রুমা মোদক
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৫৯ পিএম
চিত্রকর্ম : অরণী হোসেন অথৈ
‘পৌঁছানো যাবে না ভেবে বাড়ি থেকে বেরোনো হয় না
পাথরের ভাঁজ ভেঙে উঠে আসে ঘুম
পাখার বাতাস, ঝিল্লিরব
জানালার পাশেই ডাকে একাকী সমুদ্র, তার শান্ত দুটি ডানা
পৌঁছানো যাবে না ভেবে বাড়ি থেকে বেরোনো হয় না।’
জীবনের এই বিরতি চিহ্নে বসে ভাবি, বিরতির সময় কই? সেই সময় কতটা? বিরতিই-বা কই? কেবল তো দৌড় আর দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে হয়তো বয়সের কারণে ক্ষণিক থামি, ফেলে আসা পেছনের দিকে তাকাই। পথটা দেখি। কিছুটা চেনা কিছুটা অচেনা। কতটা নিজের ইচ্ছায় পাড়ি দিয়েছি, কতটা দিয়েছি এই পরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্রের ইচ্ছায়। এ বড় কঠিন জাদুকর। পথ দেখায়, পথ চেনায়, পথ ডাকে, আমরা পাড়ি দেই। পাড়ি দিতে বাধ্য হই। জীবন তো কেটেই যায়। বহমান নদী যেমন চলে সমুদ্রের দিকে, অবশ্যম্ভাবী গন্তব্য। জন্মের পর চড়াই-উতরাই জীবন কাটিয়ে মৃত্যুর মতো চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকেই আবশ্যিক যাত্রা আমাদের। নিজের চাওয়া, না-চাওয়ার ঊর্ধ্বে জাগতিক সত্য। আমরা এই সত্যের হাতের পুতুল কেবল নাচের ইতিকথা লিখে যাই।
লিখতে লিখতে কলম থামাই কেউ খানিক, কেউ হয়তো থামাই না। যে থামাই সেই ভাবি দ্বিধা আর সংশয় কত দিন কতভাবে হত্যা করেছে আমাদের জীবনাকাঙ্ক্ষা। জীবন শেষ করে আমাদের জানা হয়, কাটিয়েছি যে জীবন সে আমার নয় অন্য কারও ইচ্ছায়, অন্য অনেকের ইচ্ছায়।
সাদাকালো বিটিভির যুগে পাড়ার যে বাসাটায় এক দুপুরে হৈহৈ রৈ রৈ করে ছত্রিশ ইঞ্চি টেলিভিশন ঢুকে ছিল তখন বায়োনিক ওম্যান, সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান আর স্যাটারডে নাইট সিনেমার যুগ। কৈশোর কাটাতে কাটাতে সেই বাড়িতে মন পড়ে থাকত কী জানি কী নেশায়। বায়োনিক ওম্যানের স্লো মোশান দৌড়ের জাদু আর সিক্স মিলয়ন ডলার ম্যানের পৌরুষ ডিঙিয়ে মন ডুবে গিয়েছিল এক সমবয়সি বালকের দৃষ্টির গভীর খাদে। কী জানি কেন! অনেক জনের মধ্যে একজন। বৌচি খেলার মাঠে কিছুটা পক্ষপাতিত্ব ছিল হয়তো, হয়তো ছিল না। বিকালের ক্লান্ত রোদের কোনো ছায়াতলে আমি যে ডুবে গেলাম, কখন কীভাবে কেন টেরই পাইনি। তার ছায়ায় বুকে কাঁপন লাগে, তাকে এক নজর দেখার জন্য জানালার গ্রিলের আড়ালে পড়ন্ত সন্ধ্যাদের অপেক্ষা। অথচ তাকে বলা হলো না কখনও। কী দ্বিধা কী সংশয়। প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা, অপমানের গ্লানি সহ্য করা কতটা কঠিন হতো কে জানে! জানাই তো হলো না তার অন্দরের খবর। আজ ভাবি, কী হতো বললে? প্রথম প্রেম প্রথম শিহরন হয়তো পূর্ণতা পেত সুখ কিংবা অসুখের স্মৃতিতে। আর কি ফিরে আসবে সেসময় সে শিহরন? সেই মানুষটি সামনে এসে দাঁড়ালেও?
আমাদের আকাঙ্ক্ষা-অপেক্ষাগুলো সময়ের সন্তান। সময়ে জন্ম নেয় সময়েই মরে যায়। রেখে যায় কেবল আফসোসের স্মৃতিচিহ্ন। দ্বিধা আর সংকোচ যদি সময়ের উপলব্ধিকে হত্যা করে, তা আর ফেরেনা কোনো কালে।
জীবনের কত সাধ যে অপূর্ণ থেকে গেল দ্বিধা সংকোচের টানাপড়েনে। মাঝেমধ্যে এ-ও ভাবি এই দ্বিধা আর সংকোচ প্রাচ্য দেশীয় নারীদের শৃঙ্খল কেবল। কেন এই নির্মম শৃঙ্খলের ঘেরাটোপে বন্দি আমরা? সামন্ত মূল্যবোধের বন্ধন ছিঁড়ে নিজেকে স্বেচ্ছা যাপন কেন অসম্ভব হয়ে ওঠে আমাদের? পুঁজির বিকাশ ঘটেছে বটে, ঘটেনি মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা-সংস্কৃতিহীন, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিহীন মানব সন্তান পুঁজের মতো ক্লেদাক্ত পুঁজি অর্জন করেছে, সঞ্চয় করেছে। কিন্তু দিতে শিখেনি ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যবোধ আর ব্যক্তিগত জীবনের মূল্য।
আমরা তাই যতটা আমাদের, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিবারের, তার চেয়েও অনেক বেশি সমাজ আর সবটুকু রাষ্ট্রের। এই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ডিঙিয়ে আমাদের ব্যক্তি মানুষ হয়ে ওঠে না। ওঠেনি কখনও। যদিওবা ওঠে কিছু তা হয় স্বার্থপরতার নামান্তর। লোভকেন্দ্রিক দুরাচার আর দুর্নীতি চর্চার উর্বর ভূমি। এই সমাজে এই দেশে মানুষ কখনোই নিজের ইচ্ছায় আনন্দময় জীবনযাপন করে না। কিছু করে দ্বিধা সংশয়ে,কিছু করে অনাচারে।
আমাদের দ্বিধা সংশয়ের প্রেক্ষাপট অনেক কিছু, যেমন অনুষঙ্গও অনেক কয়টি। ধর্ম, দেশীয় সংস্কৃতি, প্রচলিত সংস্কার এসব যদি প্রেক্ষাপট হয়, অনুশোচনা, মাশুল, ভোগান্তি ইত্যাদির আশঙ্কা এর অনুষঙ্গ।
প্রচলিত আর বহুল চর্চিত ধর্মীয় বিশ্বাস আজন্ম লালিত জীবনাচরণে যুক্ত করে নানা সংস্কার আর ভীতি। বিধিনিষেধের নিয়মনীতি শৈশব-কৈশোর থেকেই জীবনে যুক্ত করে নিয়ন্ত্রণ। আচরণে কর্মে। কখনও সেই নিয়ন্ত্রণ নিয়ন্ত্রিত করে আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাসহীনতা মানুষকে বিচ্যুত করে আনন্দময় জীবন থেকে। আত্মবিশ্বাসহীন জীবনে ভর করে যাবতীয় দ্বিধা আর সংশয়। সেই দ্বিধা সংশয় কখনও ইতিবাচক হয় বটে, তবে নিজেকে বঞ্চিত করার কিংবা বঞ্চিত হওয়ার বেদনার ভারই জীবনকে ভারাক্রান্ত করে অধিক।
দ্বিধা সংশয়ে আড়ষ্ট জীবনে নিজেকে প্রতিদিন বঞ্চিত করে চলেছি কত আকাঙ্ক্ষা থেকে। খুব ইচ্ছা এক দিন একলা শুয়ে থাকব সেন্টমার্টিনের বালুচরে, লাল লাল কাঁককড়া ফৌজের বেষ্টনীতে থৈহীন সমুদ্রের জল ভিজিয়ে দেবে দুটো পা বেয়ে পিঠ আর চুল। গভীর রাতে দেখব, গর্ভবতী কচ্ছপরা ধীর পায়ে আসছে হেঁটে গভীর সমুদ্রের রূপকথা নিয়ে। সৈকতের বালুচরে রেখে যাবে ভবিষ্যতের ডিম। কত স্বপ্ন দেখি এক দিন খাসিয়া পুঞ্জিতে আদিবাসী পর্ণ কুটিরে কাটিয়ে আসব আদিম কয়েকটি দিন। সভ্যতার ছোঁয়াহীন যাপন। প্রিয় অনামিকার মতো নিকোটিনে দুটো টান দিয়ে দেখব কি স্বাদে মানুষ তুচ্ছ করে সব সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ। কিচ্ছু করা হয়নি বিগত জীবনে।
প্রযুক্তি প্রতিদিন কত ভঙ্গিমায় দেখাচ্ছে বিশ্বের আনাচ কানাচ, বর্ণাঢ্য, বৈচিত্র্যময়। দেশ-সমাজ আর কাল বিবেচনায় আপেক্ষিক মূল্যবোধের দুনিয়া। আমরা দেখি। নিতে পারা না পারার বৈপরীত্য অস্বীকার করে দেখি। দ্বার বন্ধ করে দিয়ে তবু ভ্রমটাকে রুখতে পারি না তো।
দরজা খোলা রেখে আমরা কখনও হিপোক্রেসিও করি। আমরা তবু দেশীয় চালচলনের দোহাই দিয়ে পড়ে থাকি অনুপযুক্ত সংস্কার আঁকড়ে। প্রযুক্তি যখন মানুষকে বেঁধে দিচ্ছে বন্ধনহীন গ্রন্থিতে, বিনিময় প্রথায় কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, নিজের প্রয়োজন পূরণে তখন জাতীয়তাবাদের শুদ্ধতার টার্মগুলোই স্বয়ংক্রিয় অকার্যকর হয়ে পড়ছে সময়ের প্রয়োজনে। চাইলেও কেউ কি আঁকড়ে থাকতে পারে ‘নীল রক্ত’ জাতীয় শুদ্ধতা? হোক তা ধর্মের ভাষার সংস্কৃতির কিংবা গাত্রবর্ণের! কত প্রয়োজনে মানুষ মিশে যায় মানুষের সঙ্গে। অথচ সো কল্ড শুদ্ধতা রক্ষার দায় আমাদের চিরসঙ্গী। কিন্তু আমরা আদৌ কি জানি ‘শুদ্ধতা’ আদতে কী? দেশ-কাল-সময় বিবেচনায় কি ধ্রুব থাকে এই শুদ্ধতার সংজ্ঞা? তবু শুদ্ধতার দিকে যাত্রার জন্য কী অপরিমেয় কষ্ট আমাদের!
দ্বিধা-সংশয় আমাদের পা টেনে ধরে, চৌকাঠ ডিঙাতে গেলে মায়ের রক্তচক্ষু, বাবার শাসন, সমাজের ফিসফিস, নিজের মেরুদণ্ডের ঋজুতা। এর নাম কখনও হয়তো পিছুটান। হয়তো কখনও লক্ষ্যে পৌঁছানোর অনিশ্চয়তা। যে অনিশ্চয়তা আবার তৈরি করে রাখে সিস্টেম। রাষ্ট্র কাঠামো। আমার ঠিক উল্টোপাশে পাশ্চাত্যের কোনো নারী কি পেরিয়েছে এত দ্বিধার সমুদ্র, সংশয়ের হিমালয়? সে কি নিজেকে বঞ্চিত করেছে দ্বিধা সংশয়ের যুপকাষ্ঠে? বিসর্জন দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিংবা অগুরুত্বপূর্ণ কোনো আকাঙ্ক্ষা?
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বৃহৎ পরাজয়ের নাম কি সব সময় ব্যর্থতা? না প্রায়শই সেই পরাজয়ের নাম শুরু না করা। কতশত মানুষের জীবন বহন করে তারই অজস্র নীরব প্রমাণ। কত প্রিয় কাজÑ হুট ফেলে একা রিকশায় ঘোরা, রাতের শহরে একা একা হেঁটে চলা, আমার উপন্যাসটার ফাইনাল টাচ দেওয়া অথবা রাষ্ট্রের নিপীড়ন দেখে সহজ কিছু ক্ষোভ উচ্চারণ করাÑ সবই পড়ে থাকে আকাঙ্ক্ষা হয়ে অসম্পূর্ণতার খাতায়।
আমি যা কিছু করতে চেয়েছি, দ্বিধা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। অদৃশ্য অথচ অটল এক দেয়ালের মতো। মনে হয়েছেÑ আমি হয়তো পারব না, আমি যথেষ্ট নই। লোকে যদি হাসে। যদি ভুল হয়। ভয়ের আড়ালেই চাপা পড়ে গেছে আমার তীব্র প্রেম, লেখক হয়ে ওঠার বাসনা, সত্য বলে দেওয়ার আকুলতা, প্রবল ক্ষোভ; যা কিছু আমার নিজস্ব, যা কিছু আমাকে আমি করত কিংবা যা কিছু করলে আমি ‘আমি’ হতাম। দ্বিধা সংশয়ে নিয়ন্ত্রিত আজ যতটুকু আমি, মাঝেমধ্যে মনে হয় এ আমি নই। অন্য কেউ। দ্বিধা সংশয় আমাকে দিয়েছে আমার নয়, অন্য এক জীবন, যে জীবন যাচিত ছিল না আমার। ‘যাহা আমি চাই, তাহাই করতে পারি না; যাহা আমি করি, তাহাই চাই না।’ চিরন্তন আত্মসংঘাতের জীবন এই আমি।
দ্বিধা মানুষের মনের এক স্বনির্মিত কারাগার। ভেতরে ভেতরে প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষকে থামিয়ে দেয়। অথচ এই কারাগারের দরজা ভাঙতে খুব কুরুক্ষেত্রের দরকার নেইÑ এক মুহূর্ত সাহসই যথেষ্ট।
এই যে যদি একা হাঁটতে থাকি রেমা কালেঙ্গা জঙ্গলের পথ ধরে, তবে ক্ষতি কী? নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়...। মানুষ যা করে সবটুকুই কী অ্যাবসোলিউট? নন্দিত কর্মযজ্ঞ? নিন্দা তো মানুষের অভিধানেরই শব্দ। হবেই জীবন, নিন্দিত এর মিশ্রণে ভালোমন্দ মিলায়ে সকলই। লেখাটা যদি অপূর্ণ হয়, তবু তা হবে আমার কলমের গর্ভনিঃসৃত। আর যদি কাউকে বলিÑ ‘তুমি আমার খুব প্রিয়’, আর সে যদি অবাক হয়, প্রত্যাখ্যান করে, তার আগেই আমার ভেতরের সংকোচ কেন যে পথ আগলে দাঁড়াবে!
‘আমাদের জীবনে অদ্ভুত এক দ্বিধা,
যেন ফুল ফোটার আগে ঝরে গেল কুসুম।’
এক দিন আমি এই দ্বিধার শৃঙ্খল ভীষণ ভাঙতে চাই। এই সমাজ কী ভাঙল, ভাবব না। আটপৌরে জীবনের সন্তান-সন্ততি, জীবনসঙ্গীর আড়চোখ উপেক্ষা করব এক দিন আমি ‘আমি’ হব। এক জীবন কাটিয়ে দিলাম মা-বাবার মধ্যবিত্ত শাসনের রিমান্ডকালে। কতকিছুই যে হারিয়েছি সে জীবনে, বন্ধুদের সঙ্গে হল্লা, গোপন ডেটিং, বাড়ি পালানো অ্যাডভেঞ্চার...। পোষা পাখির মতো খাঁচায় বন্দি কাটিয়েছি যে সময়, একটা মাত্র জীবনে সেসময় আর ফিরবে না কোনো দিন।
প্রতিদিন ভাবি, জীবনের সবচেয়ে বড় সাহসের যে কাজটা শুরু করা। আমি যে দ্বিধা সংশয়ের সব জড়তা ছিঁড়ে কেবল শুরু করতে পারি। বাকি পড়ে থাকা অনাগত দিনগুলোতে আমার হৃদয় মুক্তির সুরে গেয়ে ওঠতে পারে, আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ওই আকাশে...।