মোস্তাক আহমাদ দীন
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৪৯ পিএম
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৪৯ পিএম
কয়েক বছর আগে শোনা বক্ষ্যমান এই বাক্যালাপটি কোনো এক রহস্যগল্পের কথোপকথনের মতোই মনে হবে হয়তো বা বলা যায়, এ এক গোধূলিমদির সময়ের গল্পই, যা সাধারণত স্বপ্নেই শোনা যায়। গল্পের সেই চরিত্র এক অগ্রজ কবি আমাকে বললেন, ‘অনেক তো হলো, এবার চলো, নাও ভাসাই।’ বললাম, ‘কোথায় যাব, গন্তব্য কোথায়?’ বললেন, ‘মধ্যনগর যাব, আর কোথায়? নাও তো সেই কবে থেকেই ঘাটে বাঁধা, দূর থেকে মনে হবে, মাঝি বুঝি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে, তবে এখনও তার নাওয়ে আরও আঠারো জন পেসেঞ্জার তোলা বাকি।’ আমার মনে পড়ে, সেই কবির নিম্নোক্ত কবিতাটির কথা :
‘মধ্যনগর’ ‘মধ্যনগর’ ডাক তোলে সুনামগঞ্জের ঘাটে এসে গয়নার নাও
মন বলে ভেসে যাই
রাত জেগে ভোরে উঠি হাওরের মাঝখানে
দ্বন্দ্বে পড়ে যাই আমি, এখনই কি ঘাটে পৌঁছার সময় হয়ে গেছে? আর সময় হলেও পার হওয়াও কি এত সহজ কথা? প্রাচীন লোককবি যেখানে বলেছেন, ‘ঠেকছি আমি দধির ভাণ্ড লইয়া রে সুজন নাইয়া’, আর যিনি ছিলেন আমৃত্যু মুসাফির, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে ঘর বেঁধেছেন, সেই আদি ফকির সৈয়দ শাহনূরও কি বলেননি, ‘পার হইমু পার হইমু করি দিন তো যায় গইয়া’। ভাটিপুত্র বলে লগি বইঠা হাতে নিয়ে সেই ছোটবেলা থেকে আমার নাও ভাসানোর অভ্যাস যদিও, একটি ঘটনার পর থেকে উত্তাল জলরাশি দেখলেই আমার বড় ভয় হয়, হাওরের আফালের ডর মন থেকে আর যায় নাÑ তার কারণ, আমার জীবনের ভয়ানক একটি দিন...।
সেদিনের দুই প্রহর যেতে না যেতে গ্রামের ভেতরের ছোট ছোট খাল পেরিয়ে আমাদের গয়না নৌকা যেই কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে পড়ল, শুরু হলো ভয়ংকর তুফান, সঙ্গে ঘোর বর্ষণ, অবিরাম বজ্রপাত, ফুলে-ফেঁপে ওঠা ঢেউয়ের কবল থেকে বাঁচতে অবিরাম খতমে ইউনুস পড়তে লাগলেন মা। আমাদের সঙ্গে মাত্র সাত দিনের এক কন্যাশিশু, আমার ভাতিজি, কুশিয়ারা নদীর পর আরও বহু খাল-বিল পার হয়ে আমাদের ছোট নদী মাগুরায় আদৌ পৌঁছাতে পারবে কি না, এই আশঙ্কায় আমাদের সবার দৃষ্টি কাঁথায় মোড়ানো সেই ছোট্ট শিশুটির ওপর। শেষ পর্যন্ত সেদিন আমরা উদ্ধার পেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু এখনও নাও ভাসানোর কথা মনে এলেই তাতে উঠব, কী উঠব না, ভীষণ দ্বিধায় পড়ে যাই। এমনকি আরও পরে, অন্য অর্থে লিখিত আল মাহমুদের সেই কবিতাটি যখন পড়ার সুযোগ হলোÑ ‘কতদূর এগালো মানুষ!/ কিন্তু আমি ঘোরলাগা বর্ষণের মাঝে/আজও উবু হয়ে আছি’Ñ তখনও এই কবিতা পড়ার আনন্দের মধ্যেও সেই তুমুল ঝড়-বৃষ্টির স্মৃতি এসে পড়ে, মনে হয়, আর বুঝি দাঁড়াতে পারব না কোনো দিন।
কিন্তু এটা তো ঠিক যে, আমাকে পার হতে হবে, জগৎ-সংসাররূপী এই দধির ভাণ্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তো চলবে না, সব রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে পারে যাওয়ার সিদ্ধান্তও তো নিতে হবে। এই তাড়নায় চেষ্টাও অবশ্য কম করিনি একসময়।
তখন বিভিন্ন অঞ্চলের সীমান্তই ছিল আমার কাছে প্রবেশ দুয়ার, যার ভেতরে ঢুকতে পারলেই মুক্তি...গন্তব্য ইত্যাদি। এই সীমান্তে পৌঁছানোর নেশাটা আমার মনে ধরিয়ে দিয়েছিলেন আমার এক বন্ধু আকতারুজ্জামান টিটো। সীমান্তঘেঁষা বাজার, অদ্ভুত-সব মানুষজন, দালাল, বুঙা, কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত-নদী, খেয়া পারাপারের নাও আর সেই রহস্যময় খেয়ানিদের কথাই তিনি বলতেন।
এই নেশা থেকেই নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে আমার গল্পকার বন্ধু শেখ লুৎফর আর আমি, মাঝে মাঝে, সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আসার দুয়েক দিন আগে থেকেই সীমান্তের আশপাশে যাওয়ার জল্পনা করতাম এবং যথাদিনে রওনাও দিতাম। কখনও জাফলঙের পাহাড়ে, জৈন্তার খাসিয়াপুঞ্জিতে; কখনও সেই বাঁশতলার দিকে; কখনোবা সিলেটের জকিগঞ্জের সীমান্তঘাটে এবং লুভানদীর আশপাশ অঞ্চলে।
শেখ লুৎফর নিরন্তর গল্পখোঁজা লোক, এখানে এলেও তাই করেন, পরে এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে নানাবিধ গল্পও ফাঁদবেন; আমিও যে পরে একাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য কানা-লুলা পদ্য যে ফাঁদি না তা নয়। কিন্তু তা উপলক্ষ মাত্র, আমার লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। হয়তো কোথাও পৌঁছার জন্য দরজার খোঁজ করা, নয়তোবা ওপারযাত্রী নৌকায় ওঠে বসা, কারণ প্রায় দিনই কোথা থেকে যেন চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠে ভর করে লালন সাঁই ভেসে আসে : ‘পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়।’ তার পরও নাওয়ে বসা হয় না আমাদের; এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে ছুটির দিনের বৃহস্পতি-শুক্র চলে যায়। কীভাবে যে যায় জানি না, তবে ঘাটে পৌঁছতে না পারা আমাদের আঘাটায় যে ফেলে রেখে যায় তা ঠিক!
কখনও পথে, বিভিন্ন বাজারে বিভূতিভূষণ এসে হাজির হন, অবিকল এক আদর্শ হিন্দু হোটেল পেয়ে যাই, পাশাপাশি আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী হোটেলও এবং সৎ ও অবিচল হাজারি ঠাকুরের খোঁজে আমরা সেখানেই বসে সময় ধ্বংস করতে থাকি। বসতে বসতে কখনও শাহেদ আলীর স্মৃতিকথার কথাও মনে পড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের কাছে বাজারকে জমজমাট করার জন্যই নাকি একসময় গণিকাও আনা হতো। সন্ধ্যার পর থেকেই এসব বাজারের রূপ বদলে যায়। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, বটগাছের নিচের বেঞ্চিতে বসে, আলো-আঁধারঘেরা ছাফটা ঘরে বসে কত ধরনের আলাপ, কত ধরনের গুঞ্জন...। মনে হয় বাজারের সব লোকই যেন নানা রকম লেনদেনের জন্য কানাঘুষায় লিপ্ত। একাধিক অঞ্চলের বুঙার এসব দৃশ্যচিত্র শেষ পর্যন্ত এভাবেও মনে চলে আসে।
যে লোকেরা দলবেঁধে চলে,
বাও পেলে দুপুরে উঙায়
রাতে তারা ছিট-পথে ঘোরে
আড়ে আড়ে ব্যস্ত বুঙায়।
তারা আজ গোধূলিতে বসা
নাওখানি পাল তুলে যায়
আমাকেও সাথী হতে ডাকে,
লুভাতীরে অনেকেই চায়।
এসব বুঙা বা চোরাচালানের গল্পের সঙ্গে শুধু পণ্য নয়, নারী, জমি আরও কত কিছু যে জড়িত তা বুঝতে পারি শেখ লুৎফরের সঙ্গে সীমান্ত-অঞ্চলে বসবাসকারী তার এক বন্ধু লিটনের সঙ্গে আলাপের সময়। গল্পের কোনো শেষ নেই এখানে, একটি গল্পের লেঙুর ধরে আরেক গল্পের শুরু। অবশ্য পরে নিজের একান্ত স্মৃতিসঞ্চয় ভাঙিয়ে দেখেছি, কবিতারও শেষ নেই এখানে, সময়ে সুযোগে একটি-দুটি দৃশ্য, চিত্র, শব্দ ও গুঞ্জন যখন মাথায় ভর করে বসে, তখন কোনো না কোনো মাধ্যমে নামানো পর্যন্ত আর নিস্তার পাওয়া যায় না। কিন্তু এসব তো পথেরই কথা, পথেরই মায়া, গন্তব্যে আর যাওয়া হলো কই? শুরুতে উদ্ধৃত কবিতার বাকি অংশ পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে ভাবি, সুনামগঞ্জের ঘাটে গিয়ে যদি বলা হয়, ‘মধ্যনগর’ যেতে চাই আমি, মাঝি বলবে, বিশজন না হলে নাও ছাড়তে পারবে না সে। যদি জকিগঞ্জের সীমান্তঘাটে গিয়ে বলি, ‘করিমগঞ্জ যাব, ওপারের করিমগঞ্জ’, নাওয়ের খেয়ানি এসে বলবে, ‘পাসপোর্টে সিল মারাইছইননি, নাইলে তো হউ পারও গেলে বিএসএফ-এ আটকাইলিব?’
তাহলে কি বুঙার মালের মতো সময় বুঝে সকলের অগোচরে সাঁতরে পার হয়ে করিমগঞ্জে পৌঁছব আমি? কিন্তু আমার যে পানির ভয়।
সময়ে-অসময়ে কানে আসে সেই চন্দনা মজুমদারÑ সেই অনবদ্য লালনগান : ‘পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়/ রূপকাঠেরই নৌকাখানি নাই ডোবার ভয়।’ এবার সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে রূপকাঠের নাওয়ে ওঠার ব্যবস্থা করতে হবে, দুই হাতে দুই দধির ভাণ্ড হাতে নিয়ে কত দিন আর দাঁড়িয়ে থাকা যায়?