× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বছর কুড়ি পর

রুমা মোদক

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৩৯ পিএম

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:০৩ পিএম

চিত্রকর্ম : শতাব্দী জাহিদ

চিত্রকর্ম : শতাব্দী জাহিদ

বিজয় দিবসে আহমেদ কাইয়ুম স্কাউট টিচার ছেলেদের নিয়ে মাঠে প্যারেড শুরু হলে ধুপ ধুপ করে সন্ধ্যা নামতে থাকে। টিনশেড স্কুলঘরের চালে, শিক্ষা প্রকৌশলের তিনতলা বিল্ডিংয়ের ছাদে, মসজিদের ছাদে নুইয়ে থাকা লিচুগাছের ডাল বেয়ে…। মসজিদের সামনে ওজু করার পানির কলগুলো একটাও অবসর পায় না। আশপাশের লোকজন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে পরম করুণাময়ের কাছে হাত তোলার বাসনায়। 

ছেলেগুলো উসখুস করে। দ্রুত বাসায় ফিরতে হবে। স্যারের কাছে মিনমিন করে, স্যার বাসায় প্রাইভেট স্যার আসবে…স্যার সন্ধ্যার পর বাড়ি গেলে বাবা চ্যালাকাঠ পিঠে ভাঙবে। 

বিজয় স্কুল গেটের বাইরে বিড়বিড় করে, যা শালারা বাড়িতে যা। লেফট-রাইট, লেফট-রাইট… তোরার বাল।

এমন নয় যে বিজয়ের সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল বা কোনো কারণে তাকে চিনি। বরং বলা ভালো সেদিনই ওকে প্রথম দেখলাম এবং এই অশ্রদ্ধা জ্ঞাপক বিড়বিড় কানে গেল বলেই, ওর প্রতি আগ্রহী হলাম। 

সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত স্কুলে থাকা হয় না সাধারণত। বিজয় দিবসের প্রস্তুতি মিটিংয়ে সেদিন দেরি হয়। নতুন হেড মাস্টার বিশাল খাইস্টা। স্কুলের ক্লাস টাইমের পরে মিটিং ডাকে। মিটিংয়ের কারণেই স্কুল থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা। ততক্ষণে হৈ হৈ রৈ রৈ করে ছেলেদের দল বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে দৌড়ে বের হতে হতে আমাকে দেখে দুপা পিছিয়ে যায় আমাকে আগে বের হওয়ার সুযোগ দিয়ে। শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানানোর রীতি। বিজয়কে তখন আমি দেখি। 

কালভার্টের ওপর বসে নিচ দিয়ে বয়ে চলা খালটির উন্মত্ত শেষ স্রোত, যা প্রায় শুকিয়ে কাদা, তার মাঝে মনোযোগ নিবিষ্ট করে আছে।

কিছু একটা বলে কথা শুরু করতে হয় বলে জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখো নিচে? আমি কে, কেন প্রশ্ন করছি ইত্যাদি স্বাভাবিক বিষয়েও মুখ তুলে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করার প্রয়োজনবোধ করল না ছেলেটি। জবাব দিল, মাছ। 

হ্যাঁ ভরা বর্ষায় এই খালটায় মানুষ হুমড়ি খেয়ে বড়শি, জাল ফেলতে দেখেছি। খোলা ভরা মাছও দেখেছি। কিন্তু এই শীতে জলের স্রোত প্রায় শুকিয়ে কাদা। এখন কীসের মাছ! ছেলেটিকে প্রশ্ন না করলেও পরের প্রশ্নটি আগাম বুঝতে পেরে তড়িগড়ি উত্তর দেয়, কাদায় কিছু মাছ টকে যায়। খেতে একদম জঘন্য। কাদার গন্ধ।

পাশে কোনো একটি ছাত্র দাঁড়িয়ে আমাকে সাবধান করে, ম্যামের সঙ্গে কথা বইলেন না। এ ড্যান্ডি খায়। 

এতে আমার আগ্রহ কমার বদলে আরও বাড়ে। তারপর নাম জিজ্ঞেস করে, বিজয় জেনে আরও আগ্রহের পারদ আরও চিড়চিড় করে বেড়ে যায়। যার বাবার নাম আব্দুস সালাম, তার ছেলের নাম বিজয়! তাজ্জব বৈকি।

কথা আরেকটু বাড়িয়েই জানতে পারি, এ আমাদের নাইট গার্ড আব্দুস সালামের ছেলে। প্রথমটায় করুণা হলো আহারে সরকারি চাকরি করে লোকটা অথচ ছেলেটা এই বয়সে নেশা ভাঙের জগতে তলিয়ে গেল! নাইট গার্ড বলেই কালেভদ্রে দেখা হয় সালামের সঙ্গে। তার ঘর-সংসার বিস্তারিত কিছুই জানি না আমি। জানার প্রয়োজন পড়েনি কখনও। এই দেশ কালে কেইবা অপ্রয়োজনে কিছু করে? সামনে পাওয়া বিজয়কে দেখে তার আচরণে আর তার চেয়েও বেশি তার নামে আমি সন্ধ্যার গাঢ়তর হয়ে ওঠার অনিবার্যতা উপেক্ষা করলাম।

মাস্টারির ভাবগাম্ভীর্য ঝেড়ে পাশে বসে জানতে চাইলাম তোমরা কয় ভাইবোন? স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দেয় বিজয়। স্কুলের ম্যাডাম পাশে বসে নাম-ধাম জিজ্ঞেস করবে এ রকম ব্যাপার যেন খুবই স্বাভাবিক। তিন ভাই, দুই বোন। তুমি বড়? না, মুক্তি বড়। 

আমি থমকে যাই। স্কুলের নাইট গার্ড। স্কুলের পতিত জমিতে ঘর বানিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে যার বাস, তার ছেলেমেয়ের নাম হবে আফিয়া, মুরাদ ইত্যাদি। তার ছেলের নাম কেন বিজয়-মুক্তি? 

আমি আর প্রশ্ন না বাড়িয়ে তাদের ঘরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করি। মোটেই পাত্তা দেয় না সে। আমি ছেলেটিকে আর না ঘাঁটিয়ে একাই রওনা দিই ওদের ঘরের দিকে। ততক্ষণে ঘড়িতে সাড়ে ছয়টা হলেও বাইরে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা।

সালাম মিয়া চমকে যায়। এত রাতে স্কুলের ম্যাডাম দরজায় দাঁড়ালে যে কেউ চমকে যাওয়ারই কথা। 

সেই সাতসকালে এক কাপ চা আর একটা টোস্ট খেয়ে বের হয়েছি। বাসায় বাচ্চাগুলো অপেক্ষায়। নিজেরও শরীর ভেঙে আসছে অবসন্নতায়। তাই কোনো ভণিতা না করে সরাসরি প্রশ্ন করি, আপনার ছেলেমেয়েদের নাম বিজয়, মুক্তি কেন। আব্দুস সালামের উজ্জ্বল মুখাবয়ব গভীর বিরক্তির অন্ধকারে ঢেকে যায়। এমনি এক কথায় উত্তর দিয়ে বউকে চা করার নির্দেশ দেয় আব্দুস সালাম। 

আমি নাছোড়বান্দা। বাড়ি ফেরার তাড়া। কৌতূহলটাও অনিবার্য। 

আব্দুস সালাম চুপ। না পারছে বেয়াদব হতে, না পারছে সত্যটা বলতে। কিছু একটা সত্য গোপন করতে চাইছে আব্দুস সালাম। 

চা নিয়ে বউটা সামনে দাঁড়ায়। আব্দুস সালামের চেয়ে বউটা অনেক স্বতঃস্ফূর্ত, বিজয় আর মুক্তির নাম নিয়া বাড়িতে আইছেন আপনি? হে তো এইসব কথা কাউরে কইতে চায় না। 

কী কথা? আমার ধারণা ঠিক হতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আমি ঘটনাটা জানার অপেক্ষা করি। ভাবি বউটা বলবে। সেও কিছু না বলে ভেতরে ঢুকে যায়।

বুঝতে পারি এরা কেউ কিছু বলতে চায় না। 

কেন বলতে চায় না বিষয়টাই আমার কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

আমি হতাশ হয়ে বের হয়ে আসি। ধুর নিজের বাবা মুক্তিযোদ্ধা বলে মুক্তিযুদ্ধের গন্ধ পেলেই শুঁকতে হবে? 

তবে ব্যাপারটা অবাকই বটে। আব্দুস সালামের ছেলেমেয়ের নাম বিজয়-মুক্তি। প্রায় কুড়ি বছরের চাকরি জীবনে কখনোই এই পরিবারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কোনো সম্পৃক্ততার কথা আমার কানে আসেনি। অথচ শহরের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক সব আয়োজনে সংশ্লিষ্ট থাকি আমি। থাকতে হয় মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবার অবদানের কারণে। এই শহরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাবাকে ছাড়া নয়। এই শহরের কোনো মুক্তিযোদ্ধার গল্প আমার বাবাকে ছাড়া হয় না। কত খুঁজে খুঁজে বের করেছি কুড়ি বছর ধরে। কিন্তু কেউ কোনো দিন কোনো কারণে আব্দুস সালামের নামও নেয়নি। ওরা লুকিয়েই রাখবে কেন? কত সুবিধাই তো নিতে পারত পরিবারটা। 

হাজারটা প্রশ্ন মোড়ানো হতাশা নিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকি রিকশার জন্য। 

আব্দুস সালাম পেছন থেকে ডাকে, ম্যাডাম…। আমি চমকে তাকাই। আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে কি সালাম ভাই পেছন পেছন এলো? আমি তাকে নির্ভার করলাম। ভয় আমি পাই না সালাম ভাই। আপনি ডিউটিতে যান। 

সালাম ভাইয়ের চেহারাটা অন্ধকারে দেখা যায় না, ফলে মনোভাবটা পড়া যায় না। তবে কণ্ঠ উত্তাপহীন। 

ম্যাডাম, আমার ভাই আব্দুস সাহেদকে আপনার বাবা ভাত খাওয়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল যুদ্ধে।

আপনার ভাই? কখনও বলেননি তো? 

ভাই আর ফিরে আসেনি।

কিন্তু কোনো দিন বলেননি তো সালাম ভাই, শুনিওনি কারও কাছে কখনও। 

সালাম ভাইয়ের কণ্ঠ সমান নিরুত্তাপ। পুত্রসন্তানের জন্য আমার মাকে বিয়ে করে আব্দুস সাহেদের মাকে তাড়িয়ে দিয়ে ছিল আমার বাবা। কোন মুখে মানুষকে পরিচয় দেই?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা