বিথীয়া বেনুকা
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:১৪ পিএম
‘অকস্মাৎ টের পাই ভেতরে এক আওয়াজÑ আমার বিরান জমিতে জেগে উঠেছে প্রাণের ভেতরে প্রাণ।’ এই পঙ্ক্তিতেই মূলত কবি বর্ণনা করে ফেলেছেন পুরো কবিতার বইকে। এই দুটো লাইনের উপমা ও রূপক ধারণ করেছে কবির সমূহ অন্তর্গত অনুভূতি ও ভাবনাকে। কবিতা তো সেটাই, যা কবি ধারণ করেন। এক নিজস্ব দ্বন্দ্ব ও জৈবনিক মাশুল হিসেবে কবির নিজের কাছেই যেন তার আত্মসমর্পণ। এবং সেই নিঃশেষে সমর্পণ সেরে অকস্মাৎ আবিষ্কার করলেন নিজের ভেতরের এক নতুন সত্ত্বাকে। ‘ভেতরে এক আওয়াজ’Ñ এটা রূপক। এটা বাস্তব কোনো আওয়াজ নয়, কবির চেতনার জাগরণকে বোঝানো হয়েছে। ‘বিরান জমি’Ñ একটা সুন্দর উপমা। এতে কবির নিজের নিঃসঙ্গ ও বেদনার্ত হৃদয়ের কথা বলা হয়েছে।
কবির অন্যান্য কবিতাÑ ‘যদি সত্যকে সারথি বানানো যায়’, ‘আমরা আঠারো কোটি স্বপ্নবাজ’, ‘আমি এবং আমরা যারা সর্বহারা’Ñ এই কবিতাগুলো পড়লে আমাদের বিদ্রোহ ও গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথাই মনে পড়ে যায়। কবি আরিফ মঈনুদ্দীন তার কবিতার বই ‘প্রাণের ভেতরে প্রাণ’ বইটায়ও নতুন সমাজ বিনির্মাণ, গণমানুষের দুঃখ-দুর্দশা, অধিকারের কথা ও নতুন স্বপ্ন ও সমাজের আশাবাদই ব্যক্ত করে গেছেন প্রায় প্রতিটি কবিতায়।
তবে ভালো লাগার ধুন্ধুমার কাণ্ড শিরোনামের কবিতা এমন অধিকার ও চেতনার অগ্রযাত্রায় উজ্জীবিত করার কবিতার পাশে স্থান না দিলেই সংকলনটি আরও সুন্দর ও শক্তিমান হতে পারত। যদিও সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার পাশাপাশিই অবস্থান করে ব্যক্তিগত এবং ভালো লাগার চেতনা। জীবনের জন্য প্রেম, রাজনীতি ও যুদ্ধ; অঙ্গাঙ্গি অবস্থান। তবে প্রেমের ক্ষেত্রে কবির সতর্ক অবস্থান।
কিন্তু কোনো কবিতায়ই নেই অতিরিক্ত আমিত্ব ও একঘেয়ে বর্ণনা। চিত্রকল্পের নানান বর্ণনা ও বিষয়বস্তুতেও আছে স্বতন্ত্রতা। শব্দচয়নে নতুনত্ব থাকলেও নেই কাঠিন্যতা। বরং স্পষ্ট স্বর ও সুন্দর জীবনের আহ্বান করে গেছেন তার লেখনীতে।
স্টিফেন মালার্মের শব্দই কবিতাÑ এই ভাষ্যে কবি আরিফ মঈনুদ্দীনও তার প্রায় সবগুলো কবিতায় শব্দালংকারের অর্থাৎ উপমা, উৎপ্রেক্ষার নান্দনিক গাঁথুনির মেলবন্ধন দিয়েছেন। কবির লেখনীতে সমাজ সংস্কার ও মনুষ্যত্ব বোধের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ লক্ষণীয়।
পরিপূর্ণ হওয়ার আগে শিরোনামের কবিতাংশÑ
‘নিদ্রাতুর সময়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে
সূচনাপর্বের জমিনে ঢেলেছি প্রথম মেধার নুন
চারিদিকে তাকিয়ে দেখার কালে
নিজের লাঙল ধরেছি সহজ অভ্যাসের ডোরে’Ñ
এখানে কবি সহজ ও সাবলীল বয়ানে প্রথম সৃষ্টির প্রয়াসকে তুলে এনেছেন। নিদ্রাতুর সময়Ñ কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সময়কে বুঝিয়েছেন। জীবনের এমন এক অবস্থা যখন কবি পুরোপুরি সচেতন নয় জীবন নিয়ে। সূচনাপর্বের জমিন হলো জীবনের বা সৃষ্টির শুরুর ক্ষেত্র। সেখানে প্রথম মেধার নুন ঢালা মানে নিজের চিন্তা, বুদ্ধি ও সৃজনশীলতার প্রথম স্বাদ যোগ করা। নুন যেমন খাবারের স্বাদ বাড়ায়, তেমনি মেধা জীবন ও অভিজ্ঞতাকে অর্থবহ করে তোলে।
লাঙল হলো শ্রম, দায়িত্ব ও নিজের পথ নিজে তৈরি করার প্রতীক। সহজ অভ্যাসের ডোর মানে দৈনন্দিন অভ্যাস, শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক জীবনের টান। কবি বোঝাতে চানÑ তিনি বাহ্যিক অনুকরণে নয়, নিজের স্বভাব ও অভ্যাসকে আশ্রয় করে জীবনের জমি চাষ করতে শুরু করেছেন।
বইয়ের নাম : প্রাণের ভেতরে প্রাণ
ধরন : কাব্যগ্রন্থ
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশকাল : ২০২৫
প্রকাশনী : বিশ্বসাহিত্য ভবন
দাম : ২০০