মোহিত কামাল
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:০২ পিএম
চিত্রকর্ম : মালিহা রহমান
ঘুম থেকে উঠেছেন ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে। ভোরেই এক গ্লাস পানি পান করা প্রতিদিনের অভ্যাস তার। বেডসাইড টেবিলে রাখা প্লেটে ঢাকা গ্লাসটা অভ্যস্ত হাতে টেনে নিলেন তিনি, মিলটন খান।
এত হালকা কেন গ্লাস?
প্লেট সরিয়ে বিরক্ত হলেন। গ্লাস শূন্য। টেবিলে রেখে দিতে গিয়েও রাখলেন
না। শূন্য গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। রাতে উঠে একবার পানি খেয়েছেন। ভুলে গিয়েছিলেন
কথাটা। মনে পড়েছে এখন। সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তি কমে গেছে। পূর্ণ মগ্নতা নিয়ে তাকিয়ে দেখলেন
শূন্য গ্লাসের তলদেশ উঁচু, ভেসে উঠেছে চোখের সামনে। আশ্চর্য! তলদেশ শূন্য মনে হলো না,
মনে হলো পূর্ণতায় ভরা আছে গ্লাস!
এ পূর্ণতার শেষ কোথায়? অর্থ কী? বুঝতে গিয়ে ধাক্কা লাগল মনে। বড় করে
শ্বাস ছেড়ে আরও নিবিড় করে তাকালেন। তলটা কি ভরাট? উঁচু উঁচু লাগছে কেন? কী দিয়ে ভরাট
হয়েছে?
ভাবনার কূল পেলেন না তিনি।
আবার বড় করে শ্বাস ছাড়লেন। গ্লাসটা রেখে দিয়ে ওঠে দাঁড়ালেন। বাথরুমের
দিকে পা বাড়িয়েও থেমে গেলেন। শোয়ার ঘরের দরজায় এসে উঁকি দিলেন ড্রয়িংরুমের দিকে। ভোরে
পত্রিকা আসে না। ঢাকা শহরে থেকেও পত্রিকা পেতে সাড়ে ৭টা-৮টা বেজে যায়। অথচ মফস্বল শহরেও
আজকাল ভোরে পৌঁছে যায় ঢাকার পত্রিকা। বসার ঘরে উঁকি দেওয়ার কারণ পত্রিকা এলো কি না
দেখে নেওয়া। দরজা খুলে রেখেছে বুয়া। হকার এসে পত্রিকা রেখে যায়। কখন রেখে যায় বোঝা
যায় না। সাড়ে ৭টার আগে যে হকার আসে না, জানেন তিনি। তবু উঁকি দিলেন। অর্থ কী? উঁকি
দিলেন কেন? কেন ভেতরের গোপন চোখটা সামলাতে পারলেন না? উত্তর জানা নেই। 
বাথরুমে ঢুকে নিজেকে রিলিজ করে মিলটন খান আয়নায় দেখলেন নিজের মুখ।
অনেক দিন দেখা হয়নি চোখ মেলে। অবাক হলেন। এত বুড়ো হয়ে গেছেন? আরেকবার বের হলো দীর্ঘশ্বাস।
জীবনটা এত ছোট কেন? এত কম বাঁচে কেন মানুষ? একা একা হেসে উঠলেন আবার। হতাশ হবেন কেন?
তারুণ্যময় থাকাটাই জীবন। বয়স কি তারুণ্য রুখতে পারে? ভিন্ন ধরনের জোশ চলে এলো মনে।
দাঁত ব্রাশ করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলেন ওয়াশরুম থেকে। হাঁটার জন্য বেরোনোর প্রস্তুতি
নিতে লাগলেন। কেডস পায়ে নিজেকে দারুণ লাগে। তরুণ তরুণ লাগে। জিন্সের প্যান্ট ও ঢোলা
শার্ট গায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পত্রিকা এখনও এসে পৌঁছেনি। পত্রিকা রাখার নির্দিষ্ট
সোফাটা এখনও খালি। পত্রিকা না-পড়া পর্যন্ত শূন্য শূন্য লাগে। গ্লাসের শূন্যতা পূর্ণ
দেখতে পেলেও পত্রিকার শূন্যতা পূর্ণ হলো না। ঘর থেকে বেরোনোর সময় আরেকবার হতাশা জাগল
মনে।
ভালো লাগল বাইরে এসে। বর্ষার আলামত টের পাওয়া যাচ্ছে। হালকা বৃষ্টি
হয়েছে, বোঝা যায়। রাস্তা ভেজা, চারপাশের ছেঁড়াখোঁড়া গর্ত পানিতে ভরা। গাছের পাতাগুলো
সদ্য স্নান সেরে নির্মলতা নিয়ে সেজে রয়েছে। কাকে আহ্বান জানাচ্ছে প্রকৃতি? প্রকৃতির
এ গোপন সৌন্দর্য ডাক দিয়ে যাচ্ছে কাকে?
রাস্তা একদম ফাঁকা। একটা রিকশাও চোখে পড়ছে না। দু-চারজন হাঁটুরে হেঁটে
যাচ্ছে দ্রুত। ঘামছে। বোঝাই যায়, নিয়মিত হাঁটে তারা। ‘মত্ত বরষা’ও থামাতে পারে না ওদের।
তারুণ্যময় থাকার এ চেষ্টা! চেষ্টার ফাঁকফোকর দিয়ে চলে যায় সময়। পাতা ঝরে শূন্য হয়ে
যাওয়া গাছ আবার সবুজ হয়। মানুষ মলিন হলে আর সবুজ হয় না। ঝরতে বসলে ঝরেই যায়। ঝরা পাতার
জায়গায় সবুজ পাতা গজায় না। সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকে। সন্তানই সবুজ পাতা। নিজের অস্তিত্ব
বিলীন হয় সন্তানের মধ্য দিয়ে।
নড়ে উঠলেন মিলটন খান।
মনে হলো, সবুজ পাতা জেগে উঠেছে দেহের মধ্যে। সাইকেলে চড়ে হকার এসে
দাঁড়িয়েছে সামনে। আজ শুক্রবার। চারটি দৈনিক রাখেন তিনি শুক্রবারে। সাহিত্য পাতা আগে
পড়েন। একটা পত্রিকা হাতে নিয়ে সাহিত্য পাতা বের করলেন। একবার চোখ বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস
ছাড়লেন, এখানেও মৃত্যুর কথা। নোবেলজয়ী রুশ লেখক আলেক্সান্ডার সোলঝেনিৎসিন এবং ফিলিস্তিন
কবি মাহমুদ দারবিশের প্রয়াণকথা ছাপা হয়েছে কয়েকটি নিবন্ধ, কবিতা। কবি শামসুর রাহমানের
মৃত্যুবার্ষিকীর কথাও বয়ান করা হয়েছে। হায়! মৃত্যু পায়ে পায়ে হেঁটে চলে! টের পায় না
মানুষ! না। আজ আর পত্রিকা পড়বেন না তিনি। হকারকে বললেন, শোনো, পেপার নিয়ে আরেকটু আগে
আসা যায় না?
হকার মাথা চুলকে বলল, আজ তো আগেই এসেছি, স্যার।
আজ তো আসবেই। আজ যে মৃত্যুগাথা ছাপা হয়েছে। আজ না এসে কি আগামীকাল
আসবে?
হকার বোকার মতো তাকিয়ে থাকল।
মিলটন খান বললেন, যাও। বাসায় নিয়ে যাও পেপারগুলো।
হাঁটতে শুরু করলেন তিনি।
সামনে তাকিয়ে দেখলেন, উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসছে মধ্যবয়সি এক নারী।
কে এই নারী? হাঁটার ভঙ্গিটা চেনা চেনা লাগছে! কপালের ধাঁচটাও! চোখগুলো চেনা! শরীর কেঁপে
কেঁপে ওঠার ভঙ্গিটাও চেনা!
বসন্তকাল চলছে। বর্ষাও চলছে এখন। বর্ষার চেতন-অবচেতনের প্রতিচিত্র
নয় কেবল, ‘ঘন গৌরবে আসিছে মত্ত বরষা’! উন্মত্ততা জেগে উঠল মনে। ‘মত্ত বরষার’ বুক চিরে
জেগে উঠল নতুন বসন্ত। নিজেকে আর বুড়ো মনে হলো না। মনে হলো ছত্রিশ বছর আগের এক কিশোর।
সামনে যে আসছে সে এক কিশোরী, ছত্রিশ বছর আগে যে কাঁপন জাগাত বুকে, সেই কিশোরী!
মিলটন খান থেমে গেলেন। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে কেঁপে কেঁপে থেমে
থেমে বের হচ্ছে সবুজ পাতা। দেহের মধ্যে জেগে উঠছে প্রকৃতির নতুন রঙ। এ রঙ ঝরে যায় না।
নতুন করে সাজে। নতুন রঙে নেচে ওঠে। এ রঙ ক্ষয়ে যায় না, নিঃশেষ হয় না। রঙে রঙিন মিলটন
খান একটু এগিয়ে বললেন, শোনো!
মহিলা থামতে গিয়েও থামলেন না। হাঁটতে লাগলেন। ধীর হলো না চালার গতি।
পাশে এগিয়ে গিয়ে মিলটন আবার ডাকলেন, শোনো!
আমাকে বলছেন?
হুঁ, তোমাকে বলছি।
চেনেন আমাকে?
চিনি। জোরালোভাবে বললেন মিলটন খান।
মাথা ঘুরিয়ে মহিলা দেখলেন লোকটিকে।
আমারও চেনা চেনা লাগছে আপনাকে।
দুজন পাশাপাশি এসে দাঁড়ালেন। মুখোমুখি দাঁড়ালেন। চোখ স্থির হলে চোখে
চোখে তাকালেন দুজন।
মিলটন খান বললেন, তুমি নদী।
নদী প্রশ্ন করল, তুমি, সাগর?
প্রশ্ন করে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল নদী। জীবনে প্রথম মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন
তারা।
আমি সাগর। চিনতে পেরেছ আমাকে!
পেরেছি।
ধেয়ে যাচ্ছে উড়ন্ত মেঘ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামছে। বসন্তেও প্রকৃতির
লীলা বোঝা কঠিন। দুজন দাঁড়িয়ে আছেন মুখোমুখি। নদীর দেহে ঘাম। মুখের দুপাশে ঘাম। বৃষ্টির
ছাঁটে ঘাম ধুয়ে যাচ্ছে। মেঘের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল নদীর মুখ। ছায়ার ভেতর থেকে উজ্জ্বল
আলোকরেখা ছুটে এসে ঢুকে গেল সাগরের চোখে। বুক ভরে গেল আনন্দে। অবচেতনের নগ্ন আলো বেরিয়ে
এলো বরষার মেঘে চড়ে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার পঙ্ক্তি জেগে উঠল মনে :
দিগন্তরালে কোন ভবিতব্যতা
স্তব্ধ তিমিরে বয়ে ভাষাহীন ব্যথা,
কালো কল্পনা নিবিড় ছায়ার তলে
ঘনায়ে উঠিছে কোন আসন্ন কাজে।
বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।
সাগর বলল, কখনও কথা বলোনি তুমি। আজ প্রথম বললে।
নদী বলল, তুমিও একবার মাত্র প্রশ্ন করেছিলে আমাকে শৈশবে। উত্তর দিইনি
আমি।
উত্তর দাওনি কেন?
ভয়ে।
কী ভয়?
নদী উত্তর দেয়, বুঝিনি তখন।
এখন বুঝেছ?
হুঁ। বুঝেছি।
এইমাত্র বুঝলে?
না। সারা জীবন ধরে বুঝে এসেছি।
জানাওনি কেন?
জানানোর সুযোগ হয়নি। হারিয়ে গিয়েছিলে তুমি। দেখা হলো আজ ছত্রিশ বছর
পর।
খুঁজেছিলে আমাকে? সাগর জানতে চাইল।
তুমি খুঁজেছিলে? নদী পাল্টা প্রশ্ন করল।
খুঁজেছি।
আমিও খুঁজেছি।
ভোরের কাঁচা সূর্য উঠছে। কাঁচাসোনা রোদে ভরে যাচ্ছে প্রকৃতি। নরম
আলো আছড়ে পড়ছে নদীর মুখে। নদীর কিশোরী মুখটা জেগে উঠছে। ঝরে যায়নি নদী, প্রকৃতি গ্রাস
করে নিয়েছে বয়স। সময়। মুখের আদলে বসে আছে মায়াবী কিশোরী নদী। যে নদীকে দেখলে বুকে কাঁপন
জাগত কিশোর সাগরের, যে নদীর জন্য কেঁদেছে, কেবলই কেঁদেছে, জানাতে পারেনি কেন কেঁদেছে,
সেই নদী প্রকৃতির জরাজীর্ণ পাতার মাঝখান থেকে সদ্য সবুজ পাতার মতো গজিয়ে উঠছে নরম ভোরে।
আজ ভোরে শূন্য গ্লাসের তলদেশ ভেসে উঠেছিল চোখের সামনে। তলটা শূন্য মনে হয়নি, মনে হয়েছিল
পূর্ণতায় পরিপূর্ণ। পূর্ণতার জটিল স্তর ভেদ করে নিজ জীবনের তল দেখতে পেলেন মিলটন খান।
অন্তহীন অনন্ত এ তলেও রয়েছে উঁচু পাহাড়, শৈশব-মনের কোটি কোটি ঢেউয়ের জমাট অস্তিত্ব
গড়ে দিয়েছিল ওই পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছে নদী। কেবলই নদী।
নদী প্রশ্ন করল, এই পাড়াতেই থাকো?
হ্যাঁ।
কত কাছাকাছি থাকি!
হ্যাঁ। দেখা হয়নি!
ছেলেমেয়ে কজন?
এক মেয়ে। তোমার?
এক ছেলে। নদী উত্তর দিল। সাগর তাকাল গাছের দিকে। সবুজ পাতা দেখল।
সদ্যোজাত পাতার আড়ালে দেখছে প্রকৃতির রূপ। জীবনের আড়াল থেকেও বেরিয়ে এলো প্রকৃতি।
মনে হলো নদীর ছেলে, নিজের মেয়ে প্রকৃতির সবুজ পাতা। দুটি পাতার সঙ্গে কি নিবিড় কোনো
মিলন হতে পারে? আচমকা প্রশ্ন এলো গহিন থেকে। উত্তর খুঁজে পেল না সাগর।
নদী বলল, কী ভাবছ?
সাগর বলল, তোমার ছেলের কথা। আমার মেয়ের কথা।
নদী বলল, তাহলে কি আমাদের আর কোনো কথা নেই?
আছে?
নদী বলল, ছেলেমেয়ের মধ্য দিয়েই তো বেঁচে থাকি আমরা।
সে তো মরে গেলে! বেঁচে থাকতেও কি মরে যায় মানুষ?
সাগর বলল, মনে হয় মরে যায়।
মরে গেছ তুমি?
মরতে মরতে বেঁচে গেছি। বেঁচে আছি।
কী সেটা?
আশা। আশার ভেলায় চড়ে বেঁচে আছি।
কী আশা?
আশা ছিল, একদিন দেখা হবে তোমার সঙ্গে।
আশা তো পূরণ হয়েছে।
হয়েছে, আবার আশা করব আমরা। আবার বাঁচব।
ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়ে বাঁচব?
না। নিজেদের মধ্য দিয়েও বাঁচতে চাই।
কীভাবে?
এই যে, দেখা হলো। দেখা হবে। কথা হবে। এ সামান্য আশাও অনেক বড়। নিজেদের
বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন।
তোমার বউ রাগ করবে না?
একই প্রশ্ন আমারও। তোমার স্বামী তো মাইন্ড করতে পারেন।
পারে। মাইন্ড করবে। অবশ্য ভালোবাসা না থাকলে মাইন্ড করবে না। তোমার
বউ কি খুব ভালোবাসে তোমাকে?
বাসে। তোমার স্বামী?
হুঁ। খুব ভালোবাসে।
তাহলে তুমি সুখী।
তুমিও তো সুখী।
নদীর কথা শেষ হলো না। আকাশের মেঘে কাঁপন উঠল। ঝুমঝুম বৃষ্টি নামল।
সাগর বলল, ভিজে যাচ্ছ তো।
নদী বলল, তুমিও তো ভিজছ। চলো, ভিজতে ভিজতে হাঁটি।
সাগর বলল, ঠান্ডা লাগবে না তোমার?
নদী বলল, লাগুক। হাঁটতে চাইছি আমি।
সাগর বলল, তাহলে হাঁটি। চলো।
হাঁটতে লাগল দুজনে। বয়সের উঁচু ধাপ থেকে নিচে নেমে গেছে ওরা। শৈশবের
দুই ক্লাসমেট হেঁটে যাচ্ছে পড়ন্ত বয়সে। বৃষ্টিতে ভিজছে। মনে হচ্ছে না তারা বর্তমানে
আছে। মনে হচ্ছে, শৈশবের দুজন যাচ্ছে অনন্ত পথে... ছুটে যাচ্ছে বৃষ্টির পানি নদীর দিকে।
নদী কি মিলিত হবে সাগরের মোহনায়? বিলীন হবে কি নদী অথই সাগরের বুকে?
বৃষ্টি ঝরছে। ভিজছে নদী। ভিজছে সাগর।
নদীর মনে হতে থাকে, সে এক কিশোরী-বৃষ্টিধারায় ভিজছে প্রাইমারি স্কুল-চত্বরে।
সাগরের মনেও আলোড়ন উঠল। ওই আলোড়ন সামনে টেনে আনে স্কুলের খেলার মাঠ। বয়স ছত্রিশ বছর
কমে গেছে ওর। দেহের বয়স ভেদ করে মনের বয়স জেগে উঠেছে। এখন তার বয়স বারো। পাশের কিশোরীটির
বয়সও বারো।
সাগর বলল, ইচ্ছা হচ্ছে তোমার হাত ধরি।
নদী বলল, ছি! মানুষ কী বলবে!
সাগর আবার বলল, লুকিয়ে ধরি হাত?
লুকাবে কোথায়? খোলা রাস্তায় কি লুকানো যায়?
আমরা এখন অতীতের বয়সে। সবাই তো সেই বয়সে ফিরে যেতে পারবে না। ওরা
তো বর্তমানে বসে অতীত দেখবে না। ওরা দেখবে মধ্যবয়সি দুই নরনারীকে।
তবু তো দেখতে পাবে?
এ দেখা নিয়ে ভীত কেন তুমি? বর্তমানটা দেখুক। তোমার সংসার আছে, ছেলে
আছে। আমার সংসার আছে। মেয়ে আছে সংসারে। ওরা এটাই দেখবে। দুই কিশোর-কিশোরীকে দেখতে পাবে
না কেউ।
তবু ভয় করছে।
ভয় কীভাবে তাড়াব?
জানি না। বলে থেমে গেল নদী। আচমকা চিৎকার করে বলল, পেয়ে গেছি।
কী পেয়েছ?
রিকশা।
কী হবে রিকশা দিয়ে?
তুমি আগের মতো গবেট রয়ে গেছ। এখনও তোমার বুদ্ধি খোলেনি।
আমি তো এখনকার বয়সে নেই। ফিরে গেছি অতীতের বয়সে।
এজন্য বুঝতে পারছ না কিছু। বলে খিলখিল করে হাসতে লাগল কিশোরী নদী।
বুঝিয়ে দাও। সাগরের কণ্ঠে আকুলতা।
এই যে রিকশা ভাই! দাঁড়ান। নদীর ডাকে রিকশা এসে থামল পাশে।
নদী বলল, ওঠো। রিকশায় ওঠো।
বাধ্য ছেলের মতো রিকশায় উঠল সাগর।
নদী বলল, সরে বসো।
লক্ষ্মীছেলের মতো সরে বসল সাগর।
হুড তুলে দিল নদী। বৃষ্টির হাত থেকে আড়ালের জন্য পর্দা টেনে দিল সামনে।
নদী বলল, ভাই, সামনে এগোতে থাকুন।
ঝমঝম করে বৃষ্টি ঝরছে। টুংটাং শব্দ করে খালি রাস্তায় এগিয়ে যাচ্ছে
রিকশা। রিকশায় বসে আছে সাগর আর নদী। গোপনে আড়ালে বসেছে কাছাকাছি।
নদী বলল, এবার ইচ্ছা পূরণ করো।
সাগরের বুদ্ধি লোপ পেয়ে গিয়েছিল, কিশোর সাগর ছিল এমনিই বোকা, অথচ
সেরা ছাত্র। নদী সামনে এলে বোকা হয়ে যেত। এখনও বোকার মতো আচরণ করছে। চলছে নদীর কথায়।
নদী খলবল করছে। এগিয়ে যাচ্ছে সাগরপানে।
ইচ্ছা পূরণের জন্য হাত বাড়াল সাগর। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ধরল নদীর
ডান হাত। বসে রইল হাত ধরে। উষ্ণতা জাগছে মনে। উষ্ণতা জাগছে দেহে।
নদী বলল, কাঁপছ কেন? মনে হচ্ছে রিকশায় ভূমিকম্প হচ্ছে।
সাগর বলল, কই কাঁপছি না তো! সামনে তাকিয়ে কথা বলছে সাগর।
নদী তাকিয়ে আছে সাগরের মুখের দিকে। বোকাটে কিশোরটার জন্য বুকে মায়ার
ঢেউ উঠেছে। হাতের স্পর্শে সেই ঢেউ ছড়িয়ে যেতে লাগল নদী থেকে সাগরে। এই মায়ার স্রোত
বাধা মানে না, পিছুটান বোঝে না। এ স্রোতের গতি অপ্রতিরোধ্য। ছত্রিশ বছর পরও জীবন্ত।
বৃষ্টি ঝরছে ঝমঝমিয়ে। আকাশে মেঘ ডাকছে। রাস্তার পানি জমে যাচ্ছে।
প্রকৃতি স্নান সেরে নিচ্ছে। এক সঙ্গে পরিশুদ্ধ হাত ছুঁয়ে ধুয়ে যাচ্ছে সাগরের মন। নদীর
মন এসে মিলিয়ে গেল সাগরের নতুন মোহনায়। বর্তমান সময়ের ভেতর ঢুকে গেছে অন্য সময়, লুকানো
কৈশোরকাল।