মনিজা রহমান
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:৩৩ পিএম
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হলো
সিঁড়ির কাছেও আমার ঋণ আছে
শাড়ির প্রতিটি সুতায়, চিরুনি ও চশমায়
কাজলে, হাইহিলে ও হেয়ারক্লিপে আমার ঋণ আছে।
ঋণ আছে স্টেডিয়ামের ঘাসে, প্রেস গ্যালারি আর নিউজ ডেস্কে
ঋণ আছে অদেখা বাতাসে, পরিস্ফুট রোদের কাছে,
আমার জানালায়, ল্যাপটপে, সেলফোনে আর আংটিতে।
কিছু কিছু ঋণ থাকা ভালো
কিছু কিছু ঋণ থাকতেই হয়Ñ যেমন নিঃশ্বাসের কাছে,
কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ও অনুপ্রাসে।
গাছদেরও ঋণ আছে মাটি আর বৃষ্টির কাছে
নৌকার ঋণ আছে জল ও তরঙ্গের সঙ্গমে
বৃষ্টির ঋণ আছে মেঘ আর ফসলের দূরত্বে।
এইসব ঋণ জ্যোৎস্নার মতো অকৃপণ প্রাত্যহিক।
কিছু ঋণ আমি দরজায় ঝুলিয়ে রেখেছি
অনাগত আগামীর জন্য।
দারফুর
সৌম্য সালেক
একুশ শতকের উন্মুক্ত উঠোনে আবারও তোমাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, দারফুর!
চোখ মেলে দেখলাম তোমার শিশুরা কাঁদছে,
সম্ভ্রম হারিয়ে সাহারার বালিতে মুখ লুকিয়েছে মেয়েরা;
খানা তল্লাশি করে তুলে এনে হত্যা করা হয়েছে নিরস্ত্র যুবাদের;
রক্ত-প্লাবনে তোমার সোনালি মাটি লাল হয়ে গেছে, দারফুর!
তবু নাগরিক সভাজন কালো কপোলের অশ্রু দেখতে পেল না;
শুনতে পেল না তোমার বিদীর্ণ আত্মার আহাজারি!
সভ্যতার মুখোশ পরা পৃথিবীতে কেন কালো পুতুলের অস্তিত্ব নেই, এই বুঝি তার নগ্ন বিবরণ!
দারফুর, সোনার বিনিময়ে তোমাকে ওরা উপহার দিয়েছে সারি সারি লাশ, উপহাস আর জীর্ণবেশ!
তোমার ভূমিতে তোমারই রক্ত ঝরছে অনিঃশেষ!
ঘৃণার অসুখে অন্ধ আদিমেরা আজও তোমার কালো চামড়ার ক্ষত দেখতে পেল না;
শুনতে পেল আর্তি তোমারÑ হৃদয় ভাঙার সুর!
লেট অটাম
মামুন মুস্তাফা
সমুদ্র দেখতে এসে আমি জলের ভেতরে পড়ন্ত ছায়া দেখি
কেমন ঝরো ঝরো শীতলতা ঝরাপাতার গান করে;
পীতাভ রোদ সাগরে ভাসমান নৌকোর গলুইয়ে সোনারঙ আঁকে,
মাঝিদের জালটানা শক্ত হাতেও প্রকৃতি গাঢ় হয়!
যাকে বলি কুজ্ঝটিকা, ভেসে যেতে চায়Ñ
জলভরা করতলে হেমন্তের অভ্যেস,
কুয়াশা জড়ানো পীতপাতা ঝরে পড়ে
কারা যেন ফিস ফিস স্বরে ডাকে;
লোকালয় ফিরে যাচ্ছে সেই পাতার গুঞ্জন থেকে
সমুদ্রতটে ফেলে যাওয়া ভেজা পদরেখা বাড়ি ফিরছে এবার,
এই হিম সন্ধ্যায় কারও কোনো তাড়া নেই,
দূরে কেবল লেট অটাম ঘিরেছে শাদা বাড়ি।
মেয়েটিকে
ইমরুল ইউসুফ
নৌকার উল্টোপিঠের মতো কালো চোখ
অবয়ব
গড়ন
চোখের তারায় টলটলে স্বচ্ছ জল
জলে আঁকা আমার মুখচ্ছবি
মেয়েটি বোঝেনি
তারপরও আমি মেয়েটিকে ভালোবেসে ছিলাম চোখ দেখে।
কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো মেলানো মেয়েটির ঠোঁট
নিটোল
সুডৌল
ঠোঁটজুড়ে কচি পাতার মতো সবুজ পেলবতা
কলার মোচার মতো স্থির অথচ কী টানটান
যেন ধনুকের ছিলা।
অমাবস্যায় অরণ্যের মতো মিশমিশে কালো চুল
দীঘল
আয়ত
চুলজুড়ে মায়ের শাড়ির আঁচলের মতো মায়াময় গন্ধ
পানকৌড়ির পালকের মতো নির্ভার অথচ কী আশ্চর্য সন্নিবেশ
যেখানে জঙ্গলাবৃত্তে খেলা করে ভালোবাসার শ্বেত কপোত
এসব দেখেই আমি মেয়েটিকে বলেছিলাম
ভালোবাসি।
স্মৃতি
শামস আরেফিন
শিশির ভেজা সবুজ স্বপ্নে ভাসে দূর দিগন্ত
তারার নূপুরে জোছনায় অনন্ত ভালোবাসার সুর বাজায়
রাস্তার ভিখারির মতো প্রার্থনা করে হৃদয়
অর্পণের নৈবেদ্যে স্বপ্ন ঝোলে তেঁতুলতলে
ও ঋষি, ভালোবাসা না পেয়ে এভাবে কাতরাও?
ডাঙায় জিয়ল মাছের মতো দেখো তড়পায় সময়।
মন আছে বলেই প্রেম নামক পাখির ছানাকে আদর
আর প্রাণ আছে বলে ভালোবাসা বিছানায় যায়।
এ হৃদয় জেগে বুকের ওপর বসে মনের ঘুম ভাঙাতে
আজ সে চাঁদের জোছনায় উসকে দেয় দেহের জোয়ার
ভাটার বিরহে যে না ভাসে, সে কি জানে সমুদ্র কাকে বলে?
জানো না সাধনা মানেÑ
প্রেমিকার অপেক্ষায় থেকে ধৈর্যের হিমালয়ে আরোহণ
বিরহী বরফ গলে আবেগের নোনতা স্রোতে শব্দের চাষ
আলোর জমিনে বোনা আবেগী বীজের অঙ্কুরোদগম
আর পাখির মতো প্রেমের দানা খুঁটেখুঁটে শান্তির খোঁজ
বলো, কোন সভ্যতা বাঁচে স্মৃতিকে লালন না করে?