শিবলী মোকতাদির
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৩৫ পিএম
ভৃগু, বশিষ্ঠ, পুলহ, অরুন্ধতী, শতভিষাÑ এমন হাজারো তারার ভিড়ে আছে আরও অনেক তারা। চির অন্ধকারে, চিরকাল যারা অচেনা, অদেখাই রয়ে যায়। যদিও আলোকচ্ছটা, দ্যুতি আর দুরন্তপনা এতটুকু কম নয়; ব্যক্তিত্ববান ওইসব তারাদের চেয়ে। তারাও তারা হয়ে তাড়িত করে পৃথিবীর পথভোলা সব পথিককে। দেয় নানা ইশারা ও ইঙ্গিত। কেবল আমাদেরই দেরি হয়ে যায় সময়মতো তাদের ইন্ডিকেট করতে।
সাহিত্যের স্রোতধারায় অনেক রথী-মহারথীই এমন নামকরা তারায় পরিণত হয়েছেন। আজ এই সংকুচিত শীতে, ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিÑ ওই যে দক্ষিণে অতিরিক্ত আলোর আভা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেনÑ উনি রবীন্দ্রনাথ। একটু বামপাশে, যাকে ঘেঁষে রোজ একটি প্লেন উড়ে যায়, কেমন মিটিমিটি ধূসর হাসিতে বেদনার বাতি জ্বেলে আমাকে চমকায়। নিশ্চিত তিনি জীবনানন্দ দাশ।
এ রকম আরও অনেক সাহিত্যের গ্যাংস্টার ক্ষণে ক্ষণেই দেখা দিয়ে যায়। আমি বুঝি, নত হয়ে নতুন দীক্ষায় দীক্ষিত হতে চাই। তারা এই নিকটে তো এই দূরে চলে যায়। রাত বাড়ে। শীতের কচি হিমেল হাওয়া হঠাৎ দোলা দিয়ে যায়। আমার তন্দ্রা ছুটে যায়। বুঝি না কিসের টানে চশমা চোখে দিয়ে, আমাকে লম্ব ভেবে ফরটিডিগ্রি বরাবর চেয়ে দেখিÑ একদম পূর্বে ক্ষীণ এক আলোর জ্বলা-নেভা। মন আর মস্তিষ্কে মুহূর্তেই বোঝাপড়া হয়। উনি তো আমার অতি আপন। দুই হাজার তিন সালে হারিয়ে যাওয়া সেই তো সুঠাম আর একহারা, তেজী আর জেদি, কবি ও সম্পাদকÑ আন্ওয়ার আহমদ।
ষাটের অনেক দিকপাল যারা সত্যিই প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাংলা কবিতায়। আমরা তাদের চিনি, জানি। কারও ক্ষেত্রে বৃহৎ পরিসরে, কাউকে-বা ক্ষুদ্র আয়তনে। ছোট এদেশের সীমিত আয়তনে কতিপয় কবির ইন্ডিকেট করা তেমন কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। নিজ নিজ লেখনী দিয়েই তারা স্বভূমে প্রতিষ্ঠিত তথা বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে সামান্য হলেও ভূমিকা রাখতে পেরেছেন। গণ্য হয়েছেন। কিন্তু এমনও অভাগা, অচ্ছুত, নিরপেক্ষ, নির্দলীয়, চাপা আর গোপন কবির গুপ্ত হাহাকারে আজও বিজলী-বাতাস ভারী হয়ে আছে। আজও যে দোয়েল শিস দিয়ে যায় মন-মরা সুরে। বলি সেই কবি, তার নিজ সময়ে খানিকটা আলোচিত, আলোকিত হলেও আজ সময়ের সর্বনামে ঝুলে আছেন। তির তির করে কাঁপছে তার নামটি কেবল মৃদুমন্দ দুয়েকজন রাখাল প্রেমিকের কোষের কমনীয় দ্বারে।
সেইকালে তাদের চিরসবুজ, দীপ্তপ্রাণ আবির্ভাবে নড়েচড়ে বসেছিল পুরো দেশ। তারা তাদের মেধা, মনন, লেখনী দিয়েই জাবেদা খাতায় নাম তুলিয়েছিলেন, চিহ্নিত হয়েছিলেন নিজস্ব কবিতার টোনের টংকারে। বলতে দ্বিধা নেই, তাদেরই মধ্যে অতি অন্যতম একজন কবি ‘আন্ওয়ার আহমদ’। ষাটের শুরুতে মৃত্তিকার উর্বরভাগে প্রকাশিত হন তিনি। কঠিনকে তরল করার জিয়নকাঠি ছিল তার হাতে। অপরূপ সুষমামণ্ডিত তার কাব্যে উঠে এসেছে হৃদয়ের কোমল আর্তি।
মানুষের মানবতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে তিনি ধারণ করেছেন তার কবিতায় এবং নিসর্গের প্রতিটি বস্তুর মধ্য দিয়ে ঘোষিত করেছেন তা অকপটে। হতাশা, অস্থিরতা, চিরন্তন প্রেম এবং ক্ষুধাকে পাশাপাশি বিপ্লবের মাত্রায় যুক্ত করেছেন। আর এরই সঙ্গে যুক্ত করেছেন প্রকৃতি, নারী এবং নিঃসঙ্গতা। এ রকম বিবিধ বস্তু এবং বাঁধনে তুমুলভাবে আক্রান্ত অসাধারণ শব্দ নির্মাতা কবি আন্ওয়ার আহমদ।
১৩ মার্চ ১৯৪১ সালে পৃথিবীতে এসে বিরলপ্রজ এই মানুষটি; যিনি একাধারে কবি, সম্পাদকÑ আন্ওয়ার আহমদ কোনো চিঠি, কোনো ফোন, বস্তুত কোনো আভাস না দিয়েই চলে গেলেন ২৪ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে। বাঙালি যতটা ব্যাকুল হয়, হয়তো হয়েছিল কেউ কেউ সেদিন। তারপর যা হওয়ার হয়েছে তাই। গিভ অ্যান্ড টেকের সহজ আর সরল সমীকরণে আন্ওয়ার ভাই কেবল দিয়েই গেলেন। সামান্য কিছুই কি পাওয়ার ছিল না তার? ইতিহাস নীরব। কবির জন্য দীর্ঘ না হলেও খুব সামান্যও নয় যাপিত জীবনটুকু। জাত কবি বলতে যা বোঝায়, ‘আন্ওয়ার আহমদ সে রকম ছিলেন না। তবু যেটুকু, যতখানি, যেভাবে লিখেছেনÑ আমি বলব অঢেল, অতুলনীয়।
‘আন্ওয়ার আহমদ’-এর প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা পনেরোটি। প্রথম কবিতার বই ‘রিলকের গোলাপ’ এরপর প্রকাশিত হয়েছে ‘মানবসম্মত বিরোধ’, ‘নির্মাণে আছি’, ‘হঠাৎ চলে যাব’, ‘নীল কষ্টের ডাক’, ‘শেষ সম্বল শেষ দান’, ‘অটল থাকা ধীর সন্ন্যাস’, ‘উড়ো খই গোবিন্দ নমঃ’, ‘ঊনষাটের পদাবলী’, ‘ষাটের প্রান্ত ছুঁয়ে’ ইত্যাদি। গল্পের বই আছে একটি ।
কবিতা, কবিতার মতোই অন্তরঙ্গ আবহ গড়ে তোলে, সেখানে মূর্ত হয়ে ওঠে চাপা পড়া আনন্দ-বেদনার অভিলাষ। যেখানে রাজপথ আর মেঠোপথ নিমিষেই একাকার হতে চায়। কবিতার জন্য প্রয়োজন প্রচুর সৌন্দর্যের। আন্ওয়ার আহমদের কবিতার মধ্যে যা লক্ষ করা যায়। কবিতার মূল লক্ষ্য নির্ভেজাল সত্য, বিবৃতি বা বক্তৃতা নয়। ‘আন্ওয়ার আহমদের কবিতায় কাব্যনুভূতির দ্বারা চালিত সঞ্জীবিত বিস্তৃত বেলাভূমির ওপর সর্বদাই খেলা করে বিচিত্র চিত্রকল্প। আর তারা এতটাই সহজ-সরল যে, যেকোনো পাঠকের হৃদয়ে ঢুকে পড়ার জন্য তার দরজাগুলো খোলা থাকে।
‘মানবসম্মত বিরোধ’, ‘রিলকের গোলাপ’-এর কবি। কবিকে ছাপিয়ে আমি বলব ছোটকাগজের পথিকৃৎ, অ্যাজ-এ জেনুইন সম্পাদক ছিলেন আন্ওয়ার আহমদ। ছোটকাগজের সেই অগ্নিযুগে অনেকের মতো জন্ম হয়েছিল একটি ছোটকাগজের। যার নাম ‘কিছুধ্বনি’। যতদূর মনে পড়ে ৩৭ বছর একটানা বেরিয়েছে পত্রিকাটি আন্ওয়ার আহমদের সম্পাদনায়। এবং সেইসঙ্গে গদ্য, তথা কথাসাহিত্য নিয়ে তার আরও একটি পত্রিকা, যার নাম ‘রূপম’। অনিয়মিত বেরিয়েছে ‘সাহিত্য সাময়িকী’।
ছোটকাগজের সম্পাদক কেমন হয়? তার জ্বলন্ত উদাহরণ আন্ওয়ার আহমদ। ব্যক্তিগত জীবনে প্রভূত দুঃখ থেকেই জন্ম নেওয়া অগাধ দরদ দিয়েই বুকের দুপাশে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন তার দুটি পত্রিকাকে। এক হাতে দেখভাল করতেন, যত্ন নিতেন, ঠিক যেন দুহাতে দুটি সন্তানের হাত ধরে সারা দিন এপথে-ওপথে ঘুরে, ক্লান্ত কোনো ফেরিওয়ালা; রাত নেমে এলে বিছানায় আদর আর আপ্যায়নে স্নেহের পরশ বুলিয়ে ঘুম পারাতেন তাদের। মাঝে সম্পাদক, এ পাশে কিছুধ্বনি ওপাশে রূপম।
তার কবিতায় এক ধরনের নিসর্গের সংলাপ দৃশ্যমান। তিনি প্রকৃতির ছন্দময় অরূপতার মধ্যেও একটি হাহাকার, একটি আর্তনাদ আবিষ্কার করেন। তিনি মনে করেন, এ আর্তনাদ, এ হাহাকার শুধু প্রকৃতির নিজস্ব নয়, এর সঙ্গে কবিরও একটি যোগসূত্র আছে। তার মতে, প্রকৃতি যেমন নিঃসঙ্গ, একজন কবিও তেমনি নিঃসঙ্গ। তিনি মনে করতেন, কবিদের কোনো বন্ধু নেই, কোনো সুহৃদ নেই। একটি অন্তহীন অবিনশ্বরতার মধ্য দিয়ে তাকে পথ অতিক্রম করতে হয়। কবিতার উপমা ও প্রতীক নির্মাণে ইমোশনাল অনুবাদে তিনি এক আইডিয়াল জাদুকর। যার সাবজেক্ট মূলত মানুষ। এবং এ কারণেই চির নির্ঘুম চিত্তের পরিবেশে কবিতার শিল্পে তিনি ছড়িয়েছেন কৃষ্ণচূড়ার হাসি। আন্ওয়ার আহমদ গহিন দুঃসময়ের ঘন ক্ষেত্রে যেন এক চন্দ্রবোরার ওঝা। তিনি কবিতার টেকনিকে আরোপ করেছেন মিথ ও মিতালি, দর্শন ও রাজনীতি, স্বদেশ ও আন্তর্জাতিকতা, ঐতিহ্য ও অর্কেস্ট্রা। আর এসবই অনুপম প্রতিরোধে হয়ে ওঠে অনেকটা অন্যের মতো লোকায়ত অচেনা পারফিউম।
কবি আন্ওয়ার আহমদ ছিলেন প্রচণ্ড পরিহাসপ্রিয় তুখোড় আড্ডাবাজ মানুষ। কারণে-অকারণে তীব্র অট্টহাসির ফোয়ারা বইয়ে দিতেন। যখনই দেখেছি তাকে মনে হয়েছে, এ ব্যক্তি বিপুল এক প্রাণ-ঐশ্বর্যের অধিকারী। কবিতার অন্তর্বয়নে তার বোধগুলোকে তিনি চালিত করেছেন কখনও আরোহী কখনোবা অবরোহীর আকারে। আন্ওয়ার আহমদের কবিতায় চিত্রকল্প সর্বদাই স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্মপাতার পানশালা থেকে আকাশমুখী জ্বলন্ত হাউই-এর অন্তরে কবি বেঁধে দিয়েছেন অনন্য আমিষ ও স্নেহজাতীয় টেলিগ্রাম। তপ্ত আয়োজনের মধ্য দিয়ে তার কবিতার মৌলিক মাধুরী ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে ভেজা তোয়ালের প্রশস্ত নিরাময় মিশ্রণে। প্রণয়ের আন্তর্জাতিকতায় দখল করেছে ফুয়েল সেল ও সোলার এনার্জি। চলমান সময়, পবিত্র মানুষ ও তাদের বিচিত্র জীবনের স্বাদ-গন্ধ থেকে ভিন্ন মেজাজের প্রবল নিজস্বতা নিয়ে কবিতায় তার উচ্চারণ, ভঙ্গি ও পরিবেশনায় বরাবরই থেকেছে স্বাতন্ত্র্য ও সমুজ্জ্বল রূপে।
শুধু কবি-সম্পাদকে আটকে থাকেননি তিনি। পত্রিকার নামেইÑ রূপম প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে যত বই, বলি সেখানেও কম উদার নন এই কবি। নিজের গ্যাঁটের পয়সায় এত এত গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে জানি না তিনি কতটা লাভবান হয়েছেন? কিন্তু সেই কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক অবশ্যই পাঠকের দরবারে এসেছেন। নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ তো পেয়েছিলেন। আর এ সূত্রেই জীবনের শেষ কয়েকটা বছর বগুড়ায় এসে বলতে গেলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং প্রকাশ করেছিলেন ষাটের উল্লেখযোগ্য মেধাবী কবি-প্রাবন্ধিকদের বেশ কিছু গ্রন্থ। এ তো সত্যি যে, বলতে গেলে তাদের শুরুর পথটা বাতলে দিয়েছিলেন তিনি।
সম্ভবত নৈর্ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্যসমূহের আর্তআনুগত্য ও মর্ম বিশ্বাসের কোনো নিঃশর্ত নেগেশন নেই। এর থাকতে নেই কোনো নেগেটিভ ওয়ার্ক বা ফেনোমেনো। আসলে বহিরঙ্গের সব আয়োজিত ক্যানভাস প্রাত্যহিক অপ্রাপ্তির বিমূর্ত মাইক্রোফিলামেন্টে জড়িত একেকটি কম্বিনেশন। যদি তাই হয়, বলিÑ একজন শিল্পীর, একজন লেখক বা কবির মৃত্যু নিয়ে এমন মরমি সাধগুলো কেন তবে জেগে ওঠে? কী প্রয়োজন ছিল হেমিংওয়ের বন্দুকের গুলিতে আত্মাহুতি দেওয়ার? স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য কেন মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন শেলী, কিটস কিংবা দুর্ঘটনার নামে আলবেয়ার কাম্যু, জীবনানন্দ দাশ বা হুমায়ূন কবীর? আন্ওয়ার আহমদ কবিতার দোআঁশমাটিতে হেঁটেছেন হেসে খেলে। আজ এতদিন পরে মনে প্রশ্ন জাগেÑ তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন, হাতে তার সময় নেই! যা করার ঝটপট সেরে ফেলতে হবে? ৯০ থেকে ৯৬ সাল, খুব অবাক লাগে এতটা ডিটারমাইন্ড তিনি কবিতা তথা নিজেকে মলাটবন্দি করার ক্ষেত্রে। কাল দেখা হচ্ছেÑ দিলখোলা, হৃদয় উজাড় করে দেওয়া এই কবি, এই মহৎ মানুষটি হৃদয় সংক্রান্ত আকর্ষিক জটিলতায় থেমে গেলেন। নুয়ে পড়লেন মৃত্যুকোলে। এরপর ইতিহাস যা করে ঘটেছে ঠিক তাই। ভুলে গেছি আমরা। সমস্ত চড়াই-উতরাই, বন্ধুরতা পেরিয়ে আন্ওয়ার আহমদ একজন কবি। আমি জানি, নতুন ভুবনে আনকোড়া এক নতুন গিটার নিয়ে নতুন কবিতার ধুন বাজিয়ে চলেছেন তিনি। প্রতিটিক্ষণ, পল হতে পলকে, ন্যানো সেকেন্ডে তিনি লিখে চলেছেন। কবিতার কাহারবায় নেচে নেচে নরক গুলজার করে তুলছেন। অথচ আমরা এতটাই অন্ধ আর বধির যে, কেবল আমাদেরই ভুলে হরীতকীর সবুজে ধুয়ে দেওয়া প্রজ্ঞার প্রকল্পগুলো কোনোভাবেই স্পর্শ করতে পারছি না। হায় হেঁয়ালি! হায় হতাশা!