× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঝিঁঝি পোকাদের সঙ্গে আলাপ

আনিস রহমান

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৫৩ এএম

অলংকরণ : মিজান স্বপন

অলংকরণ : মিজান স্বপন

মন বলল, বেশ হয়েছে।

খুব ভালো হয়েছে।

দারুণ হয়েছে।

মনের আনন্দ এবার ঠোঁটে এসে ঝুল খায়। হাসি হয়ে সে আনন্দ জ্যোৎস্না ঝরায়।

অথচ ওদিকে আবার একটি অদ্ভুত কাণ্ডও ঘটে গেল। বুক ছেড়ে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আনন্দের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস! তবে কি আনন্দকে পাশ কাটিয়ে একটু একটু করে দুঃখবোধও মনের ভেতরে দানা বেঁধে উঠছে! দুঃখবোধ হলে ভেতরটা আবার পেঁজা তুলোর মতো উড়ু উড়ু কিংবা হালকা হলো কেন? আর হালকা যদি হবে তাহলে দীর্ঘশ্বাস তৈরি হলো কেন? দুঃখবোধ থেকেই তো আসে দীর্ঘশ্বাস! কিন্তু আমার মনে তো এখন আনন্দ! কেমন এক বৈপরীত্যের সুর যেন শুনতে পাচ্ছি!

ঘরের পশ্চিম কোণ দিয়ে সূর্যডোবা আলো এসে পড়ছে। 

ওদিকটায় ঘরদোর এখনও মাথা তোলেনি। তবে কাঁঠাল গাছ আছে কয়টি। কিন্তু গাছে তেমন পাতা নেই। কয়েকটা মানকচু একে অপরকে জড়িয়ে আছে। কেউ আবার একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে আছে। কেবল কয়েকটা সবুজ ডগা মাথা তুলে ওদের প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানান দিচ্ছে। ওদিকে টানা বারান্দার ওপাশটা অনেকখানি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। সে আলোয় ডুবে থাকা টেলিফোন হঠাৎ বেজে উঠল। ছোট্ট তেপায়ে রাখা কলাপাতা রঙ টেলিফোন সেট কেঁপে কেঁপে উঠছে রিঙের ঝংকারে। কেন যেন সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা ধরল না দিব্য। খদ্দের মাছ কেনার আগে থালার ওপর সাজিয়ে রাখা মাছ যেমন তির্যক চোখে দেখে কিছুক্ষণ। মাছ বাসি না পচা। কানকো সত্যি সত্যি লাল না রঙ দেওয়া! এমনি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি যেমনি থাকে মাছের দিকে। তেমনিভাবেই অনেকটা সময় ধরে ফোন সেট পর্যবেক্ষণ করে তবে রিসিভার তুলে কানে ছোঁয়াল দিব্য। ওপার থেকে একটি কণ্ঠস্বর, ‘স্যার আপনাকে বদলি করেছে!’

বদলি! কখন?

একটু আগেই অর্ডার হলো।

কোথায় বদলি?

রাজশাহী স্যার!

ঠিক আছে বলেই রিসিভার রেখে দিল দিব্য এবং বেরিয়ে এলো কণ্ঠ-নিঃসৃত সে বাণী। ‘এখন বুঝবে মজা!’ আর যা বলেনি। শুধু অনুভবেÑ আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে!

এ আনন্দের সঙ্গে রবিঠাকুরের বড় ভাই জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসে যেন ঢোল, খরতাল আর খঞ্জনি সহকারে তাল জুড়ে দিলেন! তার মনেও অনাবিল আনন্দ! অনুজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর প্রেমের আলাপনের এ যেন ছিল এক নিষ্ঠুর প্রতিশোধ।

‘আমার মনও কি তেমন কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছে থেকেই এমন হালকা, পেঁজাতুলোর মতো উড়ু উড়ু হয়ে গেল।’ মন নাচে। আমার মন নাচে আনন্দে!

কচ্ছপের এমনি দ্বৈতরূপের মতোই বোধহয় বিনীতার মন। তার আচরণ। ওর উপুড় রূপটাই দেখেছি কেবল। চিৎ রূপটি তো দেখা হয়নি কখনও। সে রূপ কেমন? দেখা হয়নি কখনও!

এ অবস্থায় আমার বদলি। ফলাফলÑ দুজনেই একা! হাতে পাব আকাশের চাঁদ। সে চাঁদ অনবরত ঢেলে দেবে নীরবতা! সে নীরবতায় দুহাত ভরে লিখবে দিব্য। তখন দমবন্ধ করা শাসন আর উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর ঝকমারি নেই।

ও তখন রোদ থেকে আনা শাড়ি ও অন্যান্য কাপড় ভাঁজ করছিল। বদলির কথা বলতেই একবার চোখ তুলে চাইলÑ তাই নাকি! কোথাও কোনো দুশ্চিন্তা কিংবা কষ্টরা ছায়া ফেলেনি ওর চোখেমুখে। যেন এমন একটি দিনের অপেক্ষায় সেও ছিল। 

এক সকালে গাবতলী এসে বাসে চড়ে বসেছি। এবারই প্রথম রাজশাহী যাচ্ছি। বিনীতা তখনও সম্পূর্ণ নির্বিকার। বাস যখন ঝিরিঝিরি করে এগোচ্ছে কী মনে করে তখন নিচ থেকে ওর হাত বাড়িয়ে দিল বিনীতা। আমিও হাত বাড়িয়ে দিতেই প্রচণ্ড জোরে চেপে ধরল ও। কোনোভাবেই সে হাত আর ছাড়ছে না। হাতটাকে যদ্দুর সম্ভব কাছে টেনে বেহুঁশের মতো কান্না। যেন হিমালয়ের সব বরফ গলে গলে জল হয়ে নামছে দুচোখ বেয়ে।

টাঙ্গাইল রোড ধরে বাস তখন উড়ে উড়ে যাচ্ছে। বিনীতার নতুন রূপ আমাকে তখন দারুণ রকম বিষণ্ন করে তুলেছে। উড়ন্ত হাওয়া বিষণ্ন ধানক্ষেত। মাঝে মাঝে জলাশয়ে বাতাসের কাঁপুনি। চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করি না। জলেরা বাধা না পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তখন দুচোখ বেয়ে। কিন্তু একটু আগের বিনীতাকে মোছা গেল না কোনোভাবেই। পুরো পথ ও হাত ধরে আমারই সংগে। এভাবেই গেস্ট হাউস অবধি চলে এলো বিনীতা। 

যেখানে কুটোটি পর্যন্ত সরিয়ে খাইনি কখনও বিনীতা আছে বলে। ও ছাড়া তো এখন সব বেসামাল হয়ে যাবে দেখছি! এক গেলাস জল খেলে ভালো হতো। কিন্তু বিনীতাকে যে বলব, ও কোথায়! স্যুটকেস খুলে কাপড়গুলো বের করা দরকার। মনে হলো বিনীতাবিহীন জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো আজ। 

শহরের শেষ প্রান্তে অফিস। চারদিকে ধু ধু ধানক্ষেত। দিগন্তের ঠিক মাঝখানে একটি ঝাঁপানো বটগাছ।

বটগাছটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে দিব্য। পাখির কলকাকলি এত ছন্দময় হতে পারে! শেষ বিকালের আলো এত মায়াবী হতে পারে! পড়ন্ত বিকালের আলো। আলো ভেজা পাতা। আলোয় মাখা পাখির ঝাঁক এবং তাদের ঝুল খাওয়া। সেই সঙ্গে ঝুমুর তালে গান, সব মিলিয়ে প্রকৃতির মাঝে এতো চমৎকার কোলাজ আঁকা হয়েছে! চমৎকার এ দৃশ্যকাব্যের ভিড়ে মুগ্ধতা আছে ঠিকই। তবে ঝুমুরের শব্দে কেমন এক নিঃসঙ্গতার সুরও বেজে ওঠে করুণ সুরে।

রাতে আর সেভাবে খাওয়া হলো না। বাজারে যেতে হলেও অনেক হ্যাপা। প্রথমে ভ্যান। তারপর খেয়া পার হয়ে ফের ভ্যান। তারপরও খাবার কিছু পাবে কি না সংশয়। কারণ সন্ধ্যার পরই বাজারের পাট চুকে যায়। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। অগত্যা নিরাপত্তা প্রহরী রতন মুন্সি এলো হুইসেল বাজাতে বাজাতে। ও পথ বাতলে দিল। স্যার, আমি রুটি বানাইলে খাবেন!

কেন, অসুবিধা কী?

আমরা ছোট পদে চাকরি করি, গরিব মানুষ! অনেকে আবার ঘেন্না করে।

তুমি নিশ্চিত থাকতে পারোÑ আমি অনেকের মতো না।

দরজার কাছে গিয়ে ফের মুখ ফেরালÑ ‘স্যার, রুটি তো বানাইলাম কিন্তু খাইবেন কী দিয়া!’

তাই তো! হঠাৎ খেয়াল হলো বিনীতা কয়েক বাটি তরকারি রান্না করে দিয়েছে। বললাম, অসুবিধা নেই। তরকারি আছে।

রাতে খাওয়ার পর্ব শেষ হলে ফের বটগাছের দিকে চোখ যায় দিব্যর। চাঁদের ম্লান আলোয় ঝাঁপানো গাছটিকে বড্ড রহস্যময় মনে হয়। গা কেমন ছমছম করে ওঠে। ঘরের চারদিকে ঢাউস আকারের একেকটি জানালা। কোনো জানালায় পর্দা দূরে থাক, একচিলতে ত্যানাও নেই। রাতটা কাটাবে কী করে!

অগত্যা উপায় না পেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় দিব্য। চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করে। অফিসটি নওগাঁ রাজশাহী রোডের বা মোচড়ে। একটু পরপর ট্রাক-বাসের হেডলাইটের তীব্র আলোয় ওর ঘরের পশ্চিমের দেয়াল ঝলসে ওঠে। কখনও ট্রাক, কখনও বাস। ওরা চলে যেতেই ফের অন্ধকার। হেডলাইটের আলো লকলকে জিভের মতো পুরো দেয়াল চেটে মিশে যায় অন্ধকারে। তন্দ্রাভাব থেকে থেকে নাই হয়ে যায় তখন।

রাত গভীর হতেই আলোর দাপাদাপি কমে আসে। কিন্তু ঘরের এককোণে ঠিকই এক টুকরো আলো ফুটছে। প্রথমে সেভাবে খেয়াল করেনি দিব্য। অনেকক্ষণ ধরে বাস ট্রাকের কোনো চলাচল নেই কিন্তু ঘরের এককোণে ঠিকই আলোর ঝলক। অন্ধকারে সে আলোর তীব্রতা আরও ভালোভাবে চোখে পড়ে। দিব্য শুয়ে শুয়ে খেয়াল করে হেডলাইটের আলোর সঙ্গে এ আলোর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। হেডলাইটের আলো এসেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু এর শুরুও নেই। শেষও নেই। ঘরের পশ্চিমে ছাদ ছুঁই ছুঁই এককোণে শুধুই জ্বলছে। এ আলো স্থির নয়। কাঁপছেÑ কম্পমান। ছোট কোনো বিন্দু নয়। গোলাপ আকারের সে আলো অনবরত কেমন যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, আলো এক জায়গাতেই স্থির। কিন্তু সে আলোর দিকে তাকাতেই তা চুই করে চলে আসে দিব্যর মাথার কাছে। দিব্য তড়িঘড়ি কাঁথা দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললে আলো আবার ফিরে যায় ওর আগের জায়গায়। দিব্য কাঁথা সরিয়ে ফের তাকায় আলোর দিকে। আলো আবারও চুই করে চলে আসে। দিব্য এবার সত্যিই ভড়কে যায়।

উঠে লাইট জ্বালায়। না নেই। আলোর ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই কাঁপা কাঁপা আলো।

বাইরে কুচুটে অন্ধকার। হিম হয়ে আসে ওর পুরো শরীর। কী করবে ভেবে পায় না। ঘরের এক কোণে একতাল খবরের কাগজ পড়ে আছে। তড়িঘড়ি কাগজ নিয়ে জানালার গ্রিলে গুঁজে দিতে থাকে। ভুতুড়ে অন্ধকার যদি একটু হলেও আড়াল হয়! 

হঠাৎ ভারী বুটের আওয়াজ। ঝপ ঝপ! মাঝে মাঝে আওয়াজ দূরে চলে যায়। কখনও ফের কাছে চলে আসে। একসময় শব্দ উঠে আসে সিঁড়ি ভেঙে ধাপে ধাপে ওপরে। শব্দ দরজার কাছে আসতেই ভারী এক কণ্ঠ। 

কে, কে? ওখানে! কেঁপে ওঠে দিব্যর কণ্ঠ। 

সিকিউরিটি। সিকিউরিটি স্যার।

কে সিকিউরিটি!

আমি মুন্সি স্যার!

ও রতন মুন্সি! তা বলবে তো। তোমার কণ্ঠ অমন শোনাচ্ছে কেন?

কেমন স্যার?

ভারী। অন্যরকম। অচেনা।

একটু চোখ লেগেছিল। ডিউটিরুম থেইকা দেখলাম আপনার ঘরে বাত্তি জ্বলতাছে তাই আইলাম! কোনো অসুবিধা?

না, কোনো অসুবিধা নেই মুন্সি। তবে...!

কী তবে!

তুমি মুন্সি তো!

বিশ্বাস না হয় দরজা মেইলা দেখেন।

দরজা মেলতে হবে না। তুমি যাও, এখন যাও মুন্সি। কিন্তু একটা কথা!

কী কথা স্যার! বলেন। খিদা লাগছে স্যার?

না, তা না। যাক কাল বলব। এখন তুমি যাও!

রতন মুন্সি ফের শব্দ তুলে নিচে নেমে যায়। হুইসেল বাজতে থাকে বেদমভাবে। 

মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে বিড়বিড় করছেÑ ডরাইছে! ডরাইছে! বলেই লম্বা করে ফের হুইসেল দেয়।

এবার ঘরময় অন্ধকার কিছুটা গাঢ় হলে আলোর সেই বৃত্তটি ফের ঝিকিয়ে ওঠে। পশ্চিমের কোণটিতে যথারীতি তার উপস্থিতি। মুখে কাঁথা চেপে একসময় ঘুমে ঢলে পড়ে দিব্য।

সকালে উঠে গেস্টরুমের চারদিকে তাকায়। কোথাও কোনো ছিদ্র রয়েছে কি না। তা না হলে বৃত্তাকার সেই আলো আসে কোন দিক দিয়ে। কিন্তু না, হতাশ হলো দিব্য।

রাতে যথারীতি সেই ঝিকিমিকি আলো। সবচেয়ে বিস্ময়কর সে আলোয় যেন ওর নাড়ির টান রয়েছে। তা না হলে আলোর দিকে তাকাতেই সুড়সুড় করে সে চলে আসে দিব্যর মাথার কাছে।

সন্ধ্যায় রুমে ফেরে দিব্য। ঘরে ঢুকে সুইচ জ্বালাবে কী! তার আগেই অন্ধকার ফুঁড়ে আলোটি চলে আসে দিব্যর কাছে। আলো জ্বালতেই দেখে সেই প্রকম্পিত আলো আর নেই। মিশে গেছে অবাক করে দিয়ে। রাতে শোয়ার সময় সুইচ নেভাতেই ঘরের অন্ধকার ফুঁড়ে সে আলো ঝিরিঝিরি কাঁপতে থাকে ওর নিজের জায়গা ঘিরে!

এ কেমন আলোরে বাপ! দিনের আলোয় হারিয়ে যায়। ফের রাতে দেখা মেলে। কিন্তু একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় না। 

কোনোদিনই নতুন কোনো জায়গায় ওকে জ্বলতে দেখা যায়নি। একই জায়গায় থাকে। একইভাবে দিব্যর কাছে চলে আসে, যখন ওর চোখ যায় বৃত্তের কাছে। একটা সরলরেখা ধরে ওর আসা-যাওয়া। 

দিব্য যেন এখন বেশ মজা পায় ওর সংগে লুকোচুরি খেলতে। বিছানায় গা এলিয়ে কিংবা বালিশে মাথা রেখেই ও তাকায় সেই আলোর দিকে। ও চলে আসে চড়ৎ করে। দিব্য কাঁথায় মুখ ঢেকে দিতেই, একইভাবে ও ফিরে যায়। এক মুহূর্তও দেরি করে না। যেন অব্যক্ত কোনো অভিমানে ওর ফিরে যাওয়া। দেখা হবে বলে আশা করে। সে আশা নিয়ে ফের ফিরে আসে ও কাঁথার আড়াল থেকে দিব্যর মুখটি ভেসে উঠতেই। এমনি করে একসময় ঘুমে ঢলে পড়ে দিব্য।

কিন্তু মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় রোজ রোজ একটি বিদঘুটে শব্দে। মনে হয় বুট পড়ে কেউ উঠছে সিঁড়ি ভেঙে। যথারীতিÑ দরজার কাছে এসে শব্দটি থেমে যায়। তখন আর কারও সাড়া পাওয়া যায় না।

কে রতন! রতন এসেছ? কথা বলছ না কেন? তারপরও সাড়া দেয় না কেউ। একইভাবে বুটের আওয়াজ নিচে নেমে যেতে থাকে। একসময় অনেক দূর থেকে সে শব্দ ভেসে আসে। তারপর মিশে যায় বাতাসের গভীরে।

দিব্য অস্থির হয়ে আলো জ্বেলে ডাক দেয়Ñ রতন! রতন! তুমি কি এসেছিলে!

রতন ডিউটি রুমের দিকে। দিব্যর ডাক শুনে কড়া করে হুইসেল বাজায়! স্যার আমি মেইন গেটে!

একটু আগে তুমি এসেছিলে!

না তো স্যার। আমি তো এখানেই। 

সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসে রতন মুন্সি। কোনো সমস্যা স্যার।

না, তেমন কিছু না! তবে দরজা খুলল না!

স্যার!

দিব্য কেমন যেন আঁৎকে ওঠে। মনে হয় আগের লোকটিই ফের রতন সেজে দরজা খোলার জন্যে ফাঁদ পেতেছে।

পরদিন পুরো অফিস কাম্পাউন্ড হেঁটে ঘুরে বেড়ায় দিব্য। সিকিউরিটিদের রুমেও ঢুঁ দেয়। রুমের পেছনে একটা গোখরা সাপের খোলস পড়ে আছে। খোলস দেখেই আঁৎকে ওঠে দিব্য। এটা তো দেখি ভয়ানক বিষাক্ত সাপের আখড়া।

অনেকেই বলছে, এ তো শুধু খোলস। আমাদের ভেতরের রাস্তায় সাপ চলতে দেখা যায়! প্রচণ্ড গরমে তো ওরা রাস্তার ওপর শুয়ে থাকে।

দিব্যর চোখে বিস্ময়। দূরে ঝোপঝাড়ের দিকে চোখ যায় ওরÑ এ তো জঙ্গল বাড়ি হয়ে গেছে। 

কী করব আমরা বন বিভাগ থেকে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ দিবসে এসে গাছ লাগিয়ে দিয়ে যায়। যত বলি আর জায়গা নেই! ওরা বলে, সরকারি হুকুম। সুতরাং জো হুকুম জাঁহাপনা। সেভাবেই চলছে।

পেছনে গাছপালার ভিড় সামান্য। আলো ঢোকারও সামান্য সুযোগ নেই। গাছের ওপর গাছ! ডালপালার জড়াজড়ি। পাখিরা যে একটু ডানা মেলবে, এ-ডাল ও-ডাল করবে তেমন ফাঁকা জায়গাও নেই।

এত ঝোপঝাড়। জঙ্গল! কেমন অন্ধকার! তোমাদের ভয় করে না!

এমনিতে ভয়ের কিছু নেই, তবে...!

তবে?

মাঝে মাঝে দূরে একটা ছায়া দেখা যায়!

কখন?

রাতে, নীরব জায়গাগুলোতে দিনেও দেখা যায়। 

রাতে কি সমসময়! দিব্যর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা!

সবসময় দেখা যায় না। তবে ওর বিচরণ কখন কোথায় তা বোঝা যায়। যেখানে ওর পা পড়ে সেখানে যেন অন্ধকার ভীষণ জমাট হয়ে পড়ে। একটা থমথমে ভাব সেখানে! 

দেখতে কেমন? ছেলে না মেয়ে!

তা বোঝা মুশকিল। সবসময় ওকে পেছন থেকেই দেখা যায়!

হঠাৎ সব মুখ থেমে যায়। ক্ষয়াটে চাঁদের দিকে ওর চোখ। তবে সে চোখ চাঁদ দেখছে না বরং মনের গভীরে ডুবে আছে যেন। গোখরা কিংবা কেউটে সাপ। সাপের খোলস। পথের ওপর সাপের অবাধ বিচরণ। ছায়া মানব। বুক কাঁপানো পায়ের শব্দ। সে সঙ্গে রাতের কাঁপা কাঁপা আলো! সব মিলিয়ে যেন এক প্রেতভূমিতে এসে পড়েছে ও।

হঠাৎ ওর সম্বিৎ ফিরে পায়Ñ শোনো এখানে একা একা আর একদিনও থাকা সম্ভব নয়। তাড়াতাড়ি আমার জন্য বাসা দেখো!

বাসা তো ঠিক। শুধু মাস শেষ হওয়ার অপেক্ষা।

সে তো আরও দিন দশ লাগবে! অত দিন একা একা! আতঙ্ক এবার আর লুকাতে পারে না দিব্য! 

কোনো সমস্যা হচ্ছে স্যার!

পরে বলব। এখন শুধু আমাকে বিদায়ের ব্যবস্থা করো।

মাস শেষে চলে আসে দিব্য। 

উপশহরের একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট নিয়েছে ও।

সেদিন সবে অফিসে গিয়েছে দিব্য। তখন রেজা, মানিকসহ অনেকে এসে বলল, স্যার আপনার রুমের পেছনের জানালায় মৌমাছি এসেছে। চাক বেঁধেছে। অনেক দিন পর মৌমাছি এলো আমাদের অফিসে! তা কুড়ি-বাইশ বছর তো হবেই!

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতেই বাড়িওয়ালা এসে বলে, আপনি বড় কপাল নিয়ে এসেছেন ভাই! পয়মন্ত কপাল!

কেন কী হয়েছে! অবাক হয় দিব্য।

পুবের জানালা দেখিয়ে বলে, এ জানালা আর ভুলেও খুলবেন না ভাই! জানালা খুললেই বিপদ!

এখানেও বিপদ! কেন কী হলো আবার! বেশ চমকে ওঠে দিব্য।

ম্যালাদিন পর মৌমাছি আমাদের বাড়িতে চাক ফেলেছে!

তাই নাকি!

তবে আর কী বলছি! আপনার জানালার ওপরেই মৌচাক। সারাদিন মৌমাছি ভনভন করে উড়ছে।

তা কেন অন্য কোনো বিপদ হয়েছে নাকি!

দিব্য একটু সামলে নেয় নিজেকে, না এমনি বললাম আর কী!

তখনই ওর মোবাইল বেজে ওঠে। বিনীতার ফোন!

তুমি কোথায়?

এই তো বাসায় ফিরলাম মাত্র।

আমাদের নিতে আসবে না?

কেমন করে আসব ছুটি পাইনি। মানা করে দিয়েছে।

তোমার ছুটি লাগবে না। আপাতত বাস টার্মিনালে এলেই হবে!

মানে!

আমরা শিরইল বাস টার্মিনালে আছি। এই নামলাম মাত্র। ন্যাশনাল বাস! কাউন্টারে আছি!

জানাবে না!

সারপ্রাইজ দেব ভেবেছি।

সমস্ত বিষণ্নতা ছাপিয়ে দিব্যর মুখে আনন্দ ছুঁয়ে যায়। স্নিগ্ধ সে রূপ। চারদিকে ঝিঁঝির শব্দ। নূপুরের নিপুণ। ওরা যেন আলাপ জুড়ে দিয়েছে। তানপুরা বাজিয়ে ঝিঁঝিদের সঙ্গে একটু আলাপ জুড়ে দিলে কেমন হয়! মন্দ হয় না! দুষ্টু হাসি খেলে যায় দিব্যর ঠোঁটে। রিকশায় বসে চাঁদ দেখে ও। অফিসে দেখা ভঙ্গুর চাঁদটিও এখন কী সুন্দর দেখাচ্ছে! আনন্দ আসলেই সুন্দর! ভাবে দিব্য!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা