× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাক্ষাৎকার

প্রধান কল্পচরিত্রের বাস্তবে প্রবেশ

নকিব মুকশি

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১০:২৮ এএম

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১৪ পিএম

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। প্রতিকৃতি: জয়ন্ত সরকার

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। প্রতিকৃতি: জয়ন্ত সরকার

এ বছর সাহিত্যে নোবেল পান হাঙ্গেরির লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। তিনি ভিন্নধাঁচের এক ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। ভয়, বিপর্যয়, হতাশা, বিপন্নতা ও ভয়াবহ সময়ের মধ্যেও শিল্পের মাধুরীশক্তিকে তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর রচনাশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রায় বিরামচিহ্নহীন, দীর্ঘ ও জটিল বাক্যবিন্যাস। তাঁর উপন্যাসে প্রায়ই দেখা যায়, লেখার কল্পদুনিয়া হঠাৎবাস্তবজগৎ ও তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত জীবনযাপনে মিশে চলতে থাকে সমান্তরালে। এ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে থিয়েটার ও বাস্তবতার সীমারেখা, বিশুদ্ধ শিল্পাভিজ্ঞতা, বেলা তারের সঙ্গে লাসলোর সিনেমা নির্মাণের অভিজ্ঞতা, তাঁর গল্প বলার ধরন ইত্যাদি বিষয়।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ঔপন্যাসিক মাউরো হাভিয়ের কারদেনাস। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয় ২০১২ সালে লাসলোর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকালে। পরে মিউজিক অ্যান্ড লিটারেটারের দ্বিতীয় সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়।

অনুবাদ করেছেন কবি নকিব মুকশি

২০১২ সালের ২৬ জুন, সান ফ্রান্সিসকো ভ্রমণ

২০১২ সালের ২৬ জুন আমি সান ফ্রান্সিসকো ভ্রমণে যাই। আমার সফরপথ ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত সুত্রো বাথ রুয়িংস, ক্লিফ হাউস থেকে শুরু করে চায়নাটাউন পর্যন্ত, সঙ্গে ছিলেন লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। এটি ছিল তাঁর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর, উপলক্ষ ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ বইটির প্রকাশ।

গুগলের মাউন্টেন ভিউ অফিসে যাওয়ার পথে আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম—আমার স্মার্টফোন রেকর্ডার কি লাসলোর দীর্ঘ স্বগতোক্তির প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় ঠিকভাবে ধারণ করতে পারছে? সেই যাত্রায় আমাদের দুজনেরই প্রিয় ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরিয়া থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার লেখক হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি, হুলিও কোর্তাসার ও হোর্হে লুইস বোর্হেসের প্রতি আমাদের অনুরাগ প্রকাশসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলাম।

চায়নাটাউনে লাসলো ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের সময় আমি পিটার মারাভেলিসের একটি ই-মেইল পাই। তিনি জানতে চান, পরদিন সিটি লাইটস বুকসে লাসলোর সঙ্গে একটি আলোচনা সভা আমি সঞ্চালনা করব কি না। এখানে প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হলো আমাদের সেই কথোপকথন। সেদিন উপচে পড়া শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন লাসলোর সংবেদনশীল ও আবেগাপ্লুত উত্তর। তিনি কথা বলছিলেন দীর্ঘ, উষ্ণ মনোলগে—যা মনে করিয়ে দেয় তাঁর উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’-এর নায়ক দ্যোর্জ কোরিনের তীব্র মনোলগগুলো।

থিয়েটার ও বাস্তবতার সীমারেখা

কারদেনাস: রেকর্ডার চালু করার আগে আমরা ফিলিপ গ্লাসের ‘আইনস্টাইন অন দ্য বিচ’ নিয়ে আলাপ করছিলাম। আপনি বলছিলেন, এই নাটকের এক অভিনেত্রী হাঙ্গেরীয় এক কবির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। পরে তিনি নাটক নিয়ে একটি বই-ই লিখে ফেলেন, যেটা ব্যাখ্যা করে কেন অধিকাংশ নাটক একঘেয়ে মনে হয়। চলুন, সেই হাঙ্গেরীয় কবিকে দিয়েই শুরু করি।

ক্রাসনাহোরকাই: ইয়ানোস পিলিনস্কি বিশ শতকে এক অসাধারণ হাঙ্গেরীয় কবি। তিনি বাস করতেন প্যারিসে। সেখানে তাঁর এক বন্ধুর প্রেমিকা রবার্ট উইলসনের থিয়েটারের প্রধান অভিনেত্রী ছিলেন, নাম শেরিল সাটন। তিনি ছিলেন ‘আইনস্টাইন অন দ্য বিচ’ গীতিনাট্যের প্রধান চরিত্র। তখন সেই হাঙ্গেরীয় কবি অসুস্থ ছিলেন, খুবই অসুস্থ। প্রতিদিন শেরিল সাটন তাঁর সেবাশুশ্রুষা করতে আসতেন। সে সময়েই তাঁদের মধ্যে আলাপচারিতা হয়, বন্ধুত্বের দরজা খুলতে শুরু করে। পরে ইয়ানোস হাঙ্গেরিতে ফিরে যান এবং একটা চমৎকার বই লেখেন, নাম ‘কনভার্সেশনস উইথ শেরিল সাটন’। বইটিতে নাটক, ঈশ্বর, পাগলামি, মঞ্চ ও মঞ্চে কী কী হওয়া উচিত—এসব নিয়ে আলোচনা আছে।

শেরিল সাটন ও ইয়ানোস পিলিনস্কি আমার মতোই বিশ্বাস করতেন, মঞ্চে যদি সাজানো কিছুই না ঘটে, তাহলে সেটা আরও গভীর হয়। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যদি বাস্তবিকই মঞ্চে উপস্থিত থাকেন তাঁদের জীবনের স্বকীয়তা নিয়ে, তাঁদের অস্তিত্বের ভার নিয়ে, তবে সেই উপস্থিতিই যথার্থ নাট্য হয়ে ওঠে। এই ধারণা আমার কাছে এক গভীর অর্থ বহন করে এবং…

কারদেনাস: অস্তিত্বের ভার?

ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ, তাঁদের সপ্রাণ উপস্থিতি ও জীবনের গভীরতা। ইয়ানোস ও শেরিল বলেছিলেন, মঞ্চে জীবন্ত উপস্থিতির অভাবই আজকের থিয়েটারের প্রধান সমস্যা। ইয়ানোস এমন এক থিয়েটার চেয়েছিলেন, যেখানে দর্শকেরা দেখতে পাবেন মানুষের আসল অবস্থা ও অবস্থান, কোনো সাজানো-গোছানো ঘটনা বা নাটকীয়তার আড়ালে নয়, হয়তো সেখানে মানুষের উপস্থিতির বেশ কিছু ঝুঁকি থাকবে। আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভুল করার ভয়ে থাকা হাস্যকর। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি ভুলকে ভালোবাসি। কারণ এটাই বাস্তব, এটাই সত্য—মঞ্চে কিছু ঘটেছে মানে ভুল কিছু না কিছু হয়েছে।

কারদেনাস: পিনা বাউশের কথাই ধরুন, তাঁর নৃত্যশিল্পীরা বলেন, পিনা যখন কোরিওগ্রাফি তৈরি করতেন, রিহার্সালে তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো তুলে ধরতে বলতেন এবং সেগুলো দিয়েই কোরিওগ্রাফি করতেন…

ক্রাসনাহোরকাই: এটা একই রকম, তবে সামান্য পার্থক্য আছে। পিনা বাউশ সমস্যাগুলো মঞ্চে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করতেন। কিন্তু আমি প্রতীকবাদকে অপছন্দ  করি। কারণ, প্রতীকবাদ মানেই সত্যিকার উপস্থিতির বদলে, একটা কিছুর বদলে ‘অন্য কিছু’। এটা কৃত্রিম! সিনেমা বা মঞ্চে  একটি সত্যিকারের মুখ, একটি সত্যিকারের কান্না বা হাসি আমার কাছে অনেক বেশি গতিশীল ও প্রাণবন্ত লাগে। কারণ, প্রতীকবাদ একটি কৃত্রিম শিল্পরীতি। শিল্প, সাহিত্য, থিয়েটার, সিনেমা নিয়ে আমার ভাবনাটা আসলে এমনই। আমি চেষ্টা করি একটি পথ খুঁজে পেতে—বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে, কল্পনা ও অস্তিত্বের গভীরতার মধ্যে। আজকের শিল্পের প্রধান সমস্যা হলো বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে এই ভারসাম্য। হয়তো এটা অমীমাংসিত সমস্যা, কিন্তু আমি চেষ্টা করি আমার সাহিত্যে এর সমাধান করতে।

কারদেনাস: ‘আইজায়া হ্যাজ কাম’ পুস্তিকাটি স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়। এটি আপনার ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ বইটি থেকে আলাদা। পুস্তিকাটির সংস্করণের প্রচ্ছদে আপনার একটি নিবেদন আছে, ‘প্রিয় নিঃসঙ্গ ও সংবেদনশীল পাঠক, অনুগ্রহ করে এই পুস্তিকা আমার বই “ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার”-এর সঙ্গে যুক্ত করুন।’ আপনি কি একটু বলবেন ‘আইজায়া হ্যাজ কাম’ সম্পর্কে এবং এটি ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’–এর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত?

ক্রাসনাহোরকাই: এটি ছিল আমার সবচেয়ে অদ্ভুত সাহিত্য প্রকল্প। কারণ, এটি ছিল আমার একটা নিরীক্ষা—কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার সংকটের একরকম সমাধান খোঁজার প্রয়াস। এ জন্যই আমি একটি নিখাদ কল্পকাহিনি লিখতে চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম সেই কল্পিত প্রধান চরিত্রকে বাস্তবের মধ্যে প্রবেশ করাতে। ফলে এই আকাঙ্ক্ষাই পুস্তিকাটির সবকিছু নির্ধারণ করেছে। ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ উপন্যাসের চারটি অধ্যায় আছে, আসলে চারটিরও বেশি—কিন্তু কেন আমি অনিশ্চিত, তা আপনি বুঝতে পারবেন।

প্রথম অধ্যায়, বলা যায় ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ প্রকল্পের প্রথম পর্ব ছিল ‘আইজায়া হ্যাজ কাম’। এটি একটি ছোটগল্প—নায়কের মুখে এক দীর্ঘ স্বগতোক্তি। এই গল্পের স্থান সেই শহর, যেখানে চরিত্রটি জন্মগ্রহণ করেছিল। সময়টা ছিল উপন্যাস শুরু হওয়ার তিন বছর আগের। এটা বোঝা খুব জরুরি। আর এ কারণেই আমি খুব খুশি যে স্প্যানিশ এই সংস্করণ ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষার অনুবাদগুলোর প্রধান সমস্যা দূর করেছে। মানে ছোটগল্পটি উপন্যাসের মূল অংশ নয়, বরং একটু আলাদা, বিচ্ছিন্ন—এই সমস্যার সমাধান করেছে পুস্তিকাটি। আমার স্প্যানিশ প্রকাশক হাউমে ভালকোরবা বুঝেছিলেন কেন এই মনোলগকে মূল উপন্যাস থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন রাখা দরকার।

‘আইজায়া হ্যাজ কাম’ গল্পটির প্রধান চরিত্র (দ্যোর্জ কোরিন) স্বগতোক্তিতে মানবজীবনের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে, কথা বলে বিশ্ব কীভাবে গোল্লায় গেল এবং কয়েক শ বছর ধরে কী ঘটেছে। ঘটনাটা ঘটে বাসস্ট্যান্ডের বারের ভেতর। প্রায় ফাঁকা জায়গা। সে বসে আছে কাউন্টারে একেবারে চুপচাপ এক ব্যক্তির পাশে। ব্যক্তিটি ক্রমাগত ধূমপান করে চলেছে। আর কোরিন তো একেবারে মাতাল। তাই সে ওই রহস্যময় ব্যক্তিকে বলতে চায়, কেন পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে, কী ঘটেছে মানবজাতির সঙ্গে। এই স্বগতোক্তি শেষ হলে সে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে, কিন্তু এতটাই মাতাল যে বাঁ হাতের তালুতে গুলি করার পরই অচেতন হয়ে পড়ে এবং তার আত্মহত্যার চেষ্টা প্রহসনে রূপ নেয়। এই প্রকল্পের প্রথম ধাপ ছিল এটি।

তিন বছর পর একই প্রধান চরিত্র নিয়ে উপন্যাস শুরু হয়। এখানে চরিত্রটি মানে কোরিন একেবারে বদলে যাওয়া মানুষ—শান্ত, নিরীহ—যার একটা নিজস্ব জীবনদর্শন আছে। সে মনে করে তার অসাধারণ আবেগপূর্ণ ও সংবেদনশীল জীবন অর্থহীন। তবু সে দুনিয়ার ওপর ক্ষুব্ধ নয়। সে শুধু বলতে চায়, ‘এই জীবন, আমার জীবন, একান্তই অপ্রয়োজনীয়।’ তাই আত্মহত্যাই তার কাছে উত্তম সমাধান। কিন্তু আত্মহত্যার আগে তার কর্মস্থলে, যেখানে সে নথিপত্র সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে, সেখানে একটি পান্ডুলিপি খুঁজে পায়।  

এটি ছিল একটি গল্পের পাণ্ডুলিপি। এতে চার দেবদূত ইতিহাসের ভেতর দিয়ে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শান্তির একটুকরা জায়গা খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু পৃথিবীতে কোথাও শান্তি নেই। তাই তারা এখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে।

তখন কোরিন দেবদূতদের আকাঙ্ক্ষার কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়, এই চার দেবদূতের জন্য সে এক চিরস্থায়ী শান্তির আশ্রয়স্থল খুঁজবে। সে পূর্ব ইউরোপের এক ছোট শহর থেকে নিউইয়র্কে যায়, যাকে সে দুনিয়ার কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে করে। কীভাবে এই পাণ্ডুলিপিকে অনন্তকাল ধরে সংরক্ষণ করা যায়, এরই খুঁজছে সে। সে বুঝতে পারে, এই নশ্বর জগতে বই, সিনেমা, ভৌত জিনিস—সবই নশ্বর। বারে ইন্টারনেটের অস্তিত্ব নিয়ে চলা আলাপচারিতা শুনে তার কাছে মনে হয়, ভার্চ্যুয়াল স্পেস কখনো ধ্বংস হবে না। তাই সে পান্ডুলিপিটি ইন্টারনেটে আপলোড করে এবং এটাই হয় পান্ডুলিপিটির চিরকালীন আবাস। সম্ভবত চার দেবদূতের জন্য এটাই উত্তম সমাধান।

কিন্তু উপন্যাসের শেষে কোরিন আবার উথালপাতাল জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সে ফিরে আসে ইউরোপে একটি ভাস্কর্যের টানে, যেটি মারিও মের্ৎস্‌ নামের এক ইতালীয় শিল্পীর তৈরি ‘ইগলু’। সে চায় তার জীবনের শেষ এক ঘণ্টা কাটাতে এই ইগলুর ভেতর, এই ভাস্কর্যের ভেতর, সুইজারল্যান্ডের এই ছোট্ট শহরের বুকে। সে এই শহরের শাফহাউজেন নামের এক আধুনিক ও অপূর্ব জাদুঘরে পৌঁছায়। এখানে মারিও মের্ৎসের তিন-চারটি শিল্পকর্ম রয়েছে, যার মধ্যে ইগলু একটি। কিন্তু মধ্যরাতে পৌঁছানোর কারণে প্রহরী তাকে ঢুকতে দেয় না। কোরিন তখন এক সংবেদনশীল ব্যক্তির দেখা পায়, যে তাকে বুঝতে পারে। লোকটিকে সে অনুরোধ করে তার শেষ কথাটি একটি ফলকে খোদাই করে দিতে। এ কাজের জন্য সে তাকে কিছু টাকাও দেয়। এরপরই কোরিন আত্মহত্যা করে। ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ উপন্যাসটি শেষ হয় সেই অনুভূতিশীল ব্যক্তির উক্তি দিয়ে, ‘আমরা অবশ্যই অসহায় মানুষটির শেষ ইচ্ছা পূরণ করব, খোদাইটা করব। কারণ, সে এটা ডিজার্ভ করে।’ এই ছিল বইটির শেষ বাক্য, কিন্তু ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ প্রকল্পের শেষ বাক্য নয়।

শেষ কথাটি খোদাই করা হয় সেই ফলকে। উপন্যাস প্রকাশের এক মাস পর এই উপন্যাসের তৃতীয় অধ্যায় শুরু হয় বাস্তব দুনিয়ায়। এখানে আমরা সবাই, উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ের সব চরিত্র শাফহাউজেন জাদুঘরের সামনে দাঁড়াই। সবাই প্রধান চরিত্র কোরিনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলে, যদিও কোরিন ছিল নিছক কল্পিত ব্যক্তি, অথচ এখানের সবাই রক্তমাংসের মানুষ। তারপর সেই ফলকের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। আজও জাদুঘরের মূল প্রবেশপথের ডান পাশে বাস্তবেই সেই ফলক রয়েছে।

এরপর কী ঘটে? মারিও মের্ৎস্‌ উপন্যাসটি জার্মান ভাষায় পড়েন। সেদিনই তিনি ছোট শহর জুরিখের শাফহাউজেন জাদুঘরের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে যান। তাঁরা পরস্পর বন্ধু ছিলেন। তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে চিৎকার করেন, ‘তুমি কোরিনকে আমার ইগলুতে ঢুকতে দিলে না কেন?’ পরিচালক হতবাক। অ্যানিমেলিস্টিক শিল্পী মারিও এবার উচ্চ স্বরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, ‘তুমি কোরিনকে, দ্যোর্জ কোরিনকে আমার ইগলুতে ঢুকতে দিলে না কেন?’ পরিচালক তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, ‘প্রিয় মারিও, আমার বন্ধু, দ্যোর্জ কোরিন কোনো বাস্তব ব্যক্তি নয়, একটি কল্পিত চরিত্র।’ কিন্তু মারিও চিৎকার করেন, ‘আমি জিজ্ঞেস করিনি সে বাস্তব মানুষ কি না। আমি জিজ্ঞেস করেছি কেন তাকে ইগলুতে ঢুকতে দিলে না।’ ‘কিন্তু প্রিয় মারিও, শোনো, এটি একটি উপন্যাস। একজন লেখক আছেন—লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। দ্যোর্জ কোরিনের অস্তিত্ব কেবল তাঁর কল্পনায়, তাঁর উপন্যাসেই আছে।’ ‘আমি জিজ্ঞেস করিনি’—এইবার মারিওর কণ্ঠ আরও তীব্র হয়ে উঠল—‘আমি জিজ্ঞেস করিনি সে বাস্তব নাকি কল্পিত!’ জাদুঘরের পরিচালক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তাঁর স্ত্রী এগিয়ে এসে মারিওকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সফল হলেন না। এক ঘণ্টা, তারও বেশি সময় ধরে একই বিতণ্ডা চলতে থাকে। এই উন্মত্ত বাক্যবিনিময়ের এক পর্যায়ে পরিচালক ও তাঁর বুদ্ধিমতী স্ত্রী একটি সমাধান খুঁজে পেলেন: তাঁরা মারিও মের্ৎস্‌কে প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাঁরা সবাই যাবে দ্যোর্জ কোরিনের জন্মশহরে, যেখান থেকে উপন্যাসটার শুরু। সেখানে কোরিনের স্মরণে মারিও মের্ৎস্‌ একটি নতুন ইগলু বানাবেন। এটাই একমাত্র সমাধান।

দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর আমি বুদাপেস্ট বিমানবন্দরে আমার উপন্যাসের চরিত্রদের জন্য  অপেক্ষা করছিলাম। আমি একটি বড় গাড়ি ভাড়া করলাম এবং আমরা রওনা দিলাম সেই ছোট শহরের দিকে। কারণ, মারিও চেয়েছিলেন একটি নতুন ইগলু বানাতে সেখানে, খোলা প্রান্তরে। কিন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত রুক্ষ প্রকৃতির মানুষ। তিনি আমাকে ছাড়া আর সবার সঙ্গেই কঠোর আচরণ করতেন। কেউই বুঝতে পারত না কেন। সবাই তাঁকে বিভিন্ন জায়গা দেখাত আর জানতে চাইত—সেটা উপযুক্ত জায়গা কি না। তিনি বরাবরই বলতেন, ‘একেবারে বাজে।’ দেড় দিন ধরে আমরা সেই শহরে ঘুরে বেড়ালাম এবং সবকিছুই তাঁর কাছে বাজে লাগছিল। সবাই হতবিহ্বল।

অবশেষে আমরা ফিরে এলাম বুদাপেস্টে। কারও সঙ্গে কারও কথাবার্তা নেই। আমার কাজ ছিল মারিও ও তাঁর স্ত্রী মারিৎসা মের্ৎস্‌কে পৌঁছে দেওয়া। মারিৎসা আরতে পোভেরা শিল্পান্দোলনের একজন শিল্পী। একজন আকর্ষণীয় নারী। মারিও ছিলেন ছয় ফুট লম্বা, রুক্ষ ও বিশাল এবং তাঁর ছিল ভাস্কর্য-সদৃশ আঙুল। আর মারিৎসা ছিলেন পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা, অত্যন্ত কোমল। তার ছিল ডাগর চোখ, দীর্ঘল চুলের ঢেউ। তিনি ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব উইচেসের সহসভানেত্রী ছিলেন।

বিমানবন্দরে কেবল আমরা তিনজন—মারিও, মারিৎসা আর আমি। চারপাশ জনশূন্য হয়ে গেলে মারিও কেমন বদলে গেলেন—শান্ত, সহচরপ্রিয়, কোমল। তিনি কোরিনের জন্য কী ধরনের ইগলু বানাবেন, তার স্কেচ আঁকতে শুরু করলেন সেখানেই। যখন বিমান ওড়ার জন্য প্রস্তুত, ঠিক তখনই মারিও বলে ওঠেন, ‘না, পরের ফ্লাইটে।’ মারিৎসা টিকিট বদলাতে বাধ্য হলেন। কারণ, মারিও তাঁর আঁকায় বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। আর টেবিলজুড়ে তাঁর আঁকা নকশাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। অবশেষে তাঁরা তুরিনে ফিরে গেলেন।

চার মাস পর, গভীর রাতে, ভোর চারটায় আমার ফোন বেজে উঠল। ‘আমি ক্রিসেল’—জাদুঘর পরিচালকের স্ত্রী—‘ক্ষমা করবেন, আমি জানি আপনার ঘুম ভেঙে দিলাম, কিন্তু এটা খুব জরুরি।’ ‘কী হয়েছে?’ ‘আমি জানি আপনি মারিও মের্ৎস্‌কে খুব ভালোবাসতেন। আজ রাত তিনটায় তিনি মারা গেছেন।’

এটাই ছিল ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়। এর অস্তিত্ব ছিল একদক বাস্তবে।

আর ২০১১ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব হাঙ্গেরির একটি ছোট্ট শহরে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বড় কবিতা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এর নাম ছিল ‘দ্যোর্জ কোরিনের কবিতা প্রতিযোগিতা’। অবশ্য সেই স্কুলগুলোর কেউই জানত না দ্যোর্জ কোরিনটা আসলে কে। সবাই বিশ্বাস করেছিল, তিনি এ শহরেরই একজন—একজন বাস্তব কবি।

এই হলো ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ বইয়ের গল্প।

চলবে...

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা