হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৪ এএম
আমাদের দেশে যে কজন সাহিত্যিক একই সঙ্গে কবিতা এবং কথাসাহিত্যে চমৎকার তালে লিখে চলছেন তাদের মধ্যে ইরাজ আহমেদ একজন। মননশীল গদ্যে তার হাত যেন হয়ে ওঠে আরও ক্ষুরধার, যা যেতেও কাটে আসতেও কাটে। খুব আগ্রহ ভরে পাঠ করি তার কবিতার ঢং এবং দর্শনমিশ্রিত গদ্য-কবিতা। এই কবি ও গদ্যকারের লেখাগুলো আমার কাছে ভরা নদীর বাঁকের মতো ঠেকে।
সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে তার ‘কয়েক চুমুক আলো’ নামের একটি কাব্যগ্রন্থ। এটি পড়েই এই লেখা। পাঠ বিশ্লেষণ নয়, বরং অনুভূতির প্রকাশ। গ্রন্থভুক্ত ৩৩টি কবিতা। প্রথম দেখায় হয়তো কবিতাগুলো তেমন ঝলক না ফেলতে পারে। কবিতা আসলে আড়ম্বরের বিষয়ও নয়। এমন হতে পারে খুব সাদামাটা কথার ভেতর থেকে একটা লাইন বা একটি শব্দÑ পাঠক হৃদয়ের গোপনতম স্থানে আশ্রয় নেয়, যা কবির ভাবনার সঙ্গে পাঠক তার জীবন অভিজ্ঞতার খতিয়ান টুকে টুকে মিলিয়ে নিতে চায়। যেমন আলোচিত এ গ্রন্থের ‘শীতে লেখা কোনো এক চিঠির প্রতি’ শিরোনামের কবিতার পাঠ শেষে সেটিই মনে হলো। অবগাঢ় এক দীর্ঘ ছায়া এসে ঘিরে ধরল। ‘রাত করে বয়স্ক শরীরে নেশা ধরে গেলে আজকাল ভয় পাই;/ ভাবি, পাতা ঝরে যাবে না তো?’ এখানে কবি বানানো কিছু বলেননি। বরং কবিতার বিষয়বস্তুর সঙ্গে মানুষের সংযোগ ঘটিয়েছেন মাত্র।
কবিতা শুধু নিঃশব্দ পাঠের বিষয়। হ্যাঁ, সত্যিকারের পাঠকহৃদয়ে কবিতা নীরবে ঝড় তোলে। কবিতা মূলত হৃৎকুঠুরিতে আলোড়নের বিষয়। কোথাও যেন একটু নাড়া দেয়। জাগিয়ে তোলে। ভাবায়। কবিতা নিদ্রাভগ্ন রাতের সারথি। তাইলে তাই। যদি বলি কবিতা লজ্জাবতী নারী। ছোঁয়া দিলে নুয়ে পড়বে। কবিতা আসলে ভিন্নরকম। এর বিষয় প্রকরণও নানান। কবিতার শক্তি সম্পর্কে একটু বলি! এই ধরুন, একটি কবিতার কোথাও ‘ব্যাকুল’ শব্দটি লেখা নেই। কিন্তু কবিতাটি পাঠক পড়ে যখন বিষণ্ন-বিধুরতায় স্নান করেন। তখনই সেটা সত্যিকারে কবিতা। কবিতার সঙ্গে যখন পাঠকের বোঝাপড়া চলে তখনই সেখানে সার্থকতা আসে। এই বইটি পড়ে তেমনটি মনে হয়েছে।
‘আজও আছে’ শিরোনামের কবিতার একটি লাইন পড়িÑ ‘একা মৃত ট্রেন যায় শত শত রাত্রি নিয়ে। ঢেউ, / এত ঢেউ/ আছড়ে পড়ে দুঃখের একশ বছরে!’ আহা! এটুকু পড়ে একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগে না! হাহাকার এসে কি ধাক্কা দিলো! এই কবিতার পরের লাইনে লিখলেন, ‘হাতের রেখায় মৃত ঘাস/ সাপে কাটা নদী।’ এই লাইনগুলো যদিও প্রতীক আশ্রয়ী। কিন্তু মনের ভেতরে লাইনগুলো কেন যেন এটা চিত্রকল্পও তৈরি করে দেয়।
কবিতাগ্রন্থের নাম শিরোনামের কবিতায় লিখেছেনÑ ‘আকাশের তলপেটে ধাক্কা দিয়ে কেউ/ ঢুকিয়ে দিক বিদ্যুতের ধারালো ব্লেড, কয়েক চুমুক আলো কেউ কিনে নিক অনায়াসে।’ এটুকু পড়ে থির হয়ে যাই। ভাবি। ভাবতে ভাবতে ঢুকে পড়ি ছায়াচিত্রের জগতে। ধূসর রহস্যের মায়ায় আবৃতে পাক খাই কি একটুকু। নাকি আরও বেশি বিস্তার খুঁজি। ‘অনটন’ কবিতায় কবি দুঃখপীড়িত জেবুন্নেসা বেগমের আখ্যান তুলে ধরলেন। ‘মৃত্যির মতো বলে কিছু নেই/অনুপস্থিতি চিরকাল ছন্নছাড়া জেবুন্নেসা বেগমের খুলে/ ফেলা ম্লান সুতি শাড়ি/এসব সত্য জানে না।/ আমাদের কত কী অজানাই থেকে যায়/ঘুমন্ত বিড়ালের মৃদু নিঃশ্বাসের মতো।’ কেমন একটা হাহাকার ঘিরে ধরল। কেমন করে শব্দগুলো যেন হয়ে উঠল আলো-আঁধার আবৃত অচেনা এক মধ্যরাত। ‘দুপুরের পাখি ভর্তি বাতাস’ এই শিরোনামটাই যেমন কবিতা হয়ে উঠেছে। ইরাজ আহমেদ তার এই বইটি সাজিয়েছেন ৩৩টি কবিতা দিয়ে। পাস নম্বর! কবি কি আমাদের সংখ্যাতত্ত্বের দিকে ঠেলে দিলেন। হয়তো এসবের কিছুই না। হতে পারে কাকতালীয় ব্যাপার! কিন্তু আমাকে যে তিনি ভাবনার দুয়ারে এঁটে দিলেন, এটাও তো কবিতা। যাই হোক এই কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতাতেই পাওয়া যাবে পাঠতৃপ্তি।
গ্রন্থের নাম : কয়েক চুমুক আলো
বিষয় : কবিতা
লেখক : ইরাজ আহমেদ
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশকাল : আগস্ট ২০২৫
প্রকাশনা : অনন্যা
মূল্য : ১৫০ টাকা