চিত্রপ্রদর্শনী
হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৩ এএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৫ পিএম
চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে চলমান প্রদর্শনী
সন্ধ্যা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। মেট্রো থেকে নেমে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর লাগোয়া পথ ধরে হাঁটছি। এই রাস্তায় গন্তব্যবিহীন হাঁটি। তবু এই পথরেখায় কখনও কখনও এসে জড়ো হয় নানা সুর ও শেকড়ের গল্প। কিন্তু সেদিন চিরচেনা এই রাস্তা যেন ক্রমেই রাবারের মতো বলে উঠছে। রাস্তার আলোও নিষ্প্রাণ। হতে পারে শীত-প্রকোপের ধাক্কা। নাকি বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা! সাত-পাঁচ ভাবনা মাথায় নিয়ে ঢুকে পড়ি চারুকলার ভেতরে। মুহূর্তেই যেন উড়ে এলো স্বস্তির হাওয়া। দেহ ও মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিল কেউ। এগোতে থাকি জয়নুল গ্যালারির দিকে। দেখি গ্যালারির সামনে গোল হয়ে বসে আছেন অনেকেই। কতজন? শতজনেরও বেশি। শিশু-কিশোর, তরুণ, মাঝবয়সী- তাদের আলাপে আড্ডায় হাসির রোল ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। পারিবারিক আবহ বিরাজ করছে। সচরাচর গ্যালারি প্রাঙ্গণে এমনটি দেখা যায় না। কিন্তু ভ্রম দূর হয় গ্যালারির প্রবেশমুখের ব্যানারে লেখা 'সেশন ৮৯, ব্যাচ-৪১', বড় করে লেখা 'চিত্রপ্রদর্শনী' দেখে। দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ যায় শীত ও কুয়াশায় মোড়ানো একটি ল্যান্ডস্কেপের ওপর। উত্তরের বরেন্দ্র জনপদের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে সে চিত্রকর্মে। চেনা এ ভূমি, রঙের ছান্দসিক বর্ণনা। বাদামির রঙের আবরণ। কাছে গিয়ে দেখি চিত্রকর্মটি এঁকেছেন শাবিন শাহরিয়ার। এই শিল্পী নাম আগে পরিচিত। কাকতালীয় ব্যাপার বটে! তখন আয়োজনে অংশ নেওয়া অন্য শিল্পীদের কাছে জানতে চাই শাবিন শাহরিয়ার কী বরেন্দ্রভূমির মানুষ? আমার কৌতূহল সত্যি হয়। তারা জানান, 'ও তো মাত্র বের হয়েছে। শাবিন পরিচিত আপনার?' বলি নাম এবং কাজে তো সবাই পরিচিত। কিন্তু এই ছবির রঙ ও ভূমি চেনা চেনা লাগছে তাই। জানতে চাইলাম, প্রদর্শনীর কিউরেটের নাম। তখন এগিয়ে এলেন শিল্পী রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, 'এটা মূলত বন্ধুদের আয়োজন। সমন্বয়ের দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। তবে এটা যতটা না প্রদর্শনী তার চেয়ে বেশি আনন্দের বন্ধুদের মধ্যে দেখা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট দিনে। একটি বিশেষ দিনে। কেননা ১৯৯০ সালের ৭ জানুয়ারি আমাদের ক্লাস শুরু হয়। ওই দিনটিকে স্মরণ করে আমরা ৩৬ বছর ধরে সবাই মিলত হই।'
প্রায় তিন যুগ ধরে হাঁটছেন সৃজনকলার পথে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অনেকেই ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়েছেন। এর আগে ১৯৯৪ সালের তাদের একটি প্রদর্শনী হয়েছিল এই জয়নুল গ্যালারিতেই। ১৯৯২ সালে একটি হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তারা নিজেরাই আয়োজন করেছেন তৃতীয় প্রদর্শনী। এতে অংশ নিয়েছেন ৪৪ জন শিল্পী। কারও কারও একটি, বেশিরভাগ শিল্পীর দুটি করে শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে জয়নুল গ্যালারির দেয়াল। মোট ৮০টি চিত্রকর্ম রয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে করা সেসব কাজ। কে ইউ মাসুদ। তিনি এখন ফটোগ্রাফি করেন। তিনিও অংশ নিয়েছেন দুটি আলোকচিত্র নিয়ে। এ আয়োজন নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন ফয়জুল হোসেন সাজু। তার আঁকা দুটি ছবিতেই চোখের অভিব্যক্তি তুলে ধরেছেন। এই শিল্পী দীর্ঘদিন ছবি আঁকা থেকে বিরত ছিলেন। এই প্রদর্শনী উপলক্ষে তিনি কাজ দুটি করেছেন। সাজু তার অনুভূতি প্রকাশে বলেন, 'চারুকলায় এসে নতুন করে ছবি আঁকার প্রেরণা পেলাম।' এর মধ্যে দেখা হয়ে গেল ফারহানা আফরোজ বাপী, মনি দীপা দাশগুপ্তর সঙ্গে। তারা তাদের আনন্দের কথা জানালেন।
এছাড়াও আর যাদের কাজ রয়েছে প্রদর্শনীতে ফারহানা ইসলাম মিল্কী, আবদুস সালাম, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, অমলেন্দু মণ্ডল বিরাজ, অনাদি কুমার বৈরাগী, আশরাফুজ্জামান তহিন, আশরাফুল কবির কনক, আতিকুর রহমান টুটুল, ধীমান কুমার বিশ্বাস, ফয়সাল মাহমুদ, গোলাম ফারুক, কাজল আব্দুল্লাহ আল মাসুম, কল্লোল লাল রায় বড়ুয়া, মাহবুবুর রশিদ, মাহেরা খালেক জয়া, মফিজ উদ্দিন, মনিরা সুলতানা মুক্তা, মোরশেদা হক বকুল, মর্জিয়া বেগম সুমি, মুক্তি ভৌমিক, নিশাত চৌধুরী জুঁই, নুরুল ইসলাম প্রিতম, রেবেকা সুলতানা মলি, রিফাত জাহান কান্তা, রেহেনা ইয়াসমিন শিলা, সাফিন ওমর, সাইদুর রহমান, সালাহ উদ্দিন, শফিক শাহীন, শায়লা আক্তার, শর্বরী রায় চৌধুরী, শারমিন সিরাজী, সিমা রায় চৌধুরী, সুব্রত চন্দ, সুমিতা সুলতানা, তৌফিক খান, জায়েদ আহমেদ খান লিটন ও জুবের মাহবুব তুষার।
দলগত এ আয়োজনে নানা মাধ্যমের কাজ রয়েছে। চিত্রকর্মগুলো শিল্পপ্রেমীরা সংগ্রহও করতে পারবেন। প্রদর্শনী চলবে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল এগারোটা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত গ্যালারির দুয়ার।