রাজনীতির সদরে-অন্দরে
শুচি সৈয়দ
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২২ পিএম
আলোচিত কলাম লেখক মারুফ কামাল খান। তার সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’। এই বইয়ে স্থান পাওয়া অনেকগুলো লেখাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আমি পড়েছি। বেশ আগ্রহ সৃষ্টিকারী, কৌতূহলোদ্দীপক সেই লেখাগুলো গ্রন্থাকারে পাঠের সুযোগ পাওয়া আগ্রহী পাঠকের জন্য এক ধরনের প্রাপ্তি বটে, বলাই বাহুল্য। বইটিতে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের রাজনীতির ভেতরে-বাইরে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, তার সঙ্গে জড়িত কুশীলব, এদেশের রাজনীতিকদের কাণ্ডকীর্তি বিধৃত হয়েছে।
দার্শনিক অ্যারিস্টটলের অমর উক্তিÑ ‘মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী’; ফলে গভীরভাবে রাজনীতিমনস্করা যেমন, তেমনই রাজনীতি-বিমুখেরাও এ গ্রন্থ পাঠে আগ্রহী হবেন বলে আমার ধারণা। আমি প্রায় টানাভাবে বইটি পড়ে শেষ করলাম। এটি নিয়ে লিখতে বসে আমার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে প্রকৃত অর্থে, বাংলাদেশের রাজনীতির সদর-অন্দর বলে কি কিছু আছে? এদেশের মনস্বী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার ‘লালসালু’ উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘এদেশে শস্যের চেয়ে টুপি বেশি’Ñ কী অবিস্মরণীয় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বাক্য! তার কথিত সেই ‘শস্যের চেয়ে টুপি’ বাড়তে বাড়তে ৫৬ হাজার বর্গমাইল ছাড়িয়ে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকায় বাংলাদেশের দলাদলির দুন্দুভি বাজিয়ে সমস্ত পৃথিবীকে তটস্থ করে তোলেনি কি? ‘টুপি’র স্থলে এখন সেখানে অনায়াসে ‘রাজনীতিক’ শব্দটি বসিয়ে নেওয়া যায়। বাংলাদেশের সেই রাজনীতিকরা পৃথিবীব্যাপী ‘হিজরত’ করে চলেছেন। এখন আর শস্য আর টুপি নেই, এখন কেবলই আছে ‘রাজনীতি’ (!)Ñ আর তা ছড়িয়ে পড়ছে সাত সমুদ্র দশ দিগন্ত ছাপিয়ে। আর দেশে তো বর্তমানে ঘরে ঘরে ‘রাজনীতিবিদ’ (!)Ñ একের অধিক। এ রকম একটা ভয়াবহ বাস্তব পরিস্থিতিতে এ সংশয় কি একেবারেই অমূলক যে, রাজনীতির ভেতরে-বাইরের ব্যবধান ঘুচে গেছে?
এই ‘রাজনীতি’ (!) সম্পর্কে এ গ্রন্থের লেখক স্বয়ং মারুফ কামাল খানের উপলব্ধিই তুলে ধরি পাঠকের কাছেÑ ‘একেবারেই চোর ধাউরের দেশ এটা। রাজনীতি বাটপারে ভরা। ভদ্রলোকের জন্য রাজনীতি নয়, অন্তত এদেশে। জোচ্চুরিতে ওভারট্রাম্প করতে না পারলে এদেশে রাজনীতিতে কল্কে পাওয়া যায় না। আমি নিশ্চিত যে, ওসমানী সাহেবের মতো লোক এদেশের পলিটিক্সে কোনো সুবিধাই করতে পারবেন না।’ [জেনারেল ওসমানীর ফিল্ড মার্শাল কুকুর, পৃ. ৪৭]
এই ‘রাজনীতি’ (!) প্রসঙ্গে লেখকের উপলব্ধির সঙ্গে দেশের অনেক প্রথিতযশা চিন্তাবিদেরও উপলব্ধি একই প্রায়। যেমন যশস্বী লেখক হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা স্থূল মানুষ, তারা সৌন্দর্য বোঝেন না ব’লে গণতন্ত্রও বোঝে না, শুধু লাইসেন্স, পারমিট, মন্ত্রীগিরি বোঝে।’ [প্রবচনগুচ্ছ, হুমায়ুন আজাদ, প্রবচন-৮৬]। রাজনীতি সম্পর্কে তার শ্লেষ আরও তীব্র। আরেক প্রবচনে তিনি বলছেন, ‘পৃথিবীতে রাজনীতি থাকবেই। নইলে ওই অপদার্থ, অসৎ লোভী দুষ্ট লোকগুলো কী করবে?’ [প্রবচনগুচ্ছ, হুমায়ুন আজাদ, প্রবচন-১৬৩]
২.
বাংলাদেশে একসময় সাদাকালো ৪ পৃষ্ঠার সংবাদপত্র বেরুত, তারপর সেটা ৬ পৃষ্ঠা, ৮ পৃষ্ঠা, ১২ পৃষ্ঠা, ১৬-২০-২৪ পৃষ্ঠায় গিয়ে দাঁড়ায়। পৃষ্ঠাসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয় রঙও। স্বাভাবিকভাবে প্রসার ঘটে পেশারও। অনেক তরুণ যুক্ত হয় সংবাদপত্র এবং পরবর্তীকালের ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোতে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে সাংবাদিকতা বিভিন্ন বিটে ভাগ হয়ে যায়। রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ, সংস্কৃতি, সিনেমাÑ এমন নানা বিভাগে বিভক্ত হয়ে সাংবাদিকরা কাজে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতিতে আবার আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত, বামপন্থী ও খুচরো পার্টির বিট ভাগ করা হয়। মারুফ কামাল খান সাংবাদিক হিসেবে অনেক সময় বিএনপি বিটের সাংবাদিক হিসেবে রিপোর্টিং করেছেন। সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে কাছ থেকে দেখা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের কথা ও কাজের সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচিত ছিলেন তিনি। লিখেছেন তাদের ঔদার্য, সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতার কথাগুলো ঘটনার উল্লেখসহ।
রাজনীতি সম্পর্কে যেমন মারুফ কামালের নিজের মূল্যায়ন আছে, তেমনি হুমায়ুন আজাদের মূল্যায়নও উল্লেখ করেছি। আবারও হুমায়ুন আজাদের শরণ নিতে হচ্ছে সাংবাদিকতা সম্পর্কে তার উক্তির নিরিখে। তিনি লিখছেন, ‘এখানে সাংবাদিকতা হচ্ছে নিউজপ্রিন্ট, বলপয়েন্টÑ মিথ্যার পাঁচন।’ [হুমায়ুন আজাদ, প্রবচনগুচ্ছ, প্রবচন-১০৮]
আমাদের সৌভাগ্য, মারুফ কামাল সাংবাদিকদের সেই দলের অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে এক পক্ষের বিষয়াবলি বেশি স্থান পেলেও সেটা নির্মোহ রিপোর্টিংয়ের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে তুলে ধরেছেন। এখানেই তার সার্থকতা। তবে সাংবাদিকসুলভ ‘আত্মতৃপ্তি’ তার ভেতর সতত সক্রিয় সেটা বোঝা যায় হুমায়ুন আজাদকে ‘ত্যাঁদর বুদ্ধিজীবী’ সম্বোধনে। কিংবা প্রেস সচিব মোজাম্মেল হকের সঙ্গে ছড়াকার আবু সালেহর ছড়ার লড়াইয়ে প্রবীণ ছড়াকারকে ‘নাস্তানাবুদ’ দেখে প্রেস সচিবের প্রতি এক ধরনের মৌন সমর্থনে। মারুফ কামাল বোধকরি আবু সালেহর সেই কালজয়ী ছড়াটির কথা ভুলে গেছেনÑ
‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না বলা যাবে না কথা,
রক্ত দিয়ে পেলাম শালার মরার স্বাধীনতা।’ [আবু সালেহ, পল্টনের ছড়া]
দারুণ দুঃসময়ে, ভীষণ দুঃসাহসে এ রকম পঙ্ক্তি লেখার জন্য প্রেস সচিবদের মতো ছড়া লিখিয়েদের দশবার জন্মাতে হবে। এমন ধরনের ‘আত্মতৃপ্তি’ এই বইয়ে আছে।
যদি বলি, ত্রুটিপূর্ণ প্রথম ফ্ল্যাপের লেখা দিয়েই এ বইটির শুরু তবে ভুল বলা হবে না। বইয়ের ফ্ল্যাপে এমন নেতিবাচক পরিচিতি তার লেখার গুণকে ঔজ্জ্বল্য না দিয়ে ধূসর করেছে। পাঠক হতাশ হবেন এমন ফ্ল্যাপের বক্তব্য পড়ে। অথচ অসংখ্য সুন্দর লেখায় ভরা বইটি। আমি তার কিছু বিবরণ দিই যা পাঠকের ভালো লাগবে, পাঠককে সমৃদ্ধ করবে।
গ্রন্থের শুরু হয়েছে একটি ঐতিহাসিক বিবৃতি দিয়ে, যার মুসাবিদা করেছিলেন তিনি বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ব্রিফিং থেকে। যাতে তিনি আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে আদালতে তোলার সময় হেনস্থা করার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এটা ছিল আমাদের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী শিষ্টাচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কোনো সন্দেহ নেই, এটি আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে একটা স্মরণীয় ঘটনা। যেখানে বেগম খালেদা জিয়ার প্রজ্ঞা বিধৃত। একই সঙ্গে বিএনপির মতো দলের জাতীয় নেতাদের অবিমৃশ্যকারিতাও তিনি দেখেছেন চরম বেদনাহত হৃদয়ে! সেই বিবৃতিকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে।
এ বইয়ে আরও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাÑ তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, মিজান চৌধুরী, সিআর দত্ত, হান্নান শাহ, শাহ আজিজ, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, এম. সাইফুর রহমান, ফজলুর রহমান পটল, তারেক রহমান, ফিরোজ নূন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিদিশা, বি. চৌধুরী, খোন্দকার মোস্তাক আহমদ, খন্দকার দেলোয়ার হোসেনÑ এঁদের সবারই ভালোমন্দ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
৩.
সাংবাদিকতা যখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মিডিয়া ট্রায়ালে চরিত্র হনন, তখন তিনি মোটেই তা করেননি। অত্যন্ত পারদর্শিতার সঙ্গে ঘটনার পর ঘটনা তুলে ধরেছেনÑ নির্মোহ মন্তব্যবিহীনÑ মতামত গঠন করবে বইয়ের পাঠক। এখানেই তার মূল্যবান মুন্সিয়ানা। এই বইয়ে তিনি বানিয়ে কোনো কথা লেখেননি। সে কারণে আমার মনে হয়েছেÑ লেখাগুলো কালানুক্রমিকভাবে সাজালে ভালো হতো। এবং আরও ভালো হতো যদি লেখার ভেতর ঘটনাবলির সময়, তারিখ, মাস ও বছর উল্লেখ করতেন। পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে মেলাতে পারতেন তার লেখার সঙ্গে।
এদেশের কোনো একজন রাজনীতিক বোধকরি মজা করে সংসদে বলেছিলেন, ‘আমাদের পলিটিকসের মধ্যে পলি-ট্রিকস ঢুকে গেছে।’ এই যখন রাজনীতির অবস্থা তখন মারুফ কামাল খান ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ লিখেছেন। কিন্তু এদেশের রাজনীতির ‘অন্তরে’ ঢোকা খুবই কঠিন কাজ, দুঃসাধ্য সন্দেহাতীতভাবেÑ আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি এ কথা।
বাংলা ভাষায় একটি কথা আছে, ‘রমণীর মন, সহস্র বর্ষে সখা সাধনার ধন’। নীরদ সি. চৌধুরী কথিতÑ ‘আত্মঘাতী বাঙালি’র দেশে তার ‘রাজনীতিকে’র মন, হাজার বছরেও সেটি হয়নি গঠনÑ বলতে পারি নির্দ্বিধায়। সাধনা দূর অস্ত! যে কারণে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘বাঙালি জাতির কোনো ইতিহাস নেই।’ বাঙালির ইতিহাস নেই কারণ বাংলার জনগণকে রাজনীতি ধারণ করেনি, রাজনীতিকরা মুষ্টিমেয় মানুষের হয়ে তাদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় ৯৯.৯৯ শতাংশ মানুষকে বিভ্রান্ত, প্রতারিতও করেছেন, করে চলেছেন। তাদের সঙ্গে শামিল হয়েছেন নীরদ সি. চৌধুরী, বঙ্কিমচন্দ্ররা নিজেও। তারা যতটা ঔপনিবেশিক শাসকের, ততটা ‘নিম্নবর্গীয়’ কিংবা বাঙালির হননি বলেই সংস্কৃতিও সেই দায় বহন করে চলেছে আজ পর্যন্ত। জাতির ইতিহাস লেখা হয় সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলে। আমরা যা গত আড়াইশ-তিনশ বছরে পারিনি। যেদিন পারব সেদিন ইতিহাস লেখার সূচনা হবেÑ সেই সূচনার একটি স্ফুলিঙ্গ এই গ্রন্থ। মারুফ কামাল খানের লেখা পড়ে আমার জেনারেল ওসমানী সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা ভেঙেছে। একই কথা সিআর দত্ত সম্পর্কে। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সম্পর্কেও। রাজনীতিমনস্ক পাঠক বইটি পড়লে উপকৃত হবেন বলেই আমার বিশ্বাস। দুটি কথা উল্লেখ করতে চাইÑ ১. বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলাদেশের গরিবের বন্ধু নরমান বেথুনÑ কমিউনিটি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. কাজী কামরুজ্জামানকেÑ এটা আমার ভালো লেগেছে। ২. এই বইয়ের শুরুর ফ্ল্যাপটির শেষ স্তবকটি যথেষ্ট। ওপরের অংশ বাদ দেওয়া যায়।
আর একটা কথাÑ মারুফ কামাল খানের সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ প্রকাশিত কলামগুলো নিয়ে কোনো গ্রন্থ আছে কি না আমার জানা নেই। না থাকলে সেগুলো নিয়ে একটি গ্রন্থ করার কথা বলবÑ কারণ সেগুলোও প্রয়োজনীয় বলে পাঠক হিসেবে আমি মনে করি।
রাজনীতির সদরে-অন্দরে
লেখক : মারুফ কামাল খান
প্রকাশক : সূচীপত্র, ঢাকা
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি
মূল্য : ৬০০ টাকা। পৃষ্ঠা ২২৪।