আহসান হাবীব
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:০৬ পিএম
চিত্রকর্ম: প্রদ্যোত কুমার দাস
আব্দুল কুদ্দুসের মনে শান্তি নাই। না ঘরে, না অফিসে। অফিসে বসের সঙ্গে খ্যাঁচাখেঁচি লেগেই আছে। আর ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে ডাবল খ্যাঁচাখেঁচি। নাহ! এভাবে বাস করা সম্ভব না। তাই একদিন কাউকে কিছু না বলে এক বস্ত্রে আব্দুল কুদ্দুস গৃহত্যাগ করলেন। সোজা হিমালয়ের দিকেই রওনা হলেন। যে করেই হোক, প্রকৃত শান্তির সন্ধান তিনি বের করে ছাড়বেন। হিমালয় পর্যন্ত যেতে হলো না। তিনি ভাবলেন আপাতত প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের কাছে কোনো পাহাড়ের গুহায় অবস্থান করে শান্তির সন্ধান করা যাক।
কিন্তু পাহাড়ের দুর্গম পথে একটা কাণ্ড হলো। এক গাছের গোড়ায় একটা মরচে পরা চেরাগ পেলেন। কি মনে করে পকেটের রুমাল দিয়ে ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করতে গিয়ে চেরাগে ঘষা লেগে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে ভুর ভুর করে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। ওমা! একটু বাদেই আকাশজুড়ে বিশাল এক দৈত্য বের হয়ে এলো!
Ñ হুকুম করুন, মালিক কী চাই আপনার?
প্রথমটায় ভয় পেলেও, সামলে উঠলেন আব্দুল কুদ্দুস। বললেন
Ñ ও আপনিই তাহলে সেই চেরাগের দৈত্য?
Ñ জি মালিক, কী চাই আপনার।
Ñ তা তুমি কয়টা বর দিবে আমাকে?
Ñ মালিক, একটা।
Ñ কী বলছ, আমরাতো গল্প-উপন্যাসে পড়েছি তিনটা করে বর দাও তোমরা।
অট্টহাস্য করে উঠল বিশালদেহী দৈত্য।
Ñ না মালিক, সেই দিন আর নেই, আর এটা গল্প-উপন্যাসও না। এখন একটার বেশি দেওয়ার নিয়ম নেই। বলুন, কী চাই আপনার।
আব্দুল কুদ্দুস ভাবলেন একটাই সই। এত তাড়াতাড়ি শান্তির সমস্যা সলভ হয়ে যাবে কে ভেবেছিল। তিনি কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন
Ñ ইয়ে, আমি শান্তি চাই। শান্তির সন্ধানে আমি বের হয়েছিলাম। এখন আমার জীবনে শান্তি এনে দাও।
Ñ কোনো ব্যাপার না মালিক, জো হুকুম। আপনার জীবনে শান্তি আসবে গ্রান্টেড। তবে...
Ñ এর মধ্যে আবার তবে কেন?
Ñ তবে ওয়ারেন্টি মাত্র ছয় মাসের।
Ñ কী বলছ? শান্তির আবার ওয়ারেন্টি কী?
Ñ জ্বি মালিক, আগেই বলেছি দিনকাল বদলে গেছে। এখন এআই-এর যুগ চলছে। আমাদের দৈত্যকূলেও এর চর্চা শুরু হয়ে গেছে। কাজেই আপনি ছয় মাসের ওয়ারেন্টিতে রাজি থাকলে বলেন।
Ñ ধ্যাত তেরিকা।
বলেই চেরাগ ছোড়ে ফেলে দিলেন আব্দুল কুদ্দুস। হাঁটা দিলেন আরও ওপরের দিকে। এর চেয়ে বরং নিজেই শান্তির সন্ধান করবেন গুহায় বসে সাধু-সন্নাসীরা যেমনটা করে আরকি।
শেষ পর্যন্ত একটা গুহা খুঁজে পেলেন আব্দুল কুদ্দুস। ছোটোখাটো ছিমছাম গুহা। হালকা কিছু খেয়ে (সঙ্গে করে একটা পাউরুটি কলা আর পানি এনেছিলেন) ধ্যানে বসে গেলেন। মিনিট পাঁচেক কি দশেকও হয়নি বোধহয়। হঠাৎ কানে আসল একটা হুঙ্কার।
Ñ আরে শালা কুদ্দুইচ্চা না? তুই এখানে!
আঁতকে ওঠলেন আব্দুল কুদ্দুস। পরিচিত গলা। পঁচিশ বছর আগের তাদের পাড়ার মালেক তার সামনে দাঁড়ান, হাতে লোহার চিমটা। দাড়ি মোচে চেনা দায়। তারপরও চেনা যাচ্ছে... পুরোপুরি সাধু সে। মালেক হুঙ্কার দিয়ে উঠল
Ñ আমার প্রেমিকাকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করলি। আমার সারা জীবনের শান্তি নষ্ট করলি। শান্তির খোঁজে পাহাড়ে গুহাবাসী হয়েছি ... সেখানেও এসে হাজির হয়েছিস? তবে রে হারামজাদা... আজ তুই নির্ঘাৎ শ্যাষ!!
আব্দুল কুদ্দুস দেরি করলেন না। এক লাফে গুহা থেকে ছিটকে বের হয়ে ছুটতে শুরু করলেন। কতক্ষণ ছুটেছেন খেয়াল নেই, তবে হঠাৎ দেখেন সেই চেরাগ, যেখানে ছুড়ে ফেলেছিলেন তিনি সেখানেই এসে দাঁড়িয়ে। কী আর করা সাত-পাঁচ ভেবে ফের চেরাগে ঘষা দিলেন। দৈত্য দ্বিতীয় দফায় এসে হাজির হলো।
Ñ হুকুম করুন মালিক, কী চাই আপনার?
Ñ শোন, ওই ছয় মাসের ওয়ারেন্টির শান্তিটাই দাও আপাতত। আচ্ছা এই ওয়ারেন্টি শেষ হলে কি পরে রিনিউ করে ওয়ারেন্টি বাড়ানোর কোনো ব্যবস্থা আছে?
Ñ না মালিক, তবে...
Ñ আবার তবে কেন?
Ñ ইয়ে... মালিক এখন আর ছয় মাসের ওয়ারেন্টি নেই... তিন মাসের ওয়ারেন্টি।
Ñ হোয়াট? ফাজলামো পেয়েছ?
Ñ মাফ করবেন মালিক... ল্যাঙ্গুয়েজ প্লিজ... ওই যে আগে বলে ছিলাম এখন এআই-এর যুগ। আপনাদের যেমন সবকিছু বদলে যাচ্ছে আমাদেরও... এই কিছুক্ষণ আগে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে এক্সক্লুসিভ মিটিংয়ে এটা সাব্যস্ত হয়েছে তিন মাসের বেশি ওয়ারেন্টি...
কি আর করা। শান্তির তিন মাসের ওয়ারেন্টি নিয়ে বাসায় ফিরে এলেন আব্দুল কুদ্দুস সাহেব। বাসায় ঢোকা মাত্র হঠাৎ হুঙ্কার,
Ñ বলি ছিলে কোন চুলায়? অ্যা? ঘরে যে চাল, ডাল কিছু নেই সে খেয়াল আছে?’
আব্দুল কুদ্দুস আশ্চর্য হলেন তিন মাসের ওয়ারেন্টি কি কাজ করছে না? এ সময় তার কনিষ্ঠ পুত্র তার ফোন নিয়ে হাজির। ফোনটা ফেলে গিয়েছিলেন ইচ্ছে করেই।
Ñ বাবা তোমার ফোনে একটা মেসেজ এসেছে।
Ñ কিসের মেসেজ?
Ñ তোমার কিসের যেন তিন মাসের ওয়ারেন্টি... এই মাত্র বাতিল করা হয়েছে! তোমার ফোনে নাকি ‘মনোস্টার অ্যাপস’টা ইনস্টল করা নেই তাই।