নিজাম বিশ্বাস
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:৪৪ পিএম
ডাকটিকিটে হেমিংওয়ে
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের যাপিত জীবনটাই ছিল এক রোমাঞ্চকর উপন্যাস। তিনি হুট করে কয়েকদিনের জন্য মাছ ধরতে চলে যেতেন গহিন সাগরে, আবার বন্ধুদের নিয়ে রীতিমতো ক্যাম্প পেতে চলত তার শিকার-অভিযান, অবসাদ কাটানোর জন্য চলে যেতেন পাহাড়ের নির্জনে। কিশোর বয়সে হেমিংওয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানের জন্য ইতালি গিয়েছিলেন। সেই ইতালির রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স চালানো অবস্থায় হঠাৎ মর্টারের আঘাতে একদিন প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গেলেন। অতঃপর হাসপাতালে ভর্তি, সেখানে এক সেবিকার প্রেমে পড়ে গেলেন। আবার আফ্রিকায় সাফারি ভ্রমণের সময় পরপর দুটি বিমান দুর্ঘটনায় অল্পের জন্যে তার বেঁচে ফেরা। অবশেষে ১৯৬১ সালের ২ জুলাই, ৬২তম জন্মদিনের মাত্র ১৯ দিন আগে, নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে বসলেন হেমিংওয়ে।
গত শতকের প্রায় প্রথামার্ধে যে কয়েকজন সাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যে রাজত্ব করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়ে থাকে আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে। মাত্র সাতটি উপন্যাস, ছয়টি ছোটগল্পের বই ও দুটি নন-ফিকশন নিয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্যে অমরত্ব পেয়েছেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেজ’ প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে, ১৯২৭ সালে ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’, ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’ ১৯৪০ সালে এবং তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে। ১৯৫৪ সালে তাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
তাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে জাদুঘর, নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্য, নামকরণ করা হয়েছে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ডাকটিকিট প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাকে স্মরণ করেছে অসংখ্যবার। হেমিংওয়েকে নিয়ে সর্বপ্রথম তিনটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল কিউবা। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত কিউবার ওই তিনটি ডাকটিকিটে হেমিংওয়ের প্রতিচ্ছবির পাশাপাশি তার উপন্যাস ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’, ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’ এবং কিউবায় অবস্থিত ‘হেমিংওয়ে জাদুঘর’ উঠে আসে। তিনি গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে কিউবায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। কিউবার রাজধানী হাভানার কাছে সাম ফ্রেম্পিসকো দে পাওলায় অবস্থিত যে বাড়িতে তিনি বাস করতেন, তার মৃত্যুর পর কিউবার সরকার বাড়িটিকে হেমিংওয়ে জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করে। জীবদ্দশায় ফিদেল ক্যাস্ত্রোর কিউবা থেকে অকল্পনীয় আতিথেয়তা পেয়েছিলেন তিনি এবং মৃত্যুর পরে কিউবাই হেমিংওয়েকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করেছে তাদের ডাকটিকিটে। হেমিংওয়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কিউবা ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ একটি দৃষ্টিনন্দন ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

১৯৫০ সালের ২৬ মে হাভানা বন্দর থেকে কাস্তিয়ো দেল মোরো প্রণালী ধরে ৩৬টি মাছ ধরার নৌকা যাত্রা করে। তার মধ্যে ‘পিলার’ নামের একটি নৌকা ছিল হেমিংওয়ের। সেটিই ছিল কিউবায় প্রথম আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক মাছ শিকার প্রতিযোগিতা। সাগরে মাছ শিকারের প্রতি ছিল হেমিংওয়ের দুর্বার আগ্রহ। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিযোগিতাটির নাম রাখা হলো তারই নামে। প্রতিযোগিতাটির নাম নিজের নামে পেয়ে হেমিংওয়ে শুধু সম্মানিতই হননি, বরং প্রথম তিনটি প্রতিযোগিতায় সবাইকে পেছনে ফেলে জিতে নেন শিরোপা। ১৯৭২ সালে কিউবা ডাকবিভাগ ‘বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’ শিরোনামে সাতটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে, এরমধ্যে একটি ডাকটিকিটে ‘আর্নেস্ট হেমিংওয়ে জাতীয় ফিশিং প্রতিযোগিতা’ কথাটি পুনর্মূদ্রণ করা হয় এবং ২০১০ সালে ‘আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আন্তর্জাতিক ফিশিং প্রতিযোগিতা’র ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কিউবার ডাকবিভাগ প্রকাশ করে আরও চারটি ডাকটিকিট। ডাকটিকিটগুলোতে যথাক্রমে উঠে এসেছে হেমিংওয়ের মুখাবয়ব সম্বলিত প্রতিযোগিতার লোগোসহ সাগরে মাছ ধরার দৃশ্য, একটি বিশাল আকৃতির মাছ, প্রতিযোগিতার ট্রফি ও শেষ ডাকটিকিটে ‘পিলার’-এর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রতিকৃতি।
২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর কিউবার ডাকবিভাগ থেকে প্রথমবারের মতো হেমিংওয়েকে নিয়ে সুভেনির শিটে ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-এর চিত্রায়ন আবারও দেখা যায়। কিউবা থেকে হেমিংওয়েকে নিয়ে সর্বশেষ সুভেনির প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল ‘কোপা কিউবা জাতীয় ডাকটিকিট প্রদর্শনী’ উপলক্ষে। সেই সুভেনিরে হেমিংওয়ের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য উঠে আসে। কিউবার শিল্পী হোসে ভিইয়া সবেরনের করা এ ভাস্কর্যটি রাখা আছে হাভানায় অবস্থিত হেমিংওয়ের প্রিয় পানশালা ফিওরিদিতায়।
কিউবার পাশাপাশি বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে হেমিংওয়েকে নিয়ে স্মারক ডাকটিকিট। ডাক প্রকাশের সেই শুরুটা হয়েছিল সাবেক চেকশ্লোভাকিয়া থেকে। ১৯৬৮ সালের ১৮ নভেম্বর চেক ডাকবিভাগ ‘ইউনেস্কোÑ ক্যারিকেচারে বিশ শতকের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ শিরোনামে সাতটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে, সেটের প্রথম ডাকটিকিটেই স্থান পায় হেমিংওয়ের একটি ক্যারিকেচার। এরপর ১৯৭৭ সালে হেমিংওয়ে বিশ্বের তিনটি দেশের ডাকটিকিটে উঠে আসেÑ দেশগুলো হলো মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র (১ জুলাই), গিনি বিসাউ (২৭ জুলাই) এবং প্যারাগুয়ে (৫ সেপ্টেম্বর)। ‘নোবেল পুরস্কারজয়ী’ শিরোনামে মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র প্রকাশ করে পাঁচটি ডাকটিকিটের সেট ও একটি সুভেনির শিট। সেটের তৃতীয় টিকিটে ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ নিয়ে হাজির হয়েছে হেমিংওয়ে এবং একমাত্র সুভেনিরে স্থান পেয়েছে বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আফ্রিকার আরেকটি দেশ গিনি বিসাউ নোবেল পুরস্কারের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশ করে ছয়টি ডাকটিকিট ও দুটি সুভেনির শিট। অন্যান্য নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে সেই ডাক প্রকাশে উঠে আসে হেমিংওয়ের নাম। একটি সুভেনিরে হেমিংওয়ের মুখাবয়বের পাশাপাশি ১৯২৭ সালে প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ ও ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ছোট গল্প ‘দ্য স্নো অব কিলিমানজারো’ দেখা যায়। দক্ষিণ আমেরিকার প্যারাগুয়ে ‘নোবেল পুরস্কারজয়ী’ শিরোনামে প্রকাশ করে আরও আটটি ডাকটিকিট ও একটি সুভেনির শিট। এর মধ্যে দ্বিতীয় ডাকটিকিটে দেখা যায় হেমিংওয়ে ও ১৯৩২ সালে প্রকাশিত তার নন ফিকশন ‘ডেথ ইন দ্য আফটারনুন’-এর চিত্রায়ন। জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্র তাকে নিয়ে একমাত্র ডাকটিকিটটি প্রকাশ করে ১৯৮৯ সালের ১৭ জুলাই। পরের বছর ২৭ নভেম্বর সুইডিশ ডাকবিভাগ ‘সাহিত্যে নোবেলজয়ী’ শিরোনামে চারটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে, এর মধ্যে একটি ডাকটিকিটে উঠে আসে হেমিংওয়ে। হেমিংওয়ের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতেও বিশ্বের তিনটি দেশ ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এশিয়া মহাদেশ থেকে ভিয়েতনাম, আফ্রিকা থেকে টোগো (চারটি ডাকটিকিট ও একটি স্মারক পাতা) এবং ইউরোপের দেশ মেসিডোনিয়া। এরপর ২০০২ সালে মোজাম্বিক ‘নোবল পুরস্কারজয়ী’ শিরোনামে চারটি ডাকটিকিট ও একটি সুভেনির প্রকাশ করে, সেই সেটের একটি টিকিটে দেখা যায় হেমিংওয়েকে। ডাকটিকিটের পাশাপাশি উদ্বোধনী খাম, বিশেষ সিলমোহরসহ আরও অনেক ডাক প্রকাশনা রয়েছে হেমিংওয়েকে কেন্দ্র করে। ডাকটিকিট ছাড়াও স্মারক মুদ্রা ও অন্যান্য অসংখ্য স্মারকে স্থান পেয়েছে হেমিংওয়ে। একই সঙ্গে স্থান পেয়েছে বিশ্বের অসংখ্য পাঠকের হৃদয়ে।
আহ, কে পায় এক জীবন হেমিংওয়ের!