শাহীন রেজা, রাগীব হাসান, সাকিরা পারভীন
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৫৭ পিএম
কিছুটা পেরিয়ে এসেছি
শাহীন রেজা
কিছুটা পেরিয়ে এসেছি, পুরোটা নয়-
এভাবে চলতে থাকলে
বৃক্ষগুলো বঞ্চিত হবে
জোনাকস্পর্শের আনন্দ থেকে
নিশ্চয়ই সেটা কাম্য নয়
তোমার আমার
এবং অযুত অভ্যাসের
নক্ষত্রের দুটো হাতে
যদি বেঁধে দেই জোড়া লণ্ঠন,
তবে কি সূর্য হয়ে হাসবে
রাতের আকাশ?
সময় আমাকে যতই বুঝুক ভুল
আমি চেতন-ঘড়ির পেন্ডুলাম হয়ে
তবুও দুলতে থাকব মহাকালের
মাথার ওপর
কিছুটা পেরিয়ে এসেছি একা,
বাকিটা তোমার সাথে।
গোল ও প্রসারিত
রাগীব হাসান
গর্ভকূপে যে সকল শব্দ ভেঙে পড়ে
সেসব শব্দের নির্জন শরীর কোথায় এলোপাতাড়ি শুয়ে ছিল?
এক ফোঁটাও ঘুমায়নি, ব্যালকনির পাশে
করবীর শাখায় ঝুলে থাকা গোল চাঁদের মুখের দিকে
তাকিয়ে ছিল।
প্রতিফলিতের শরীরে রক্ত লেগে রয়েছে,
পৃষ্ঠা উল্টে দেখা যায় শীতকালীন রচনা।
রাত্রিফেরা, কত সহস্রা হয়ে কফি রঙের মতন
জ্বলে উঠল আলো।
যে হিম বাতাস নেমে এলো করবী গাছে
টানা বারান্দাজুড়েÑ ছুটে এসে
শুয়ে পড়ল তার পাশে।
সেইসব শব্দ, যারা রঙিন হয়ে বাজত
ময়দানের দিকে ছুটে যেত, গোল হয়ে বসে থাকত,
কাঠের ব্রিজ হৃদয় খুলে ভালোবাসা দিয়েছিল
ওই হিম বাতাস তাকেও ছুঁয়ে ছিল
গোল ও প্রসারিত হয়ে ছুঁয়ে ছিল।
জামগাছের স্বাধীনতা
সাকিরা পারভীন
আমি একখান জামগাছ। কোনো এক নাম না-জানা পাখির বিষ্ঠায় মেঘনার প্রলম্বিত
অববাহিকায় নরসিংদীর হাঁটুভাঙা গ্রামে জন্ম নিয়াছিলাম। তহন সংগ্রামের বছর। হারিছ মাস্টারের
নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন নরসিংদীর কৃষক শ্রমিক। আর যারা যোগ দিবার পারে
নাই তারাও কুনো না কুনো ভাবে গাইছিল মুক্তির গান।
তহন আমারও টগবগে যৌবন। কত পাকি পক্কল আহে যায়, মোর ছায়ায় জিরায়, চোহে
চোহে তাকায়, কেউ কেউ দেহি নানান ফুসুর-ফাসুর পরিকল্পনাও করে। আমি সবই বুজবার পারি কিন্তুক
কিচু কই না। আবালবৃদ্ধবনিতার মতন আমার চক্ষেও তহন স্বাধীনতার স্বপ্পন। মনে মনে সিদ্ধান্ত
নিছিলাম, যদ্দিন দ্যাশ স্বাধীন না হয়, বন্ধ্যা হইয়া থাকুম। একখান ফলও দিতাম না ফুল
ত আরও নয়, এই আমার গাছ জন্মের শপত।
একদিন গভীর রাতে দেহি দৌড়াইয়া আইতেছে হারিছ মাস্টার। বুঝতে বাকি থাকল
না মিলটারির রাইফেল তাক করে আগাইয়া আইতেছে তার দিকে। সিদ্ধান্ত নিলাম এইটাই সময়। চারিদিক
থেইকা শুরু করলাম উলটা-পালটা বাতাস। হাত বাড়াইয়া হারিছ মিয়ারে টাইনা লইলাম বুকের মইদ্যে।
একদিকে রাইতের আন্ধার অইন্যদিকে হাজার হাজারে ডাইল পাতার আছাড়ি-বিছাড়ি; উপরের দিকের
একটা ডালে বিছানা বানাইয়া দিলাম, কুনো রহম দম বন্ধ কইরা হুইত্যা রইল হারিছ মিয়া। টর্চমর্চ
মারছে মোর গায়ের মইদ্যে, মুই আরও নইড়া-চইড়া উডি। মাতামুটা মিলিটানি হারিছ মিয়ার নিশানা
পায়না কুনোহানে।
তারপর কী এক অজানা আক্রোশে এলোপাতাড়ি গুলি চালাল আমার গায়ে। ক্ষতবিক্ষত
ঝাঁঝরা হয়ে গেল আমার বুক। এফোঁড়-ওফোঁড় হলো জামগাছের বাদামি জমিন। কতই তো হয়েছে এমন!
পাখি, ফুল আর বাঁশি আর হাসি আর নদীর কুমারী সত্তায় ঢুকে পড়েছে ভয়ার্ত বারুদ। গা গুলিয়ে
ওঠা অন্তঃসত্ত্বায় প্রতিটি মুহূর্তেই হাত বুলিযে দিচ্ছে বিষোদগার।
গ্রামের মানুষের হাহাকারে উদ্বেলিত হলো তুচ্ছ এই জামগাছ জীবন। তারা
বলাবলি করতে লাগলÑ শুয়োরের বাচ্চারা এফোঁড়-ওফোঁড় কইরা দিছে সব। জমিরন বিবির মাইয়াডারে
আর বাঁচানো গেল না।
স্বাধীনতার পাঁচচল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে। হাঁ করা খোড়ল বুকে নিয়ে এই দেখো আমি, এক অসীম সাহসী জামগাছÑ সুনিশ্চিত মৃত্যুর বধ্যভূমি থেকে উঠে এসে স্বাধীন বাংলার বুকে মেলে ধরেছি আমার লক্ষ লক্ষ সবুজ পত্রপল্লব। প্রত্যেক বছর ষোলোই ডিসেম্বর আইলেÑ স্কুল-কলেজের পুলাপাইন আমার তলাত আইসা লাল-সবুজের পতাকা ওড়ায় আর তারা গায় আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।