× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মোহনপুরে কখনও মল্লিকরা বাস করেননি

মাহমুদুর রহমান

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২১ পিএম

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২২ পিএম

চিত্রকর্ম: জান মাতুলকা

চিত্রকর্ম: জান মাতুলকা

নির্জন যখন বাস থেকে নামলেন, তখন সকাল খানিকটা গড়িয়েছে। রাতের বাস ধরে এসেছেন তিনি। উপজেলা অবধি আসেন মানিক পরিবহনের বাসে। সার্ভিস কিছুটা খারাপ হলেও উপজেলা পর্যন্ত আসতে পারবে বলেই মানিকে উঠেছিল। সালেহীন ভাই বলে দিয়েছিলেন। আসতেও চেয়েছিলেন কিন্তু নির্জন চাননি তার অজানা সময়, ইতিহাসের খোঁজের সঙ্গে অন্য কেউ যুক্ত হন। একাই রওনা হয়েছিলেন বৃহস্পতিবার রাতে। তার গন্তব্য মোহনপুর।

নির্জনের আবছা মনে পড়ে কিছু স্মৃতি। তিনটা ভ্যান, কিছু তোশক-বালিশ, কাপড়ের গাটরি, কয়েকটা চটের ব্যাগ আর ১২ জন মানুষ। তার মধ্যে তিনজন বৃদ্ধ আর চারজন  শিশু। বাস, ট্রলার, নৌকা বদলে ওরা পৌঁছেছিলেন খেপুপাড়াÑ নানাবাড়িতে। তার বছর তিনেক পর ঢাকায়। বহু দিন পর মা সালেহা মল্লিকের কাছে এই গল্প শুনে নিজের আবছা স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন বিজন। তার মনে হতো এসব বুঝি পার্টিশনের স্মৃতিকথা বা কোনো লেখকের উপন্যাসের দৃশ্য। কিন্তু না। বিরানব্বই সালের এক সন্ধ্যায় তাদের ভিটা ছাড়তে হয়েছিল।

সাঁইত্রিশ বছর বয়স এখন নির্জন মল্লিকের। গত বত্রিশ বছরে তিনি বা তার পরিবারের কেউই মোহনপুরে যাননি। বাবা আরেফ মল্লিক তার ভিটা ছাড়ার পর একবারের জন্যও মোহনপুরের নাম নেননি। এক তীব্র অভিমান ছিল। সম্ভবত সেই সব মানুষের জন্য না, যারা তাকে ভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন, বরং সেইসব মানুষের জন্য, যাদের জন্য আরেফ গড়েছিলেন স্কুল, পাঠাগার এমনকি বানাতে চেয়েছিলেন একটা থিয়েটার। সেই থেকেই তো বিদ্বেষের শুরু।

সেসব কথা মনে করতে চান না নির্জন। বত্রিশ বছরের পুরনো স্মৃতিও মুছে ফেলতে চেয়েছেন অনেকবার। তবে কম বয়সের স্মৃতি বলেই হয়তো তাড়াতে পারেননি। তা ছাড়া সালেহা যেভাবে তার ঘর, পুকুরঘাট, ধান মাড়াইয়ের গল্প করতেন, সম্ভব না সেসব ভুলে যাওয়া। যে স্মৃতি তার ছিল না কোনো দিন, তা-ও তৈরি হয়েছিল। 

উপজেলা পরিষদের সামনে একটা টং চোখে পড়ল নির্জনের। অনেকক্ষণ চা খাওয়া হয়নি। দোকানের সামনে গিয়ে চাওয়ালাকে বললেন, ‘মামা, একটা দুধ চা দেন। চিনি দেওয়ার দরকার নেই।’

লোকটা তাকাল একবার পূর্ণ দৃষ্টিতে। সকালে তখনও এই জায়গায় তেমন কোনো ক্রেতা নেই। উপজেলা পরিষদের কাজ শুরু হতে হয়তো এখনও দেড় দুই ঘণ্টা দেরি। নির্জন বসলেন বেঞ্চিতে। সাধারণত এসব দোকানদার খুব কথা বলেন। নিয়মের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে লোকটি চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাজান আসতিছেন কই থেকে?’

‘ঢাকা থেকে’Ñ কাপটা হাতে নিয়ে জবাব দেন নির্জন।

‘সিগ্রেট দিমু?’, জানতে চাইলেন দোকানি। নির্জন না বলে দিলে লোকটি আবার বলেন, ‘কনে যাবেননি?’

‘মোহনপুর’, সংক্ষেপে উত্তর দিলেন নির্জন। তিনি জানেন মিনিটখানেক লোকটা কোনো কথা বলবে না। সেই ষাট সেকেন্ড পার হলে দোকানি আবার বলেন, ‘মোহনপুর কোন বাড়ি যাবেন?’

এবারও এক শব্দে উত্তর দেন নির্জন। তবে উত্তর দেওয়ার সময় তীব্র চোখে লক্ষ করে দোকানির মুখের ভাব। কেননা, ‘মল্লিকবাড়ি’ বলার পরই তিনি লক্ষ করে লোকটার মুখের সবগুলো রেখা বদলে গেছে। কেননা, দৈনিক আলোর বার্তার ফিচার এডিটর নির্জন মল্লিক খোঁজ নিয়ে জেনেছেন মোহনপুরে মল্লিক বলে কোনো বংশের কথা সেখানকার মানুষ কখনও বলেন না।

স্মৃতি আর নিজের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে ভ্যানে চড়ে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে নির্জন দেখেন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ‘শিকদার ভিলা’।

২.

ইতিহাস বদলে যায় সময়ের সঙ্গে। যাদের হাতে ক্ষমতা থাকে তারাই বদলে ফেলে। আর মানুষরা সেটাই বিশ্বাস করে, যা থাকে তাদের সামনে।

দুই দিন আগে অফিসের ডেস্কে বসে খবর পড়ছিলেন নির্জন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন বিশেষ বাহিনী। ট্রাম্প সে কথা ফলাও করে প্রচার করছে। দেশি-বিদেশি পত্রিকাগুলো নিউজ, ফিচার প্রকাশ করছে ভেনেজুয়েলার তেলের মজুদ নিয়ে। কিন্তু ট্রাম্প বলছেন, ভেনেজুয়েলায় স্বৈরশাসন চলছিল। আর বহু মানুষ বিশ্বাস করে বসছে সে কথা। 

মাদুরোর খবর বন্ধ করে নির্জন খুলেছিলেন আরেকটা নতুন ট্যাব। হুমায়ূন আজাদের ওপর হামলার খবরটা নতুন করে পড়ল আবার। তখনই মনে পড়ল সালেহা মল্লিকের বলা বহু ঘটনা। তার দেবর রাজিব মল্লিককেও প্রায় একইভাবে মেরেছিল কিছু অচেনা-অজানা মানুষ।

মোহনপুরে মল্লিকদের পাঁচ পুরুষের বাস। আরেফ মল্লিক পঞ্চম পুরুষ। ধানিজমি আছে বিঘার পর বিঘা। তার দাদা মালেক মল্লিক ছিলেন মোহনপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ। মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন। কিন্তু ঊনসত্তরের পর আর ভরসা রাখেননি অখণ্ড পাকিস্তানে। যুদ্ধে গিয়েছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন বড় ছেলে আরেফকে। বয়স তখন আরেফের মাত্র ১৮ বছর। যুদ্ধ থেকে আরেফ ফিরেছিল কিন্তু মালেক ফেরেননি।

মালেক মল্লিকের ইচ্ছা ছিল একটা স্কুল করা। বাহাত্তরে আরেফ মল্লিক সেই কাজ শুরু করেন। তেয়াত্তরে চালু হয় মোহনপুর বিদ্যানিকেতন। উদ্বোধনের দিন উপস্থিত আরও অনেকের সঙ্গে ছিলেন শিকদারবাড়ির আলাউদ্দিন শিকদার। বৈভবে মল্লিকদের চেয়ে খানিকটা এগোনো। কিন্তু চার ভাই আর তাদের অগুনতি সন্তানদের কারোর মধ্যেই ছিল না শিক্ষার কোনো ইচ্ছা। সেই দিনই আলাউদ্দিন শিকদার বলেছিলেন, ‘মালেক চাচার ইচ্ছা ছিল একটা কওমি মাদ্রাসা দেওয়ার। পোলায় দিল ইসকুল।’

এই গল্প মোহনপুরের সবাই জানতেন, নির্জনকে বলেছেন সালেহা। কিন্তু তারা যা জানতেন না, তা হালো স্কুল বা মাদ্রাসা কখনোই আলাউদ্দিনের সমস্যা ছিল না। আলাউদ্দিন নিজেই চেয়েছিলেন স্কুল করতে। কিন্তু সেটা করার জন্য বিদ্যা বা কর্মবোধের জোর তার ছিল না। মোহনপুর বাজারে চা খেতে খেতে ভাই সালাউদ্দিনকে তিনি চাপা গলায় বলেছিলেন, ‘মল্লিকগো ভিটাছাড়া করতে না পারলে শিকদারবাড়ি টিকব না রে, নয়া।’

পরবর্তী উনিশ বছর ছিল সেই আধিপত্যের লড়াই। শিকদাররা ছিলেন সংখ্যায় বেশি। তারা দাঙ্গাবাজ। কথায় কথায় যে কারও মাথা ফাটিয়ে দেন। আর দলীয় রাজনীতিতেও তারা মল্লিকদের বিপরীত পার্টি। এদিকে মল্লিকদের সরাসরি রাজনৈতিক সংযোগ নেই। আরেফ ব্যস্ত স্কুল নিয়ে। আর তার ভাই রাজিব মল্লিক কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে এসে গ্রামেই আলো আনতে বিলি করে বেড়ান নানা ধরনের বই। স্কুলের পাশাপাশি বয়স্ক নারীদেরও মল্লিকবাড়িতে ডাকে সাক্ষর করে তোলার জন্য। এদিকে শিকদাররা ছড়িয়ে দেন, বাড়িতেই বেশ্যাখানা বসাচ্ছেন মল্লিকরা। উদাহরণে তারা নাম নেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সোনাগাছিতে নাকি তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মোহনপুরের মানুষ তা মেনেও নিতে থাকে। 

সংখ্যা, গায়ের জোর আর বারবার ছড়ানো কথায় বিশ্বাস করে মোহনপুরের মানুষ। তারা বিশ্বাস করেন মল্লিকরা ধর্ম মানে না, সমাজ মানে না। বাজারে মল্লিকদের দোকানের ভাড়া দেন না কেউ। মোহনপুরের মানুষ ভুলে যায় এক দিন তারাই আরেফ মল্লিককে মাথায় তুলেছিলেন, তাদের গ্রামে স্কুল করে দেওয়ার জন্য।

রাজিবের চাকরি হয়েছে ঢাকার একটা সরকারি কলেজে। পরদিনই তার জয়েনিং। একটু রাত করেই মোহনপুর বাজার থেকে ফিরছিলেন তিনি। পথের মাঝখানেই গর্দান বরাবর রামদার কোপ। রাজিব কোনো শব্দ করতে পারেননি। আর তার লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর দুই ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল মোহনপুরের কয়েকশ মানুষ। তাদের নেতা নেই কোনো। তবু তারা সমস্বরে বলেছিলেন, মল্লিকদের বাড়ি ছাড়তে হবে।

ভিটা ছাড়ার শর্তে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল মল্লিকদের বারোজন মানুষ। কিন্তু দাফন হয়নি রাজিবের।

৩.

ফিরতি বাসের জানালায় মুখ রাখেন নির্জন। মনে করে মনসুরের বলা কথাগুলো একটা দীর্ঘ গল্প সংক্ষেপে বলেছিলেন চায়ের দোকানদার মনসুর আলী। নির্জন সেটা সহজ ভাষায় গুছিয়ে নেন নিজের মনে।

মল্লিকরা যে বছর বাড়ি ছাড়েন, মনুসরের তখন বয়স ২০ বছর। মল্লিকদের বাড়ির সামনে উপস্থিত ছিলেন তিনিও। আর মল্লিকরা বাড়ি ছাড়ার পর সেই বাড়ি থেকে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়েছিলেন মনসুর। তার মনে হয়েছিল, এটাই তার হক।

মল্লিকরা বাড়ি ছাড়ার পর সেই বাড়ির দখল নিয়েছিলেন শিকদাররা। বাজারে মল্লিকদের দোকানগুলো ভাগ হয়ে যায় শিকদার, খাঁ আর জোয়ার্দারদের মধ্যে। শিকদাররাই পেয়েছিল বেশি। আর তিন দিনের মধ্যে মোহনপুর বিদ্যানিকেতনের নামফলক উঠে যায়। পরের বছর বন্ধ হয়ে যায় স্কুল। সেখানে কোনো মাদ্রাসাও হয়নি। শিকদারদের বাড়ির বখাটে ছেলেরা সেখানে ক্যারমের আড্ডা বসাত।

মোহনপুরের মানুষ বুঝে নিয়েছিল রাজিবের আদতে কোনো দোষ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সোনাগাছি থেকে ট্যাক্স তুলত কি না, তা তারা জানেন না কিন্তু মল্লিকরা বাড়িকে বেশ্যাবাড়ি বানায়নি সেটা তারা বুঝেছিল। কিন্তু মল্লিকদের নাম কেউ নিতেন না। সত্য তারা জেনে ছিলেন, কিন্তু সত্য উচ্চারণ করার সাহস ছিল না। আজও নেই। সত্য তারা ভুলেই গেছে। মোহনপুরের বহু মানুষেরই মনে আছে মল্লিকদের কথা। কিন্তু তারা বিশ্বাস করেন, মোহনপুরে কখনও মল্লিকরা বাস করেননি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা