× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রক্ত ও অশ্রুর আখ্যান

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২৯ পিএম

রক্ত ও অশ্রুর আখ্যান

১৯৭১ সাল বাঙালির জাতীয় জীবনে কেবল একটি ঐতিহাসিক সাল নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের শেকড়, আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত দলিল। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের পর থেকে দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য এবং শোষণ চলেছিল, তারই অনিবার্য বিস্ফোরণ ঘটে একাত্তরে। কিন্তু দীর্ঘ নয় মাসের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, গণহত্যা ও ত্যাগের ইতিহাস সংরক্ষণে আমাদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অপ্রতুলতা আজও পীড়াদায়ক। সেই শূন্যতা পূরণে যে কজন গবেষক ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, সালেক খোকন তাদের অন্যতম। তার সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘গৌরব ও বেদনার একাত্তর’ মাঠপর্যায়ের গবেষণালব্ধ এক দালিলিক মানচিত্র।

বইটির শক্তিমত্তা এর নির্মাণশৈলী ও বিন্যাসে। লেখক আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে প্রামাণ্যের ওপর জোর দিয়েছেন। সাংবাদিকতার নিরাসক্ত দৃষ্টি আর গবেষকের অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে তিনি ছুটে গেছেন দেশের প্রত্যন্ত জনপদে। বইটির কাঠামো দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্তÑ গণহত্যার কেস স্টাডি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-গদ্য। এই বিভাজন মূলত মুক্তিযুদ্ধের ‘বেদনা’ ও ‘গৌরব’Ñ উভয় দিককেই সমান্তরালে উপস্থাপন করে।

‘গণহত্যার অভিঘাত’ অংশে লেখক তুলে এনেছেন রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমি, সিলেটের কাইয়ার গুদাম, সৈয়দপুর ও সিরাজগঞ্জসহ আটটি গণহত্যার লোমহর্ষক বিবরণ। এগুলো কেবল সংখ্যার খতিয়ান নয়, বরং ঘটনার পেছনের নির্মম সত্য। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের ১৮ মের ‘অপারেশন’-এর বর্ণনা পাঠ করলে পাঠক শিউরে ওঠেন। মোস্তফা খন্দকার নামের সাইকেল মিস্ত্রি কিংবা অন্ধ ভিখারির মাধ্যমে হিন্দুপাড়ার অবস্থান ফাঁস হওয়া এবং পরবর্তীতে জ্ঞানদায়িনী হাইস্কুলের শিক্ষক যোগেন্দ্রনাথ বসাকসহ একই পরিবারের তিন প্রজন্মকে হত্যার ঘটনা পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার এক নির্মম দলিল। লেখক দেখিয়েছেন, এই হত্যাযজ্ঞ ছিল সুপরিকল্পিতÑ যার লক্ষ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করা এবং জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করা। একইভাবে সৈয়দপুরের রেলশহরে ট্র্যাক বরাবর লাশের সারি কিংবা কাইয়ার গুদামে মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনাগুলো একাত্তরের ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স’ বা কাঠামোবদ্ধ ত্রাসের স্বরূপ উন্মোচন করে। লেখক একে ‘শিল্পায়িত হত্যা’র ইঙ্গিত হিসেবেও দেখিয়েছেন।

সালেক খোকনের গবেষণার একটি বড় স্বাতন্ত্র্য হলোÑ তিনি ইতিহাসের ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ বা বড় বয়ানের বাইরে গিয়ে স্থানীয় ইতিহাসকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কালিয়াকৈরের ডাকবাংলোয় পাকিস্তানি ক্যাম্প গড়ে ওঠা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী দোসরদের (যেমনÑ চৌধুরী তানভীর আহমেদ, তজিমুদ্দিন চেয়ারম্যান প্রমুখ) ভূমিকা তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। খাদ্য সরবরাহ, পিস কমিটি গঠন এবং অস্ত্রধারী গ্রুপ তৈরির মাধ্যমে তারা কীভাবে ‘হোমফ্রন্ট’-এ দখলদারদের সহায়তা করেছিল, তার দালিলিক প্রমাণ বইটিতে উপস্থিত। এর মাধ্যমে পাঠক বুঝতে পারেন, যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয়নি, প্রতিটি গ্রাম ও জনপদই ছিল একেকটি রণাঙ্গন।

বইয়ের দ্বিতীয় অংশে উঠে এসেছে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়ান। এখানে অন্তত দশজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জবানিতে প্রশিক্ষণের কষ্ট, রেশনের অভাব, আর মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে অপারেশনের গল্প বর্ণিত হয়েছে। যেমনÑ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদের বয়ানে উঠে এসেছে দারিদ্র্য ও দেশপ্রেমের দ্বৈরথ। ভাতের বদলে যবের ছাতু খেয়ে বেঁচে থাকা, টাইপরাইটিং শেখার স্বপ্ন ত্যাগ করে যুদ্ধে যাওয়াÑ এসব ঘটনা যুদ্ধের মানবিক ও কঠিন বাস্তবতাকে সামনে আনে। আবার রওশন জাহান সাথীর মতো নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, একাত্তর কেবল পুরুষের যুদ্ধ ছিল না। লিয়াকত আলী খানের (বীরউত্তম) বয়ানে যখন উচ্চারিত হয়Ñ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানেই প্রপার ডেমোক্রেসি’Ñ তখন পাঠক বুঝতে পারেন, এই লড়াই কেবল ভূখণ্ডের জন্য ছিল না, ছিল ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন।

প্রামাণ্যের জন্য তিনি স্থাননাম, তারিখ, ব্যক্তিনাম নথিবদ্ধ করেছেনÑ যা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হয়ে থাকবে। ভূমিকায় যেমন উঠে আসেÑ পাকিস্তান রাষ্ট্র এখনও ক্ষমা চায়নি; সামরিক অপরাধীদের কাউকে বিচারও করা হয়নি। এই সত্য কেবল অতীতের ক্ষোভ নয়; এটি বর্তমান ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আবার, বাংলাদেশে শহীদ-তালিকা ও শহীদ-পরিবারের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি মডেল না গড়ে ওঠা আমাদের রিপাবলিকান নৈতিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। বইটি তাই গোপনে পাঠককে জিজ্ঞেস করেÑ ‘স্মৃতির ঋণ কি শুধু ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরের বক্তৃতায় শোধ হয়?’

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনও ১৯৭১-এর হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে পূর্ণ আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ‘গৌরব ও বেদনার একাত্তর’-এর মতো কেস স্টাডিনির্ভর বইগুলো জরুরি দালিলিক ভিত্তি তৈরি করে।

বইটির বিন্যাসেও একটি ছন্দ আছেÑ গণহত্যার কেস স্টাডির পর বীরত্ব-কাহিনী পাঠককে ‘শোক থেকে শক্তি’র দিকে নিয়ে যায়। আলোকচিত্রের ব্যবহার সংযত, টেক্সটভিত্তিক বইতে এগুলো শ্বাস-ফেলার অবকাশ তৈরি করে। ভাষা সহজ, কিন্তু ওজনদার। আবেগ আছে, তবে অতিরঞ্জন নেই; নাটকীয়তা নেই, আছে দৃশ্য-ব্যাকরণ। ফলে বইটি একদিকে তথ্যনির্ভর, অন্যদিকে আবেগঘন দলিল।

গৌরব ও বেদনার একাত্তর শুধু স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে না; মনে করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের গভীর তাৎপর্য। স্বাধীনতার লড়াই ছিল মূল্যবোধ, ন্যায় ও মানবাধিকারের সংগ্রাম। আজও এর শিক্ষা সমান প্রাসঙ্গিকÑ কারণ ইতিহাসকে ভুলে গেলে আমরা শুধু পরিচয় হারাই না, সংগ্রামের মূল শিক্ষাকেও অবমূল্যায়ন করি। তাই ইতিহাসকে স্মরণ করা যথেষ্ট নয়; তা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিদিনের জীবনে ন্যায়, সাহস ও মানবিকতার অনুশীলন করাও জরুরি। এখানেই বইটির প্রাসঙ্গিকতাÑ এটি কেবল স্মৃতিচারণ নয়, বরং সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক প্রজন্ম গঠনের প্রেরণা।


বই : গৌরব ও বেদনার একাত্তর

লেখক : সালেক খোকন

প্রকাশনা : কথাপ্রকাশ

প্রচ্ছদ :  মোস্তাফিজ কারিগর

প্রকাশকাল : ২০২৪ (প্রথম সংস্করণ)

মূল্য : ৫০০ টাকা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা