমেল পরশ। জ্যাকেটের পকেটে হাত রেখে নিরাপদে বাসায় পৌঁছানোর তাগিদ অনুভব করি। শহীদ মিনারের মোড় ঘুরে স্বাধীনতা উদ্যানের সামনে দিয়ে প্রেস ক্লাবকে বাঁ-হাতে রেখে যখন ডানের গলিতে ঢুকি, সেই পাগলিনীর চিৎকার কানে আসে। প্রস্তাবিত ডায়াবেটিস হসপিটালের বিপরীতের পরিত্যক্ত বাড়িটার একটি কোণে ছিঁড়া কাপড় টাঙিয়ে বসত গড়েছে সে! তার সেই হাড় জির জিরে কৃশকায় ছেলেটি কোথায়? কত কিছু ভাবি, কিন্তু দাঁড়াতে সাহস হয় না। পা দ্রুততর হয়।
শরীরে-মনে, সর্বব্যাপী শীতের গভীর ক্ষত নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে কানে আসে বেহাগ রাগÑ ‘শূন্য করে ভরে দেওয়া যাহার খেলা/ তারি লাগি রইনু বসে সকল বেলা/ শীতের পরশ থেকে থেকে যায় বুঝি ওই ডেকে ডেকে,/ সব খোওয়াবার সময় আমার হবে কখন কোনো সকালে।’ কিছুটা সহজ হই। রবীন্দ্রনাথ এভাবে খোয়াবার বেদনাকেও সহজ করে দিতে চান। তবু উষ্ণতার আহ্বানে বাসায় প্রবেশ করতে করতে মনে হয়Ñ শীত আর উষ্ণতার প্রহেলিকা, এ কি সকলকে পারে ডোবাতে? কিংবা ভাসাতে?