বই আলোচনা
রাজীব কুমার সাহা
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:০১ পিএম
কবিতা দৃশ্যত মানুষের অধিগম্য শব্দসমষ্টির বিন্যাস হলেও কার্যত বিস্ময় ও গভীর সৌন্দর্যের উৎসমূল। কবিতা শব্দাবলির সমষ্টি হলেও অনুভূতিতে সৃষ্টি করে বিশেষ এক রস, সঞ্চারিত করে অনন্য আবেগ; যা মানুষের উপলব্ধিতে জাগিয়ে তুলে সুখকর তৃপ্তিবোধ, বিস্ময় এবং অনির্বচনীয় আনন্দ-উচ্ছলতা। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনের যে ছন্দমিল, তার সরগমই ফুটে ওঠে কবির জারিত শব্দে। সেই অর্থে বলা যেতে পারে কবিমাত্রই একজন প্রকৃতি সাধক। কখনও তিনি আমাদের হৃদয়ের অন্তর্নিহিত একাকিত্বকে কুয়াশামাখা মাঠের নির্জনতা দিয়ে এঁকে দিতে পারেন আবার কখনও আমাদের আদিম অনুভূতিগুলোকে মিলিয়ে দিতে পারেন নিসর্গের একান্ত সুরে। ঠিক এমনই একটি অনুভূতি ধরা দেয় কবি মতিন রায়হানের ‘নির্বাচিত কবিতা’র নিবিড় পাঠে।
একজন কবিকে নিবিড়ভাবে অনুধাবনের অন্যতম কৌশল হতে পারে তার নির্বাচিত কবিতা পাঠ। নব্বইয়ের দশকের কবি মতিন রায়হানের ‘নির্বাচিত কবিতা’ তার তিন দশকের কাব্যজীবনের সারাৎসার। তার সাতটি কাব্যগ্রন্থ ও কিছু অগ্রন্থিত কবিতার সংকলন হলো এই ‘নির্বাচিত কবিতা’। এই গ্রন্থে সংকলিত ১৫০টি কবিতাই কবি কর্তৃক নির্বাচিত। যেখানে সাধারণভাবে কবির ব্যক্তিগত পছন্দের কবিতাবলিই স্থান পেয়েছে। তার কবিতায় প্রেম-প্রকৃতি ও জীবন-জিজ্ঞাসার বিচিত্র অনুষঙ্গ ধ্রুব সত্যের মতো উদ্ভাসিত। চলুন এর কিছুটা পাঠে পাঠে উন্মোচন করি।
মতিন রায়হানের কবিতায় আমরা এক দূর আবহ প্রত্যক্ষ করি; দেখি এক নিবিড় প্রসন্নতা সারাকাব্যে ছড়িয়ে দিয়েছে দুর্মর আকর্ষণ, সেখানে অলৌকিক মনোভুবনের ইঙ্গিত আমাদের নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে। তার ‘বৃষ্টিচিত্র’ কাব্যে পাই, ‘খরার ভেতর ডুব দিয়ে পৌঁছে যাই/স্বপ্নময় বৃষ্টির ভেতর.../চৈত্রের দুপুর, দ্রুতগামী রাত্রিট্রেন একটানে নিয়ে যায়/কোনো এক দূরের স্টেশনে, সন্ধ্যাগামী বিকেলের/শেষ আলোরশ্মি বিদায় বিদায় প্রিয় কোনো স্মৃতিভোর।’ উল্লিখিত কবিতার লাইনগুলো যেন আমাদের সত্যিই অন্য এক কাব্যভুবনে নিয়ে যায়। মানুষের ক্লান্তি-নিদ্রা-অবসাদ, জীবন-মৃত্যুর দোলাচল, দূরত্ব-নৈকট্যের জোয়ারভাটা, মানবসভ্যতার নিয়তিলাঞ্ছিত ইতিহাস, মানুষের নিরবলম্ব অস্তিত্ব, নিসর্গের করুণ-বিষণতা রূপ কবির চেতনাকে দান করেছে এক প্রসন্ন গাম্ভীর্য। তার ‘বাড়িফেরা মানুষের গল্প’ কবিতায় উল্লিখিত অনুষঙ্গগুলো নিবিড়ভাবে ধরা দেয়। কবির ভাষায়, ‘আমি রোজ মানুষের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরি/পায়ে পায়ে মানুষের পরিধি বাড়াই।/জীবন ও মৃত্যুর গোধূলিগ্রাম থেকে/আমি রোজ শিখে নিই মানুষের বর্ণমালা।’ অথবা ‘সমষ্টি মানুষের গান’ কবিতায়, ‘কাকের ঐক্যের কথা তোমাকে বলি না আর; খাদ্যের/মিছিলে যদি পিপীলিকা দেখে থাকো, তাহলে/বাড়াবো কেন কথার মিছিল! অভাজন শ্রমে-ঘামে/শিল্পের কথাই বলি; শ্রমঘন শিল্পে আছে আশার বসতি।’ অথবা ‘এই সঙ্গনিরোধকালে’ কবিতায়, ‘পৃথিবীর কঠিন অসুখ আজ। এই সঙ্গনিরোধকালে/কী করে তুমুল চুম্বনে শুশ্রূষার গল্প বুনি?/নলখাগড়ার বনে ঢুকে পড়েছে বিষাক্ত ফণী/চিঁচিঁ রবে ডাকছে পক্ষিশাবক/কে বাঁচাবে? তুমি না আমি?’ উল্লিখিত পঙ্ক্তিগুলো যেন কবির কাব্যভাবনায় জারিত নিবিড় ভাষ্য।
কবি বর্তমানকে অতীতের সঙ্গে মিশিয়ে, নিকটের সঙ্গে সুদূরকে সংঘবদ্ধ করে, সচেতনতার সঙ্গে অবচেতনার সংশ্লেষ ঘটিয়ে, সর্বোপরি অভিজ্ঞতার সঙ্গে কল্পনাকে জারিত করে সৃষ্টি করেছেন সংবেদনময় এক কাব্যজগৎ। ‘জলস্মৃতি ও প্রাচীন সিন্দুক’ কবিতায় এমন ভাবনারই দেখা মেলে। কবির ভাষায়, ‘ডুবে গেলে জাহাজ মাস্তুলে লেগে থাকে জলস্মৃতি!/তুমিও জাহাজ এক অতীতের স্মৃতিজলে! নোঙরের/গল্পগুলো তোলা আছে প্রাচীন সিন্দুকে।’ অথবা ‘সমতটের গান’ কবিতায়, ‘স্মৃতি রোমন্থনে যদি মনের নদীতে জাগে চর, তবে/কথায় কথায় ঢেউ ভাঙে দূরের সমুদ্র; স্মৃতি ও/বিস্মৃতি পাখা মেলে ধূসর আকাশে।’
তার কবিতায় শব্দচয়নের পারম্পর্য, উপমার ঔজ্জ্বল্য আর সংগীতময়তা অভিনব ও তুলনারহিত। তার প্রেমের কবিতা স্পষ্টতই সঘন আবেগের তুলিতে কেবল সুন্দরের ছবি এঁকেছেÑ যার মধ্য দিয়ে তার অভীষ্ট লক্ষ্য সার্থক হয়েছে। সৌন্দর্যই প্রেমের অন্যতম প্রধান উদ্দীপক, শিল্পের প্রধান আরাধ্য। তিনি প্রেমের কবিতায় ইতিহাস আর নিসর্গের নানা স্তর ছুঁয়ে এক মায়াবীলোক তৈরি করেছেন যা সর্বজনবোধ্য নতুন এক কাব্যভাষা। তার ‘ও প্রেম মায়াগন্ধা’ কবিতায় পাই, ‘তুমি হাসলেই আমি ঢেউ ঢেউ নদী! কখনোবা/চড়ইয়ের প্রেম! তুমি অনন্যা, অন্যের নও! লজ্জাময়ী/পাতার আড়ালে বাজো রোজ নূপুর নিক্বণে। ও প্রেম,/মায়াগন্ধা সজল মেঘের ছায়া, শেকড়ে তুমুল ক্ষুধা/ পৌঁছে দাও পাতার সবুজে!’ উল্লিখিত পঙ্ক্তিরাশি যেন আমাদের মননকে নিসর্গে ভর করে নতুন এক কাব্যভাষায় মোহিত করে রেখেছে।
জীবন ও জগৎসংসারের নানাবিধ ঘটনাপুঞ্জ বরাবরই কবির মননকে উদ্বেলিত করে। যেসব ঘটনা সময়ের স্মারক হয়ে মানবমনে বিশেষ রেখাপাত করে, সেইসব ঘটনা ঐতিহাসিকরা ভবিষ্যতের জন্য লিপিবদ্ধ করেন, সমাজকর্মীরা কালানুক্রমে তা বিশ্লেষণ করেন, শিল্পীরা রঙতুলিতে অঙ্কিত করেন আর কবিরা উপমা-রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্পে তা ব্যক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, ঐতিহ্যপ্রীতি, নিসর্গ ও মানব-মানবীর প্রেম-বিরহ, সমসাময়িক ঘটনাবলি কবি মতিন রায়হানের নতুন এক কাব্যভাষা, যা তার ‘নির্বাচিত কবিতা’র পরতে পরতে উপমা-রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্পের সমুজ্জ্বল উপস্থিতিতে বিরাজমান।