শামস আরেফিন
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:৪৭ পিএম
২২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী ‘ধানসিড়ি’তে সরকার মাসুদের ‘আধুনিকতা, আধুনিক কবিতা, নানা কথা’ শিরোনামে একটি গদ্য ছাপা হয়। এই লেখায় তিনি বলতে চেয়েছেন আধুনিক কবিতা ‘ঘুরিয়ে কথা বলতে অভ্যস্ত’। আর তার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘নতুন ধরনের উপমা, অভিনব বাকপ্রতিমা, প্রথাগতভাবে কবিতার মতো সমাপ্তি না টানা, নগরজীবনের নানা অনুষঙ্গ, গ্রামীণ ছবির সুরুচিসম্মত স্মার্ট প্রকাশ, ধর্ম বিষয়ে ঔদাসীন্য অথবা বড় জোর ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অধ্যাত্মভাবনা।’ কিন্তু স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে ‘আধুনিকতা’র শুরু কবে থেকে। কারণ টিএস এলিয়টের সময়কাল থেকে ইংরেজি আধুনিক কবিতার সময়কাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আধুনিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে শ্রদ্ধেয় অগ্রজ সরকার মাসুদ ওয়ার্ডসওয়ার্থকে সফল ও শ্রেষ্ঠ কবি বলে দাবি তুলেছেন। অথচ আমরা জানি ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক যুগের কবি। তার মধ্যে রোমান্টিক যুগের বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি প্রেম, আবেগ-অনুভূতি, সরলতা, গ্রামীণ জীবনের আধ্যাত্মিকতা রয়েছে। অথচ ইংরেজি সাহিত্যের আধুনিক সময়ের কবিতায় শহুরে বাস্তবতা, নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা, ভাঙন, ব্যঙ্গ বা পরিহাস এবং মোহভঙ্গ বা বিভ্রমভঙ্গ থাকে। সেই আধুনিকতায় আসক্ত হবে সরকার মাসুদ কীভাবে রোমান্টিক সময়ের কবিতাকে পছন্দ করেন বা সফল বলে দাবি করেন তা বোধগম্য নয়। কারণ প্রতীকের ব্যবহারের তুলনায় ওয়ার্ডস ওয়ার্থ এই পঙ্ক্তি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় :
‘Nature never did betray/ The heart that loved her.’
আধুনিকতার আওয়াজ ও বিভ্রান্তি
আধুনিকতার আওয়াজ তুলে এ দেশের অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছেন। পাঠককে কবিতাবিমুখ করেছেন। তাই আধুনিকতার পুরোধা টিএস এলিয়টকে পশ্চিমারা কতটা মূল্যায়ন করে, তা ভাবার বিষয়। ২০১৫ সালে সমালোচক রবার্ট ক্রফার্ড তার ‘ইংয় এলিয়ট’ গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন− মেধা-মননে টিএস এলিয়ট যুবক থাকলেও কবিতায় এলিয়ট বার্ধক্যের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। যেমন এলিয়টের কবিতার বই ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফক’ আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কবি হিসেবে এলিয়ট প্রাথমিক জীবনের ইতি টানে ১৯২২ সালে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ রচনার মধ্য দিয়ে। মৃত্যু, একাকিত্ব ও অসহায়ত্বÑ এ তিনই ছিল তার কবিতা রচনার মূল পটভূমি। অন্যদিকে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ডে’র ভূমিকায় সমালোচক ‘রে ম্যান্ড চ্যান্ডলার’ বলেছেন− এলিয়ট কবিতায় একজন দক্ষ কৌশলী ও রহস্যের আধার হিসেবে স্মরণীয়। বিশেষত, কবিতায় তার আধুনিকতাবাদের আন্দোলন যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছে। তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে দুর্বোধ্যতা, মিথ-বিদ্রূপের মাঝে উল্লম্ফন, হঠাৎ সামঞ্জস্যহীনভাবে বক্তব্য পরিবর্তন, সময় ও স্থানের পরিবর্তন, ভয়ংকর সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও ছন্দহীনতা, যার সবই এখন বর্তমান আধুনিক বাংলা কবিতায় দেখা যায়।
আবার অনেক ইংরেজি সাহিত্যের সমালোচক মনে করেন, এলিয়টের আবিষ্কৃত ইংরেজি আধুনিক কবিতার ধরনই পাঠককে কবিতাবিমুখ করেছে। বিশেষত নিউইর্য়ক টাইমসের অনেক সমালোচকও রবার্ট ক্রফার্ড ইংরেজি কবিতার দুর্বোধ্যতা ও পাঠকবিমুখতার জন্য সরাসরি এলিয়টকে দায়ী করেন। তার মতো তথাকথিত আধুনিকতা কবিতায় দুর্বোধ্যতার ভীতি সৃষ্টি করেছে পাঠকের জন্য। অথচ তিক্ত সত্য এই, পশ্চিমা বিশ্বের চেয়ে তৃতীয় বিশ্বের অনুকরণপ্রিয় সাহিত্যপ্রেমীরা এলিয়ট দ্বারা বেশি প্রভাবিত। ফলে আমরা কবিতার বক্তব্যকে করেছি অস্পষ্ট। অথচ পাবলো নেরুদা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকা বা তৃতীয় বিশ্বের কবিদের কাব্যভাষা টি, এস, এলিয়টের মতো হতে পারে না। কারণ শাসক কখনোই প্রতিবাদের ভাষা শেখায় না। তার অনুগত হতে শেখায়। রূপকের বেড়াজালে তারা পৃথিবীকে উপস্থাপন করে। তারপরেও সরকার মাসুদ ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে পুরোনো শকুন’Ñ এই লাইনটিতে কবিতা খুঁজে পান না।
ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও রোমান্টিসিজম
ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিরিক্যাল ব্যালাডস গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, ‘গ্রামীণ জীবন নগরজীবনের তুলনায় অনেক বেশি প্রাকৃতিক ও সরল। শহরের চলমান জনসংখ্যার ক্ষণস্থায়ী মূল্যবোধ অতীতের সঙ্গে কোনো সংযোগ রাখে না। তিনি কবিতা সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে ৪টি বিষয়ের ওপর প্রাধান্য দেন ক) সাধারণ মানুষের জীবন, খ) মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, গ) প্রবল আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসÑ শান্ত মনে স্মরণ ও রূপায়ণ এবং ঘ) সাধারণ, প্রাকৃতিক ভাষার ব্যবহার।’ তিনি মনে করেন, কবিতায় ভাবের বা অভিব্যক্তি প্রকাশ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই তিনি বলেন ‘Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings : it takes its origin from emotion recollected in tranquility.’
শ্রেষ্ঠ কবিতা বনাম আধুনিক কবিতা
জীবনানন্দ তার শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় বলেছেন কবিতা অনেক রকম। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন হোমার যেমন বীরত্ব ও মানবিক মহিমা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। মালার্মে কবিতায় প্রতীক ও ভাষার সংগীতধর্মিতা প্রাধান্য দিয়েছেন। আবার র্যাঁবো বিপ্লব, কল্পনা ও আত্ম-অন্বেষণকে প্রাধান্য দিয়ে কবিতা লিখলেও রিলকে আধ্যাত্মিকতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাই কেউ রবীন্দ্রনাথের মতো জমিদার হয়ে কোমল প্রেমে ভেসে গেছেন। আবার কেউ নজরুল হয়ে বলেছেন ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’। আবার কেউ জসীমউদ্দীনের মতো বলেছেন,
‘বুকে যে তোমারে রাখিব বন্ধু, বুকেতে শ্মশান জ্বলে;/ নয়নে রাখিব! হায়রে অভাগা, ভাসিয়া যাইবে জলে!
কপালে রাখিব! এ ধরার গাঁয়ে আমার কপাল পোড়া;/ মনে যে রাখিব! ভেঙে গেছে সে যে কভু নারে লাগে জোড়া!”
যে কবিতা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তাই শ্রেষ্ঠ কবিতা। আর তা কি আধুনিক না অনাধুনিক তা বিচার্য নয়। এ কারণে বিনয় মজুমদার তার ঈশ্বরীর স্বরচিত প্রবন্ধে বলেন, ‘এ দেশে যে সব নির্বাচিত কবিতার সংকলন করা হয়, তার কোনোটাই পাঠকের ভালো লাগার বিষয় থাকে না। এমনকি সম্পাদক নিজে কবিতা নির্বাচন করার সময় পাঠকের মুখে-মুখে ছড়িয়ে যাওয়া কবিতাকে এড়িয়ে চলেন। অথচ এই কবিতাগুলোকে সংকলনে রাখা হতো, তবে যেমন হ্রাস পেত অকবির সংখ্যা, ঠিক তেমনি হ্রাস পেতে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলনের সংখ্যা।’ তাই পাঠকের মুখে মুখে ছড়িয়ে যাওয়া কবিতাই মহৎ কবিতা, যেমন :
‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান/ তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান (নজরুল)’
‘অদ্ভুত আঁধার এক এ পৃথিবীতে এসেছে আজ/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা (জীবনানন্দ)’
‘স্বাধীনতা তুমি পিতার উদার জায়নামাজের কোমল জমিন (শামসুর রাহমান)’
‘ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা/ সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে/ কবিতা বোঝে না। (আল মাহমুদ)’
‘বড়ো বেশি কবিতা লিখেছি আমরা/ এমনকি নারীর ঋতুস্রাবের চেয়েও বেশি। (সিকদার আমিনুল হক)’
‘ভাত দে হারামজাদা/ তা না হলে মানচিত্র খাবো (রফিক আজাদ)’
‘চাঁদ গিয়েছিল বালিকা বিহারে/ মন গিয়েছিল মনে/ একখানা রাত ভোর হয়ে গেল/ টেলিফোনে-টেলিফোনে।’ (আবু হাসান শাহরিয়ার)
কোনটি মহৎ কবিতা তা কাল বা সময় বলে না, বরং বলে পাঠক। কারণ এই পাঠকই বিভিন্ন কালে সেই একই কবির কবিতা মনোযোগ সহকারে পড়ে। এই সব কবিতায় মহৎ হয়েছে হৃদয় স্পর্শ করেছে বলে। যেমনটা পাবলো নেরুদা তার আত্মজীবনীতে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় এক বখাটের সঙ্গে তার বন্ধুদের ঝগড়া হয়। ঝগড়া থামাতে গিয়েÑ তিনি ওই বখাটে ছেলেকে অতিউৎসাহী হয়ে উত্তম-মাধ্যম দেন। তার বন্ধুরা সবাই তাকে সাবধান করল। কিছুদিন পর রাতে তিনি একা শহরের রাস্তায় হাঁটছিলেন। এমন সময় হঠাৎ তার সামনেই সেই বখাটে পথ আটকে ধরল। ছেলেটি নেরুদাকে জোর করে টেনে নিয়ে একটি অন্ধকার চিপা গলিতে দাঁড় করাল। নেরুদা ভীতসন্ত্রস্ত। তারপর নেরুদাকে অবাক করে দিয়ে সে পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইল। যে প্রহার করার কথা, সে কি না তার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে। অতঃপর বখাটে ছেলেটা জানাল যে তার প্রেমিকা নাকি তাকে ধমক দিয়ে বলেছে, ‘যে কবির কবিতা পড়ে আমরা প্রেম শিখলাম, তুমি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছ। যাও তার কাছে মাফ চেয়ে আসার আগ পর্যন্ত আমার সাথে কথা নেই।’
কবিতা হলো তাই, যা মুখে মুখে রটে যায় কখনও গানের আকারে, কখনও প্রেমিকার চিঠির পদ্য হিসেবে, যা আমাদের ভালোবাসতে শেখায়। আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে শেখায়।