× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সুবর্ণ সুনীলের দেশে

এমরান কবির

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪৭ এএম

সুবর্ণ সুনীলের দেশে

পুরাতন লাইব্রেরিতে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ-ই চোখ চলে যায় একটা বইয়ে। নাম ছবির দেশে কবিতার দেশে। লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি না প্রবন্ধ, না উপন্যাস, না গল্প। প্রত্যেক অধ্যায় আবার বিদেশি কবিতার অনুবাদ দিয়ে শুরু। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মার্গারিটা নামটার ওপরও চোখ চলে যায়। এতদিন আমরা ‘কেউ কথা রাখেনি’র সুনীলকে চিনতাম। তাও আবৃত্তির কল্যাণে। আর সোনালী দুঃখের গা গরম করা উপন্যাসের লেখক হিসেবে। এখন দেখি এক অদ্ভুত ধরনের রচনার লেখকও তিনি। সুনীল, বিদেশি কবিতার অনুবাদ, মার্গারিটাÑ এতসব আকর্ষণীয় বিষয় যখন চোখের সামনে তখন বইটা না কিনে পারা যায়? ওই দিন রাতে একাডেমিক পাঠের নির্ধারিত সময় ছবির দেশে কবিতার দেশে নামক বইটি দখল করে ফেলে। ঘটনা গত শতকের, নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যায়ের।

তারপর রাত কাবার হয়ে যায়। পুরাতন বইটার প্রতিটি পাতার প্রতিটি অক্ষরের প্রেমে পড়ে যাই। মার্গারিটার জন্য মনটা ছটফট করতে থাকে।

পরদিন বিকালের আড্ডায় তৎকালীন সতীর্থদের কথাটা বলি। সঙ্গে সঙ্গে মাহমুদ শাওন প্রথম দাবি জানায় বইটা পড়ার। আমার পড়া শেষ হলে তারপর তোমাকে দেব বলে জানিয়ে দেই। পরদিন সারা রাতও বইটা দখল করে রাখে শেষ না হওয়া অব্দি। মার্গারিটার জন্য প্রথমে চোখ সজল হয়ে ওঠে। তারপর বুকের ভেতরে হাহাকার করতে থাকে। সেই হাহাকার কিছুতেই যায় না। মাহমুদ শাওনকে বইটা দেওয়ার পর হাত ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে জীর্ণ বইটা আরও জীর্ণ হতে থাকে। এভাবে আমরা প্রবেশ করি সুনীল নামক এক গভীর সমুদ্রের ভেতরে।

এই সমুদ্রযাত্রার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় প্রথম আলো দিয়ে। অনেকটা কাকতালীয়ভাবে। বড় বোনের বিয়েতে উপহার পাওয়া বইটার ভেতরে ডুব দিয়ে দেখি ভারতীয় ইতিহাসকে বইয়ের পাতায় নিয়ে আসার এক শৈল্পিক প্রতিচ্ছবি। কত শত বিখ্যাত চরিত্র। তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ জীবনের চিত্র। তাতে তাদের পাঠের পাশাপাশি পাঠ হয়ে যায় ওই সময়ের। ইতিহাস তো উচ্চবর্গের লেখা বিজয়ের কাহিনী। কিন্তু সুনীলের ইতিহাস তো দেখে ওই দিনের রোদের তীব্রতা আর বাতাসের শাসন। দেখে বৃষ্টি হলো কি না। মেঘ জমল কি না। উচ্চবর্গে থেকে পাখির চোখে দেখা কিংবা নিম্নবর্গ হয়ে ব্যাঙের চোখে দেখার পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে আলো ফেলে শিল্পীর চোখে দেখা কতখানি বাক্সময় হয়ে ওঠেÑ তা দেখিয়েছেন সুনীল। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা ডুব দেই সেই সময়ে, পূর্ব-পশ্চিমে। আত্মজীবনী অর্ধেক জীবন প্রকাশ পেলে তার সামগ্রিক জীবন যা ব্যক্তি-শিল্প-শিল্পযাপন-বন্ধুকৃত্য-সংগ্রাম তথা একজন সামগ্রিক সুনীল সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়। নিজের জীবনের ওপর যেন নানা রকম নিরীক্ষা চালিয়েছেন তিনি। নির্লিপ্ত হয়ে তিনি দেখেছেন কলকাতা নগরীকে। তার সঙ্গে জড়িয়েছেন নিজেকে। দেখেছেন, দেখিয়েছেন। তাতে উঠে এসেছে এক শিল্পীর জীবনের শিল্পলিপি।

শুরুটা তার কবিতা দিয়ে। বার্ষিক পরীক্ষার পর স্কুলশিক্ষক বাবা কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র সুনীলকে হোমটাস্ক হিসেবে টেনিসনের কিছু কবিতা বাংলায় অনুবাদ করতে দেন। কাজটা মোটেও সহজ নয়। এই অসহজ কাজটি করতে করতে তিনি লক্ষ করলেন তিনিও লিখতে পারেন। ‘একটি চিঠি’ নামে কবিতা লিখে ডাকে পাঠিয়ে দিলেন বিখ্যাত দেশ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালের ৩১ মার্চে দেশ পত্রিকায় ছাপা হয়ে গেল সেটি। একজন নতুন লেখকের প্রথম কবিতা প্রকাশ দেশ পত্রিকা দিয়ে। এই নতুন লেখক যে অনেক দূর যাবেÑ তা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন তৎকালীন পত্রিকাটির সম্পাদক মহাশয়। বাস্তবে হয়েছেও তাই।

এরপর বাংলা সাহিত্য পেয়েছে এমন একজন কবিকে যার কবিতার বিষয় স্পর্শ করেছে হাজারো বিষয়কে। ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতা দিয়ে স্পর্শ করেছেন সর্বসাধারণের হৃদয়। ‘নিখিলেশ’ এখনও আমাদের হাহাকারের সঙ্গীÑ ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ/এই কি মানুষ জন্ম?/না কি শেষ পুরোহিত কঙ্কালের পাশাখেলা?/ .. তোর সঙ্গে জীবন বদল করে তেমন কোনো লাভ হতো না আমার।’

মন খারাপ হলে এখনও আমাদের যেতে হয় ‘নীরা’র কাছে। আমাদের প্রেমে, ব্যর্থতায়, আবেগে, অভিমানে এখনও নীরা নিরন্তর সঙ্গীÑ ‘নীরার অসুখ হলে কলকাতায় সবাই বড় দুঃখে থাকে/ সূর্য নিভে গেলে পর, নিয়নের বাতিগুলো হঠাৎ জ্বলার আগে জেনে নেয়/ নীরা আজ ভালো আছে?/গির্জার বয়স্ক ঘড়ি, দোকানের রক্তিম লাবণ্য, ওরা জানে/ নীরা আজ ভালো আছে?’

সুনীলের মতো আর কে আছে যিনি বলতে পারেন, ‘শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার/জন্য কিছু খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধ্যে বেলা/ভুবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য/ অপলক মুখশ্রীর শান্তি এক ঝলক/শুধু কবিতার জন্য তুমি নারী, শুধু/কবিতার জন্য এত রক্তপাত, মেঘের গাঙ্গেয় প্রপাত/শুধু কবিতার জন্য, আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা, শুধু কবিতার/জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।

একজন প্রকৃত শিল্পীর নানারকম অভিব্যক্তি থাকে, থাকে সম্ভাবনা। আরেকজন প্রকৃত শিল্পী তার এই সম্ভাবনা ঠিকই টের পেয়ে যান। দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ একদিন ডেকে বললেন শারদীয় সংখ্যার জন্য উপন্যাস দিতে হবে। সময় তিন মাস। তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে যেন এ কথা শুনে। এক এক করে দুই মাস পার হয়ে আড়াই মাস স্পর্শ করে। অবশেষে তিনি শুরু করতে পারেন। পনের দিনে টানা লিখে দেশ পত্রিকার দপ্তরে জমা দিয়ে পালিয়ে যান। পুজোর পরে ভয়ে ভয়ে দেশ-এর কার্যালয়ে যাওয়ার সময় লিফটে দেখা হয়ে যায় রমাপদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘তোমার উপন্যাস পড়তে শুরু করেছি। শেষটা যদি ভালো না হয় তাহলে খুন করে ফেলব।’

সুনীলকে খুন হতে হয়নি। এরপর উপন্যাসশিল্প নিয়ে তাকে আর পেছনে ফিরেও তাকাতে হয়নি। উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতার উপকণ্ঠে আশ্রয় নেওয়া পূর্ববঙ্গের মানুষের দুর্দশা আর সংকট নিয়ে লিখলেন ‘অর্জুন’। লিখলেন ‘এক জীবন’, ‘জীবন যেরকম’, ‘একা এবং কয়েকজন’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। ফরাসি সঙ্গিনী মার্গারিটাকে নিয়ে লিখলেন প্রেমের উপন্যাস ‘সুদূর ঝর্ণার জলে’। রাধা কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী নিয়ে লিখলেন ‘রাধা ও কৃষ্ণ’। রবীন্দ্রনাথ ও রানুকে নিয়ে লিখলেন ‘রানু ও ভানু’। আদিম যুগের মানুষ নিয়ে লিখলেন আমিই সে। লিখলেন ক্রিয়াপদমুক্ত আস্ত একটা উপন্যাস ‘মায়াকাননের ফুল’। লালন সাঁইকে নিয়ে লিখলেন ‘মনের মানুষ’। গৌতম ঘোষ সেটা নিয়ে সিনেমা বানালেন। তারও অনেক আগে সত্যজিত রায় বানালেন প্রতিদ্বন্দ্বী। সত্যজিতের বিখ্যাত কলকাতা ট্রিলজির একটি। নারী পাচার নিয়ে লিখলেন ‘জোসনাকুমারী’। গল্পেও তিনি চমক দেখালেন। লিখলেন ‘মহাপৃথিবী’, ‘রাতপাখি’, ‘গরমভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’, ‘দেবদূত অথবা বারো হাটের কানাকড়ি’, ‘শাহাজান ও তার নিজস্ব বাহিনী’। গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প নিয়েও হিন্দি ভাষয় সিনেমা তৈরি হলো।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন পেটের দায়ে তাকে লিখতে হয়েছে নানারকম রচনা। বিশেষ করে উপন্যাস ও ফিচার। কিন্তু ফিচার বা নিছক গদ্য হিসেবে যেগুলো উপস্থাপিত তার ভেতরেও তিনি গেঁথে দিয়েছিলেন সহিত্যের শিল্প-সুষমা আর দেখার ভিন্নতর উপলব্ধি। যুক্ত করেছিলেন নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গি। তাতে এই ফিচারগুলো অথবা তথাকথিত গদ্যগুলো নিছক কাটখোট্টা গদ্যে পর্যবসিত হয়নি। হয়ে উঠেছে সাহিত্যিক উপাদানে সমৃদ্ধ অন্যতর রচনা। যাকে ঠিক নির্দিষ্ট কোনো অভিধায় ফেলা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে ধারাবহিক রচনা লিখতে শুরু করলে চারিদিকে হইচই পড়ে যায়। কিন্তু তিনি তার যুক্তিতে অবিচল, বিশ্লেষণে ততোধিক গভীর। ফলে আধুনিক মনস্কতার কাঠগড়ায় সত্যি সত্যি দাঁড়াতে বাধ্য হলেন বঙ্কিম।

এই না হলেন সুনীল। একই সঙ্গে আনন্দবাজারের সবগুলো কাগজে দুহাতে লিখেছেন। একই নাম প্রকাশ পেলে তাদের নীতির পরিপন্থী হবে বিধায় তিনি নিয়ে ফেললেন আরও কয়েকটি নাম। নীললোহিত, সনাতন পাঠক।

শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় এক রচনায় লিখেছেন ‘মধ্যরাতে কলকাতা শাসন করে চার যুবক।’ এই চার যুবক হলেনÑ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় আর বেলাল চৌধুরী। কলকাতা শাসন করতে গিয়ে তারাও কম শাসিত হননি। পুলিশের কাছ ধরা খেয়েছেন, কবরখানায় শুয়ে থেকেছেন, মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গ্রামের মাঠে শুয়ে থেকেছেন। গ্রামবাসী ডাকাত ভেবে মারতে এসেছে। আরও কত কী! শুধু কল্পনার রাজ্যে না ভেসে জীবনকে নিংড়ে দেখার জন্য এর ভেতরের কদর্যের মুখোমুখী হয়েছেন। তাইতো সাহিত্যের যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই রীতিমতো সোনা ফলেছে।

‘ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে।’ এই চন্দনের বন তো আরেক পৃথিবী। যেখানে শিল্প-পল্লবে আমাদের নিয়ে যান একজন সুনীল। একজন নীললোহিত। একজন সনাতন পাঠক। এই তিনজন বা অনেকজন আসলে একজনই। এই একজন নিয়ে যান এমন এক দেশেÑ যে দেশে পরিভ্রমণের আশ্চর্যময়তা কখনও শেষ হয় না।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা