× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নৃত্যনিয়া ও তার অভিনাচ

আনিফ রুবেদ

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:১৩ পিএম

প্রচ্ছদ:  মন্দিরা ভাদুড়ী, অধ্যাপক, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

প্রচ্ছদ: মন্দিরা ভাদুড়ী, অধ্যাপক, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

আমাদের দেহ থেকে সুন্দর ত্বক পলাতক হয়েছে বহু দিন হয়ে গেল। এখন ত্বক মানে চামড়া শুধু; জামড়া ধরা ঝুলঝুলে চামড়া; চামড়ার ওপর জরের মোটা মোটা রেখার টেক্সচার। চুলে পাক। কিন্তু আজতক সেই স্মৃতির ত্বক তকতক করছে।

সুন্দর সন্ধ্যা চলছিল সেদিন। তাদের পুরো বাড়িটা ঝলমলে বাতিতে ঝলমল করছিল। এতসব ঝলমল আমার ভালো লাগে না খুব; বড্ড গোলমাল লাগে। তবু গেছিলাম। অনেকেই নাচবে বাড়ির উৎসবে। সেও নাচবে। আমি নাচ দেখব শুধু তার। তার মতো সুন্দর কাউকে দেখিনি কখনও। এখনও। তার নাচও ছিল অপূর্ব। নৃত্য যেন তার পায়ের ভৃত্য। তার চোখের চাউনিতে নৃত্য, তার হাতে, তার কোমরে। সর্বাঙ্গে নৃত্যের মেলা।

সে আমার দিকে তাকাত না, কথা বলত না, এমন নয়। কথা বলত কিন্তু কথা বলত না; তাকাত কিন্তু তাকাত না। এর মানে, মনে মনে গুরুত্বটা পেতে চাইতাম, তা তার চোখের ভেতর ছিল না। তবু তাকে দেখতে যেতাম তাদের বাড়িতে কখনও কখনও। আর যেতাম তাদের পারিবারিক কোনো উৎসবে। উৎসবে নাচ হতো। সে নাচত। অনেকেই নাচত। তাদের বিরাট বাড়ি। তাদের বাড়ির সঙ্গে আমাদের বাড়ির চলাচল ছিল সুপ্রতিবেশীর মতো, শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশীর মতো। ওবাড়ির সে ছিল সবচে ছোট মেয়ে।

সেদিন সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, একটা ঘরকে নাচঘরে রূপান্তর করার কাজ চলছে। মেঝেতে কার্পেট বিছানো, সাউন্ডসিস্টেম বসানো, যারা নাচ দেখবে তাদের জন্য চাঁদাকারে রাখা চেয়ার। তাদের বাড়ির আশপাশের মেয়েরা নাচের পোশাক পরে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাচ শুরু হবে। সাউন্ডসিস্টেম চেক হচ্ছে, তার নানা রকম শব্দ ভেসে আসছে। আমি দেখতে পাচ্ছি না তাকে। আমার চোখ ফড়িংয়ের মতো, প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে তাকেই খুঁজছে। কোথাও নাই সে।

হঠাৎ তাকে দেখা গেল। আমি উজ্জ্বল হয়ে উঠলাম। কিন্তু উজ্জ্বলতা খুব বেশিক্ষণ থাকল না। তাকে দেখলাম সাদা পোশাকে। নাচের পোশাক নেই পরনে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি নাচের পোশাক পরনি কেন? সে বলল, আমি তো নাচব না। আমার তো মন খারাপ হয়ে গেল। আমার তো কিছু বলার নেই তাকে। না, তাকে বলার কিছু নেই এমন নয়, বলার আছে। কিন্তু বলতে পারি না, বলার অধিকার নেই। আমি চলে আসতে গেলাম চুপচাপ। সে তাকাল আমার দিকে। সম্ভবত আমার মন খারাপনা আমার চেহারার ওপর পড়েছিল। অবশ্য এতেও কোনো সমস্যা নেই, আমার মন খারাপে তার কীইবা যাবে-আসবে।

কিন্তু কিছু একটা ব্যাপার ঘটল সম্ভবত আমার মুখের ওপর মন খারাপের ঘন সর দেখে। সে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে যেনÑ এমনভাবে তাকাল। বলল, চলে যাচ্ছেন কেন? আমি বললাম, আমি তো নাচ দেখতে এসেছিলাম। নাচবে না যখন তখন আর থেকে কীইবা হবে! সে বলল, আমি নাচব না কিন্তু অনেকেই তো নাচবে, নাচের ঘরে গিয়ে বসেন। আমি বললাম, তুমি নাচবে না, তোমার নাচ দেখতেই তো এসেছিলাম, তাহলে থেকে আর কী করব!

তার মুখের ওপর একটা বিস্মিত থাকবে ভেবেছিলাম, কিন্তু কোনো ভাবই দেখা গেল না। আমিও ভাবশেষহীন মুখ নিয়ে বের হয়ে আসলাম। দরজা পার হয়ে গেলাম। ভেতর থেকে গানের শব্দ বের হয়ে আসছে। কেউ হয়তো নাচতে শুরু করেছে সেই গানের তালে। গান আমাকে টানছে না, নূপুরের নিক্বণ আমাকে টানছে না। চারদিক নির্জন। সুনসান পথ। আমার ভাবশেষহীন মনে একটা অভিমান জন্ম নিল। মনে হতে লাগল, সে আমাকে নাচ দেখানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে নাচ দেখাল না। অথচ সত্যিকারভাবে এমন নয়। তবু মনে অভিমানের সর স্তরের পর স্তর পড়তে শুরু করল। মনে হতে লাগল, সে কেন একটু গুরুত্ব দেয় না আমাকে!

নানা রকম কথা, অভিমানমাখা কথা মনে জন্মিছে; সেসব কথাকেই বারবার মনের ভেতর পোকা বানিয়ে সেই বানানো কথাপোকা দিয়ে নিজের হৃদয়কে কাটাচ্ছি। কথাপোকারাও বিশ্বস্ত শ্রমিকের মতো হৃদয় ছিদ্র করছে, হৃদয় টুকরো করছে, হৃদয়ের রস চুষে নিচ্ছে।

রাস্তায় পা রাখছি এমন সময় কে যেন আমার হাত ধরে টান দিল। আমি কি কোনো গাড়ির তলে চাপা পড়তে যাচ্ছিলাম এবং কোনো লোক আমাকে বাঁচানোর জন্য হাত ধরে টান দিল! কিন্তু টানটা তো হেঁচকা টান নয় আর কোনো গাড়ি-ঘোড়াও চলছে না। এমন নরম টান! আমি ফিরে দেখি, সে। সে বলল, ভেতরে আসেন। আমি বললাম, তুমি নাচবে? সে বললÑ না, নাচব না। কিন্তু আপনার চলে আসাটা ভালো লাগল না। আমি বললাম, নাচবে না যখন তখন আমি গিয়ে কী করব! যাও, আমি যাই। সে এবার ঘিরে ধরল আমাকে। তার শরমশক্তি কমে গেছে যেন, অথচ সে আগে কতইনা শরম পেত আমাকে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাই। কী বলব বুঝতে পারি না। আবার বলি, থাক গে, তুমি যাও। আর যদি তুমি নাচ তবে আমি যাব তোমার সঙ্গে। সে বলল, আমি অসুস্থ, আমি নাচতে পারব না। ভাবলাম, আপনি অভিমান করে চলে যাচ্ছেন তাইতো সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আপনাকে ফিরিয়ে নিতে আসলাম। আমি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাইÑ আমার অভিমানও সে বোঝে। একটা কেমন শান্ত শিহরন খেলে গেল আমার ভেতর। আমি বললাম, কী অসুস্থ তুমি? সে হেসে বলল, বলা যাবে না! আবার তার ভেতর শরমশক্তি ফিরে এসেছে, এ শরম আলাদা ধরনের। আমি তার অসুস্থতার ধরন বুঝতে পারলাম না, কিন্তু আর কিছু বললামও না; তার পিছু পিছু ঢুকলাম তাদের বাড়ি।

নাচঘরে সে একটা চেয়ারে আমাকে বসিয়ে দিয়ে একটু দূরে সেও বসল। নাচ চলছে। আমি নাচ দেখছি। মাঝে মাঝে তাকাচ্ছি তার দিকে, যতবার তাকাচ্ছি ততবার দেখছি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একসময় দেখলাম সে উঠে গেল। তার মুখে অভিমানের কাঁচা রেখা। অভিমানের কাঁচা রঙ টকটক করছে। কেন সে অভিমান করল বুঝতে পারলাম না। উঠে যেতেও পারছি না তার পিছু পিছু। মন খারাপ করে বসে আছি আমি।

হঠাৎ একসময় দেখলাম, নাচের পোশাক পরে সে ঘরে ঢুকল। যে নাচছিল তাকে থামিয়ে দিল, সরিয়ে দিল। সে নাচতে লাগল। সে নাচছে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছি। সে নাচছে। অনেকক্ষণ চলছে তার নাচ। নাচতে নাচতে সে পড়ে গেল একসময়। মেয়েরা ছুটে গিয়ে তাকে ধরল। তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। কার্পেটে কিছু কিছু রক্ত। নূপুরে তার পা কেটে গেছে কি? কিন্তু তার পা কাটেনি। কে একজন স্বগতোক্তির মতো করে বলল, সে বলেছিল সে অসুস্থ; এমন অসুস্থতা নিয়ে সে নাচবে না। কিন্তু হঠাৎ করে সে নাচতে এলো কেন। আবার একেবারে তুমুল নাচ! আমার খারাপ লাগছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন সে হঠাৎ করে রাগ করল আর নাচের পোশাক পরে এসে নাচতে শুরু করল! এমন নাচ নাচল সে নৃত্যনিয়া যে ঘরের মেঝে রক্ত মেখে নিল!

পরে অবশ্য সব জানা গেছিল, কিন্তু সেসব বলে আর কীইবা হবে! অবশ্য জানি, আমি না বললেও আপনারা বুঝে গেছেন সবই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা