ইমরান উজ-জামান
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৩৫ এএম
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১০ পিএম
নানা রূপে বাংলার চিরায়ত নারী, প্রকৃতির রূপে নর-নারীর প্রেম, মহামতি বুদ্ধ। সব ছবিতেই আছে পবিত্রতার আবেশ। রাজধানীর ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে ‘পবিত্র সৌন্দর্যের সন্ধানে : মলয় বালার ভক্তিমূলক শিল্প’ শীর্ষক একক প্রদর্শনী স্থলে বিরাজিত আধ্যাত্মিকতা, পবিত্রতা বিরাজ করে, মনে লয় বসে যাই ধ্যানে। প্রাচ্যকলার গেরুয়া রঙে, মূর্ত এবং বিমূর্ততার মধ্যে ভিন্ন এক জগতের কথা বলে যায় ‘পবিত্র সৌন্দর্যের সন্ধানে : মলয় বালার ভক্তিমূলক একক শিল্প’ প্রদর্শনী।
বলা হয়ে থাকে মানুষের মননে তার শৈশব সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে। মলয় বালার শৈশব, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা সব কিছুর প্রামাণিক স্বাক্ষর রয়েছে এই প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে। সেই গত শতকের নব্বইয়ের দশকে মলয় বালার শৈশবের গোপালগঞ্জের রামশীল গ্রামের পদ্মবিলের পৌরাণিক রঙের প্রভাব আছে ছবিতে। শৈশব ও কৈশরের শিল্পচেতনা ও নন্দনবোধের ভিত্তি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগে অধ্যাপনায় যুক্ত করেছে প্রাতিষ্ঠানিকতা। এ ছাড়া ‘বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচ্য-চিত্রকলার ধারা’ শীর্ষক গবেষণাকর্ম তার শিল্প ভাবনাকে করেছে সাসটেইনেবল।
প্রদর্শনীতে আশিটি শিল্পকর্ম রয়েছে, যা চারটি পর্বে বিন্যস্তÑ শকুন্তলা, ধর্ম, নারী ও প্রকৃতি। ‘শকুন্তলা’ পর্বে রয়েছে পৌরাণিক চরিত্র ও শকুন্তলার জীবনোপাখ্যান। এই ধারার চিত্রে বট গাছের শিকড় মধ্যস্থ অবয়ব-প্রধান কাজ তার স্বকীয় পরিচয় বহন করে। ‘ধর্ম’ পর্বে রয়েছে ধর্মগুরু বুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণ, দেবী দুর্গা ও অন্যান্য। ‘নারী’ পর্বের কাজ দৃশ্যত ফিগারেটিভ। ‘প্রকৃতি’ পর্বের কাজে উঠে এসেছে পশু-পাখি ও ল্যান্ডস্কেপ।
প্রদর্শনী মূলত প্রাচ্যধারার কাজ দিয়েই সাজানো হয়েছে। যেখানে জলরঙ ধৌত (wash) পদ্ধতির কাজই বেশি। গোয়াশ, টেম্পারা, অ্যাক্রেলিক মাধ্যমের কাজও রয়েছে। শিল্পীর অ্যাক্রেলিক মাধ্যমের কাজগুলো দেখতে অনেকটা জলরঙ ওয়াশ পদ্ধতির কাজের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
শিল্পী মলয় বালার শিল্পচর্চা আধ্যাত্মিকতার গভীর অন্বেষণ যেখানে তিনি শিল্পের মাধ্যমে ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে চান, সাধনা করেন, ধ্যান করেন। তার শিল্প যেন একেকটি প্রার্থনা, একেকটি নিবেদনÑ যেখানে শিল্পী নিজেকে সমর্পণ করেন সেই পরম শক্তির কাছে, যিনি তার মাধ্যমে সৃষ্টি সম্পন্ন করেন।
শিল্পী মলয় বালা বলেন, ‘আমি আঁকি ঈশ্বরের সান্নিধ্য খুঁজে পেতে, ধ্যান করতে এবং তার আরও কাছাকাছি যেতে। আমার হৃদয় অনুভব করে ঐশ্বরিক সত্তাকে… পবিত্র পুরাণে আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুশ্রেষ্ঠদের মধ্যে, প্রকৃতির পবিত্র সৌন্দর্যে এবং নারীর মর্যাদাময় অনুগ্রহে… যা আমি আমার চিত্রে প্রকাশ করার চেষ্টা করি।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেনÑ আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুন, চিত্রশিল্পী সমর মজুমদার এবং লেখক ও গবেষক শরিফা আক্তার। প্রদর্শনীটি উৎসর্গ করা হয়েছে ভাস্কর, মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে।
‘পবিত্র সৌন্দর্যের সন্ধানে : মলয় বালার ভক্তিমূলক একক শিল্প’ প্রদর্শনীটি কিউরেটিং করেছেন মিখাইল ইদ্রিস। মিখাইল ইদ্রিসের ভাষ্যে, ‘শিল্পী মলয় বালার শিল্পসাধনা প্রকাশ করে এক আধ্যাত্মিক প্রেরণাকেÑ যা পৃথিবী, প্রকৃতি ও জীবজগৎকে পবিত্র আলোর মধ্যে উদ্ভাসিত করতে চায়। তার শিল্প রহস্যময়ভাবে আত্মার ঐশ্বরিক মিলনের আকাঙ্ক্ষাকে পুনরায় জাগিয়ে তোলে।’
প্রদর্শনীতে ঐতিহ্যবাহী বাংলা সংগীত পরিবেশনা, লোক ও প্রাচ্য শিল্পকর্ম-বিষয়ক কর্মশালা এবং শিল্পীর সঙ্গে কথোপকথন। প্রদর্শনী চলাকালে যন্ত্রশিল্পীদের পরিবেশনা দর্শকদের বারতি বিনোদন দেবে।
গত ১৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত। রবিবার ব্যতীত প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।