× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঘর ও ঘোর

সাব্বির জাদিদ

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৭ পিএম

চিত্রকর্ম: মিজান স্বপন

চিত্রকর্ম: মিজান স্বপন

আসলামের কাছে যুদ্ধটা ছিল নেশার মতো। মাত্রা ছাড়া নেশায় লোকে যেমন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে, দুঃখ-বেদনা, ভয়-শঙ্কা কিংবা পিছুটানের ঊর্ধ্বে উঠে যায়, আসলামেরও সেই দশা হয়েছিল। নতুবা আজন্ম ভীতু, অলস, নির্বিবাদী আসলামের পক্ষে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। যুদ্ধটা ছিল আসলামের জীবনের একটা ঘোর। মহাঘোর। যে ঘোরের হাতছানি সহজে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। আসলামও পারেনি। তাইতো সে বেরিয়ে পড়েছিল এক কাপড়ে। আসলাম যুদ্ধটার কাছে ঋণী। যুদ্ধের সময় মানুষ চেনা যায়। যুদ্ধের সুযোগে আসলাম মানুষ চিনেছে। ভালো এবং মন্দ দুটোই। তার জীবন পাত্র এখন উপচে পড়ছে মানুষ চেনা-বিষয়ক দুর্লভ সব অভিজ্ঞতার ভারে। কদমতলীর সেই মায়ের কথা কি আসলাম কোনোদিন ভুলতে পারবে, মিলিটারি আসার প্রাক্কালে ঘরের বেড়া ভেঙে যিনি আসলামদের বের করে দিয়েছিলেন?

মাসটা তখন আগস্ট। মিলিটারির আচমকা আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল আসলামদের ক্যাম্প। যে যেভাবে পেরেছিল, জীবন হাতে নিয়ে পালিয়েছিল। আসলাম আর খায়রুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল মূল দল থেকে। রুদ্ধশ্বাসে দৌড়নোর পর আসলাম নিজেকে আবিষ্কার করে এক কলার ক্ষেতের মধ্যে এবং সেখানে সে পেয়ে যায় খায়রুলকে। দুজনের হাতেই থ্রি নট থ্রি। তারা যুক্তি করে এদিকটায় আসেনি। মৃত্যুর ঢেউ তাদের একসঙ্গে আছড়ে ফেলেছে কলার ক্ষেতের সৈকতে। এই চরম দুঃসময়ে অন্তত একজন সঙ্গী পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল আসলাম। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পুবপাড়ার দিকে ছুটে যাচ্ছে একদল মিলিটারি, পথপ্রদর্শক স্থানীয় এক রাজাকার, কলার ক্ষেতের ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। দৃশ্যটি দুই যোদ্ধার রক্তে ক্রোধের আগুন ছোটায়। রাজাকারের চেহারাটি চিনে রাখে তারা। খানিক বিশ্রাম নিয়ে দুজন যুক্তি করে হাঁটতে থাকে উল্টোদিকে। ওই দিকটা হয়তো নিরাপদ। কলার মাঠ পেরিয়ে বিশাল এক বাঁশঝাড়। এই নরম রোদের বিকালেই বাঁশঝাড়ের নিচে ছড়িয়ে আছে অন্ধকার। আগস্ট সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ে এক দঙ্গল শালিকের মাথা খারাপ করা কিচিরমিচির। বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে পায়ে চলা সরুপথ। বাতাসে মৃদু ধুলো উড়ছে। ওই পথে পা রাখতেই মাগরিবের আজান পড়ে। নিকোনো উঠোনওয়ালা এক বাড়ির দেউড়িতে থেমে যায় পথ। বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া দেওয়া চারচালা তিনটি ঘর নিয়ে এই বাড়ি। জাঁকিয়ে বসা অন্ধকারের মাঝেও কেমন চকচক করছে নতুন চাটাইয়ের বেড়া। পুরো বাড়ি জুড়ে গা ছমছমে ভৌতিক নীরবতা। এই নীরব পটভূমিকার মাঝে হঠাৎ কলপাড় থেকে কল চাপার ক্যাচক্যাচ শব্দ ভেসে এলে দুজনই চমকে ওঠে। সাদা থান শাড়ি পরিহিত এক প্রৌঢ়া কলপাড়ে ওজু করছেন। মাথা মাসেহের সময় যখন তার ঘোমটা সরে যায়, তখন এই অন্ধকারেও মহিলার মাথা ভরা কাঁচাপাকা চুল দৃষ্টিগোচর হয় আসলামদের। এত বড় বাড়িতে মহিলা কি একাই থাকে! পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ওরা। এক রাতের জন্য ওদের নিরাপদ আশ্রয় প্রয়োজন। এই বাড়ি কি হতে পারে না ওদের আশ্রয়স্থল? দেউড়ির মুখে ওরা মহিলার ওজু শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। ততক্ষণে মহিলারও চোখ পড়েছে ওদের ওপর। শুরুতে তিনি চমকান। পরক্ষণে সামলে নিয়ে ওজু অসমাপ্ত রেখেই তিনি দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে এগিয়ে এলেন আসলামদের দিকে। তোমরা কারা? এইখানে কী করো? মহিলার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা। আলাপের শুরুতেই তিনি জেনে নিতে চান ওদের পরিচয়। যেন ওদের পরিচয়ের ওপরই নির্ভর করছে মহিলার নিজের পরিচয়।

মহিলার মুখজুড়ে ছড়িয়ে আছে মায়েদের সৌরভ। এমন মানুষের সামনে সত্য বলায় ঝুঁকি নেই। আসলাম সত্যটাই বলেÑ আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের ক্যাম্প আক্রান্ত হয়েছে। পেছনে তাড়া করছে শত্রু। এই রাতে আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।

মহিলার চোখেমুখে এবার ফুটে ওঠে যুগপৎ ভয় ও মায়া। তিনি আসমানের দিকে তাকান। বিড়বিড় করে কাকে যেন অভিশাপ দেন। তারপর খপ করে চেপে ধরেন দুজনের দুই হাত। বিপদগ্রস্ত সন্তানকে মা যেমন টেনে নেয় বুকের ভেতর, অবিকল সেই ক্ষিপ্রতায় তিনি দুই মুক্তিকে টেনে নেন দেউড়ির ভেতর। 

খানিক পর আসলামরা নিজেদের আবিষ্কার করে অন্ধকার এক ঘরের মধ্যে। ঘর বলতে যা বোঝায়, এটা যেন তা নয়। সংসারের যাবতীয় অচল ও বাতিল জিনিসে ঠাসা এর প্রতিটি কোনা। মায়ের মতো নারী কেন এই ঘরেই তাদেরকে আশ্রয় দিল, বুঝে উঠতে পারে না ওরা। তার কি বিছানাওয়ালা ঘর নেই, যেখানে হাত-পা ছড়িয়ে একটা রাত আরাম করে ঘুমানো যায়! 

মহিলা ওদেরকে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দিয়েছেন। এই শিকল তোলা ব্যাপারটায় ওদের বুকের ভেতর খচখচ করে। কোনো চক্রান্তের কবলে পড়ল না তো ওরা! অস্ত্রগুলোকে ওরা বাড়তি সতর্কতায় কাঁধের ওপর তুলে রাখে। টিনের চালে সরসর শব্দ তুলছে অবাধ্য কয়েকটি বাঁশের আগা। দুটো কুকুর তার স্বরে ঝগড়া করে থেমে গেলে যুদ্ধকবলিত সন্ধ্যা রাতের নিস্তব্ধতা আরও প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। আর তখন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাড়া মেলে গৃহকর্ত্রীর। শিকল নামিয়ে তিনি প্রবেশ করেন আসলামদের ঘরে। তার এক হাতে কুপি আর অন্য হাতে টিনের থালা, তাতে নাড়-মুড়ির আয়োজন। উত্তেজনায় এতক্ষণ ক্ষুধার কথা মনে ছিল না ওদের। কিন্তু টিনের থালায় ফুটে থাকা স্বাস্থ্যবান লালচে মুড়ি আর নারকেলের নাড়ুর সৌরভ ঘরময় ছড়িয়ে পড়লে ওদের পেটের ভেতর আরেক মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কোনো কথা না বলে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মুড়ির ওপর আর তখন খেয়াল হয়, মহিলা এলে তাদের মিত্রপক্ষই হবে, কেননা শত্রুপক্ষকে কেউ এত আয়োজন করে মুড়ি খাওয়ায় না। এরপর ওদেরকে অবাক করে দিয়ে সেই রাতে পোষা মোরগ জবাই করেন মহিলা। তারপর বসে যান চুলার পিঠে। বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে মোরগের মাংস রান্না করেন। আসলামরা মনের আনন্দে পায়চারি করে উঠোনে। থ্রি নট থ্রি বারান্দার খুঁটির সঙ্গে থাকে হেলানো। মাংস কষানো হয়ে গেলে ঝোলের পানি ঢেলে মহিলা নেমে আসেন উঠোনে। আসলামদের বলেন, দোয়া করো যেন হায়দার আজ বাড়ি না ফেরে।

হায়দার কে? দুই যোদ্ধার মুখ থেকে একসঙ্গে উচ্চারিত হয় বাক্যটা। জবাবে মহিলা যা বলেন তাতে দুঃখ আর পরিহাস একাকার হয়ে মিশে থাকে। হায়দার মহিলার ছেলে। সময়ের সুবিধা নিতে সে নাম লিখিয়েছে রাজাকার বাহিনীতে। বাড়িতে খুব একটা আসে না। আর্মি ক্যাম্পে থাকে। আর্মিদের পেটের এবং দেহের ক্ষুধার অন্ন সরবরাহ করে। 

মহিলার কথা হতভম্ব করে আসলামদের। এমন মহৎ মায়ের পেটে দেশদ্রোহী কুলাঙ্গার সন্তানের জন্ম হলো কীভাবে! বুঝতে পারে, এই রাতে হায়দার বাড়ি এলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে।

তার জন্যই তো ঘরে শিকল তুলে রাখছি। যেন হায়দার এলেও টের না পায় বাড়িত কেউ আছে। মহিলাকে অভয় দেয় খায়রুলÑ চিন্তা করবেন না। আমাদের হাতে অস্ত্র আছে। 

রাত গভীর হলে কুপির আলোয় খেতে বসে দুই মুক্তিযোদ্ধা। দুজনের পাতে মোরগের দুটো রান তুলে দিতে দিতে মহিলা যা বলেন, তাতে অভিভূত হয়ে যায় আসলামরা। এ বাড়িতে আসলামদের আগমন মহিলার দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও দোয়ার ফসল। মহিলা প্রতিদিনই মুক্তিযোদ্ধাদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকেন। তার বড় সাধ মুক্তিদের একবেলা ভাত রেঁধে খাওয়াবেন। সঙ্গে পোষা মোরগের কষানো মাংস। এ তার কুলাঙ্গার সন্তান পেটে ধরার প্রায়শ্চিত্ত। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে আজ। মহিলার পাপ আজ সামান্য হলেও হালকা হলো। 

বুকভরা প্রশান্তি আর পেটভরা তৃপ্তি নিয়ে সে রাতে ঘুমাতে যায় আসলামরা। বাড়তি সতর্কতায় তাদের আশ্রয় হয় আগের সেই পুরনো ঘরেই। মহিলা যথারীতি বাইরে থেকে শিকল তুলে দেন। যাওয়ার আগে উপদেশ দেন নির্ভার থাকার। মুক্তিরা দেশটাকে পাহারা দিচ্ছে। আজ রাতে তিনি ঘুমাবেন না। আজ তিনি মুক্তিদের পাহার দেবেন। কিন্তু প্রকৃতি বোধহয় ভালো মানুষের জীবনে সংকট দেখতে পছন্দ করে। তাইতো এই মানুষগুলোর জীবনের সংকট ঘনীভূত করতে সে রাতে অনেক দিন পর বাড়ি ফেরে হায়দার। রান্নাঘরে মাংসের গন্ধ পেয়েই তার সন্দেহ জাগে। এত রাতে মাকে জায়নামাজে বসে থাকতে দেখে তার সন্দেহ আরও প্রগাঢ় হয়। ব্যবহৃত দুটো ঘরে ঢুঁ মেরে কী ভেবে সে ছুটে যায় পরিত্যক্ত ঘরে আর আসলামদের ঘুমন্ত দেহ আবিষ্কার করে ক্ষণিকের জন্য থরথর করে কেঁপে ওঠে। কিছুক্ষণ পর সে স্থির করে ফেলে করণীয়। এ এক সুযোগ। সুবর্ণ সুযোগ। অমনি সে বাইরে তালা ঝুলিয়ে দেয় আর মাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছুটে যায় মিলিটারি ক্যাম্পের দিকে। কতক্ষণ মহিলার মাথায় কোনো বুদ্ধিই খেলে না। সময় খুবই কম। আজরাইল হয়তো এ বাড়িতে আসার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে; যা করার এর আগেই করতে হবে। নয়তো ছেলে দুটোকে বাঁচানো যাবে না। ভেতরে বয়ে চলা উথালপাতাল ঝড় থামলে মহিলার মাথা তৎপর হয়ে ওঠে। ঘর তালাবদ্ধ তাতে কী, চাটাইয়ের বেড়া কেটে সহজেই তো ওরা পালিয়ে যেতে পারে। অমনি তিনি বঁটি হাতে ছুটে যান বেড়ার কাছে। ছেলে দুটো তখনও ঘুম। বড় মায়া হয় মহিলার। কে জানে কত দিন পর তারা এমন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছে। দরজার কড়া নেড়ে তিনি ওদেরকে ডেকে তোলেন। ভেঙে পড়া গলায়, দরজার ওপাশ থেকে, খুলে বলেন বৃত্তান্ত। এরপর বঁটি দিয়ে ঘরের নতুন চাটাই কেটে বেরোনোর পথ করে দেন।

বাইরে বের হয়ে ওরা হড়বড় করে বলে, কিন্তু আর্মি তো আপনাকে ধরবে।

এই বিপদের মুহূর্তেও মহিলার স্থিরতা ও শানিত বুদ্ধি মুগ্ধ করে আসলামদের। আর্মি এলে বলব, ধরায় দেওয়ার জন্যি তোমাদের আশ্রয় দিচ্ছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পেরে ঘরের মধ্যে থাকা বঁটি দিয়ে চাটাই কেটে পালিয়ে গেছে। 

কিন্তু আপনার ছেলে যদি আসল ঘটনা বলে দেয়?

আমি তার মা। কুলাঙ্গার হলেও মাকে সে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চাবে না। আল্লাহ তোমাদের ভালো করুক। তোমরা যদি আমার পেটের ছেলে হতে! মহিলার কণ্ঠ থেকে আক্ষেপ ঝরে পড়ে। এরপর কীসব দোয়া পড়ে ওদের মাথায় ফুঁ দিয়ে দেন তিনি।

এক বিপদগ্রস্ত মাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে আসলামরা সে রাতে পালিয়ে যেতে পারে না। তারা একটু দূরে এক ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পরবর্তী ঘটনার অপেক্ষায়। খানিক পর বাংলার কোমল মাটি মাড়িয়ে যথানিয়মে মিলিটারি আসে। মহিলা মিলিটারির সামনে আছড়ে পড়েন, কাটা চাটাই দেখান আর চিৎকার করে বলেন, মুক্তি পালা গিয়া। 

  ঘটনা বুঝতে পারলেও মিলিটারির সামনে সত্য প্রকাশ করে না হায়দার। সেও বরং মায়ের সঙ্গে আফসোসে যোগ দেয়। ক্ষণকাল পর মিলিটারি দলটি ত্যক্ত হয়ে ফিরে গেলে হায়দারের প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে। ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে সে চাটাইয়ের গায়ে ক্রমাগত লাথি মারতে থাকে আর ঝাঁজালো কণ্ঠে বলে, ওই শয়তানগুলোর ওপর তোমার এত দরদ!

সেই রাতে চাইলেই হায়দারকে পরপারে পাঠিয়ে দিতে পারত আসলামরা। কিন্তু এক উপকারী মায়ের সামনে সন্তানকে হত্যা করতে মন সায় দেয় না ওদের। যতই হোক বিপথগামী, তবু সন্তান তো! শত্রু বাগে পাওয়ার পর ওই একবারই নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছিল আসলাম। তার মাশুলও অবশ্য দিতে হয়েছে কড়াগন্ডায়। চিতলমারির যুদ্ধে এই কুলাঙ্গার হায়দারই পথ দেখিয়েছিল আর্মিদের। সেই যুদ্ধে খায়রুলসহ আট সহযোদ্ধাকে হারিয়েছে আসলাম। যার সন্তান এত বড় ক্ষতি করল, তার মাকে কিন্তু ভুলতে পারেনি আসলাম, এক মুহূর্তের জন্যও। যদিও অমন সাহসী, মহানুভব অনেক মায়ের দেখাই সে পেয়েছেন রণাঙ্গনে। তারপরও কদমতলীর ওই মা ভিন্ন এক দ্যোতনা নিয়ে জাগরূক থেকেছে আসলামের হৃদয়ে। যুদ্ধে না গেলে এদেশের মায়েদের সাহসের এই লাবণ্য সে কোনোদিন দেখতে পেত না। 

স্বাধীনতা নয়, আসলামের কাছে যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল সময়ের দায় শোধ করার একটি উপলক্ষ। পশ্চিম পাকিস্তানের সুপ্রশিক্ষিত যোদ্ধাদের সামনে তাদের মতো লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা অপুষ্ট ভুখা-নাঙ্গা তরুণরা লড়াইয়ে টিকে থাকবে, সেই আশা কখনও করেনি আসলাম। এ যেন লৌহপ্রাচীরের দিকে মাটির ঢিলা ছুড়ে মারার মতো ব্যাপার। মাত্র নয় মাসের এক যুদ্ধে দেশটা স্বাধীন হয়ে যাবে, এতটা উচ্চাশাও কোনোদিন করেনি আসলাম। কিন্তু নয় মাস পর, এক সাগর রক্তের ওপর যখন স্বাধীনতার সৌধ নির্মিত হলো, আসলাম হতভম্ব হয়ে গেল। কীভাবে সম্ভব হলো এই অর্জন! তখনও তার যুদ্ধের ঘোর পুরোপুরি কাটেনি। তখনও তার মনে পড়ছে শহীদ খায়রুল, কদমতলীর মাসহ রণাঙ্গনের সুখ-দুঃখের অসংখ্য স্মৃতি। যখন তার ঘোর ভাঙল, মনে পড়ল ঘরের কথা। দেশ তো পাওয়া গেল, কিন্তু ঘর? পরক্ষণে মনে হলো, যতই সে ঘোরের বাহানা দিক, ভীতু আসলামের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে তার নরকতুল্য ঘরের ভূমিকা, যে ঘরে সে ছিল এক অনাহূত, অপাঙতেয়।

গা থেকে শৈশবের পালক ঝরার আগেই মাকে হারিয়েছিল আসলাম। এখনও তার আবছা মনে পড়েÑ এক মিষ্টি বাতাস বওয়া ভোরে গাবগাছের ডাল থেকে মায়ের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছিল গ্রামবাসী। আদুরে-আহ্লাদে যে ডাগর ডাগর চোখ দুটো ঘুরিয়ে মা গল্প বলত, সেই জোড়া চোখ বেরিয়ে এসেছিল কোটর ছেড়ে। আসলাম মায়ের কাছে ছুটতে চাইলে পাড়াতো এক চাচি তাকে চেপে ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর মাকে আর সে কোনোদিন দেখেনি। মায়ের মৃত্যুর পর বড় চাচার বিধবা স্ত্রী মা হয়ে এসেছিল আসলামদের ঘরে। বড় হয়ে আসলাম ধারণা করেছে, এই বিধবা চাচির কারণেই মরেছে তার মা। তবে শত বেদনার মাঝেও যে ব্যাপারটা আসলামকে স্বস্তি দেয়, তা হলোÑ নতুন মাকে সে কোনোদিন মা বলে ডাকেনি। ওই স্বর্গীয় ডাকটা সে অপাত্রে ব্যবহার করে কলুষিত করতে চায়নি। এই নতুন মাকে নিয়েই ঘরে যত অশান্তি। আজন্ম উদাসীন আসলামের কাজেকর্মে, এমনকি পড়াশোনায় কোনো মন নেই। এইট পাস দেওয়ার পর সে আর পড়েনি। পাঠশালা কিংবা মাঠের কাজের চেয়ে তাকে বেশি আকর্ষণ করে প্রকৃতি। আর এই ঔদাস্যের কারণেই সে নতুন মায়ের চক্ষুশূল হয়েছে শুরু থেকে। দামড়া ছেলে কেন মাঠের কাজকাম না করে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়Ñ এই ছিল তার অভিযোগ। এক দিন বাবার সামনে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণাও দিলেন, আসলামের জন্য তিনি আর ভাত রানতে পারবেন না। এই ছেলে চোখের সামনে থেকে দূর হলেই তিনি শান্তি পান। এত কিছুর পর সেই বাড়িতে আর থাকা যায় না। বিশেষত বাবা যেখানে নীরব। আসলাম সিদ্ধান্ত নেয় গৃহত্যাগী হওয়ার। আর তখনই ডাক আসে যুদ্ধের। এবং উপায় না দেখে সে ঝাঁপিয়েও পড়ে যুদ্ধে। যুদ্ধের নয়টা মাস সে ঘরের দুঃখ ভুলে ছিল। কিন্তু নয় মাস পর দেশটা স্বাধীন হলে তার সামনে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিল, তা হলো, ঘরের প্রশ্ন। আসলাম এই ভূখণ্ডের মানুষের জন্য দেশ এনে দিল কিন্তু তার নিজের ঘর নেই। সে এখন যাবে কোথায়! একেকবার মনে হলো, যুদ্ধ চলাকালে যেসব মানুষের সঙ্গে তার হৃদ্যতা তৈরি হয়েছে, তাদের কাছে যাই। পরক্ষণে মনে হলো, সেই জায়গাগুলো এমন, যেখানে শুধু আপৎকালে যাওয়া যায়, চিরকাল থাকার জন্য নয়। ফলে আসলামের ভবঘুরে জীবনের ব্যাপ্তি ক্রমাগত বাড়তেই থাকল। এরই মধ্যে দেশ ও দেশের রাজনীতিতে ঘটতে থাকল অনেক পরিবর্তন। কিছুদিন পর সে টের পেল, যে লক্ষ্যকে স্থির করে স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছিল, দেশ যেন সেই পথে নেই। দেশটার গতিপথ কেবলই বেঁকেচুরে যাচ্ছে। আসলাম নিজের সঙ্গে দেশটার কোথায় যেন মিল খুঁজে পেল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা